চিকিৎসার মাধ্যমে কমানো যাবে বয়স, ফিরে পাওয়া যাবে তারুণ্য

· Prothom Alo

রূপকথার গল্পে আমরা প্রায়ই ফাউন্টেন অব ইয়ুথের কথা শুনি। অর্থাৎ যার পানি খেলে বুড়ো মানুষও তরতাজা তরুণ হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে কি বয়সের ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘোরানো সম্ভব? এত দিন যা কেবল সায়েন্স ফিকশনের পাতায় বন্দী ছিল, এবার চিকিৎসাবিজ্ঞানে ঠিক তেমন একটি জাদুকরী ঘটনার বাস্তব পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। প্রথমবারের মতো একজন মানুষের শরীরে এমন এক জিন থেরাপি প্রয়োগ করা হয়েছে, যার কাজ হলো বয়স্ক কোষগুলোকে নতুন করে তরুণ হতে বাধ্য করা!

যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের কোম্পানি লাইফ বায়োসায়েন্সেস এই যুগান্তকারী পরীক্ষাটি পরিচালনা করছে। গত ৯ জুন তারা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ইতিমধ্যে প্রথম এক রোগীর শরীরে এই থেরাপি প্রয়োগ করা হয়েছে।

Visit sportbet.reviews for more information.

বিজ্ঞানীরা এই পদ্ধতির নাম দিয়েছেন পার্শিয়াল রিপ্রোগ্রামিং। মানে, বয়স্ক কোষগুলোর ভেতরে থাকা নির্দিষ্ট তিনটি জিনকে চালু করে দেওয়া। এতে কোষগুলো এমন আচরণ করতে শুরু করে, যেন তারা আবার তরুণ বয়সে ফিরে গেছে!

বয়স্ক কোষগুলোকে কি নতুন করে তরুণ হতে বাধ্য করা সম্ভব?

বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য হলো, কোষগুলোকে পুরোপুরি স্টেম সেলে (যেখান থেকে কোষের জন্ম হয়) রূপান্তর না করে, তাদের বর্তমান পরিচয় ঠিক রেখেই শুধু তারুণ্যের শক্তিটুকু ফিরিয়ে দেওয়া। ব্যাপারটা অনেকটা এমন—একজন বয়স্ক মানুষ তার জীবনের সব অভিজ্ঞতা মনে রেখেছেন, কিন্তু তার শরীরে ফিরে এসেছে ২০ বছর বয়সের শক্তি ও সতেজতা!

বার্ধক্য কি ঠেকিয়ে দেওয়া সম্ভব
পার্শিয়াল রিপ্রোগ্রামিং মানে, বয়স্ক কোষগুলোর ভেতরে থাকা নির্দিষ্ট তিনটি জিনকে চালু করে দেওয়া। এতে কোষগুলো এমন আচরণ করতে শুরু করে, যেন তারা আবার তরুণ বয়সে ফিরে গেছে!

প্রাথমিকভাবে এই থেরাপিটি গ্লুকোমা নামে চোখের একটি ভয়ংকর রোগের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এই রোগে অপটিক নার্ভ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে মানুষ অন্ধও হয়ে যেতে পারে। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের এই স্নায়ুকোষ বা নিউরনগুলো একবার নষ্ট হলে আর নতুন করে তৈরি হয় না। কিন্তু বিজ্ঞানীদের আশা, ওই তিনটি জিন চালু করার মাধ্যমে অপটিক নার্ভের নিউরনগুলোকে নতুন করে জন্ম নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে।

কিন্তু শরীরের এত অঙ্গ থাকতে চোখ কেন? ওয়াশিংটনের প্রিভেন্টিভ মেডিসিন কোম্পানি অপটিস্প্যানের সহপ্রতিষ্ঠাতা ম্যাট কেবারলেইন এর চমৎকার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই প্রযুক্তির যেমন বিশাল সম্ভাবনা আছে, তেমনি ভয়ংকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও অনেক বেশি। সবচেয়ে বড় ভয় হলো, কোষগুলোকে তরুণ করতে গিয়ে সেগুলো যদি ক্যান্সারে রূপ নেয়! তাই চোখ হচ্ছে এই পরীক্ষা চালানোর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। কারণ চোখের কোনো ছোটখাটো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মানুষের জীবনের জন্য সরাসরি কোনো বড় হুমকি তৈরি করবে না।’

২০২০ সালে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ডেভিড সিনক্লেয়ারের ল্যাবে একটি পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত অপটিক নার্ভওয়ালা বয়স্ক ও গ্লুকোমায় আক্রান্ত ইঁদুরের শরীরে এই তিনটি জিন চালু করে দেখা যায়, ইঁদুরগুলোর দৃষ্টিশক্তি ফিরে এসেছে! তখন থেকেই লাইফ বায়োসায়েন্সেস ইঁদুর ও বানরের ওপর এই পদ্ধতির পরীক্ষা চালিয়ে আসছে।

বয়স বাড়লে মানুষের মস্তিষ্কও কি বুড়ো হয়
গ্লুকোমা রোগে অপটিক নার্ভ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে মানুষ অন্ধও হয়ে যেতে পারে। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের এই স্নায়ুকোষ বা নিউরনগুলো একবার নষ্ট হলে আর নতুন করে তৈরি হয় না।

মানুষের ওপর এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে মোট ১২ জন গ্লুকোমা রোগীকে যুক্ত করা হবে। পরে 'NAION' নামে আরেকটি জটিল চোখের রোগের রোগীদেরও এখানে যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে।

কিন্তু জিনগুলো শরীরে ঢোকানো হবে কীভাবে? বিজ্ঞানীরা এখানে জিন থেরাপিতে ব্যবহৃত একটি সাধারণ ভাইরাসকে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে ব্যবহার করছেন। এই ভাইরাসটি ওই তিনটি জিনকে বহন করে রেটিনার গ্যাংলিয়ন কোষে পৌঁছে দেবে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো এর সুরক্ষাব্যবস্থা। রোগীর শরীরে এই জিনগুলো নিজে নিজে কাজ শুরু করতে পারবে না। রোগীকে যখন ডক্সিসাইক্লিন নামে একটি নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হবে, কেবল তখনই জিনগুলো কাজ করা শুরু করবে। ওষুধ দেওয়া বন্ধ করলেই জিনগুলো আবার বন্ধ হয়ে যাবে! লাইফ বায়োসায়েন্সেসের চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার শ্যারন রোজেনজউইগ-লিপসন বলেন, ‘এই ব্যবস্থাটি আমাদের হাতে পুরো নিয়ন্ত্রণ এনে দিয়েছে। কোষগুলোকে তরুণ করার জন্য ঠিক যতটুকু সময় দরকার, আমরা ততটুকু সময়ই এটি চালু রাখতে পারব।’

বয়স বাড়লেও কিছু মানুষ কীভাবে সুস্থ থাকে
বিজ্ঞানীরা এখানে জিন থেরাপিতে ব্যবহৃত একটি সাধারণ ভাইরাসকে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে ব্যবহার করছেন। এই ভাইরাসটি ওই তিনটি জিনকে বহন করে রেটিনার গ্যাংলিয়ন কোষে পৌঁছে দেবে।

অমরত্বের পথে কি একধাপ এগোলাম আমরা

গ্লুকোমা রোগীদের জন্য এই ট্রায়াল সফল হলে তা চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বিশাল আশীর্বাদ হবে। কিন্তু এর মানে কি এই যে মানুষ দীর্ঘায়ু লাভের চাবিকাঠি পেয়ে গেল?

মেলবোর্নের সেন্টার ফর আই রিসার্চের স্নায়ুজীববিজ্ঞানী পিট উইলিয়ামস বলেন, ‘এই পদ্ধতি সত্যিই মানুষের আয়ু বাড়াতে পারবে কি না, তা এখনো অনেক বড় একটি প্রশ্ন।’

লাইফ বায়োসায়েন্সেস কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে বেশ সতর্ক। শ্যারন রোজেনজউইগ-লিপসন পরিষ্কার করেই বলেছেন, ‘আমরা এখনই পুরো শরীরকে তরুণ করার কথা ভাবছি না। আমরা একবারে একটি বয়সভিত্তিক রোগের সমাধান নিয়ে এগোচ্ছি। হয়তো কোনো একদিন আমরা পুরো শরীরকে তারুণ্য ফিরিয়ে দেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছাব, কিন্তু সেই সময়টা এখনো আসেনি।’

প্রচুর প্রত্যাশা ও উত্তেজনার পারদ চড়লেও পিট উইলিয়ামস একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। এই প্রযুক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে বিপুল উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তাতে যদি এই পরীক্ষা কোনো কারণে মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়, তবে ভবিষ্যতের এমন সব জিন থেরাপির গবেষণাই বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।

তবুও, বিজ্ঞানের এই সাহসী পদক্ষেপ মানুষের মনে একটি নতুন আশার প্রদীপ তো জ্বালিয়েছেই। হয়তো অদূর ভবিষ্যতেই বার্ধক্য নামের শব্দটিকে আমরা শুধু একটি চিকিৎসাযোগ্য রোগ হিসেবেই দেখতে পাব!

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকানবয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরের চামড়া কুঁচকে যায় কেন?

Read full story at source