বাজারে যখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত সুস্বাদু জাতগুলোর মধ্যে ক্ষীরসাপাতি ও ল্যাংড়া আম থাকে, তখন আমের ভরা মৌসুম ধরা হয়। এর পরও যুক্ত হয়েছে আম্রপালি, বারি-৪ ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো। কদর কম হলেও কম মিষ্টি আম লক্ষণভোগ বা লখনাসহ আরও নানা জাতের গুটি আমের সমাহারে দেশের বৃহত্তর কানসাট আমের বাজার জমজমাট। জুন মাসের প্রথম দিন থেকে বাজার শুরু হলেও এ অবস্থা চলছে গত এক সপ্তাহ থেকে। তবে দাম নিয়ে আমচাষিরা অসন্তুষ্ট।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
বৃহস্পতি ও শুক্রবার বাজার ও বাগান ঘুরে দেখা গেছে, চারদিকে শুধু আম। কানসাট বাজারের দিকে যত রাস্তা ঢুকেছে, সেসব রাস্তায় আমবোঝাই রিকশা ও ভ্যানের সারি। কানসাট বাজারের সামনে শিবগঞ্জ-সোনা মসজিদ সড়কের সামনে যানজট। বাজারে ঢোকার প্রধান সড়কে এক দিক দিয়ে বিক্রির জন্য ঢুকছে আম। অন্যদিক দিয়ে বের হচ্ছে বিক্রি হওয়া আমবোঝাই যানবাহনের সারি।
আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্ষীরসাপাতি ও ল্যাংড়া আমের দাম নিয়ে আমচাষিদের মধ্যে রয়েছে হতাশা। ক্ষীরসাপাতি আমের এখন শেষ দিক। ল্যাংড়া আম বিক্রেতারা বলছেন, স্বাদে-গন্ধে ক্ষীরসাপাতির তুলনায় কোনো অংশে কম না হলেও ল্যাংড়া আম বিক্রি হচ্ছে পানির দরে। আর লক্ষণভোগের তেমন দরই নেই। তার ওপর আম বিক্রি করতে হচ্ছে ৫৪ থেকে ৫৬ কেজিতে মণ ধরে। এরপর কুলি, ওজনদার ও আড়তের শ্রমিকদের আম দিতে দিতে ৬০ কেজিতে মণ, মানে দেড় মণে এক মণের দাম পাচ্ছেন আমচাষিরা। কাঙ্ক্ষিত লাভ না হলেও বা লোকসান গুনলেও বংশপরম্পরার এ পেশা তাঁরা ত্যাগ করতে পারছেন না।
কানসাটের আব্বাস বাজারের আমচাষি আশরাফুল ইসলাম বলেন, ক্ষীরসাপাতি আম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা মণ।
আমচাষি আবদুস সালাম বলেন, ল্যাংড়া আম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। একই দামে বিক্রি হচ্ছে আম্রপালি।
আমচাষি গোলাম নবী নিয়ে এসেছেন ব্যানানা ম্যাঙ্গো। দাম চান পাঁচ হাজার টাকা মণ। ক্রেতা ৪ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত বলেছেন, কিন্তু তিনি ওই দামে বিক্রি করেননি।
কানসাট থেকে এক যুগ ধরে অনলাইনে আমের ব্যবসা করছেন মো. ওয়াহিদ। শনিবার সকালে কানসাট আমের বাজার থেকে মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজ বাজারে অনলাইন সেলার (বিক্রেতা) ও বাইরের ব্যাপারীদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। আমের বাজারও চড়া আজ। ক্ষীরসাপাতি ৩–৫ হাজার, ল্যাংড়া ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা, আম্রপালি ১ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা, ব্যানানা ম্যাঙ্গো ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে। আজ বাজারে আমের দাম সর্বোচ্চ। এটা স্থায়ী হবে কি না বা আরও বাড়বে নাকি কমবে, তা আগাম বলতে পারছি না।’
শুক্রবার দুপুরে কানসাট বাজারে আসা আমচাষি ও চাষি সংগঠনের নেতা আহসান হাবিব বলেন, পুরোপুরি পরিপক্ব না হলেও গত এক সপ্তাহ থেকে নামছে বিদেশি জাতের আম্রপালি ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো। নামছে কাটিমন আমও। এসব বিদেশি জাতের আমের কারণে দেশের ঐতিহ্যবাহী ক্ষীরসাপাতি ও ল্যাংড়া আম এখন কোণঠাসা। কিছুদিনের মধ্যেই বাজারে নামবে ঐতিহ্যবাহী ফজলি আম। ফজলিরও করুণ দশা। অথচ চাঁপাইনবাবগঞ্জে অন্যান্য জাতের তুলনায় ফজলির ফলনই বেশি।
ফজলি আমের ভারে নুয়ে পড়েছে গাছের ডাল। শুক্রবার দুপুরে শিবগঞ্জ উপজেলার একটি ফজলি আমের বাগানেশিবগঞ্জের নেতৃস্থানীয় আমচাষি ইসমাইল হোসেন খান শিবগঞ্জের একাডেমি মোড়ের একটি আমবাগানে নিয়ে যান। সেখানে দেখা যায়, বড় বড় বেশ কিছু প্রায় শতবর্ষী ফজলি আমের গাছ। আম ঝুলছে ডালে ডালে। আমের ভারে কোনো কোনো ডাল নুয়ে পড়েছে। একেকটি বড় গাছে ৩০-৪০ মণ আম ধরে।
ইসমাইল হোসেন খান বলেন, জেলার অন্য চার উপজেলায় যে আম উৎপাদন হয়, তার থেকে বেশি হয় শিবগঞ্জ উপজেলায়। একসময় ৮০ শতাংশই ছিল ফজলি আমের গাছ। এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। কয়েক বছর থেকে আশানুরূপ দাম না পেয়ে ফজলি আমের গাছ কেটে ফেলছেন আমচাষিরা, অথবা লাগাচ্ছেন হাইব্রিড জাতের আমগাছ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও কৃষি উদ্যোক্তা মুঞ্জের আলম (৪৯) বলেন, ‘১৫ বছর থেকে কৃষি পেশায় যুক্ত আছি। কিন্তু অনেক কষ্ট করে খরচ করে আম উৎপাদন করে কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছি না। আগে জানলে এ পেশায় যুক্ত হতাম না। আমের প্রক্রিয়াজাত না এগোলে আমের ভবিষ্যৎ নেই। এখন সে চেষ্টাই করে যাচ্ছি।’
মুঞ্জের আলম আরও বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরসাপাতি, ল্যাংড়া, আশ্বিনা ও ফজলি আম জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এখানকার অর্থনীতিতে আমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকা আমের ওপর নির্ভরশীল। এখানে ছয়–আট হাজার কোটি টাকার আম বেচাকেনা হয়। কিন্তু আমের উন্নয়নে সরকারের ভূমিকা মোটেও সন্তোষজনক নয়। এখানে একটি আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্র রয়েছে। সেখানেও জনবল–সংকট লেগেই থাকে। নেই উন্নত গবেষণাগার। এটাকে একটি পূর্ণাঙ্গ আম গবেষণাকেন্দ্র, অর্থাৎ আম গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার দাবি উপেক্ষিত হয়ে আসছে।
