স্মৃতিতে সাখাওয়াত আলী খান

· Prothom Alo

৯ মার্চ গভীর রাতে অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের কন্যা ও বিভাগের প্রাক্তনী সুমনা শারমীনের ফোনটি পেয়েই বুঝতে পারলাম খারাপ কিছু ঘটেছে। যোগাযোগের শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা পাঠ্যবইয়ে পড়েছি, যোগাযোগের ক্ষেত্রে সময়ের ডাইমেনশন বা মাত্রা কীভাবে বার্তার অর্থ বদলে দেয়।

Visit bettingx.club for more information.

ফোনটি পাওয়ামাত্রই অবাচনিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে বুঝতে পারলাম খারাপ কিছু ঘটেছে। সংবাদটি যখন পরিচিতজনদের জানালাম, তখন লিখলাম, ‘স্যার চলে গেলেন’। কেন জানি লিখতে পারলাম না, স্যার ‘মৃত্যুবরণ’ করেছেন। শ্রুতিকটু শব্দের বদলে কোমলতর শব্দের এই যে প্রয়োগ, একেই বলা হয় ‘ইউফেমিজম’ বা ‘মঞ্জুভাষণ’। আর এটি আমাদের প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষে স্যারই শিখিয়েছিলেন।

ভাষার উৎপত্তি নিয়ে স্যারের ক্লাসগুলো তাঁর পড়ানোর গুণেই খুব মজাদার হয়ে উঠত। মঞ্জুভাষণ বোঝাতে স্যার একবার গ্রামবাংলার সেই চেনা উদাহরণ দিলেন—কীভাবে আগেকার দিনের বাড়ির বধূরা শ্রদ্ধা ও লোকলজ্জার খাতিরে স্বামী-শ্বশুর বা ভাশুরের নাম মুখে আনতেন না; বরং সেই নামের বদলে অন্য শব্দ ব্যবহার করতেন। স্যারের মুখে এমন উদাহরণ শুনে আমাদের স্মৃতি থেকে একে একে বেরিয়ে এল নানা চেনা গল্প।

আমার মনে পড়ল ছোট দাদির (আব্বার ছোট চাচি) কথা। তিনি ‘কোরমাপ্রেমী’ হওয়া সত্ত্বেও কোরমার বদলে বলতেন ‘সাদা তরকারি’, কারণ দাদার নাম ছিল কোরবান (সাধারণের উচ্চারণে ‘কোরমান’)। সহপাঠী আশরাফের মনে পড়ল, তার দাদার নাম লিচু মিয়া হওয়ার কারণে দাদি লিচুকে বলতেন ‘কাঁটা ফল’। সবার এমন ব্যক্তিগত আর প্রাণবন্ত গল্পে স্যারকে ঘিরে সেদিনের ক্লাসটি অনন্য হয়ে উঠেছিল।

স্যার অত্যন্ত গুণী একজন মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর আচরণে কোনো রাশভারী ভাব ছিল না। ফলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটি সহজ হয়ে উঠত দ্রুত। স্যারের ক্লাসেই আবিষ্কার করেছিলাম এক অদ্ভুত সুন্দর সত্য—অভিধান ভাষার গুরু নয়, বরং মানুষের বলা ভাষা থেকেই একসময় জন্ম নেয় অভিধান। পাঠ্যবইয়ের এক কঠিন তত্ত্বের সহজ উপস্থাপক ছিলেন তিনি। সেই বইটির লেখক সম্ভবত ছিলেন উইলবার শ্র্যাম। 

স্যারের নামটা আমার ফোনে এখনো ‘স্যাক-স্যার’ হিসেবেই লেখা আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস রুটিনে তাঁর নামটা সংক্ষেপে লেখা থাকত ‘এসএকে’। আমরা শিক্ষার্থীরা আড়ালে তাঁকে সেই আদ্যক্ষর মিলিয়ে ডাকতাম ‘স্যাক’ নামে। ইংরেজি শব্দের সমার্থক বিচারে স্যারের এই নামের সঙ্গে কোনো মিলই ছিল না তাঁর চরিত্রের। ‘স্যাক’ মানে আমরা যা জানি, স্যার মোটেও তেমন ছিলেন না। তিনি ছিলেন দারুণ চটপটে আর সদা পরিপাটি। কিংবা কর্মজীবনে কাউকে কখনো ‘স্যাক’ (বরখাস্ত) করার মতো কঠোর হতেও তাঁকে দেখা যায়নি।

পড়াতে বড় ভালোবাসতেন স্যার। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারলে তিনি ছটফট করতেন। অসুস্থ হয়ে যখন হাসপাতালে, শেষ দেখাটা হলো সেখানে। তবে বিভাগে শেষ দেখার স্মৃতিটা ভুলব না। দেখা হতেই ‘কী হে’ বলে আমার কাঁধে যখন স্নেহের হাতটি রাখলেন, পরম মমতায় স্যারের সেই হাত দুটো তুলে নিয়েছিলাম নিজের মাথায়।

আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের একদম শুরুর দিনগুলো থেকেই তিনি স্থান নিয়েছিলেন। কেননা, আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, তখন স্যারই ছিলেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপারসন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন বিভাগ অনুযায়ী আলাদা ভর্তি পরীক্ষা হতো। আমি তখন চারটি বিভাগে পরীক্ষা দিয়ে সবার আগে যেখানে ভর্তি শুরু হলো, সেখানেই ভর্তি হয়ে গিয়েছি। কিন্তু কিছুদিন পরেই মনে হতে শুরু করল, ‘গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা’ বিভাগটি বেশি মজার। 

কলাভবনের নিচতলার করিডরে ওই বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের সপ্রতিভ পদচারণ আর গভীর যোগাযোগ দেখলেই তা বোঝা যেত। একদিন হুট করেই সরাসরি ঢুকে পড়লাম বিভাগীয় চেয়ারপারসনের রুমে। প্রকাণ্ড টেবিলের ওপাশে যে হাস্যোজ্জ্বল মানুষটি বসে ছিলেন, তাঁকে অবলীলায় বলে ফেললাম নিজের ইচ্ছার কথা, জানালাম যে আমি এই বিভাগেই চলে আসতে চাই। স্যার মোটেও আনুষ্ঠানিকতা দেখালেন না, বরং সহজ সব নিয়ম বাতলে দিলেন। তাঁর হাত ধরেই শুরু হলো সাংবাদিকতা বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার যাত্রা। 

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব একেকটি সংস্কৃতি গড়ে ওঠে সেখানকার গল্পকথা বা মিথ ঘিরে। সাখাওয়াত স্যারও সেই ‘মিথ’-এর বড় অংশজুড়ে থাকবেন। যেমন বাজেট নিয়ে এক রিকশাওয়ালার সেই মন্তব্য। রিকশাওয়ালা তাঁকে বলেছিল, ‘স্যার, বাজেট দিলে যদি সবকিছুর দাম বাড়ে, তাইলে বাজেটটা না দিলে হয় না?’ এর পর থেকে দেশে প্রতিবার বাজেট উপস্থাপনের সময় আমাদের স্যারের সেই গল্পের কথা মনে পড়ে যায়। 

গত বছর অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক স্যারের স্মরণসভায় যখন তিনি এসেছিলেন, তখন শরীর ভালো কি না জানতে চাওয়ায় হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলেছিলেন, ‘জীবনে অনেক কিছু দেখলাম, টিকিটের পয়সা উশুল।’

পড়াতে বড় ভালোবাসতেন স্যার। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারলে তিনি ছটফট করতেন। অসুস্থ হয়ে যখন হাসপাতালে, শেষ দেখাটা হলো সেখানে। তবে বিভাগে শেষ দেখার স্মৃতিটা ভুলব না। দেখা হতেই ‘কী হে’ বলে আমার কাঁধে যখন স্নেহের হাতটি রাখলেন, পরম মমতায় স্যারের সেই হাত দুটো তুলে নিয়েছিলাম নিজের মাথায়।

স্যারের প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে যেন একটি পূর্ণ প্রজন্মের প্রস্থান দেখছি। সেই প্রজন্মের সঙ্গে যখন বর্তমানকে তুলনা করি, তখন বুঝি শিক্ষার্থীদের আগের প্রজন্মের গুণী শিক্ষকেরা অনেকটা সময় এবং মনোযোগ দিতেন। তাঁদের জীবনের কেন্দ্রস্থলেই ছিল শিক্ষার্থীরা। তবে আমরা তো জানি, একজন খাঁটি শিক্ষকের কখনো অবসর হয় না, মৃত্যুও হয় না। তিনি যা শিখিয়েছেন, তা তো ভুলিনি। তাহলে?

ড. গীতি আরা নাসরিন অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Read full story at source