‘অনার কিলিং’: যে হত্যার কাহিনি সিনেমাকেও হার মানায়

· Prothom Alo

মেয়ের খোঁজ নেই। বাবা কখনো থানায় ছুটছেন, কখনো তদন্ত সংস্থার দোরগোড়ায়, আবার কখনো আদালতে গিয়ে মেয়েকে খুঁজে দেওয়ার আর্তি জানাচ্ছেন। টানা সাত বছর ধরে চলতে থাকে এই দৌড়ঝাঁপ। দীর্ঘ এই সময়ে থানা-পুলিশ, ডিবি, পিবিআই ও সিআইডি—এই চার সংস্থা তদন্ত করে বিষয়টির সুরাহা করতে পারেনি। প্রতিটি সংস্থাই তদন্ত করে বলেছে, নিখোঁজের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তদন্তে অসন্তুষ্টির কথা জানান বাবা। তিনি চারবারই নারাজি দেন। মামলা চালাতে গিয়ে তিনি জমিজমা বিক্রি করেছেন, ঋণ করেছেন। এরপরও নতুন করে তদন্ত চেয়েছেন। মেয়ে নিখোঁজের পেছনে জামাতার হাত রয়েছে বলে সন্দেহের কথা বলছিলেন তিনি।

মেয়েটির বাবা এবার বিচারবিভাগীয় তদন্তের আবেদন করেন। বিচার বিভাগীয় তদন্তের পর আবারও মামলার নির্দেশ দেন আদালত। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পিবিআইকে।

Visit casino-promo.biz for more information.

এবার পিবিআই বাবার অভিযোগ নয়, মেয়েটির স্বামীর করা নিখোঁজের জিডির (সাধারণ ডায়েরি) সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে। সেই জিডিতে মেয়েটির একটি মুঠোফোন নম্বর উল্লেখ করা হয়েছিল। সেটার সূত্র ধরেই তদন্তে বেরিয়ে আসে, ২০১৫ সালের জুলাইয়ে মেয়েটিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। পরে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। একজনকে ভাড়া করে মেয়ের বাবাই এই কাজ করেছিলেন।

টাঙ্গাইলের কালিহাতী থানা-পুলিশ, টাঙ্গাইল জেলা গোয়েন্দা পুলিশ, পিবিআই ও সিআইডি এই মামলার তদন্ত করে। প্রতিটি সংস্থাই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কুদ্দুছ মিয়া নারাজি দেন।

জিজ্ঞাসাবাদে মেয়েটির বাবা তদন্তকারীদের বলেছেন, মেয়েটি পরিবারের অমতে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন। এতে তাঁর ও পরিবারের ‘সম্মানহানি’ হয়। সেই ক্ষোভ থেকে মেয়েকে হত্যা করে জামাতাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেন তিনি। পাশাপাশি নিজের অপরাধ ঢাকতে তিনি মেয়েটির স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন।

মেয়েটির নাম পারুল আক্তার। তাঁর বাবার নাম মো. কুদ্দুছ মিয়া। তাঁদের বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতীর ঘড়িয়া পশ্চিমপাড়ায়। ২০১২ সালের ২৮ মে বাসা থেকে পালিয়ে একই গ্রামের নাসির উদ্দিনকে (বাবু) বিয়ে করেছিলেন পারুল। এরপর তিন বছর তাঁরা ঢাকার আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় বসবাস করেন। পারিবারিক কলহের জেরে ২০১৫ সালে পারুল বাবার কাছে ফিরে যেতে চান। এই সুযোগে ২০১৫ সালের ২২ জুলাই পারুলকে কৌশলে জয়পুরহাটের পাঁচবিবির কলন্দপুর এলাকায় নিয়ে যান কুদ্দুছ মিয়া। এরপর পারুলকে খুন করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেন।  

পিবিআই এই হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে। তখন কুদ্দুছ মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারিতে পিবিআই সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শিরোনামে প্রকাশিত বইয়ে পারুল হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

পারুল আক্তারকে হত্যায় গ্রেপ্তার বাবা মো. কুদ্দুছ মিয়া

যেভাবে খুন হন পারুল

পিবিআই জানায়, পালিয়ে বিয়ে করার পর তিন বছর পারুল আক্তারের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ ছিল না। পারুল ও তাঁর স্বামী নাসির উদ্দিন ঢাকার আশুলিয়া এলাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। তবে তাঁরা যা আয় করতেন, তাতে সংসার চলত না। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। বিয়ের সাড়ে তিন বছর পর ২০১৫ সালের জুলাই মাসে বাবা কুদ্দুছ মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেন পারুল। তিনি মেয়েকে বাড়ি ফিরে যেতে বলেন। বাবার কথায় ২০১৫ সালের ১৯ জুলাই স্বামীর সংসার ছেড়ে টাঙ্গাইলে ফিরে যান পারুল।

পালিয়ে বিয়ে করায় পারুলের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন কুদ্দুছ মিয়া। তিনি মনে করতেন, মেয়ের কারণে চরমভাবে তিনি অপমানিত হন। সেই রাগ ও ক্ষোভ থেকে তিনি মেয়েকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। সেই পরিকল্পনার কথা জানান তাঁর বন্ধু ও ভাড়াটে খুনি মোকাদ্দেছ ওরফে মোকা ডাকাতকে। তাঁরা হত্যার স্থান নির্ধারণ করেন মোকাদ্দেছের শ্বশুরবাড়ি জয়পুরহাটের পাঁচবিবির কলন্দপুর গ্রামে তুলসীগঙ্গা নদীর পাড়। হত্যার পরিকল্পনার পর কুদ্দুছ মিয়া মেয়েকে জানান, তাঁকে ভালো ছেলের সঙ্গে তিনি বিয়ে দিতে চান। সে জন্য জয়পুরহাট যেতে হবে। বাবার কথায় বিশ্বাস করেন পারুল। ২২ জুলাই পারুল বাবার সঙ্গে জয়পুরহাট যান। ওই দিন রাতেই ঘটনাস্থলে যান। সেখানে ওড়না দিয়ে পারুলের হাত-পা বাঁধেন তাঁর বাবা আবদুল কুদ্দুছ ও ভাড়াটে খুনি মোকাদ্দেছ। পারুলের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন তাঁর বাবা আবদুল কুদ্দুছ। এরপর পারুলের লাশ তুলসীগঙ্গা নদীতে ফেলে ওই রাতেই টাঙ্গাইলে ফিরে আসেন কুদ্দুছ মিয়া। ঘটনাস্থলটি ভাড়াটে খুনি মোকাদ্দেছের শ্বশুরবাড়ি হওয়ায় সেখানকার নির্জনতা সম্পর্কে তিনি জানতেন। তিনি ওই এলাকায় ২৫ বছর ধরে বসবাস করেন। পাশাপাশি তিনি ডাকাতিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তদন্তকারীরা বলছেন, এ ঘটনা একটি ‘অনার কিলিং’। অনার কিলিং বলতে বোঝায়—পরিবারের তথাকথিত সম্মান রক্ষা বা সম্মানহানির জন্য পরিবারের সদস্যকে হত্যা করা। সাধারণত প্রেম করে বিয়ে করা, পরিবারবিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া বা সামাজিক রীতির বাইরে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ‘অনার কিলিংয়ের’ ঘটনা ঘটে। পাকিস্তানে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড প্রায়ই ঘটে থাকে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনার নজির কম। তবে বিচ্ছিন্নভাবে ঘটছে।

জিজ্ঞাসাবাদে মেয়েটির বাবা তদন্তকারীদের বলেছেন, মেয়েটি পরিবারের অমতে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন। এতে তাঁর ও পরিবারের ‘সম্মানহানি’ হয়। সেই ক্ষোভ থেকে মেয়েকে হত্যা করে জামাতাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেন তিনি। পাশাপাশি নিজের অপরাধ ঢাকতে তিনি মেয়েটির স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন।

মুঠোফোনের সূত্র ধরে হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন

পারুল আক্তার হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন ঢাকা জেলা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) বিশ্বজিৎ বিশ্বাস। বর্তমানে তিনি গাজীপুর জেলা পিবিআইতে এসআই হিসেবে কর্মরত। তিনি গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোকে জানান, পারুল তাঁর স্বামীর ঘর ছাড়ার আগে একটি মুঠোফোন নম্বরে কথা বলেছিলেন। ওই নম্বরটি সে সময় পারুলের বাবা ব্যবহার করতেন। তবে পারুল হত্যার পর তিনি নম্বরটি বন্ধ করে দেন। পরে এই নম্বরের বিষয়টি পারুলের পরিবার সম্পূর্ণ অস্বীকার করে।

সাড়ে সাত বছর পর আবার তদন্তে দেখা যায়, নম্বরটি তখন রংপুরের এক পোশাককর্মী ব্যবহার করছেন, যার সঙ্গে পারুল বা তাঁর পরিবারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। দীর্ঘদিন নম্বরটি বন্ধ থাকায় মুঠোফোন কোম্পানি সেটি আবার বিক্রি করে দেয়। পরে পারুলের পরিবারের ২২ জন সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করে নম্বরটির বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়।
এসআই বিশ্বজিৎ বিশ্বাস জানান, এরপর আবদুল কুদ্দুছকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, তিনিই মেয়ের হত্যাকারী। মেয়েকে হত্যার পর লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেন।

কুদ্দুস মিয়াকে নিয়ে পারুল আক্তারকে হত্যার ঘটনাস্থলে যান পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তারা

পারুলের স্বামীকে ফাঁসাতে বাবার প্রাণান্ত চেষ্টা

মেয়ে পারুলকে হত্যার পর কুদ্দুছ মিয়া টাঙ্গাইল জেলার আদালতে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় পারুলের স্বামী নাসির উদ্দিনকে আসামি করেন।

মামলায় কুদ্দুছ মিয়া অভিযোগ করেন, পালিয়ে বিয়ে করার পর পারুল তাঁর স্বামী নাসিরকে নিয়ে আশুলিয়ার জামগড়ায় বসবাস করছেন। তবে অনেক দিন মেয়ের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বন্ধ থাকায় তিনি মেয়ের ঠিকানা সংগ্রহ করেন। এরপর ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই তিনি জামগড়ার সেই ঠিকানায় আসেন। বাসায় মেয়ের স্বামী নাসিরকে পেলেও মেয়েকে পাননি। এ বিষয়ে নাসিরকে জিজ্ঞাসা করেন তিনি। তবে নাসির কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে তিনি টাঙ্গাইলে ফিরে মামলা করেন।

পিবিআই বলছে, টাঙ্গাইলের কালিহাতী থানা-পুলিশ, টাঙ্গাইল জেলা গোয়েন্দা পুলিশ, পিবিআই ও সিআইডি এই মামলার তদন্ত করে। প্রতিটি সংস্থাই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কুদ্দুছ মিয়া নারাজি দেন। সর্বশেষ সিআইডির দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে কুদ্দুছ মিয়া নারাজি দিলে আদালত সেটি খারিজ করে দেন। এর বিরুদ্ধে কুদ্দুছ মিয়া আপিল করেন। পরে বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয়। বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন সংযুক্ত করে কুদ্দুছ মিয়া ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগ দেন। পরে আদালত আশুলিয়া থানাকে মামলা নিতে নির্দেশ দেন। ঢাকা জেলা পিবিআইকে মামলার তদন্তের নির্দেশ দেন।

২০২২ সালের ১১ ডিসেম্বর আশুলিয়া থানায় পারুল আক্তারের স্বামী নাসির উদ্দিন এবং তাঁর এক মামাকে আসামি করে মামলা করা হয়। পিবিআই দুজনকেই গ্রেপ্তার করে। তবে পিবিআইয়ের তদন্তে তাঁদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। উল্টো মামলার বাদী কুদ্দুছ মিয়া ও তাঁর বন্ধু ভাড়াটে খুনি মোকাদ্দেছ ওরফে মোকা ডাকাতের সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে। সেই সঙ্গে এই মামলা থেকে নাসির উদ্দিনকে অব্যাহতি দেয় পিবিআই।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, এ ঘটনা একটি ‘অনার কিলিং’। অনার কিলিং বলতে বোঝায়, পরিবারের তথাকথিত সম্মান রক্ষা বা সম্মানহানির জন্য পরিবারের সদস্যকে হত্যা করা। সাধারণত প্রেম করে বিয়ে করা, পরিবারবিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া বা সামাজিক রীতির বাইরে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ‘অনার কিলিংয়ের’ ঘটনা ঘটে। পাকিস্তানে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড প্রায়ই ঘটে থাকে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনার নজির কম। তবে বিচ্ছিন্নভাবে ঘটছে।

পারুলের লাশের সন্ধান

হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর পিবিআইয়ের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা খোঁজ শুরু করেন পারুল আক্তারের লাশ কোথায়। বাবা আবদুল কুদ্দুছের জবানবন্দির ভিত্তিতে তাঁরা চলে যান পাঁচবিবি থানায়। থানার নথি পর্যালোচনা করে দেখেন, ২০১৫ সালের ২৩ জুলাই পাঁচবিবির কলন্দপুরের তুলসীগঙ্গা নদী থেকে এক নারীর অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ওই দিনই পাঁচবিবি থানায় একটি হত্যা মামলা করে পুলিশ। তবে ওই নারীর পরিচয় না পেয়ে ২০১৯ সালের ১৯ অক্টোবর পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।

পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা ধারণা করেন, অজ্ঞাতপরিচয় ওই নারীর লাশটি পারুল আক্তারের। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় এই লাশ পারুল আক্তারের। পরে পাঁচবিবি থানার অজ্ঞাতপরিচয় নারী হত্যা মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করতে আদালতে আবেদন করে বগুড়া জেলা পিবিআই। আদালত মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করলে বগুড়া জেলা পিবিআই মামলাটি তদন্ত করে ২০১৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। তাতে পারুল আক্তার হত্যাকাণ্ডে বাবা আবদুল কুদ্দুছ ও ভাড়াটে খুনি মোকাদ্দেছের সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরা হয়। বগুড়ার আদালতে বর্তমানে এই মামলার বিচার চলছে।

Read full story at source