শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, কফির তেতো স্বাদ যাঁরা খুব দ্রুত ধরতে পারেন বা এই স্বাদের প্রতি বেশি সংবেদনশীল, তাঁরাই আসলে সবচেয়ে বেশি কফি পান করেন।
গবেষকেরা তাঁদের গবেষণাপত্রে জানিয়েছেন, কফির তেতো স্বাদ পাওয়ার এই ক্ষমতা কেবল মুখের স্বাদের ওপর নির্ভর করে না। বরং এর পেছনে মানুষের জিনগত বা বংশগত গঠনের বড় ভূমিকা রয়েছে। গবেষণাটি বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্টিফিক রিপোর্টসের অনলাইনে ই-ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।
Visit esporist.org for more information.
শিকাগোর নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ফাইনবার্গ স্কুল অব মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ও এই গবেষণার প্রধান গবেষক মেরিলিন কর্নেলিস এ বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জানান, সাধারণভাবে মনে হতে পারে, যাঁরা ক্যাফেইনের তেতো স্বাদের প্রতি বেশি সংবেদনশীল, তাঁরা হয়তো কফি কম খাবেন। কিন্তু আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে উল্টো। আসলে কফি যাঁরা নিয়মিত পান করেন, তাঁরা কফিতে থাকা ক্যাফেইনের চনমনে ও ইতিবাচক অনুভূতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যান। ফলে তেতো স্বাদটিই একসময় তাঁদের কাছে ভালো লাগতে শুরু করে। তাঁরা সহজেই এটি পছন্দ করে নেন।
সহজ কথায় বলতে গেলে, যাঁদের জিহ্বা কফির তেতো ভাব বিশেষ করে ক্যাফেইনের নিজস্ব তেতো স্বাদটা খুব সহজে চিনে নিতে পারে, তারা কিন্তু কফিকে অপছন্দ করেন না। উল্টো তাঁরা এই তেতো স্বাদের সঙ্গেই একটা দারুণ চনমনে আর মজার অনুভূতি পান। কফি খেলে যে শরীর চাঙা হয়ে ওঠে, এই ভালো লাগার কারণেই তাঁরা তেতো কফিও ভালোবেসে ফেলেন।
চিনি যদি দাঁতের জন্য খারাপ হয়, তাহলে টুথপেস্ট মিষ্টি কেনবিজ্ঞানীদের কাছে অবশ্য এই ব্যাপার বেশ অবাক করার মতো। কারণ, প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম কিন্তু একদম উল্টো। সাধারণত কোনো খাবারের তেতো স্বাদ মূলত মানুষকে সাবধান করার জন্য একধরনের প্রাকৃতিক অ্যালার্ম হিসেবে কাজ করে। আদিকাল থেকেই আমাদের মস্তিষ্ক জানে তেতো মানেই সেটা কোনো ক্ষতিকর বা বিষাক্ত জিনিস হতে পারে, যা মুখে দেওয়া একদম উচিত নয়। কিন্তু কফির বেলায় তা আর কাজ করে না।
যাঁদের জিহ্বা কফির তেতো ভাব বিশেষ করে ক্যাফেইনের নিজস্ব তেতো স্বাদটা খুব সহজে চিনে নিতে পারে, তারা কিন্তু কফিকে অপছন্দ করেন নাগবেষকেরা বলেন, মানুষের জিনগত বা বংশগত গঠন কীভাবে চা, কফির মতো তেতো পানীয় পানের অভ্যাসের ওপর প্রভাব ফেলে, তা বুঝতেই এই গবেষণা করা হয়েছে। জু শেং ওং অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে অবস্থিত কিউআইএমআর বার্গহোফার মেডিকেল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একজন পিএইচডি গবেষক। তিনি এ গবেষণার অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী।
আমাদের মধ্যে কেউ চা খেতে ভালোবাসে, আবার কেউ কফির ভক্ত। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছ, কেন এমন হয়? আমাদের এই পছন্দের পেছনে লুকিয়ে আছে শরীরের ভেতরে থাকা জিনের কারসাজি। আমাদের জিবে বিভিন্ন স্বাদ চেনার জন্য ছোট ছোট কিছু কোষ থাকে, যেগুলোকে বলে টেস্ট রিসেপ্টর। আর এই কোষগুলো কেমন হবে, তা ঠিক করে দেয় আমাদের জিন বা বংশগতির গঠন।
পুদিনাপাতা খেলে মুখে ঠান্ডা অনুভূত হয় কেনবিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, কিছু মানুষের শরীরে এমন এক বিশেষ জিন থাকে, যা করলা বা সবুজ শাকসবজির তেতো স্বাদ খুব দ্রুত ও তীব্রভাবে ধরে ফেলে। মজার ব্যাপার হলো, যাঁদের শরীরে এই জিনটি সক্রিয়, তাঁরা কিন্তু কফি একদম সহ্য করতে পারেন না। কফির ভেতরে যে ক্যাফেইন থাকে, তার তেতো ভাবটা এই জিনের কারণে তাঁদের কাছে অনেক বেশি কড়া মনে হয়। তাই তাঁরা কফি এড়িয়ে চলেন এবং তুলনামূলক কম তেতো হওয়ায় আয়েশ করে চা পান করতে পছন্দ করেন।
কফির তেতো স্বাদ পাওয়ার এই ক্ষমতা কেবল মুখের স্বাদের ওপর নির্ভর করে না। বরং এর পেছনে মানুষের জিনগত বা বংশগত গঠনের বড় ভূমিকা রয়েছেআবার কিছু মানুষের জিনগত গঠন কুইনাইন নামের একটি তেতো উপাদানের প্রতি সংবেদনশীল থাকে। আমাদের মস্তিষ্ক কিন্তু প্রাকৃতিকভাবেই তেতো স্বাদকে একটা বিপৎসংকেত হিসেবে দেখে। আদিম কালে মানুষ মনে করত তেতো মানেই সেটা বিষাক্ত কোনো ফল বা খাবার হতে পারে। যাঁদের শরীরে কুইনাইন চেনার জিনটি বেশি, তাঁদের মস্তিষ্ক কফি মুখে দিলেই সতর্কবার্তা পাঠায় মস্তিষ্ক। ফলে তাঁরা কফি বেশি পছন্দ করেন না। গবেষকেরা মনে করেন, এই আবিষ্কার থেকে বোঝা সম্ভব—কেন কোনো মানুষ কোনো নির্দিষ্ট পানীয়র প্রতি সহজে আসক্ত হয়ে পড়ে, আর কেউ কেউ কেন তা থেকে দূরে থাকে।
অবশ্য তোমরা একটি কথা বলতেই পারো। আমরা তো কফিতে চিনি, দুধ বা চকলেট মিশিয়ে নিই। এতে কফির তেতো ভাব অনেকটা কমে যায়।
বিজ্ঞানীরা অবশ্য এই বিষয়ে অন্য কথা বলছেন। দুধ–চিনি দিয়ে স্বাদ বদলানো বা কফি খাওয়ার অভ্যাস শুধু জিনের ওপর নির্ভর করে না। এর পেছনে কিছু সামাজিক কারণও থাকে। আবার ধূমপানের অভ্যাস বা শরীর কত দ্রুত ক্যাফেইন গ্রহণ করতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে কফি যেভাবেই বানানো হোক না কেন, আসল কথা একটিই। সব কফির মূলে থাকে তেতো স্বাদ। শরীরের জিন এই স্বাদ পছন্দে ভূমিকা রাখে।
সূত্র: লাইভ সায়েন্সনিষিদ্ধ কফি কীভাবে বিশ্ব জয় করল