কোরআনের ভাষাগত চ্যালেঞ্জে আরবদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়

· Prothom Alo

মানব ইতিহাসের ধারায় যখনই কোনো নবী বা রাসুল প্রেরিত হয়েছেন, তাঁদের মোজেজা বা অলৌকিক নিদর্শনের প্রকৃতি নির্ধারিত হয়েছে সেই সময়ের সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট অনুসারে।

নবী মুসা (আ.)-এর যুগে জাদুর ব্যাপক প্রচলনের কারণে লাঠি সাপে রূপান্তরের ঘটনা ছিল প্রাসঙ্গিক। নবী ইসা (আ.)-এর সময় চিকিৎসাশাস্ত্রের উন্নতি ঘটার কারণে কুষ্ঠরোগ নিরাময় ছিল বিস্ময়কর।

Visit rouesnews.click for more information.

কিন্তু সপ্তম শতাব্দীতে আরবে যে নবী আবির্ভূত হলেন, তাঁর জাতির কাছে মৌলিক গৌরবের বিষয় ছিল শব্দের শিল্প ও বাগ্মিতা। সাহিত্য, কবিতা, ভাষা ও ব্যাকরণে তারা ছিল অগ্রগামী। এগুলোই ছিল তাদের গর্ব ও প্রতিযোগিতার বিষয়।

মরুচারী সেই জাতির বাগ্মী ও কবিদের স্তব্ধ করে দিয়েছে কোরআনের ভাষাগত উৎকর্ষ ও আধিপত্য। তাদের সামনে যে অলৌকিক চ্যালেঞ্জ পেশ করেছে কোরআন, তা ইতিহাসের অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক মহাকাব্য।

আরবরা ছিল জন্মগতভাবে ভাষা ও সাহিত্যের অনুরাগী। তারা দাবি করত, বিশুদ্ধ ও সুন্দর করে কথা বলা শুধু তাদেরই অধিকার। অবশিষ্ট বিশ্ব তাদের কাছে ছিল ‘আজম’ বা বোবা।

ভাষা যেখানে বীরত্বের পরিচয়

প্রাচীন আরবরা ছিল জন্মগতভাবে ভাষা ও সাহিত্যের অনুরাগী। তারা দাবি করত, বিশুদ্ধ ও সুন্দর করে কথা বলা শুধু তাদেরই অধিকার। অবশিষ্ট বিশ্ব তাদের কাছে ছিল ‘আজম’ বা বোবা।

উকাজ ও মাজান্নাহর সাহিত্য মেলাগুলোতে কবিরা একদিক থেকে পদ্য পাঠ করতেন, অন্যদিকে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিতেন। একজন শ্রেষ্ঠ কবির শ্রেষ্ঠত্বের ওপর পুরো গোত্রের সম্মান নির্ভরশীল ছিল। তারা শব্দের যতি, ছন্দের কারুকার্য এবং বাক্যের অন্তর্গূঢ় মাধুর্য অনুধাবনে পারদর্শী ছিল।

ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত মুকাদ্দিমা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, তৎকালীন সমাজ কবিতা ও সুবক্তৃতাকে তাদের ‘স্মৃতিগ্রন্থ’ ও ‘শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড’ হিসেবে দেখত। ঠিক এই সময়েই মুহাম্মদ (সা.) নিজে নিরক্ষর হয়েও, অবতীর্ণ কোরআনের যে ভাষা ও শব্দধারা আরবদের পড়ে শোনালেন, তা আরবে প্রচলিত কবিতা, গদ্য, মন্ত্র, শাস্ত্র বা রূপকথা—কোনোটির সঙ্গেই মেলেনি।

চ্যালেঞ্জের ধাপ

কোরআন পর্যায়ক্রমে ধাপে ধাপে আরবের পণ্ডিত ও বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল। চ্যালেঞ্জের তিনটি প্রধান ধাপ ছিল:

১. পূর্ণাঙ্গ কোরআনের অনুরূপ আনয়ন: প্রথমে বলা হলো, যদি সন্দেহ থাকে তবে সমগ্র কোরআনের মতো কোনো গ্রন্থ লিখে নিয়ে এসো। কোরআনে বলা হয়েছে, “বলুন, যদি মানব ও জিন এই কোরআনের অনুরূপ আনার জন্য একত্র হয়, তবু তারা তা আনতে পারবে না, যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়।” (সুরা ইসরা, আয়াত: ৮৮)

এই আয়াতে আল্লাহ মানুষ ও জিনের মিলিত সামর্থ্যের চূড়ান্ত সীমাবদ্ধতা ঘোষণা করেছেন।

পার্থিব জীবনের সঙ্গে আধ্যাত্মিক জীবনের সমন্বয় যেভাবে করবেন

২. দশটি সুরা রচনার দাবি: প্রথম পদক্ষেপে তারা চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ার পর, চ্যালেঞ্জটি সংক্ষিপ্ত করা হলো। কোরআনে বলা হয়েছে, “তারা কি বলে, ‘সে (অর্থাৎ মুহাম্মদ) ওটা রচনা করেছে?’ বলো, ‘তাহলে তোমরা এর মতো দশটি সুরা রচনা করে আনো, আর (এ কাজে সাহায্য করার জন্য) আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাকে ডাকতে পারো ডেকে নাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়েই থাকো।’” (সুরা হুদ, আয়াত: ১৩)

৩. মাত্র একটি সুরা তৈরির অন্তিম আহ্বান: সর্বশেষ কোরআন চিরন্তন এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, যা আজও বহাল ও বিদ্যমান। কোরআনে বলা হয়েছে, “আমি আমার বান্দার প্রতি যা নাজিল করেছি তাতে তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকলে তোমরা তার মতো কোনো সুরা এনে দাও।...আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সব সাহায্যকারীকে আহ্বান করো। যদি তোমরা না পারো এবং কখনো পারবেও না…।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৩-২৪)

এখানে শব্দের প্রয়োগ লক্ষণীয়: ‘তোমরা না পারো এবং কখনো পারবেও না’। এটা একদিক থেকে যেমন বর্তমানের অবস্থার জানান দেওয়া, তেমনি অনাগত ভবিষ্যতের জন্য দেওয়া নিশ্চয়তাও বটে।

মক্কার অন্যতম বাগ্মী উতবা যখন রাসুলের কাছ থেকে সুরা হামিম-সেজদার কয়েকটি আয়াত শোনেন, তখন তিনি স্তম্ভিত হয়ে কাঁপতে শুরু করেন।

সমকালীনদের শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য

তৎকালীন আরবের শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিতেরা কোরআনের এই অভাবনীয় ভাষাশৈলী দেখে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তা ইতিহাসে সোনালি হরফে লিখিত।

মক্কার অন্যতম বাগ্মী উতবা যখন রাসুলের কাছ থেকে সুরা হামিম-সেজদার কয়েকটি আয়াত শোনেন, তখন তিনি স্তম্ভিত হয়ে কাঁপতে শুরু করেন। কোরাইশ নেতাদের কাছে ফিরে গিয়ে তিনি বলেন, “আল্লাহর কসম, আমি এমন কিছু শুনেছি যা কোনো মানুষের কথা নয়। তা না কবিতা, না কোনো জ্যোতিষীর গণনা। হে কোরাইশগণ, আমার কথা মানো, তোমরা একে একা ছেড়ে দাও।” (সিরাতে ইবনে হিশাম, ১/২৮৬-২৮৭)

কোরআনের ভাষার বর্ণনা দিতে গিয়ে সেকালের শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা বলেছিল, “আল্লাহর কসম, তিনি যা বলছেন তার মধ্যে এক বিশেষ মিষ্টতা আছে, এর ওপর রয়েছে অপরূপ এক লাবণ্য। এর (কোরআন) উপরিভাগ ফলবান (উর্বর) এবং এর তলদেশ সমৃদ্ধ (প্রবহমান)। এটি নিশ্চিতভাবেই সবার ওপরে বিজয়ী হয়, এর ওপরে কোনো কিছু বিজয়ী হতে পারে না। আর এটি তার নিচের সবকিছুকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়।” (তাফসির ইবনে কাসির, ৮/২৬৬-২৬৭)

যে পদ্ধতিতে পবিত্র কোরআন সংকলন ও সংরক্ষণ করা হয়

মোস্তফা সাদিক রাফেয়ি ও মুহাম্মদ আবদুহুর বিশ্লেষণ

আধুনিক যুগের বিখ্যাত আরব ভাষাবিদ মোস্তফা সাদিক রাফেয়ি তাঁর গ্রন্থ ইজাজুল কোরআন-এ বলেন, যদি কোরআনের শব্দগুলো শুধু মানুষ তৈরি করতে পারত, তবে এর অসারতা প্রমাণের জন্য তৎকালীন আরবরা দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বেছে নিত না।

কলম দিয়ে যারা হাজার বছর ধরে জগৎ শাসন করছিল, তারা কেন সামান্য ৩ লাইনের সুরা কাউসার সমতুল্য কিছু লিখে লড়াই শেষ করেনি? এর কারণ একটিই—হাস্যকর প্রচেষ্টায় মোসায়লিমা যে ‘ব্যাঙ’ বা ‘হাতি’র ছন্দ মিলিয়ে কোরআন অনুকরণ করতে চেয়েছিল, তা আজও মানুষের হাস্যরসের উপাদান।

কোরআন শুধু শব্দসমষ্টি নয়, এটি এমন এক শাব্দিক গঠন যার সমতুল্য গড়া মানবিক প্রতিভার সাধ্যাতীত। (ইজাজুল কুরআন, পৃ. ১৮২)

মুহাম্মদ আবদুহু লেখেন, কোরআনের চ্যালেঞ্জ এই যে যারা সেই যুগের সবচেয়ে পারদর্শী ও সমালোচক ছিল, তাদের কণ্ঠস্বরও কোরআনের শৈলী স্তব্ধ করে দিয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে কোরআন মহানবীর মাধ্যমে আসা আল্লাহর পবিত্র কালাম, যেখানে স্রষ্টার অনন্ত জ্ঞান প্রতিফলিত হয়েছে। (রিসালাতুত তাওহিদ, পৃ. ১৭০)

এই শ্রেষ্ঠত্ব সেই মরুভূমির প্রতিবেশ, ইতিহাস ও জীবনধারায় সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতি যুগে, লৈখিক বা সাহিত্যিক মানদণ্ডের পরিবর্তনেও কোরআন নিজের সগৌরব উপস্থিতি বজায় রেখেছে।

বুদ্ধিবৃত্তিক মৌনতা

মানুষ যখন সেই ক্ষেত্রে হেরে যায়, যা ছিল তার অস্তিত্বের শ্রেষ্ঠতম গৌরব, তখন সে মানসিকভাবে ধসে পড়ে। আরবরা যেই শব্দ, ভাষা আর ছন্দ নিয়ে খেলতে পারত, সেখানেই কোরআন তাদের জন্য অসাধ্য অলৌকিকত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়।

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পেরে তারা শেষ পর্যন্ত তরবারি ধরতে বাধ্য হয়। শাব্দিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা যদি যুদ্ধের মাধ্যমে করতে হয়, তবে বুঝতে হবে শাব্দিক ময়দানে প্রতিপক্ষ চিরস্থায়ীভাবে পরাজিত।

কোরআনের এই শ্রেষ্ঠত্ব সেই মরুভূমির প্রতিবেশ, ইতিহাস ও জীবনধারায় সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতি যুগে, লৈখিক বা সাহিত্যিক মানদণ্ডের পরিবর্তনেও কোরআন নিজের সগৌরব উপস্থিতি বজায় রেখেছে। কোরআন এমন এক আধ্যাত্মিক সাহিত্যের উপমা, যা মানবমনের অস্থিরতাকে প্রশমিত করে। সব ভাষা, সাহিত্য, দর্শন, কবিতা ও মানবীয় জ্ঞান কোরআনের অলৌকিকত্বের সামনে নুয়ে পড়ে।

মোস্তফা সাদিক রাফেয়ি যথার্থই বলেছেন: “কোরআনের বিস্ময় চিরকাল জীবিত থাকবে। কারণ এটি কোনো মানুষের ভাবনার প্রতিফলন নয়, বরং এটি স্বয়ং ভাবনার স্রষ্টার কথন।” (ইজাজুল কুরআন, ৩/২১৮)

[email protected]

  • আবদুল্লাহিল বাকি : আলেম, লেখক ও সফটওয়্যার প্রোগ্রামার

সভ্যতা রক্ষা ও বিপর্যয় রোধে কোরআনের অনন্য দর্শন

Read full story at source