অনার্স–মাস্টার্স কোর্সের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের আর্তনাদ!

· Prothom Alo

বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকের কথা। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে এমফিল করছি। এর মধ্যে একটি বিদেশি এনজিওতে চাকরি হলো।

কিছুদিন পর পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে জানতে পারি, আমার এলাকার অর্থাৎ যে কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়েছি, সেই কলেজে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পাঠদানের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক ২ হাজার ৮৫০ টাকা স্কেলে কয়েকটি বিষয়ে প্রভাষক পদে কয়েকজন শিক্ষক নিয়োগ করা হবে।

Visit mchezo.co.za for more information.

এর আগে আধা সরকারি বা বেসরকারি কলেজে অনার্স–মাস্টার্স পড়ানো হতো না। দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার জগন্নাথ, ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন, ফরিদপুরের রাজেন্দ্র, খুলনার বিএল, বরিশালে বিএম কলেজসহ হাতে গোনা কয়েকটি সরকারি কলেজে অনার্স–মাস্টার্স পড়ানো হতো।

তৎকালীন বিএনপি সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান তীব্র সেশনজট হ্রাস ও উচ্চশিক্ষা প্রসারের জন্য এবং যাতে একজন শিক্ষার্থী নিজের এলাকায় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পান, সে জন্য ডিগ্রি পর্যায়ের কয়েকটি আধা সরকারি কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালুর অনুমোদন দেয়। সেই তিন–চারটি কলেজের মধ্যে আমার এলাকার কলেজটিও রয়েছে। এটি দক্ষিণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আগেই পরিচিতি পেয়েছে।

পরিবারের পরামর্শ ও স্বজনদের উৎসাহ পেয়ে আমি আবেদন করি। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অনেক প্রার্থীকে হারিয়ে আমরা কয়েকজন নির্বাচিত হই। ইতিমধ্যে আমি বিয়ে করি। চাকরি নিশ্চিত হওয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকটি চাকরির মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকেও বিরত থাকি।

কিছুদিন পর নিয়োগপত্র পেয়ে কলেজে যোগ দিই। মাসের পর মাস যায়। বেতন–ভাতা পাই না। মন খারাপ হয়ে যায়। অধ্যক্ষ জানালেন, এমপিওভুক্ত না হওয়া পর্যন্ত কলেজ কর্তৃপক্ষ যতটা সম্ভব, পরিশোধ করবে।

তখন জানতে পারি, জনবল কাঠামো অনুযায়ী ডিগ্রি পর্যায়ের কলেজে প্রতি বিষয়ে তিনজন শিক্ষকের পদ রয়েছে (পরে দুজন করা হয়)। আরও জানতে পারি, কলেজ কর্তৃপক্ষ অনার্স–মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষকদের বেতন–ভাতা বিধি মোতাবেক পরিশোধ করবে, এই শর্তে অনুমোদন দিয়েছে। আমি হতাশ হয়ে বোকা বনে যাই।

২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর আমি বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ৩০ বছর শিক্ষকতা শেষে শূন্য হাতে অবসরে যাই। কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে বকেয়া দাবি করলে ‘ফান্ডে টাকা নেই, টাকা হলে পরিশোধ করা হবে’ বলে জানায়। জানি না, এই বিপুল পরিমাণ টাকা কবে, কীভাবে পাব।

ওই সময় কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করত। আমরা শিক্ষার্থীসংখ্যা বৃদ্ধি করে বিভাগের আয় বাড়ানোর চেষ্টা করি। অনেক শিক্ষক হতাশ হয়ে চাকরি ছেড়ে চলে যান। কিন্তু আমার অন্য চাকরিতে ঢোকার বয়স না থাকায় এমপিওভুক্তির আশায় কলেজ নিয়ে পড়ে থাকি। একসময় শিক্ষার্থী বেড়ে বিভাগের আয় বেড়ে যায়। বকেয়া বেতন–ভাতা পরিশোধ শুরু হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষও উন্নয়নকাজের জন্য বিভাগ থেকে আয়ের একটা অংশ নিয়ে যায়। কিন্তু বকেয়া সম্পূর্ণ পরিশোধ করে না। স্কেল পরিবর্তন হলে আড়াই লক্ষাধিক টাকা বকেয়া রেখে নতুন স্কেল অনুযায়ী বেতন–ভাতা প্রদান করা হয়।

বিগত সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেল দেওয়ায় সর্বশেষ ২৯ হাজার টাকা স্কেলে বেতন–ভাতা ভোগ করি। মোটামুটি অপেক্ষাকৃত ভালোই চলছিল। এর মধ্যে অধ্যক্ষ অবসরে গেলে নতুন একজন সেই পদে যোগ দেন। কিছুদিন পরই স্থানীয় সংসদ সদস্যের দোহাই দিয়ে তিনি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। অনার্স–মাস্টার্স শিক্ষকদের বেতন–ভাতা অর্ধেক করে পরিশোধ শুরু করেন। একপর্যায়ে নানান দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে ম্যানেজিং কমিটি তাঁকে সাময়িক বহিষ্কার করে (যদিও তিনি কয়েক মাস ধরে বেতন তুলছেন)। এ সময় আমার বিপুল পরিমাণ বেতন–ভাতা বকেয়া পড়ে যায়।

প্রাথমিক শিক্ষায় ভালো মানের শিক্ষক কেন আসবে

২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর আমি বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ৩০ বছর শিক্ষকতা শেষে শূন্য হাতে অবসরে যাই। কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে বকেয়া দাবি করলে ‘ফান্ডে টাকা নেই, টাকা হলে পরিশোধ করা হবে’ বলে জানায়। জানি না, এই বিপুল পরিমাণ টাকা কবে, কীভাবে পাব। বেসরকারি বা আধা সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা অবসরকালীন পেনশন–সুবিধা ভোগ করেন। কিন্তু একজন নন-এমপিও শিক্ষককে কে পেনশন দেবে? এই দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কলেজ কর্তৃপক্ষের, নাকি সরকারের? আমি মনে করি, নিয়োগকর্তা সরকারেরই বিষয়টি দেখার দায়িত্ব।

আমার চাকরিজীবনে বিএনপি দুবার এবং আওয়ামী লীগ চারবার সরকার পরিচালনা করেছে। মাদ্রাসাসহ হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি হয়েছে, এমপিওভুক্ত হয়েছে, অসংখ্য বেসরকারি কলেজে নির্বিচার অনার্স–মাস্টার্স কোর্স অনুমোদন দিতে দেখেছি। অসংখ্যবার রাজধানীতে ‘অনার্স–মাস্টার্স শিক্ষক পরিষদ’–এর ব্যানারে আমরণ অনশন, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনে এমপিওভুক্তির দাবি জানিয়েছি। সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশ্বাস পেয়ে কাজে ফিরে গেছি; কিন্তু দাবি পূরণ হয়নি। যদিও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের বড় উৎস এই বেসরকারি কলেজের অনার্স–মাস্টার্স কোর্সের বিভিন্ন ফি।

সরকার প্রতিটি উপজেলায় একটি কলেজকে সরকারি করার ঘোষণায় আনন্দিত হই এই ভেবে যে উপজেলার সব থেকে বড় কলেজ হিসেবে আমাদের কলেজটিই সরকারি হবে। কিছুদিন পর দেখতে পাই, সাবেক এমপির নিজ গ্রামের নতুন কলেজটি সরকারি ঘোষণা করা হয়েছে। কিছুদিন পর উপজেলা ভেঙে দুটি করা হয়। আবার সুযোগ হয় আমাদের কলেজ সরকারি ঘোষণার। কিন্তু এমপির স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের কারণে সে সুযোগও অধরা থেকে যায়।

কয়েকটি কথা না বললেই নয়, উচ্চমাধ্যমিক থেকে মাস্টার্স শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান, শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা গ্রহণ, খাতা মূল্যায়নসহ সব কাজই আমাকে করতে হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে পাঠদানে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিষয়ভিত্তিক একাধিক উচ্চতর প্রশিক্ষণও গ্রহণ করি। বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বও পালন করেছি। সরকার শুধু নিয়োগ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে, শিক্ষকদের বেতন–ভাতা দেওয়ার দায়িত্ব নেয়নি।

ভাবতেও অবাক লাগে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা বোর্ডের একই সিলেবাস অনুযায়ী পাঠদানসহ শিক্ষার যাবতীয় কর্মকাণ্ড সম্পাদন করেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মতো সুবিধা ভোগ করতে পারেন না। আবার বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে এমপিও–নীতির নামে এই বৈষম্য শিক্ষার প্রতি সরকারের নিষ্ঠুর উদাসীনতারই সাক্ষ্য দেয়। জানি না, এমন পৃথিবীর আর কোনো দেশে হয় কি না!

সর্বশেষ গত ডিসেম্বর ২০২৫–এ জানতে পারি, সরকার বেসরকারি কলেজের অনার্স–মাস্টার্স শিক্ষকদের জন্য নতুন এমপিও নীতিমালা ঘোষণা করেছে। কিন্তু এতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পেনশনের বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। আমার জানামতে, শুরুতে হাতে গোনা কয়েকটি কলেজে অনার্স–মাস্টার্স কোর্স অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সেই হিসাবে নগণ্যসংখ্যক শিক্ষক এ পর্যন্ত অবসরে গেছেন। এই স্বল্পসংখ্যক শিক্ষককে পেনশন–সুবিধা দিতে সরকারের সামান্য বরাদ্দ প্রয়োজন। আমি মনে করি, এর জন্য সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট।

  • সন্ধ্যা রানী সরকার অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক। কালকিনি, মাদারীপুর

Read full story at source