আমার মায়ের নাম বেগম লুৎফুন্নেসা। ২০০৯ সালে মারা যান। মৃত্যুর সময় বয়স হয়েছিল ৭০–এর মতো। দিনাজপুর শহরের পাটুয়াপাড়ায় স্বামীর বাড়িতে, অর্থাৎ আমার বাবার বাড়িতে মারা যান। এই পাটুয়াপাড়া আমার জন্মস্থান। মায়ের জন্মস্থান ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বারঘড়িয়া ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামে। আমার নানার বাড়ি ছিল এই গ্রামে। এই গ্রামেই ব্রিটিশ শাসনামলে আমার মায়ের জন্ম হয়েছিল।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
ব্রিটিশ শাসনামলে নানা বদরুল বিশ্বাস রেলওয়েতে চাকরি করতেন। ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ ভেঙে যখন পাকিস্তান ও ভারত রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়, তখন নানা বর্তমান ইন্ডিয়ার দক্ষিণ দিনাজপুর জেলাধীন বালুরঘাট রেলস্টেশনে কর্মরত ছিলেন। দেশভাগ হওয়ার পর তিনি বদলি হন বাংলাদেশের বর্তমান দিনাজপুর জেলার বিরল রেলস্টেশনে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর এই যে তিনি বিরল রেলস্টেশনে বদলি হয়ে এলেন, এরপর বিরল উপজেলাই হলো তাঁর স্থায়ী আবাসস্থল। যোগাযোগব্যবস্থার অসুবিধার কারণে নানার পক্ষে আর চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
অভাবী দিন ও মায়ের রান্নাঘরআমার মা নানার সঙ্গে ছোটবেলায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বালুরঘাট হয়ে বিরলে এসেছিলেন। বিরলে অবস্থানকালে তাঁর বিয়ে হয়েছিল দিনাজপুর জেলার পাটুয়াপাড়ায়। মায়ের পক্ষেও তাঁর জন্মভূমিতে কখনো ফিরে যাওয়া হয়নি।
আমি যখন বড় হলাম এবং আয়রোজগার শুরু করলাম, তখন মা একদিন আবদার করলেন, ‘বাবা তোর যখন টাকা হবে, তুই আমাকে অন্তত আমার বাপের ভিটায় একবার নিয়ে যাস।’
মায়ের মৃত্যুর আগে সেই সুযোগ এসেছিল। ১৯৯৬ সালে আমি মা, তাঁর দুই বোন খুকি খালা ও মুক্তা খালাকে নিয়ে গিয়েছিলাম মায়ের জন্মভূমি লক্ষ্মীপুরে। লক্ষ্মীপুরে তখন মায়ের সবচেয়ে বড় ভাই ডা. রইস উদ্দিন আহমেদ অর্থাৎ খোকা মামা থাকতেন। তিনি সেখানেই বিয়ে করেছিলেন। আমরা খোকা মামার বাড়িতে উঠেছিলাম। সেখানে যাওয়ার প্রথম দিনেই লক্ষ্মীপুর গ্রাম যেন ভেঙে এসেছিল মাকে দেখার জন্য। দুই থেকে আড়াই শ নারী–পুরুষের সমাহার হয়েছিল মাকে দেখতে। মায়ের সম্পর্কে চাচি ও ফুফু হন, এমন অনেকেই মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন।
লেখকের মাতা বেগম লুৎফুন্নেসা।অনেকেই মাকে দেখেছেন সেই ছোট্টবেলায়। তখন মা ছিলেন নাদুসনুদুস ও হৃষ্টপুষ্ট। সেই মা এখন যখন গ্রামে এসে হাজির হয়েছেন, তখন তিনি জীর্ণশীর্ণ রোগাক্রান্ত। মাকে এমন অবস্থায় দেখে তাঁর সেই চাচি–ফুফুরা বিলাপ করছিলেন, আর কাঁদছিলেন, যে কী চেহারা ছিল কী হয়ে গেছে!
লক্ষ্মীপুর গ্রাম ছিল মায়ের আত্মীয়স্বজনে ভরা। মায়ের চাচা, ফুফু, মামাসহ অনেক আত্মীয় সেখানে থাকতেন। তাঁর নিজের বড় ভাইও সেখানে ছিলেন বৈবাহিক কারণে। অনেক দিন পর মাকে দেখে তাই পুরো গ্রামের মানুষ ভেঙে এসেছিল মামার বাসায়। মায়ের প্রতি তাঁদের ভালোবাসার বহুল প্রকাশ দেখেছি। মাকেও সেদিন কাঁদতে দেখেছি। কিন্তু আমার আনন্দ হয়েছিল এই ভেবে যে, আমি অন্তত মাকে তাঁর ছেলেবেলায় ছেড়ে যাওয়া জন্মভূমিতে নিয়ে আসতে পেরেছিলাম।
পাটুয়াপাড়া, দিনাজপুর
