প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]
Visit extonnews.click for more information.
১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। ওই বছরের ২৯ এপ্রিল সাংগঠনিক কাজে কক্সবাজারে গিয়েছিলাম। দিনের শুরুটা ছিল সাধারণ দিনের মতোই। তবে আকাশের দিকে তাকালে একধরনের গুমোট ভাব লক্ষ করা যাচ্ছিল। আগে থেকেই ১০ নম্বর মহা বিপৎসংকেত দেওয়ায় লোকজনের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ ছিল। কিন্তু আমরা তখনো পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পারিনি।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে আবহাওয়ার পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। আকাশ ক্রমেই কালো হতে থাকল। বাতাসে একধরনের চাপা গর্জন। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে মনে হলো যেন অজানা এক শক্তি সমুদ্রের বুকে উত্তাল তরঙ্গ তৈরি করছে।
সন্ধ্যার পর আমরা কক্সবাজারের পাহাড়চূড়ায় হিলটপ সার্কিট হাউসে অবস্থান নিই। স্থানটি তুলনামূলক নিরাপদ। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের গতি হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। প্রথমে মনে হচ্ছিল সাধারণ ঝড়, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তা এক প্রলয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। রাত যত গভীর হতে থাকে, ততই পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ২৫০ কিলোমিটার গতির বাতাস যেন হাজারো বন্য জন্তুর সম্মিলিত গর্জন। জানালার কাচগুলো প্রচণ্ড শব্দে কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, সেগুলো ভেঙে উড়ে যাবে। দরজাগুলো শক্ত করে বন্ধ রাখা সত্ত্বেও বাতাসের বেগে সেগুলো ভেঙে যাওয়ার
উপক্রম হচ্ছিল।
হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। চারপাশে নেমে এল গভীর অন্ধকার। মাঝেমধ্যে বিজলির ঝলকানি আকাশকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। সেই আলোর ঝলকে আমরা দূরের গাছপালা ভেঙে পড়তে দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, পুরো পৃথিবী যেন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বাতাস যেন কক্সবাজার শহরকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল মানুষের আর্তনাদ। ঝড়ের শব্দের মধ্যেও কানে ভেসে আসছিল বাঁচার আকুতি, চিৎকার আর কান্না।
আমরা সার্কিট হাউসের ভেতরে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করছিলাম। রাতের এক পর্যায়ে মনে হলো, এই ভবনও হয়তো টিকবে না। এই রাতই হয়তো আমাদের শেষ রাত।
অবশেষে দীর্ঘ এক ভীতিকর রাতের পর ভোর এল। আমরা বাইরে বের হয়ে দেখলাম চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। গাছপালা উপড়ে পড়ে আছে, ঘরবাড়ি নেই; রাস্তা ভেঙে গেছে। সমুদ্রসৈকত এলাকায় চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল অসংখ্য মৃতদেহ। ছোট ছোট শিশুর প্রাণহীন দেহ। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। পাশে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন, ‘এইটা আমার নাতি…।’ আর কোনো শব্দ বের হলো না তাঁর মুখ থেকে। আমরা কেউ কথা বলতে পারছিলাম না।
সাংগঠনিক কাজ শেষ করে আমার ৩০ এপ্রিল সকালে চট্টগ্রামে ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু চারদিকে এমন অবস্থা দেখে ফিরতে পারলাম না। আমার সঙ্গীদের নিয়ে সন্দ্বীপে গেলাম।
সেখানে গিয়ে মনে হলো যেন পুরো দ্বীপটাই হারিয়ে গেছে। ঘরবাড়ি নেই, মানুষ নেই; শুধু ধ্বংসস্তূপ আর শূন্যতা। এক ব্যক্তি আমাদের বললেন, ‘আমার পরিবারে আটজন ছিল। কেউ বেঁচে নেই...এখন আমি একা।’ তাঁর চোখে পানি ছিল না, ছিল শুধু এক গভীর শূন্য দৃষ্টি।
পরে জানতে পারলাম, এটি শুধু একটি ঝড় ছিল না; ছিল এক মহাবিপর্যয়। ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের প্রাণহানি হলো। লাখ লাখ মানুষ আহত আর প্রায় এক কোটি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত।
সে সময় পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অভাব ক্ষয়ক্ষতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
এ অভিজ্ঞতা আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর স্মৃতিগুলোর একটি। আজও যখন চোখ বন্ধ করি, তখন ভেসে ওঠে সেই রাতের দৃশ্য, ঝড়ের গর্জন, মানুষের চিৎকার আর মৃত্যুভীতিতে কাঁপতে থাকা মুহূর্তগুলো।
দিলশাদ আহমেদ, নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি, চট্টগ্রাম
