ভয়াবহ অভিযোগ সেলিনার, স্বামীর বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

· Prothom Alo

একসময় বলিউডের অন্যতম আলোচিত মুখ ছিলেন সেলিনা জেটলি। মিস ইন্ডিয়া খেতাব জয়, গ্ল্যামার জগতে দ্রুত উত্থান, বলিউডে একের পর এক জনপ্রিয় ছবি—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন ছিল নিখুঁত রূপকথা। কিন্তু সেই ঝলমলে জীবনের আড়ালে যে দীর্ঘদিন ধরে জমছিল ব্যক্তিগত অস্থিরতা, মানসিক যন্ত্রণা আর সম্পর্কের টানাপোড়েন, তা এবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে।

পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগে অভিনেত্রীর স্বামী পিটার হাগের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছে মুম্বাই পুলিশ। শুধু তা-ই নয়, তদন্ত চলাকালে ভারত ছাড়ার আশঙ্কায় তাঁর বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আর এ ঘটনার পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক রহস্যময় পোস্ট করে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন সেলিনা।

Visit rouesnews.click for more information.

‘নার্সিসিস্টের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙা মানে নিজের হারানো সত্তাকে ফিরে পাওয়া’
ঘটনার পর গভীর রাতে ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে একটি ছবি পোস্ট করেন সেলিনা। সেখানে দেখা যায়, তিনি একটি বই পড়ছেন। বইয়ের পাতার শিরোনাম— ‘ব্রেকিং আপ উইথ আ নার্সিসিস্ট’।

পাতার বেশ কয়েকটি অংশ তিনি হাইলাইট করেছিলেন। একটি লাইনে লেখা ছিল—‘একজন নার্সিসিস্টের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙা মানে সেই মানুষটির তৈরি করা আপনার আরেকটি সংস্করণের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটানো।’

আরেকটি অংশে ছিল—‘যখন আপনি সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন শুধু একটি সম্পর্কই শেষ করেন না; আপনি নিজের পরিচয়, নিজের কণ্ঠস্বর এবং নিজের জীবনও ফিরে পান।’

সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে আরেকটি অংশ—‘আপনি নিজের গল্প নতুন করে লেখার যোগ্য। আপনি সুস্থ হয়ে ওঠার যোগ্য। আপনি সেই মানুষ নন, যেভাবে আপনাকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল।’

এই পোস্টের পর থেকেই জোর জল্পনা শুরু হয়েছে, নিজের দাম্পত্য জীবনের সংকট নিয়েই কি পরোক্ষ বার্তা দিয়েছেন অভিনেত্রী?

কী অভিযোগ উঠেছে পিটার হাগের বিরুদ্ধে
মুম্বাই পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, পিটার হাগের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিষ্ঠুরতা ও নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির অভিযোগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং দীর্ঘদিন ধরে হয়রানি।

মামলাটি প্রটেকশন অব উইমেন ফ্রম ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স অ্যাক্ট ২০০৫-এর সঙ্গেও যুক্ত। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগ দায়েরের পর পিটারের বিরুদ্ধে লুক-আউট সার্কুলার জারি করা হয়েছে। সাধারণত যখন আশঙ্কা থাকে, অভিযুক্ত ব্যক্তি তদন্ত এড়িয়ে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন, তখনই লুক–আউট সার্কুলেশন জারি করা হয়।

সূত্রের দাবি, তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। যদিও এখন পর্যন্ত পিটার হাগ কিংবা তাঁর আইনজীবীদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সেলিনা জেটলি। অভিনেত্রীর ফেসবুক থেকে

সন্তানের কবরের সামনে এক মায়ের কান্না
এই আইনি লড়াইয়ের মধ্যেই কয়েক দিন আগে একটি হৃদয়বিদারক ভিডিও পোস্ট করেছিলেন সেলিনা। সেখানে তাঁকে দেখা যায় প্রয়াত ছেলে শমশেরের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। ভিডিওতে তিনি ইঙ্গিত দেন, বর্তমানে তিনি নিজের সন্তানদের সঙ্গেও স্বাভাবিকভাবে দেখা করতে পারছেন না। তাঁর কথায়, শুধু শমশেরই যেন এখন তাঁর নীরব সঙ্গী। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনুরাগীরা। অনেকেই অভিনেত্রীর পাশে থাকার বার্তা দেন।

কে এই পিটার হাগ
পিটার হাগ মূলত অস্ট্রিয়ার নাগরিক। আন্তর্জাতিক হোটেল ও আতিথেয়তাশিল্পে বহু বছর ধরে কাজ করেছেন তিনি। দুবাই, সিঙ্গাপুরসহ মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেল চেইনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্র্যান্ডিং, মার্কেটিং ও হোটেল ম্যানেজমেন্টে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

স্বামী ও সন্তানের সঙ্গে সেলিনা। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

রূপকথার প্রেম, তারপর ভাঙনের গল্প
২০১১ সালে বিয়ে করেন সেলিনা ও পিটার। সে সময় বলিউডে তাঁদের বিয়ে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। বিয়ের পর অভিনয় থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যান সেলিনা। বিদেশেই সংসার গড়েন তাঁরা। ২০১২ সালে জন্ম নেয় তাঁদের যমজ সন্তান উইনস্টন ও বিরাজ। পরে ২০১৭ সালে আবারও যমজ সন্তানের মা–বাবা হন তাঁরা—শমশের ও আর্থার। কিন্তু জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় শমশের। সেই ট্র্যাজেডি সেলিনার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
অভিনেত্রী একাধিকবার বলেছেন, সন্তান হারানোর যন্ত্রণা তাঁকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল।

‘যে রাতগুলো আমি একা কেঁদেছি, তখন আপনারা ছিলেন না’

২০২৫ সালেই শুরু হয়েছিল আইনি লড়াই
জানা গেছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরেই প্রথম গার্হস্থ্য হিংসার মামলা করেন সেলিনা। তখন ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার প্রথম দায়িত্ব আমার সেনা অফিসার ভাইয়ের জন্য লড়াই করা, আমার সন্তানদের ভালোবাসা ফিরে পাওয়া এবং নিজের মর্যাদা রক্ষা করা।’

সেলিনা অভিযোগ করেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক নির্যাতন, অবহেলা ও সম্পর্কের ভাঙনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে।
শুধু তা-ই নয়, তিনি ৫০ কোটি রুপির ক্ষতিপূরণও দাবি করেন বলে জানা গেছে। সম্পত্তি ও আয়ের ক্ষতির কথাও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বলিউডের গ্ল্যামারের আড়ালে অন্য এক বাস্তবতা
২০০১ সালে ‘মিস ইন্ডিয়া ইউনিভার্স’ খেতাব জয়ের পর বলিউডে পা রাখেন সেলিনা। ‘নো এন্ট্রি’, ‘গোলমাল রিটার্নস’, ‘আপনা সাপনা মানি মানি’ ইত্যাদি ছবিতে অভিনয় করে দ্রুত জনপ্রিয়তা পান তিনি।

তবে বিয়ের পর ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। পরিবার, সন্তান ও ব্যক্তিজীবন নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু এখন সেই ব্যক্তিজীবনই আদালত, পুলিশি তদন্ত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রে।

মিড ডে ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে

Read full story at source