নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার প্রভাব ফেলতে পারে শিশুর বিকাশে

· Prothom Alo

রাস্তাঘাট, রেস্তোরাঁ কিংবা ঘরের ড্রয়িংরুমে বসে আজকাল ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাতে শোভা পাচ্ছে স্মার্টফোন। চোখের পলক না ফেলে তারা স্ক্রিনে একের পর এক শর্টস বা ভিডিও পাল্টে যাচ্ছে। এই দৃশ্যটি আমাদের সবার কাছেই অত্যন্ত পরিচিত। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় অনেক সময় আপনি হয়তো বাচ্চাদের শান্ত রাখতে কিংবা যোগাযোগ রক্ষার জন্য তাদের হাতে এই প্রযুক্তি তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু এর আড়ালে শিশুদের মানসিক বিকাশে কতটা ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে নতুন করে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার একদল গবেষকের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ভয়ংকর সত্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশব ও বয়ঃসন্ধির শুরুতে নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের কারণে শিশুদের শব্দভান্ডার এবং পড়ার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যারা প্রতিদিন বেশি সময় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, তাদের শব্দ চিনতে এবং সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে বেশ বেগ পেতে হয়।

Visit mwafrika.life for more information.

শিশুদের মানসিক বিকাশে স্মার্টফোন কতটা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে?

সম্প্রতি ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করার মতো যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। বিশ্বের আরও অনেক দেশ যখন এমন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে, ঠিক তখনই এই গবেষণাটি জনসমক্ষে এল।

সোশ্যাল মিডিয়ায় বট বাহিনী কী, কীভাবে কাজ করে
গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশব ও বয়ঃসন্ধির শুরুতে নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের কারণে শিশুদের শব্দভান্ডার এবং পড়ার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

গবেষণার প্রধান লেখক কোরি কারভালহো বিষয়টিকে একটি উদাহরণের সাহায্যে ব্যাখ্যা করেছেন। মানুষের মস্তিষ্ক অনেকটা শরীরের পেশির মতো। আপনি একে যেভাবে ব্যবহার করবেন, তা ঠিক সেভাবেই গড়ে উঠবে। অলিম্পিকের ফিগার স্কেটারদের উদাহরণ টানলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। তাঁরা প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে বরফের ওপর স্কেটিং করেন। ফলে তাঁদের শরীরের পেশিগুলো এমনভাবে তৈরি হয়ে যায়, যেন তাঁরা একেকজন স্কেটিং মেশিন। একইভাবে, আপনার ঘরের শিশু যদি দিনে আট ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটায়, তাহলে তার মস্তিষ্ক শুধু স্ক্রল করা ও ছোট ছোট ভিডিও দেখার জন্যই অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। পড়ার বা গভীরভাবে চিন্তা করার মতো জটিল কাজগুলোর ক্ষমতা ধীরে ধীরে তার মস্তিষ্ক থেকে কমতে থাকবে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় কাটানোর অর্থ, শিশুরা আগের মতো আর বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছে না

এই গবেষণাটি কোনো ছোটখাটো ডেটার ওপর ভিত্তি করে হয়নি। ১০ বছরের বেশি বয়সী ১০ হাজারেরও বেশি কিশোর-কিশোরীর ওপর টানা ছয় বছর ধরে ‘অ্যাডোলেসেন্ট ব্রেন কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট’ নামে এই গবেষণাটি চালানো হয়। এর মূল কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা সময়ের মূল্যের কথা উল্লেখ করেছেন। আপনি যদি কোনো কাজে সময় ব্যয় করেন, তার মানে আরেকটি জরুরি কাজ করার সময় হারাচ্ছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় কাটানোর অর্থ, শিশুরা আগের মতো আর বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছে না। বই পড়ার সময় একটি শিশুর মস্তিষ্ক নতুন নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়, বাক্যের গঠন শেখে এবং কল্পনার জগৎ বিস্তৃত করে। কিন্তু ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের দুনিয়ায় সেই গভীর চিন্তার কোনো সুযোগ নেই। ফলে তাদের শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ হচ্ছে না এবং পড়ার বিকাশও পিছিয়ে পড়ছে। এই দুর্বল পড়ার অভ্যাসের সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের স্কুলের সার্বিক ফলাফলের ওপর।

সোশ্যাল মিডিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপ্লব
বই পড়ার সময় একটি শিশুর মস্তিষ্ক নতুন নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়, বাক্যের গঠন শেখে এবং কল্পনার জগৎ বিস্তৃত করে। কিন্তু ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের দুনিয়ায় সেই গভীর চিন্তার কোনো সুযোগ নেই।

শুধু কি শব্দভান্ডার? সোশ্যাল মিডিয়া শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে। একটা স্ক্রিনে একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ করা এবং কিছুক্ষণ পরপর ঘন ঘন নোটিফিকেশন আসার কারণে শিশুদের মনোযোগ বারবার বিঘ্নিত হয়। যেকোনো একটি কাজে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

অবশ্যই সব কিছুরই মুদ্রার উল্টো পিঠ থাকে। গবেষকরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব যে ১০০ ভাগ নেতিবাচক, তা কিন্তু নয়। যে শিশুরা নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকে, তারা যেকোনো তথ্য খুব দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারে এবং তাদের প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময়ও অন্যদের তুলনায় কম হয়। এ ছাড়া যেসব শিশুর বাস্তব জীবনে লাজুক স্বভাবের কারণে বন্ধু বানাতে সমস্যা হয়, তাদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া অন্যদের সঙ্গে যুক্ত থাকার একটি মাধ্যম হতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এই দ্রুততার সুবিধা হয়তো শুধু স্ক্রিনের কাজগুলোর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে শিশুদের ঘর থেকে ফোন দূরে রাখতে হবে

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় কী? এ ব্যাপারে গবেষকেরা কিছু কার্যকর পরামর্শ দিয়েছেন। কিশোর-কিশোরীদের ফোন ব্যবহারের সময় কঠোরভাবে সীমিত করতে হবে। বিশেষ করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে শিশুদের ঘর থেকে ফোন দূরে রাখতে হবে। শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার আগে তাদের বয়স আরেকটু বাড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। যদি বাইরে যাওয়ার কারণে যোগাযোগের জন্য ফোন দেওয়াটা খুব জরুরিই হয়, তাহলে আধুনিক স্মার্টফোনের বদলে বাটন ফোন দেওয়া যেতে পারে, যেগুলোতে ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সুযোগ নেই।

শিশুর ওপর অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের প্রভাব
কিশোর-কিশোরীদের ফোন ব্যবহারের সময় কঠোরভাবে সীমিত করতে হবে। বিশেষ করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে শিশুদের ঘর থেকে ফোন দূরে রাখতে হবে।

কোরি কারভালহো বলেছেন, সোশ্যাল মিডিয়া জিনিসটা আমাদের মানবসভ্যতার জন্যই একেবারে নতুন। ছোট-বড় সবাই এটি ব্যবহার করছে এবং আমরা এখনো এর পুরো প্রভাব সম্পর্কে শিখছি। তাই বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা এখন নানা রকম নিয়মকানুন চালুর চেষ্টা করছে। আমাদের এমন কিছু নিয়মে পৌঁছাতে হবে, যা শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য কাজ করবে, কেবল সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক লাভের জন্য নয়। জার্নাল অব রিসার্চ অন অ্যাডোলেসেন্স-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সুস্থ মানসিক বিকাশের স্বার্থে সোশ্যাল মিডিয়ার লাগাম টেনে ধরার সময় এখনই।

সূত্র: ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া এবং জার্নাল অব রিসার্চ অন অ্যাডোলেসেন্সশিশুর ওপর অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের প্রভাব

Read full story at source