২৪ ঘণ্টার শ্রীমঙ্গল অভিযান

· Prothom Alo

গত মার্চ মাসের শেষ শুক্রবার সন্ধ্যায়, দৈনন্দিনের যাবতীয় কাজ শেষে নরসিংদী পুরোনো লঞ্চঘাটে গিয়ে কিছুক্ষণ বসেছিলাম। একা থাকলে যেমন শান্তি লাগে, নীরবে বসে থাকা যায়, তেমনি জীবনের নানা রকম চিন্তা মাথায় এসে ভর করে। স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার ব্যর্থতা, মনমতো জীবন পরিচালনা না করার কষ্ট, ব্যক্তিগত হতাশা ইত্যাদি এসে সুন্দর সব চিন্তা নষ্ট করে দেয়। তবু সারা দিনের মধ্যে কিছুটা সময় একা থাকতে ভালো লাগে।

ঘড়িতে রাত তখন ৯টা। বাড়ির পথে রওনা দিলাম। পথিমধ্যে নরসিংদী সদরের বাজার ব্রিজের পাশে একটা চায়ের দোকানে স্কুলজীবনের বন্ধু ওমর, লোকনাথ, রাজু, রাজীব, মিলন ও সাইফুলদের দেখতে পাই। তারা চা খাচ্ছিল। ঈদের ছুটি উপলক্ষে বিকেলে তারা বের হয়; আমাকেও নক করে বলেছিল দেখা করার জন্য। আমার ব্যক্তিগত কাজ ছিল, আর নিজে এখনো পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারিনি বলে দেখা করার ইচ্ছে হচ্ছিল না। না করে দিই একটা অজুহাত দিয়ে।

Visit rouesnews.click for more information.

যাহোক, দেখা হওয়ার পর মাথা থেকে সব চিন্তা চলে গেল। আমরা হাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, এবং হাজীপুর নাসিরউদ্দিন মেমোরিয়াল হাইস্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। ক্লাস ওয়ান থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি। সম্ভবত এ জন্যই বলে স্কুলের বন্ধুরা হলো জীবনের সেরা বন্ধু—যারা থেকে যায় মনের মধ্যে আমৃত্যু। তাদের সঙ্গে দেখা হলে জীবনের সব ক্লান্তি যেন এক নিমেষেই দূর হয়ে যায়। সেদিনও ব্যতিক্রম হয়নি। কিছু সময়ের জন্য ফিরে যাই শৈশব আর কৈশোরের স্মৃতিময় দিনগুলোতে।

বন্ধুরা বলল, সবাই মিলে শ্রীমঙ্গল যেতে চায়। সেটারই পরিকল্পনা চলছে। আমিও মুহূর্ত না ভেবে বলে দিলাম, ‘যাব।’ দ্রুত রাজি হওয়ায় তারা অবাক হলেও খুশি হলো। আমিও অনেক দিন ধরে এমন হুটহাট একটা ভ্রমণে যাব বলে মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম। সময় আর সুযোগ সব সময় একসঙ্গে আসে না; তাই সামনে আসা বর্তমান সুযোগটা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করিনি।

সেদিনই রাত পৌনে ১১টার মধ্যে আমরা নরসিংদী রেলস্টেশনে একত্র হলাম। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেস নরসিংদী স্টেশনে এল রাত প্রায় সাড়ে ১১টায়, আমরা ট্রেনে উঠে বসি। ট্রেন তার গতিতে চলছিল আর আমরা ফিরে যাই অতীতের স্মৃতিতে। আড্ডায় জায়গা করে নিল স্কুলজীবনে ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনার কথা। পরীক্ষার হলে একজন আরেকজনকে না দেখানো, খেলার মাঠে রান গোনা নিয়ে তর্কাতর্কি, টিফিনের সময় একসঙ্গে কোথাও যাওয়ার ঘটনা, স্কুল পালিয়ে গিয়ে শিক্ষকের কাছে ধরা পড়ার গল্প, কোন স্যার কেমন ছিলেন, সেসব মনে করা; ক্লাসে কে বেশি স্মার্ট ছিল, কোন মেয়েটা বেশি সুন্দরী ছিল, তাদের বর্তমান অবস্থা এখন কেমন ইত্যাদি। নানা গল্প–আড্ডায় আমাদের নির্ঘুম রাত আনন্দে কাটতে লাগল। শ্রীমঙ্গল নামার আগে ভৈরব আর শায়েস্তাগঞ্জ ছাড়া তেমন কোনো স্টেশনে এই ট্রেনটি থামেনি।

শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে যখন পৌঁছাই, তখন ঘড়িতে রাত ৪টা বেজে ২০ মিনিট। ভেবেছিলাম, এই রাতে তেমন লোকজন ও যাত্রী স্টেশনে থাকবে না। কিন্তু নেমে অবাক! অসংখ্য লোকজন ও ট্রেনের জন্য অপেক্ষারত যাত্রী। ঈদ–পরবর্তী সময় হওয়ায় কেউ সিলেট যাচ্ছে, আবার কেউ ঢাকার পথে। সেখানে অপেক্ষা করি সকাল সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত। এর মধ্যে কিছু সময় বিশ্রাম করেছি প্ল্যাটফর্মে বসে, নাশতা করেছি স্টেশনসংলগ্ন রেস্টুরেন্টে পরোটা আর ডাল সবজি দিয়ে। কেউ কেউ স্টেশনসংলগ্ন জামে মসজিদে ফজরের নামাজ পড়েছে। আর অনেকটা সময় লেগে যায় আলোচনা করে বাজেটের মধ্যে ভ্রমণের জন্য চান্দের গাড়ি ঠিক করতে গিয়ে।

সারা দিনের জন্য পছন্দ করা জায়গাগুলোতে নিয়ে যাওয়ার শর্তে একটি চান্দের গাড়ি ঠিক করলাম তিন হাজার টাকায়। আমরা সাতজন। ভ্রমণ শুরু করলাম মৌলভীবাজার জেলার প্রবেশদ্বারে সাতগাঁও চা–বাগানের ‘চা কন্যা ভাস্কর্য’ দেখার মাধ্যমে। চা কন্যা না দেখলে ভ্রমণ অসমাপ্ত থেকে যেত।

সেখান থেকে পানসি হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে গিয়ে দুধ–চা খেলাম। এখানকার চা আসলেই সুস্বাদু। চা খেয়ে চোখে নির্ঘুম রাত্রির কষ্ট কাটিয়ে চললাম লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের উদ্দেশে। কিন্তু কপাল মন্দ; বৃষ্টি আমাদের স্বাগত জানাল। গেটে গিয়ে বৃষ্টির কারণে গাড়ি থেকে নামতেই পারিনি। অগত্যা উদ্যানে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হলো। অনেকটা সময় বৃষ্টি ছিল। প্রথমে বিরক্ত হলেও রাস্তার দুই পাশে বড় বড় গাছ, জঙ্গল, পাহাড় আর চা–বাগানসহ প্রকৃতির সব সুন্দর দৃশ্য দেখে বিরক্তি ভাব কেটে গেল। বৃষ্টি উপভোগ করলাম ত্রিপল দিয়ে ছাদঘেরা চান্দের গাড়িতে বসে। সিদ্ধান্ত নিই আবার আমরা শুধু লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেখার জন্য একদিন সময় নিয়ে শ্রীমঙ্গল আসব।

বৃষ্টি কিছুটা কমলে চান্দের গাড়ি লাউয়াছড়া থেকে মাধবপুর লেকের উদ্দেশে রওনা করে। পথিমধ্যে দেখলাম স্থানীয় শত শত চা–বাগানের সঙ্গে সমতল জমিতে ধান, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফল ও ফসলের চাষাবাদ। দূর থেকে চোখে পড়ে পরিপাটি করা বাড়ির উঠোন। চা–বাগানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের অনেকের থাকার বাসস্থান কোম্পানি থেকে দেওয়া হয়। সে জন্য চা–বাগানের আশপাশেই দেখা যায় ছোট ছোট জায়গায় কয়েকটা করে বাড়িঘর। ঘরগুলো কিছু শণের, কিছু টিনের আবার কিছু আধপাকা। ঘরের সঙ্গে ছোট উঠান আর অল্প ফাঁকা জায়গায় বিভিন্ন ফুলের গাছ, হাঁস–মুরগির চলাচল, গরুর গোয়াল ইত্যাদি দেখে বাংলার চিরাচরিত রূপের কথা মনে হতে বাধ্য। এসব দেখতে দেখতেই আমরা গন্তব্যে পৌঁছে যাই।

মাধবপুর লেকে পৌঁছাই সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে। তখন খুব একটা পর্যটক ছিল না। বৃষ্টি হওয়াতে পরিবেশও বেশ শীতল। প্রবেশপথে গেটে ৭ জনের জন্য ৮০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হলো। কিছুটা পথ হাঁটার পরই চোখে পড়ল বেগুনি রঙের শাপলা ভরা মাধবপুর লেক। পুরোপুরি স্বচ্ছ না হলেও লেকের পানি সুন্দর। চারপাশে পাহাড় আর চা–বাগানের কারণে লেকের সৌন্দর্য বেড়ে গেছে। মনে হলো স্বর্গীয় সৌন্দর্যভরা কোনো জায়গায় এসে গেলাম! মনের সব ক্লান্তি, হতাশা, ক্ষুধা কিংবা নির্ঘুম রাত—সব যেন এক নিমেষেই দূর হয়ে গেল।

অনেকটা সময় মাধবপুর লেকে ঘুরাঘুরি করলাম। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে হেঁটে গেলাম। থেমে থেমে কয়েকবার বৃষ্টি হলে জুম ঘরে দাঁড়ালাম। গ্রুপ ছবি ও একক ছবি তুললাম, ভিডিও করলাম। কিছু সময়ের জন্য মনে হলো জীবনের যাবতীয় সব ঝামেলা আর চিন্তা মাথা থেকে চলে গেছে। কোনো চাপ নেই, দুশ্চিন্তা নেই, প্রাণভরে নিশ্বাস নিচ্ছি, মনখুলে হাসতে পারছি, যা খুশি তা বলতে পারছি। এ রকম দিন হয়তো জীবনে বারবার আসবে না। তাই মুহূর্তটা আনন্দে বাঁচি।

ঘোরাঘুরি শেষে লেকের প্রবেশপথের পাশে থাকা ছোট ছোট অস্থায়ী দোকানগুলো থেকে চা–পাতা আর চানাচুর দিয়ে মাখা ঝালমুড়ি আর আনারস মাখা খেলাম। একটা বিষয় দেখে খারাপ লাগল, মাধবপুর লেকের আশপাশের অনেক জায়গায় চিপস, পলিথিনসহ প্লাস্টিকের অনেক কিছু পড়ে রয়েছে, যা সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য হুমকি।

তখন রোদ উঠেছে। মাধবপুর লেক থেকে চান্দের গাড়ি ছুটে চলল, আমরা পেছনে ফেলতে লাগলাম একের পর এক পাহাড় আর চা–বাগান। মাঝেমধ্যে রাবারবাগানও চোখে পড়ল। আরও দেখলাম চা–বাগান থেকে শ্রমিকদের চা–পাতা সংগ্রহের দৃশ্য।

আমরা পৌঁছালাম নূরজাহান টি গার্ডেনে। একটা নির্দিষ্ট পয়েন্টে গিয়ে গাড়ি থামল। গোছানো চা–বাগানের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হলাম। সবাই আনন্দ নিয়ে সেলফি তুললাম। অল্প সময় সেখানে থাকলেও সৌন্দর্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। এরপর গাড়ি ছুটে চলল আবার পাহাড়ি আর সমতলের সমন্বয়ে পিচঢালা রাস্তায়, কখনো মাটির পথ ধরে। চোখে পড়ল লেমন টি গার্ডেন আর লাউয়াছড়া এলাকার কয়েকটি সুন্দর মনোমুগ্ধকর দৃশ্যমান রিসোর্ট।

ঘোরাঘুরি করতে করতে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে এল। প্রত্যেকেরই ক্ষুধা লেগেছে। বন্ধু ওমর বলল, গ্র্যান্ড সুলতান হোটেলের সামনের রাস্তার বিপরীত পাশে রাজু ভাইয়ের হোটেলে খাওয়া যায়। সবাই তাতে সায় দিলাম। খাবার মোটামুটি ভালো ছিল। ড্রাইভারসহ আমরা মোট আটজন ভাত, ভর্তা, রুই মাছ, ডালের একটা প্যাকেজ এবং জলের বোতলসহ মোট খরচ হয় প্রায় দুই হাজার টাকা। বন্ধু ওমরের উদ্যোগ, আইডিয়া ও পরিকল্পনায় আমাদের এই ভ্রমণ। আর বন্ধু আনিসুজ্জামান রাজুর আগ্রহের কারণে প্রতিবছর একবার হলেও আমরা স্কুলজীবনের বন্ধুরা একত্র হতে পারি।

মধ্যাহ্নভোজন শেষে রওনা হলাম ফুলছড়া চা–বাগানের লাল পাহাড় বা লাল ঢিলা আর রাবার বাড়ি দেখার জন্য। লাল পাহাড় দেখে নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার সোনাইমুড়ী এলাকার কথা মনে পড়ল। সে এলাকার মাটিও এমন লাল রঙের, এমন পাহাড়ও রয়েছে, যাকে আমরা ঢিলা বলি। রাবারবাগানের অন্যতম সৌন্দর্য গাছ থেকে ঝরে পড়ে থাকা অগণিত শুকনা পাতা। এরপর চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের গেটে গেলাম। শনিবার সরকারি ছুটির দিন বলে ভেতরে প্রবেশ করতে পারিনি। পরে শ্রীমঙ্গলের রামনগরের মণিপুরীপাড়ায় আদি নীলকণ্ঠ টি ক্যাবিনের বিখ্যাত সাত রঙের আর লেয়ারের চা খেতে গেলাম। ব্যক্তিগতভাবে আমার এই চা ভালো লাগেনি। ৭ রঙের কিংবা ৮ লেয়ারের চা—কোনোটাই ভালো লাগল না। তাই আমি গ্রিন টি খেলাম।

মণিপুরী পাড়ার দোকানে বসে চা খেতে খেতে তিনটা বেজে যায়। আমরা আর ঘোরাঘুরি না করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ট্রেন পাব কি পাব না, নাকি বাসে যাব; কিন্তু বাসে যানজটে যাত্রা দেরি হতে পারে ইত্যাদি দ্বিধাদ্বন্দ্বে আমাদের আলোচনা চলল। এর মধ্যে চান্দের গাড়িতে উঠলাম। ড্রাইভার আবুল হোসেন চাচা পরামর্শ দিয়ে বললেন, ‘আপনাদের প্রথমে রেলস্টেশন নিয়ে যাই। যদি ট্রেন না পান, তাহলে বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে নামিয়ে দেব।’ আমরা সম্মতি দিলাম। রেলস্টেশনে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই দেখতে পেলাম ঢাকাগামী জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনটি স্টেশনে থেমে আছে। দ্রুত চান্দের গাড়ির ভাড়া মিটিয়ে দৌড়ে ছুটে চললাম ট্রেন ধরতে। সবাই একই বগিতে ওঠার সুযোগ পেলাম।

ফেরার পথে ট্রেনযাত্রায় জানালা দিয়ে দুই পাশে চাষের জমি, পাহাড় আর চা–বাগান চোখে পড়ল। তবে কষ্ট লেগেছে জরিমানাসহ টিকিট কেটে ট্রেনের ভাড়া দিতে হয়েছে বলে। আমরা ব্রাক্ষণবাড়িয়া এসে নামলাম। সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী মহানগর গোধূলি ট্রেনে উঠে নরসিংদী রেলস্টেশনে পৌঁছাতে রাত নয়টা বেজে যায়।

আগের দিন রাত ৯টায় ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়ে বের হয়ে ভ্রমণ শেষে আবার পরের দিন রাত ৯টায় ফিরে এলাম। এই একটি কারণে হলেও ভ্রমণটি সারা জীবন মনে থাকবে।

হাজীপুর, নরসিংদী

Read full story at source