সড়কের দুই পাশে সবুজের সমারোহ। সবুজের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে হলুদ ফুল। আর সেসব ফুলের চারপাশে উড়ছে মৌমাছির ঝাঁক। সেখান থেকে মধু সংগ্রহ করে ফিরে আসছে সড়কের পাশের মৌ-বাক্সে।
ঠাকুরগাঁওয়ে ব্যাপক আলু আবাদ হয়। আলু তোলার আগে কৃষকেরা খেতে মিষ্টিকুমড়ার চারা রোপণ করে দেন। সেসব গাছ এখন ফুলে ফুলে ভরে গেছে। আর মিষ্টিকুমড়ার ওই খেত ঘিরে মৌ চাষ করছেন খামারিরা।
Visit rouesnews.click for more information.
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, মিষ্টিকুমড়া ফুলে মৌমাছি বসলে পরাগায়ন ভালো হয়। ফলে একদিকে উৎপাদন যেমন বাড়ছে, তেমনি মধুও আহরণ করা যাচ্ছে। সমন্বিত এ চাষে মিষ্টিকুমড়া চাষি ও মৌ চাষি দুজনই লাভবান হচ্ছেন।
সদর উপজেলার আকচা, ঢোলারহাট, পটুয়াসহ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, সেখানের মিষ্টিকুমড়াখেতে মৌ-বাক্স বসিয়েছেন খামারিরা। তাঁরা নাটোর, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জ থেকে এসেছেন। কেউ কেউ অন্য এলাকার। মৌ-বাক্স ঘিরে চলছে তাঁদের কর্মযজ্ঞ।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে মৌ-বাক্স নিয়ে ঠাকুরগাঁও-রুহিয়া সড়কের হারাগাছ এলাকায় এসেছেন খামারি মো. আলহাজ। একদল কর্মী সেসব বাক্স দেখভাল করছেন। তাঁদেরই একজন মো. আকাশ বলেন, প্রতিবছর আশপাশের লিচুবাগানে মৌ-বাক্স নিয়ে আসেন তাঁরা। এবার লিচুবাগানে মুকুল কম আসায় তাঁরা সেখান থেকে চলে এসেছেন। এখন মিষ্টিকুমড়াখেতে মৌ-বাক্স বসিয়েছেন। প্রতিটি বাক্সে একটি করে রানি ও পুরুষ মৌমাছি এবং অসংখ্য কর্মী মৌমাছি আছে। কর্মী মৌমাছিরা ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে যায় ফুলে। সেখান থেকে মধু সংগ্রহ করে নিজ নিজ বাক্সের মৌচাকে এনে জমা করে।
সদর উপজেলার ঢোলারহাট এলাকায় ব্যাপক মিষ্টিকুমড়ার আবাদ হয়। কৃষকেরা আলুর সাথি ফসল হিসেবে এই মিষ্টিকুমড়া আবাদ করেন। ঢোলারহাট থেকে ফাঁড়াবাড়ি যাওয়ার সড়কের ছয়টি খেতে মৌ-বাক্স বসিয়েছেন আওলাদ হোসেন। তিনি নাটোর থেকে মধু সংগ্রহে করতে এখানে এসেছেন। আওলাদ বলেন, মধু সংগ্রহের জন্য তাঁরা এক এলাকায় মাসখানেক থাকেন। একেকটি খেতের পাশে ৪০ থেকে ৫০টি মৌ-বাক্স রাখেন। এক চেম্বারের প্রতিটি বাক্সে ১০টি এবং দুই চেম্বারের একটি বাক্সে ২০টি ফ্রেম থাকে। ১০ ফ্রেমের একটি বাক্সে ২০ হাজার পর্যন্ত মৌমাছি থাকে। পাঁচ থেকে সাত দিন পর বাক্সগুলোর ফ্রেমে থাকা মৌমাছিগুলো সরিয়ে যন্ত্রের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করা হয়। ১০০টি মৌ-বাক্সে সাত থেকে আট মণ মধু পাওয়া যায়।
পটুয়া এলাকার সামসুল হকের মিষ্টিকুমড়াখেতে ৭০টি মৌ–বাক্স নিয়ে মধু সংগ্রহ করছিলেন মোতাল্লেব হোসেন। তিনি বলেন, এই খেত থেকে ৪ থেকে ৫ মণ মধু পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি। প্রতি কেজি মধু বিক্রি করছেন ৬০০ টাকায়।
মিষ্টিকুমড়া চাষি সামসুল হক বলেন, মিষ্টিকুমড়াখেতে মৌমাছি যত বেশি আসবে, তত পরাগায়ন ঘটবে। এতে ফলনও বেশি হবে।
খামারি মো. আলহাজ বলেন, এবার তিনি চারটি এলাকার মিষ্টিকুমড়াখেতে ৩৫০টি বাক্স বসিয়েছেন। সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে মিষ্টিকুমড়ার ফুল থেকে বেশ ভালো মধু পাওয়া যায়। আর এতে ভালো ব্যবসাও হয়।
মিষ্টিকুমড়াখেতের মালিক জাফর আলী বলেন, মিষ্টিকুমড়া ফুলের পরাগায়ন না হলে ফলন কম হয়। খেতের পাশে মৌ–বাক্স বসালে তাঁদেরই লাভ। ফুলে ফুলে ঘুরে মধু সংগ্রহ করার সময় মৌমাছি পুরুষ ফুলের পরাগরেণু স্ত্রী ফুলের গর্ভমুণ্ডে স্থাপন করে পরাগায়ন ঘটায়। এতে মিষ্টিকুমড়ার উৎপাদন বেড়ে যায়।
ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) আলমগীর কবির বলেন, মিষ্টিকুমড়া একটি পর-পরাগায়িত ফসল। এর পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা হওয়ায় সাধারণত মৌমাছি বা বাতাসের মাধ্যমে পরাগায়ন ঘটে। মিষ্টিকুমড়ার খেতে মৌ-বাক্স বসালে মৌমাছি উড়ে উড়ে ফুলে বসে মধু সংগ্রহ করে। এতে ফুলে সহজে পরাগায়ন ঘটে। এতে অন্তত ৩০ শতাংশ ফলন বেড়ে যায়। আবার মধুও পাওয়া যায়।
