শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী একজন শৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক ও সংগঠক। জন্ম ১৯৬৫ সালে, পাবনা জেলার ঈশ্বরদীতে। তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত গণিতে এমএসসি করেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জামাল নজরুল ইসলাম উচ্চতর গবেষণা কেন্দ্রের ডেপুটি রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত আছেন।
তাঁর হাতেই চিটাগাং ইউনিভার্সিটি অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যাত্রা শুরু হয়। পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর হাতেখড়ি ১৯৮৬ সালে হ্যালির ধূমকেতু দেখার মধ্য দিয়ে। পরে ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালে যথাক্রমে ধূমকেতু হায়াকুতাকা এবং হেল-বপসহ অন্যান্য জ্যোতিষ্ক পর্যবেক্ষণ করেন।
Visit een-wit.pl for more information.
দেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তিনি ভারতের পুনের ইন্টার-ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস জ্যোতির্বিজ্ঞান কর্মশালায় অংশ নেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর তাঁর বেশ কিছু লেখা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং চিটাগাং ইউনিভার্সিটি অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মডারেটর। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের সঙ্গেও যুক্ত আছেন।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলার আইনস্টাইন অমল কুমার রায়চৌধুরী, বিশ্বনন্দিত বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম, বাংলার আলোকিত জ্যোতির্বিজ্ঞানী, মেসিয়ে তারকাপুঞ্জ: আবিষ্কারের ইতিকথা, নক্ষত্র, ধূমকেতু ও মহাকাশ গবেষণায় মানমন্দির। সম্প্রতি বিজ্ঞানচিন্তার পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন কবি ও সাংবাদিক কাজী আলিম-উজ-জামান।
লেখালেখির শুরুটা কীভাবে? কোন মুহূর্তে বুঝলেন বিজ্ঞানই হবে আপনার লেখার প্রধান ক্ষেত্র?
শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী: লেখালেখির শুরুটা একটু দেরিতেই ঘটেছে। তবে এর ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে, যখন হ্যালির ধূমকেতুর আবির্ভাব ঘটে। আপনি জানেন, প্রতি ৭৬ বছর পর পর হ্যালির ধূমকেতুর আবির্ভাব ঘটে। ওই সময় জ্যোতির্বিজ্ঞানীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে ধূমকেতু দেখার প্রবল কৌতূহল সৃষ্টি হয়।
একই বছর কাকতালীয়ভাবে অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম স্যারের রচিত কৃষ্ণ বিবর বইটির সন্ধান পাই। বইটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এই বইটিই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং আমি জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি ভীষণ আগ্রহী হয়ে উঠি। পরে জামাল স্যারের দ্য আল্টিমেট ফেইট অব দ্য ইউনিভার্স (মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি) শীর্ষক আরেকটি বইয়ের সন্ধান পাই। এসব বই পড়তে গিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান তথা মহাকাশবিজ্ঞান এবং জামাল স্যারের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। মূলত এভাবেই জ্যোতির্বিজ্ঞান আমার লেখালেখির প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
জ্যোতির্বিজ্ঞান আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে কীভাবে টানে? বিজ্ঞান হিসেবে, নাকি বিস্ময়ের গল্প হিসেবে?
শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী: আমি গণিতের ছাত্র ছিলাম। গণিত পড়তে গিয়ে দেখলাম, বেশির ভাগ গণিতবিদই একই সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানীও ছিলেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান গণিতবিদেরা সুচারুভাবে করতেন এবং পরে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা তা প্রমাণ বা আবিষ্কার করতেন।
যেমন গাণিতিক হিসাব-নিকাশের মাধ্যমেই নেপচুনের অস্তিত্বের কথা প্রথম জানা যায়। পরে বার্লিন মানমন্দিরে বসে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এটি আবিষ্কার করেন। গণিতের এই যে কারসাজি, পাশাপাশি পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিস্ময়কর সব আবিষ্কার ও গল্প আমাকে প্রথম দিকে প্রবলভাবে টানত। এভাবেই পরে বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ ও বই লেখার প্রতি আমি ঝুঁকে পড়ি।
চেরনোবিল শুধু পারমাণবিক দুর্ঘটনা নয়—সেরহিই কুরিকিন, সহপ্রতিষ্ঠাতা, উইপ্ল্যানেট ইউক্রেনবাংলায় মহাকাশ ও বিজ্ঞান নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শূন্যতা বা চ্যালেঞ্জ কোথায় দেখেন?
শৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক ও সংগঠক শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকীশরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী: এ ক্ষেত্রে জামাল স্যারের একটি কথা মনে পড়ছে। স্যার বলেছিলেন, ‘অনেকের ধারণা, ভালো ইংরেজি না জানলে বিজ্ঞানচর্চা করা যাবে না। এটি একটি ভুল ধারণা। মাতৃভাষায়ও ভালো বিজ্ঞানচর্চা ও উচ্চতর গবেষণা হতে পারে...। সুতরাং বাংলায় বিজ্ঞানচর্চাটা গুরুত্বপূর্ণ।’
আমি মনে করি, ছেলেবেলা থেকেই—অর্থাৎ স্কুল থেকেই মাতৃভাষা ভালোভাবে রপ্ত করতে হবে। এর জন্য প্রচুর বই পড়তে হবে। শরৎচন্দ্র বলেছেন, ‘মাতৃভাষাকে বড় করে না তুললে চিন্তা চিরদিন ছোট হয়ে থাকবে।’ আমরা দেখেছি, বাংলার নবজাগরণের নায়ক রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি মাতৃভাষায় বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ ও গ্রন্থও লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রবন্ধই ছিল বিজ্ঞানবিষয়ক, সাহিত্য নয়। তাই আমি বলব, মাতৃভাষায় ভালো দখল থাকলে, বিজ্ঞান ভালোভাবে বুঝলে, সর্বোপরি মাতৃভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসা থাকলে বিজ্ঞান বিষয়ে লেখালেখি করতে তেমন কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
কেউ কেউ অবশ্য পরিভাষার কথা বলেন। সে ক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিভাষা তৈরি করে নিতে হবে। আর যদি পাওয়া না যায়, তবে সরাসরি মূল ভাষার শব্দই ব্যবহার করা যেতে পারে। আমরা দেখেছি, নিউটন তাঁর বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রমাণের প্রয়োজনে ক্যালকুলাস বা নতুন গণিত সৃষ্টি করেছিলেন। ঠিক তেমনি প্রয়োজনে আমাদেরও পরিভাষা তৈরি করে নিতে হবে। তাই বাংলায় মহাকাশ ও বিজ্ঞান নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে আমি বড় কোনো শূন্যতা বা চ্যালেঞ্জ দেখি না।
বিশৃঙ্খলাকে বশে এনে ৩০ কোটি টাকার ব্রেকথ্রু পুরস্কার!একটি বিজ্ঞান বই লেখার সময় গবেষণার বিষয়বস্তুকে সাধারণ পাঠকের উপযোগী ভাষায় নিয়ে আসার পুরো প্রক্রিয়াটি আপনি কীভাবে পরিচালনা করেন?
শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী: বিজ্ঞানীদের গবেষণা বা চিন্তার ফসলই হলো বড় বড় সব আবিষ্কার। বিজ্ঞানের এই কালজয়ী আবিষ্কারগুলোকে সাধারণ পাঠকের উপযোগী করে মাতৃভাষায় প্রকাশ করা একজন বিজ্ঞান লেখকের প্রধান কাজ।
এ ক্ষেত্রে গাণিতিক সমীকরণের ব্যবহার পাঠকের কাছে খটকা লাগতে পারে। তাই সাধারণ পাঠকের জন্য গাণিতিক সমীকরণ পরিহার করে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো সহজ-সরল ভাষায় উপস্থাপন করেন একজন বিজ্ঞান লেখক। এ ধরনের প্রবন্ধকে জনপ্রিয় বিজ্ঞান বলা হয়। কেউ কেউ একে বিজ্ঞানসাহিত্যও বলেন। এসব লেখার মধ্যে বিজ্ঞানের ইতিহাসও জড়িয়ে থাকে, যা বেশ চমকপ্রদ। বিজ্ঞানের ইতিহাস না জানলে শুধু বিজ্ঞান পড়ে পূর্ণ আনন্দ পাওয়া যায় না।
সবাই জানেন, আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব বেশ কঠিন। ওই সময় মাত্র গুটি কয়েক বিজ্ঞানী এ তত্ত্ব বুঝতেন। সেই তত্ত্ব অর্থাৎ আইনস্টাইনের ক্ষেত্র সমীকরণের প্রথম সমাধান করেছিলেন জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল শোয়ার্জশিল্ড। তারও একটি চমকপ্রদ ইতিহাস আছে।
সালটা ১৯১৪। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। শোয়ার্জশিল্ড কাইজারের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পরে যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওই যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেই তাঁর হাতে এসে পৌঁছায় আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের ওপর প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো। যুদ্ধের ময়দানে স্থাপিত হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়েই তিনি এই তত্ত্বের সমাধান বের করে ফেলেন এবং তা আইনস্টাইনের কাছে পাঠিয়ে দেন! এভাবে গল্পে গল্পে ইতিহাস তুলে ধরেও বিজ্ঞানের প্রতি সাধারণ পাঠককে আকৃষ্ট করা যায়।
বিজ্ঞানের কাজ হচ্ছে প্রতিনিয়ত প্রকৃতিকে পাঠ করা—ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, লেখক ও অধ্যাপকবিজ্ঞানীদের জীবনী লিখতে গিয়ে এমন কোনো অভিজ্ঞতা কি হয়েছে, যা আপনাকে নতুনভাবে বিজ্ঞান বা মানুষের সংগ্রামকে দেখতে শিখিয়েছে?
বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক ও সংগঠক শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকীশরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী: প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনোভাবে সংগ্রামী। বিজ্ঞানীরাও এর ব্যতিক্রম নন। বিজ্ঞানীদের নামের সঙ্গে সাধারণত বিপ্লব বা বিদ্রোহের মতো শব্দ খুব একটা শোনা যায় না। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বেলায় একটু ব্যতিক্রম দেখা যায়। বিপ্লবী জ্যোতির্বিজ্ঞানী কোপার্নিকাস, ব্রুনো বা গ্যালিলিওর কথা আমরা সবাই জানি।
সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে কোপার্নিকাসকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। জিওর্দানো ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। আর গ্যালিলিওকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে কোপার্নিকাসের মতবাদ ভুল বলতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু এত কিছুর পরও আমরা দেখি, শেষ পর্যন্ত সেই কোপার্নিকাসের মতবাদেরই জয় হয়েছে। এসব বিজ্ঞানীর সংগ্রামী জীবন মানুষকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে।
যুগে যুগে পৃথিবীতে যাঁরা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন, তাঁদের সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার কয়েকটি চরণ এখানে উল্লেখ করতে চাই। কারণ, তিনি সব অন্যায়, অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। নজরুল লিখেছেন—‘মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না—’
৫৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় বেঁচে ফেরা এক শিশুর গল্পআপনার মতে, নক্ষত্র-মহাকাশের গল্প শিশু-কিশোরদের মধ্যে কৌতূহল ও যুক্তিবোধ গড়ে তুলতে কতটা কার্যকর?
শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী: মহাকাশের প্রতি মানুষের আগ্রহ সেই প্রাচীনকাল থেকেই। নক্ষত্র দেখে পথচলা, কৃষিকাজ, সময় নির্ণয় প্রভৃতি কাজ প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই হয়ে আসছে। মানুষ এখনো আকাশের কোটি কোটি নক্ষত্রের পানে তাকিয়ে অবাক বিস্ময়ে নানা প্রশ্ন করে এবং সেই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে।
আমরা দেখেছি, বড়দের চেয়ে শিশুরা বেশি কৌতূহলী হয়। তারা নক্ষত্র বা মহাকাশের গল্প শুনতে চায়। প্রশ্ন করে, জানতে চায়। সবকিছু ভেঙেচুরে দেখতে চায়। এটি তাদের সহজাত প্রবণতা। এই প্রবণতা থেকেই মূলত যুক্তিবোধ তৈরি হয়, তৈরি হয় জিজ্ঞাসা। তাই শিশুদের উপযোগী বিজ্ঞানবিষয়ক বই আমাদের বেশি বেশি করে প্রকাশ করতে হবে। তাদের শোনাতে হবে বিজ্ঞানের চমকপ্রদ সব গল্পকাহিনি।
আমাদের দেশে অনেক শিক্ষার্থী বিজ্ঞানকে কঠিন মনে করে তা থেকে দূরে সরে যায়। এই মানসিকতা বদলাতে কী করা দরকার বলে মনে করেন?
শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকীর লেখা বই ধূমকেতুশরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী: আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে আনন্দের সঙ্গে বিজ্ঞান শিক্ষাদানের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই, নেই তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগও। অনেক স্কুলে বিজ্ঞানাগার বা ল্যাবরেটরি নেই। লাইব্রেরি থাকলেও বিজ্ঞানের হালনাগাদ বা নতুন কোনো বই থাকে না। বিজ্ঞান শিক্ষকের কথা না-হয় বাদই দিলাম! এ অবস্থায় কীভাবে বিজ্ঞান শিক্ষা সম্ভব?
আমার মনে হয়, প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি করে বিজ্ঞান ক্লাব থাকা প্রয়োজন। এই ক্লাবের পক্ষ থেকে বিজ্ঞান মেলা, বিজ্ঞান বক্তৃতা এবং অলিম্পিয়াডের আয়োজন করলে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে, তারা প্রশ্ন করতে শিখবে। প্রসঙ্গক্রমে আমাদের বিজ্ঞান বক্তা আসিফ ভাইয়ের কথা বলা যায়। তিনিই আমাদের দেশের একমাত্র পেশাদার বিজ্ঞান বক্তা এবং অনেক দিন ধরে তিনি অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে এই কাজ করে আসছেন।
যাহোক, যে কথা বলছিলাম—প্রতিটি বিদ্যালয়ে যদি আকাশ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকে, তবে শিক্ষার্থীরা দূরবিন বা টেলিস্কোপ দিয়ে সরাসরি গ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকা বা ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। মহাকাশ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাবে। এভাবেই বিজ্ঞানের প্রতি তাদের ভীতি আস্তে আস্তে দূর হবে।
অনেকেই মনে করেন, বাঙালিদের দিয়ে বিজ্ঞান গবেষণা সম্ভব নয়। বাঙালিরা শুধু কবিতা বা গল্প-উপন্যাস লিখবেন এবং শিল্প-সাহিত্য চর্চা করবেন। এটি সম্পূর্ণ ভুল একটি ধারণা। আমাদের দেশেই অনেক বড় বড় বিজ্ঞানী জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁরা বাংলার মাটিতে বসেই যুগান্তকারী সব আবিষ্কার করেছেন।
অমল কুমার রায়চৌধুরীর কথাই ধরুন। তাঁকে নিয়ে আমি বাংলার আইনস্টাইন অমল কুমার রায়চৌধুরী শীর্ষক একটি বই লিখেছিলাম। শুনলে হয়তো অবাক হবেন, বিশ্বসৃষ্টিতত্ত্বে বা কসমোলজিতে তাঁর নামেই একটি বিখ্যাত সমীকরণ রয়েছে, যা রায়চৌধুরী ইকুয়েশন নামে পরিচিত। এই সমীকরণ ব্যবহার করেই বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তাঁর সিঙ্গুলারিটি তত্ত্ব প্রমাণ করেছিলেন। অথচ আমাদের ছেলেমেয়েরা রায়চৌধুরীর নাম শোনেনি, তাঁকে জানেও না। ভুবনবিখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহা বা সত্যেন্দ্রনাথ বসুর আবিষ্কারের কথা এখানে নতুন করে আর বললাম না। অতএব, কঠিন বলে কিছু নেই। এ বিষয়ে আমাদের মনমানসিকতা এবং ধ্যানধারণার পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
মহাবিশ্বে এলিয়েনের অস্তিত্ব খুবই স্বাভাবিক অনুমান—আমিনুল হক, কনটেন্ট ক্রিয়েটরনতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানমুখী করতে বই, ম্যাগাজিন ও জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখকদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী: নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানমুখী তথা বিজ্ঞানমনস্ক জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে বই ও ম্যাগাজিনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এ ক্ষেত্রে একজন বিজ্ঞান লেখকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু বিজ্ঞান লেখক নন, এর সঙ্গে বিজ্ঞানের শিক্ষক ও গবেষকদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রচুর বই লিখতে হবে। বইয়ের কোনো বিকল্প নেই; সেটি হার্ডকপি হোক বা সফটকপি।
শুধু শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মফস্বল এলাকায়, এমনকি গ্রামগঞ্জেও বই-ম্যাগাজিনের প্রসার ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে বিজ্ঞান বক্তৃতা ও অলিম্পিয়াডের আয়োজন করতে হবে। এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানচিন্তা ম্যাগাজিনের কথা বিশেষভাবে বলা যায়। এ ধরনের একটি ম্যাগাজিনের আমাদের দেশে খুবই প্রয়োজন ছিল। এটি নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে, যা এর আগে কখনো চোখে পড়েনি। আমাদের দেশে বিজ্ঞানের প্রসারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অন্তত এই ম্যাগাজিনটিও যদি আমরা সব ছেলেমেয়ের হাতে তুলে দিতে পারতাম, তাহলে অনেক বড় কাজ হতো। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের শিক্ষকেরা নিজ নিজ এলাকায় এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন।
বর্তমান যুগে মহাকাশ অভিযান, প্রযুক্তি ও এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির মধ্যে জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখার গুরুত্ব কীভাবে বদলাচ্ছে?
শৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকীশরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী: পৃথিবী খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে আমাদের প্রতিনিয়তই জ্ঞান-বিজ্ঞানে হালনাগাদ হতে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও এআই ব্যবহার ছাড়া দেশে শিক্ষা ও অগ্রগতি সম্ভব নয়।
একসময় বিজ্ঞানের অগ্রগতি, আবিষ্কার এবং নানা বিষয় জানতে আমাদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির বদৌলতে আমরা মুহূর্তের মধ্যেই জেনে যাচ্ছি, পৃথিবীর কোন প্রান্তে কী ঘটছে। এটি প্রযুক্তির অগ্রগতি। ফলে যে বই লিখতে একসময় এক, দুই বা পাঁচ-দশ বছর সময় লেগে যেত, তা এখন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পাঠকের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
তবে শুধু জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখা নয়, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাতৃভাষায় গবেষণাপত্র প্রকাশেরও উদ্যোগ নিতে হবে। চীন, জাপান বা কোরিয়ার মতো দেশগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের সব আবিষ্কার নিজ নিজ মাতৃভাষায় অনুবাদ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদেরও ঠিক একই কাজ করতে হবে।
বিজ্ঞানী হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার কৌতূহল বজায় রাখা—সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন, অধ্যাপক, সাউথ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রযাঁরা আজ থেকেই আকাশ দেখতে চান, বিজ্ঞান শিখতে চান বা বিজ্ঞান নিয়ে লিখতে চান, তাঁদের জন্য আপনার তিনটি বাস্তব পরামর্শ কী?
শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী: শেখার কোনো সহজ বা সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি নেই। যাঁর যেমন ইচ্ছা, তিনি তাঁর নিজের মতো করেই শিখবেন। প্রতিটি মানুষ স্বতন্ত্র এবং আলাদা। তাই কাউকে জোর করে আকাশ দেখতে বলা যায় না। আকাশ তো সবাই দেখেন। তবে যাঁর আগ্রহ আছে, যাঁর আকাশ দেখে ভালো লাগে বা আনন্দ পান, তিনি নিজে থেকেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আকাশ দেখবেন। তিনি আকাশ দেখার নানা সরঞ্জাম, বইপুস্তক ও বাইনোকুলার সংগ্রহ করবেন। সম্ভব হলে টেলিস্কোপ সংগ্রহ করবেন, অথবা নিজেই হয়তো একটি টেলিস্কোপ তৈরি করে ফেলবেন!
আকাশ দেখা একটি দারুণ শখ। হয়তো এই শখই এক দিন তাঁকে বিখ্যাত করে তুলবে। হয়তো তিনি আবিষ্কার করে ফেলবেন নতুন কোনো ধূমকেতু, গ্রহ বা নীহারিকা! যেমন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী উইলিয়াম হার্শেলের কথা বলা যায়। তিনি পেশায় ছিলেন গায়ক। স্কুল-কলেজে সেভাবে লেখাপড়াও করেননি। ছেলেবেলায় ঘরে বসেই ভাইবোন মিলে গ্যালিলিও, নিউটন, অয়লার প্রমুখ বিজ্ঞানীর জীবনী পড়তেন। পরে নিজেরাই দূরবিন তৈরি করে আবিষ্কার করে ফেলেন সৌরজগতের সপ্তম গ্রহ, ইউরেনাস!
তাই যাঁরা আকাশ দেখতে চান, বিজ্ঞান শিখতে বা বিজ্ঞান নিয়ে লিখতে চান, তাঁদের উদ্দেশে আমার পরামর্শ হলো—বই পড়ুন, অনুসন্ধিৎসু হোন এবং আনন্দের সঙ্গে কাজ করুন। অর্থাৎ লেগে থাকুন। এর চেয়ে সহজ কোনো বিকল্প পথ আমি অন্তত দেখি না।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী: আপনাদেরও ধন্যবাদ।
‘ভেবেছিলাম আরও অপেক্ষা করতে হবে’—চিকিৎসায় নোবেলজয়ী শিমন সাকাগুচি