১২ এপ্রিলের রাত। বার্লিন থেকে খবর এল—হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর অরবান টানা ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ভোটে হেরেছেন এবং পরাজয় মেনে নিয়েছেন। দানিয়ুব নদীর তীরে জমে ওঠা জনতার মুখে তখন একটাই স্লোগান—‘রুশরা, ফিরে যাও।’ নতুন কোনো শব্দ নয়, চার দশক আগের সেই পুরোনো ডাকই ফিরে এল।
Visit rouesnews.click for more information.
তবে এবার সেই স্লোগানের মানে আলাদা। ১৯৮৯ সালে এই স্লোগান ছিল সোভিয়েত শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ। ১৯৫৬ সালের বিপ্লব দমাতে সোভিয়েত ট্যাংক নামার পর হাঙ্গেরি কার্যত মস্কোর নিয়ন্ত্রণেই ছিল। তখন ‘রুশরা, ফিরে যাও’ মানে ছিল বিদেশি দখলদারির অবসান, নিজের দেশের স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার দাবি।
কিন্তু ২০২৬ সালে এই স্লোগান কী বোঝাচ্ছে? অরবান কোনো রাশিয়ার বসানো নেতা ছিলেন না। তিনি নির্বাচিত হয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি নিজেই ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এই সম্পর্ক হয় কিছুটা আদর্শগত কারণে, কিছুটা ব্যক্তিগত বোঝাপড়ায়; আর সবচেয়ে বেশি হয় আর্থিক স্বার্থে।
এবার রাশিয়া ট্যাংক নিয়ে আসেনি। এসেছে গ্যাস চুক্তি, প্রভাবশালী ধনীগোষ্ঠী আর দুর্নীতির জাল বুনে।
হাঙ্গেরির ওরবান ইউরোপে যে সংকটের জন্ম দিয়েছেনএই স্লোগান তুলে হাঙ্গেরির মানুষ আসলে একধরনের লুটতরাজের রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। অরবানের ঘনিষ্ঠরা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। আর রাষ্ট্র ধীরে ধীরে ফাঁপা হয়ে গেছে। এখানে লড়াইটা সরাসরি স্বাধীনতা বনাম দখলদারির নয়, বরং দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
এই পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশ দখলমুক্ত হয় যখন বিদেশি সেনা চলে যায়। কিন্তু দুর্নীতির শাসন এভাবে শেষ হয় না। কারণ, এ ব্যবস্থা আদালত, গণমাধ্যম, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা—সব জায়গায় শিকড় গেড়ে বসে। তাই শুধু নির্বাচনে জিতলেই সব বদলে যায় না।
অরবানের হার যত বড়ই হোক, তিনি ১৬ বছরে যে কাঠামো গড়েছেন, তা এক দিনে ভাঙবে না। নতুন নেতা পেতের মাজারের জয় আসলে দীর্ঘ লড়াইয়ের শুরু মাত্র। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সামনে পথ সহজ নয়।
১৯৮৯ সালে ‘রুশরা, ফিরে যাও’ ছিল এক দৃশ্যমান দখলদার শক্তির বিরুদ্ধে স্লোগান। ২০২৬ সালে সেটি আরও জটিল কিছুকে বোঝায়। এটি বোঝায় একধরনের শাসনব্যবস্থা, যা সরাসরি চোখে পড়ে না, কিন্তু সমাজের ভেতরে-ভেতরে ছড়িয়ে থাকে। তাই লড়াইটাও আলাদা।
তবু এই ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। ‘উদার গণতন্ত্রের’ বিপরীতে যে ‘অনুদার গণতন্ত্র’ মডেল অরবান তুলে ধরেছিলেন, সেটিই ভোটের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমন একসময়ে, যখন অনেকেই ভাবছিল এ ধরনের শাসনই ভবিষ্যৎ, হাঙ্গেরির মানুষ উল্টো পথ বেছে নিয়েছেন। এখানেই একধরনের বিদ্রূপ লুকিয়ে আছে। অরবান গণতন্ত্রের কাঠামো রেখে ভেতরটা দুর্বল করেছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য থাকায় নির্বাচন পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেননি। কারণ, তাতে আর্থিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যেত। তাই নির্বাচন চলেছে, আর সেই নির্বাচনের মাধ্যমেই তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলেন।
এখন প্রশ্ন—এই জয় টিকবে তো? ১৯৮৯ সালে হাঙ্গেরির সামনে একটা স্পষ্ট লক্ষ্য ছিল—পশ্চিমা বিশ্বে যোগ দেওয়া। তখন যুক্তরাষ্ট্র শুধু সামরিক শক্তি নয়, একধরনের আদর্শও ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে।
এবার যুক্তরাষ্ট্র হাঙ্গেরির গণতন্ত্রপন্থীদের পাশে নয়, বরং অরবানের দিকেই ঝুঁকেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর মাগা রাজনীতি অরবানের মডেলকে অনুসরণযোগ্য মনে করে। ফলে হাঙ্গেরি এখন একধরনের আদর্শিক লড়াইয়ের ময়দান। এই পরিবর্তনটা বড়। আগে বাইরের পরিবেশ গণতন্ত্রকে শক্তি দিত, এখন সেটাই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—ইউরোপ কি একা গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে পারবে?
ইউরোপীয় ইউনিয়ন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও ভিন্ন সময়ের জন্য তৈরি। হাঙ্গেরির মানুষ যদি সত্যিই নতুন পথ বেছে নিতে চায়, তাহলে তাদের জীবনে বাস্তব উন্নতি আসতে হবে; ভালো প্রতিষ্ঠান, স্থিতিশীল অর্থনীতি, দৃশ্যমান অগ্রগতি আসতে হবে। কারণ, অরবান ক্ষমতা হারালেও তাঁর সমর্থন, মিডিয়া আর প্রভাব এখনো রয়ে গেছে।
১৯৮৯ সালে ‘রুশরা, ফিরে যাও’ ছিল এক দৃশ্যমান দখলদার শক্তির বিরুদ্ধে স্লোগান। ২০২৬ সালে সেটি আরও জটিল কিছুকে বোঝায়। এটি বোঝায় একধরনের শাসনব্যবস্থা, যা সরাসরি চোখে পড়ে না, কিন্তু সমাজের ভেতরে-ভেতরে ছড়িয়ে থাকে। তাই লড়াইটাও আলাদা।
স্লোগান একই, কিন্তু অর্থ বদলে গেছে। একসময় এটি একটি বন্দী জাতিকে মুক্ত করেছিল। এখন এটি ভবিষ্যৎকে খোলা রাখার লড়াই—শুধু হাঙ্গেরির জন্য নয়, সবার জন্য।
স্টিফেন হোমস নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক এবং বার্লিনের আমেরিকান একাডেমির রিচার্ড হলব্রুক ফেলো
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত
