চৈত্রের শেষ বিকেলটায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি চত্বর ভিন্ন এক রঙে রঙিন হলো। এই রং ছড়াল লোকজ উৎসব। মুখোশ, ঢাকের তালে নাচ, নানা বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশনা, পটগান ও পুঁথিপাঠ—সব মিলিয়ে যেন হারিয়ে যাওয়া বাংলার এক টুকরা ফিরে এল এই মহানগরে।
Visit extonnews.click for more information.
সন্ধ্যায় একাডেমির খোলা প্রাঙ্গণে ছিল মানুষের ঢল। বাচ্চাদের হাত ধরে মায়েরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন মেলার ভেতর, কেউ থামছেন খেলনার দোকানে, কেউ আবার ছেলের আবদার মেটাতে দাঁড়িয়ে পড়েছেন বায়োস্কোপের সামনে। ছোটদের চোখে কৌতূহল—কী আছে ওই ছোট্ট বাক্সের ভেতরে! মাঠের এক পাশে শীতলপাটির স্টল, জলরঙে আঁকা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে শিল্পীর তুলি চালানো দেখা কিংবা টেপাপুতুল বানাতে ব্যস্ত কারিগরের হাত—সব মিলিয়ে যেন মেলার ভেতরেই তৈরি হয়েছে বর্ষবিদায়ের এক সার্থক উৎসব, যেখানে পুরোনো বছরের স্মৃতি আর লোকজ ঐতিহ্য মিশে গেল একসুতোয়।
চৈত্রসংক্রান্তি ১৪৩২ ও বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পাঁচ দিনব্যাপী আয়োজনের প্রথম দিন ছিল গতকাল। উন্মুক্ত মঞ্চে বিকেলে উৎসবের উদ্বোধন করে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘পয়লা বৈশাখ আসলে কৃষকের সংস্কৃতি। এ দেশের মানুষ আগে কখনো ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বাইরে যায়নি। বরং বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক ও মনীষীরা এ দেশে এসেছেন। ঐতিহাসিক নানা কারণে আমরা পিছিয়ে গেছি। তবে সঠিক নেতৃত্ব পেলে আমাদের হারানো গৌরব আমরা পুনরুদ্ধার করতে পারব।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ।
শুরুতেই ছিল অর্কেস্ট্রা ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’। ফোয়াদ নাসের বাবুর পরিচালনায় পরিবেশিত এই অর্কেস্ট্রায় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বাদ্যযন্ত্র—মাদল, বানাম, করতাল, টামাকের সঙ্গে ছিল হারমোনিয়াম, ঢোল, তবলা ও আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের মিশ্রণ। এরপর ৩০ জন নৃত্যশিল্পীর ধামাইল নৃত্য মুগ্ধ করে দর্শকদের। সামিনা হোসেনের পরিচালনায় ‘জলের ঘাটে দেইখা আইলাম, কী সুন্দর শ্যামরায়’ গানের তালে ঘূর্ণমান নৃত্য পরিবেশনার সময় দর্শকেরা মঞ্চের আরও কাছে ঘেঁষে দাঁড়ান।
সন্ধ্যার দিকে লোকসংগীত, জারিগান, পটগান ও পুঁথিপাঠে আরও জমে ওঠে পরিবেশ। ছিল লালনের গান। একই আয়োজনে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা ছিল ভিন্ন স্বাদের। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিল্পীদের পাশাপাশি আধুনিক গানের শিল্পী মনির খান ও রিজিয়া পারভীনের গান দর্শকদের জন্য ছিল বাড়তি প্রাপ্তি।
মঞ্চে ফিরে আসে যাত্রাপালার ঐতিহ্যও। রহিম বাদশা রূপবান কন্যা পরিবেশনায় শিল্পকলা একাডেমির রেপার্টরি যাত্রা দল দর্শকদের নিয়ে যায় অন্য এক সময়ে।
একদিকে যখন খোলা প্রাঙ্গণে চলছিল সংক্রান্তির লোকজ মেলা, অন্যদিকে জাতীয় নাট্যশালার ভেতরে ছিল ভিন্নমাত্রার আয়োজন। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের উদ্যোগে সেখানে অনুষ্ঠিত হয় শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এখানে এসেছিলেন আবুল হায়াত, আবুল কাশেম, খায়রুল আলম সবুজ, আবদুল আজিজ, তারিক আনাম খান, নিমা রহমান, দেবপ্রসাদ দেবনাথ প্রমুখ। বহুদিন পর এক আয়োজনে দেখা গেল নব্বই দশকের পরিচিত মুখ জহির উদ্দিন পিয়ারকে।
সেখানে সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীনের গান ছিল বিশেষ আকর্ষণ। অনুষ্ঠানে তাঁকে সম্মাননা জানানো হয়। কুদ্দুস বয়াতির গান পরিবেশনার মধ্য দিয়ে গ্রুপ থিয়েটারের চৈত্রসংক্রান্তির অনুষ্ঠান শেষ হয়।
শিল্পকলা একাডেমির খোলা প্রাঙ্গণ কিংবা জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে শত শত মানুষের প্রাণবন্ত উপস্থিতি, লোকজ আসর—সব মিলিয়ে চৈত্রের শেষ দিনটি জানিয়ে গেল, এই শহর এখনো শিকড় ভুলে যায়নি। পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে সবাই যেন প্রস্তুত নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে।