প্রবাসীদের ছোট করে দেখার সুযোগ নেই, তাঁদের পাঠানো অর্থেই সচল থাকে অর্থনীতির চাকা

· Prothom Alo

‘প্রবাসী–অধ্যুষিত কুমিল্লা থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন। এই প্রবাসীদের পাঠানো অর্থেই সচল থাকছে দেশের অর্থনীতির চাকা। তাই কোনোভাবেই প্রবাসীদের ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে—অভিবাসনপ্রত্যাশীরা যেন ভোগান্তির শিকার না হন। আশার কথা হলো, বর্তমান সরকার এ ক্ষেত্রে আন্তরিক। সরকার ইতিমধ্যে প্রবাসী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কল্যাণে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।’

আজ শনিবার ‘কুমিল্লা অঞ্চলে জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা (টিপু)। কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কোটবাড়ী সড়কের ধনপুর (হালিমানগর) এলাকায় অবস্থিত ব্যুরো বাংলাদেশ ট্রেনিং সেন্টারে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও প্রথম আলো। আড়াই ঘণ্টাব্যাপী চলা এ বৈঠকে অভিবাসন প্রক্রিয়ার সম্ভাবনা, বাধা, চ্যালেঞ্জ ও সুপারিশগুলো নিয়ে মতামত তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা।

Visit sportbet.reviews for more information.

ইউসুফ মোল্লা বলেন, ‘অভিবাসনপ্রত্যাশীরা বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে মাধ্যম হিসেবে এজেন্টসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে বেছে নেন। বিদেশে গিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রতারণার শিকার ও সমস্যার মুখে পড়েন মাধ্যম হিসেবে কাজ করা ব্যক্তিদের কারণে। কিন্তু আমাদের দেশে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় মাধ্যম ব্যক্তিদের জন্য কোনো আইন নেই। অবিলম্বে এ ব্যাপারে আইন হওয়া দরকার। আইন থাকলে কোনো মানুষ বিদেশে গিয়ে প্রতারিত হলে আইনের কঠোর প্রয়োগ করা যাবে।’

বৈঠকে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসনপ্রত্যাশী ও প্রবাসীরা ওয়ান–স্টপ সার্ভিসের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু কাজটি এখনো সরকার করে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ দালালকে বেছে নেন। দালাল বা মাধ্যম সেই সেবা দিচ্ছে। আজকের বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দপ্তরের কর্মকর্তারা আছেন। এখান থেকে ভালো কিছু সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সাইফুল মালিক বলেন, নিয়ম না জানার কারণে প্রবাসীরা বেশি প্রতারিত হচ্ছেন, দালালের খপ্পরে পড়ছেন। দায়িত্ব পালনের সময় দেখেছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অবৈধ চ্যানেলে বিদেশে যাওয়া মানুষজন বেশি সমস্যার মুখে পড়ছেন। অভিবাসনপ্রত্যাশীরা বৈধভাবে বিদেশে গেলে সমস্যা অনেকাংশেই সমাধান হয়ে যায়। বিদেশে যাওয়ার আগে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রশিক্ষিত হওয়ার কাজটি বেশি জরুরি। বিশেষ করে কম্পিউটার ও ড্রাইভিং জেনে বিদেশে গেলে সেই কর্মীর চাহিদা ও বেতন অনেক বেশি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বিদেশে যাওয়ার আগে একটি নিবন্ধন হওয়া দরকার।

বৈঠকের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি ক্যাথরিন সিসিল। এফসিডিও ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ক্যাথরিন সিসিল বলেন, অভিবাসন প্রক্রিয়াকে সহজ, কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ করতে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা জরুরি। বিভিন্ন সংস্থার ভিন্ন দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতার কারণে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এ লক্ষ্যে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে অংশীজনদের অভিজ্ঞতা, মতামত ও পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের পরিচালক (প্রোগ্রাম) মেরিনা সুলতানা বলেন, ‘দক্ষতা অর্জন ছাড়া বিদেশে যাওয়ায় আমাদের কর্মীরা তাদের সঠিক মূল্যায়ন পাচ্ছে না। অভিবাসন প্রক্রিয়ায় মাধ্যম বা সাব-এজেন্টদের জন্য আইন জরুরি। কারণ, বিদেশে যাওয়া ৩১ শতাংশ মানুষ প্রতারণার শিকার হন মাধ্যমকারীদের জন্য কোনো আইন না থাকার কারণে।’

ওয়্যারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক জেসিয়া খাতুন বলেন, ‘মানুষ পণ্য নয়। তাই মানুষকে রপ্তানি করা যায় না। আমাদের অবশ্যই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মানবিকভাবে দেখতে হবে। কারণ, তাঁরা দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি।’

মাল্টি-পার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম (এমএএফ), কুমিল্লার সভাপতি বদরুল হুদা তাঁর বক্তব্যে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ম্যাপকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মাল্টি-পার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরামকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা গেলে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আরও বেশি সচেতন করা যাবে।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি কাজী এনামুল হক একটি ওয়েবসাইট তৈরির উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান; যেখানে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সব দপ্তরের তথ্য একসঙ্গে পাওয়া যাবে। এতে সেবা পেতে মানুষের ভোগান্তি কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।

যেসব সমস্যা, সংকট ও সুপারিশ উঠে এল বৈঠকে

ওয়্যারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের কুমিল্লা সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাফরউল্লাহ প্রবাসী শ্রমিকদের বেশ কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেন। দক্ষতা ছাড়া বিদেশে যাওয়া, দালালের প্রতারণা, অতিরিক্ত খরচ, বিদেশে গিয়ে বেতন-কাগজপত্র না পাওয়া, দেশে ফিরে পুনর্বাসনের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন তিনি। এসব সমস্যা সমাধানে ইউনিয়ন পর্যায়ে অভিবাসন তথ্যসেবা ও ‘অভিবাসন কর্নার’ চালু করতে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার আমড়াতলী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য কামাল হোসাইন অভিবাসন প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রে নির্যাতন, অতিরিক্ত কাজের চাপ, বেতন আটকে রাখা, অভিযোগে সহায়তা না পাওয়া প্রধান সমস্যা বলে উল্লেখ করেন তিনি। সমস্যা সমাধানে তিনি বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরেন।

বায়রার সদস্য (সাব–এজেন্ট) ফারজানা আলম মজুমদার সাব-এজেন্ট ও রিক্রুটমেন্ট ব্যবস্থার সমস্যাগুলো তুলে ধরনে। এ ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা ভুয়া প্রতিশ্রুতি, নগদ লেনদেনে প্রতারণা ও চুক্তিপত্র গোপন রাখার কথা উল্লেখ করেন তিনি। সুপারিশে তিনি বলেন, সব সাব-এজেন্টকে নিবন্ধনের আওতায় আনবে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে সাব-এজেন্ট ও রিক্রুটমেন্ট ব্যবস্থার বিধিমালা প্রণয়ন করতে হবে।’

দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের ডেপুটি টিম লিডার ইকবাল মাহমুদ তাঁর বক্তব্যে সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বয় সংকটের কথা তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন, জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়, কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক, ইউনিয়ন পরিষদ ও অন্যান্য দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় কম, অভিন্ন ডেটাবেজের ঘাটতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সমস্যা সমাধানে জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আতিকুর রহমান বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একীভূত জাতীয় অভিবাসন ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে। জেলা পর্যায়ে সমন্বয় টাস্কফোর্স গঠন ও নিয়মিত সভা পরিচালনা করবে জেলা প্রশাসন। ইউনিয়ন অভিবাসন কমিটিকে সক্রিয় করতে হবে স্থানীয় সরকার বিভাগকে। সব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাসিক সমন্বয় সভা বাধ্যতামূলক করতে হবে মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনকে।

কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র, কুমিল্লার অধ্যক্ষ প্রকৌশলী কামরুজ্জামান কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাব-এজেন্ট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে। ইউনিয়ন পর্যায়ে অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি সক্রিয় করতে হবে। জাতীয় অভিবাসন ডেটাবেজ অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। নারী নিরাপত্তা সেল সম্প্রসারণ করতে হবে দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে। এ ছাড়া বিমানবন্দর সহায়তা ডেস্ক সম্প্রসারণ, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালু, পুনর্বাসন ঋণ সহজ করা ও বৈধ ব্যাংকিং লেনদেন বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেন তিনি।

প্রবাসীকল্যাণ সেন্টার, কুমিল্লার সহকারী পরিচালক মো. মাইন উদ্দিন তাঁর বক্তব্যে নিজেদের কার্যক্রম ও প্রবাসীদের কীভাবে সহায়তা দেওয়া হয়, সেসবের বিস্তারিত তুলে ধরেন। প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক, কুমিল্লা অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রওনক জাহান বলেন, ‘কুমিল্লার ১৭টি উপজেলার মধ্যে আমাদের শাখা আছে মাত্র ৪টি। এর মধ্যে টমছমব্রিজ শাখায় লোকবল আছে তিনজন; কিন্তু সেখান থেকে ৯টি উপজেলায় সেবা দিতে হয়। লোকবলসংকট ও কার্যক্রম সীমিত হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ঋণ প্রদান ও আদায়ে আমাদের সমস্যা হচ্ছে।’

গোলটেবিলটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর কুমিল্লার উপপরিচালক মো. ইসহাক। উপস্থিত ছিলেন, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের প্রোগ্রাম ম্যানেজার আশরূপা চৌধুরী, কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক আবুল বাশার, বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি কুমিল্লার সভাপতি ইয়াসমিন রীমা; লালমাই সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সফিকুর রহমান, প্রবাসফেরত নারী ফাতেমা আক্তার; জিএমসিসি, কুমিল্লার সহসভাপতি জসিম উদ্দিন চাষী; জাতীয় যুবশক্তি, কুমিল্লার যুগ্ম সদস্যসচিব জাফরিন হক; অভিবাসন উন্নয়নকর্মী আবদুর রহিম প্রমুখ।

Read full story at source