আগের পর্বে আমরা যে ধাঁধাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, সেগুলো হয়তো আপনাদের একটু ভাবিয়েছে। কিন্তু এবার যে প্যারাডক্সের কথা শোনাব, সেটি শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বড় বড় গণিতবিদদেরও রীতিমতো ঘোল খাইয়ে ছেড়েছিল! এর নাম মন্টি হল প্যারাডক্স।
এই ধাঁধাটির শেকড় লুকিয়ে আছে আগের পর্বে বলা বার্ট্রান্ড বক্স প্যারাডক্সের ভেতরেই। গণিতবিদেরা একে বলেন কন্ডিশনাল প্রবাবিলিটি। মানে শর্তসাপেক্ষ সম্ভাবনার একটি উদাহরণ। ১৯৫৯ সালে সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনে মার্টিন গার্ডনার ‘থ্রি প্রিজনার্স প্রবলেম’ নামে একটি ধাঁধা প্রকাশ করেছিলেন। মন্টি হল প্যারাডক্স মূলত তারই একটি আধুনিক রূপ।
Visit amunra.qpon for more information.
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘লেটস মেক আ ডিল’ নামে একটি খুব জনপ্রিয় টিভি গেম শো হতো। সেই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন কানাডিয়ান বংশোদ্ভূত ক্যারিশম্যাটিক উপস্থাপক মন্টে হল। পরে তিনি নিজের নাম বদলে রেখেছিলেন মন্টি। তাঁর নাম অনুসারেই এই ধাঁধার এমন অদ্ভুত নামকরণ!
এখন বলি, কীভাবে এল এই ধাঁধা? ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বার্কলি) পরিসংখ্যানের অধ্যাপক স্টিভ সেলভিন দুর্দান্ত শিক্ষক ও গবেষক। চিকিৎসাবিজ্ঞানে, বিশেষ করে বায়োস্ট্যাটিস্টিকসে তাঁর অনেক অবদান আছে। কিন্তু তিনি বিশ্বজুড়ে তাঁর এই বিশাল অর্জনগুলোর জন্য খ্যাতি পাননি, বরং মন্টি হল প্যারাডক্স নিয়ে লেখা ছোট্ট একটি আর্টিকেলের জন্য পেয়েছেন! ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য আমেরিকান স্ট্যাটিস্টিশিয়ান নামে একটি জার্নালে মাত্র আধা পৃষ্ঠার একটি লেখা ছাপিয়েছিলেন তিনি।
যে সহজ ধাঁধাগুলো আমাদের মগজ ধোলাই করে দেয়মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লেটস মেক আ ডিল নামে একটি খুব জনপ্রিয় টিভি গেম শো হতো। সেই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন কানাডিয়ান বংশোদ্ভূত ক্যারিশম্যাটিক উপস্থাপক মন্টে হল।
অধ্যাপক সেলভিন ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি, তাঁর ওই ছোট্ট লেখাটি এত বড় আলোড়ন তুলবে। কারণ, ওই জার্নালটি পড়তেন শুধু গবেষক ও শিক্ষকেরা। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে এই ধাঁধা পৌঁছাতে আরও ১৫ বছর সময় লেগে যায়।
১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকায় এক কোটির বেশি বিক্রি হওয়া সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন প্যারেড-এর একটি জনপ্রিয় কলাম ছিল ‘আস্ক মেরিলিন’। মেরিলিন ভস সাভান্ত নামে এক নারী পাঠকদের নানা গাণিতিক ধাঁধা ও প্রশ্নের উত্তর দিতেন সেখানে। আশির দশকে গিনেস বুকে বিশ্বের সর্বোচ্চ আইকিউ (১৮৫) সম্পন্ন মানুষ হিসেবে তাঁর নাম উঠেছিল। ওই কলামে ক্রেগ এফ হুইটেকার নামে এক পাঠক সেলভিনের সেই মন্টি হল প্যারাডক্সের একটি পরিমার্জিত রূপ মেরিলিনকে জিজ্ঞেস করেন। এরপর যা ঘটেছিল, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য!
মেরিলিন যখন এই ধাঁধার উত্তর দিলেন, তখন তা সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনার ঠিক উল্টো হলো। ঠিক যেমনটা সেলভিন তাঁর মূল লেখায় বলেছিলেন। মেরিলিনের উত্তরটি শতভাগ নিখুঁত হওয়া সত্ত্বেও সারা দেশ থেকে শত শত গণিতবিদ তাঁকে ভুল প্রমাণ করতে রীতিমতো হামলে পড়লেন! ম্যাগাজিনের দপ্তরে ক্ষুব্ধ গণিতবিদদের চিঠির পাহাড় জমে গেল। চলুন, সেই চিঠিগুলোর কয়েকটা লাইন আপনাদের পড়ে শোনাই।
প্যারাডক্স লস্টমেরিলিন ভস সাভান্ত নামে এক নারী পাঠকদের নানা গাণিতিক ধাঁধা ও প্রশ্নের উত্তর দিতেন সেখানে। আশির দশকে গিনেস বুকে বিশ্বের সর্বোচ্চ আইকিউ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে তাঁর নাম উঠেছিল।
‘পেশাদার গণিতবিদ হিসেবে সাধারণ মানুষের গণিতের এই দৈন্যদশা দেখে আমি খুব চিন্তিত। দয়া করে নিজের ভুল স্বীকার করুন এবং ভবিষ্যতে আরও সতর্ক হোন।’
‘আপনি একটি বিশাল ভুল করেছেন! মনে হচ্ছে এই ধাঁধার পেছনের সাধারণ নিয়মটাই আপনি বুঝতে পারছেন না। এই দেশে এমনিতেই গাণিতিক অশিক্ষার অভাব নেই, তার ওপর বিশ্বের সর্বোচ্চ আইকিউধারী কেউ এমন ভুল ছড়াবেন, তা মানা যায় না। লজ্জাজনক!’
‘এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আপনি বরং সম্ভাবনার ওপর লেখা কোনো সাধারণ পাঠ্যবই পড়ে নিতে পারেন।’
‘আমি রীতিমতো ঘোরের মধ্যে আছি! অন্তত তিনজন গণিতবিদ আপনার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার পরও আপনি নিজের ভুল বুঝতে পারছেন না!’
‘হতে পারে নারীরা গণিতের সমস্যাগুলোকে পুরুষদের চেয়ে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন।’
কী বুঝলেন? পাঠক কত রাগী এবং ক্ষুব্ধ! কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, পরে এই সব মানুষেরই লজ্জায় মুখ লুকানোর উপক্রম হয়েছিল। মেরিলিন পরের একটি সংখ্যায় আবারও একই উত্তর দেন এবং ১৮৫ আইকিউসম্পন্ন মানুষের মতোই দুর্দান্ত যুক্তিতে প্রমাণ করে দেন, তিনিই ঠিক! বিষয়টি এতই আলোড়ন তুলেছিল যে শেষ পর্যন্ত তা নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রথম পাতায় জায়গা করে নেয়।
শুনে মনে হচ্ছে প্যারাডক্সটা হয়তো এতই কঠিন যে শুধু জিনিয়াসরাই তা বুঝতে পারবে! কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই সেরকম না! এর চেয়ে সোজা জিনিস আর হয় না। চলুন, স্টিভ সেলভিনের ১৯৭৫ সালের সেই মূল ধাঁধাটি দিয়েই শুরু করা যাক।
যোগফল বের করার জাদুকরী শর্টকাটমেরিলিন পরের একটি সংখ্যায় আবারও একই উত্তর দেন এবং ১৮৫ আইকিউসম্পন্ন মানুষের মতোই দুর্দান্ত যুক্তিতে প্রমাণ করে দেন, তিনিই ঠিক!
স্টিভ সেলভিনের বর্ণনায় টিভি শোয়ের দৃশ্যপটটি ছিল ঠিক এ রকম:
মন্টি হল (উপস্থাপক): আপনার সামনে A, B এবং C লেবেল লাগানো তিনটি বাক্স আছে। এর মধ্যে যেকোনো একটির ভেতরে ১৯৭৫ সালের নতুন লিঙ্কন কন্টিনেন্টাল গাড়ির চাবি রাখা আছে। বাকি দুটি বাক্স একদম খালি। আপনি যদি চাবিওয়ালা বাক্সটি বেছে নিতে পারেন, গাড়িটি আপনার!
প্রতিযোগী: (উত্তেজনায় হাঁসফাঁস করে উঠলেন!)
মন্টি হল: যেকোনো একটি বাক্স বেছে নিন।
প্রতিযোগী: আমি বাক্স B নেব।
মন্টি হল: ঠিক আছে। বাক্স A এবং C এখন টেবিলে রাখা আছে, আর আপনার হাতে আছে বাক্স B (প্রতিযোগী শক্ত করে বাক্সটি চেপে ধরলেন)। হতেই পারে গাড়ির চাবি ওই বাক্সেই আছে! আমি এই বাক্সের জন্য আপনাকে ১০০ ডলার দেব।
প্রতিযোগী: না, ধন্যবাদ।
মন্টি হল: তাহলে ২০০ ডলার?
প্রতিযোগী: না!
দর্শক: না!!
মন্টি হল: মনে রাখবেন, আপনার বাক্সে চাবি থাকার সম্ভাবনা ৩ ভাগের ১ ভাগ। আর বাক্স খালি হওয়ার সম্ভাবনা ৩ ভাগের ২ ভাগ। আমি আপনাকে ৫০০ ডলার দেব।
দর্শক: না!
প্রতিযোগী: না, আমি আমার বাক্সটাই রাখব।
মন্টি হল: ঠিক আছে, আমি আপনাকে একটু সাহায্য করছি। আমি টেবিলের ওপর থাকা বাকি দুটি বাক্স থেকে একটি খুলে দেখাচ্ছি। (তিনি বাক্স A খুললেন)।
দেখুন, এটি একদম খালি! (দর্শকদের হাততালি)। তার মানে গাড়ির চাবি হয়তো আপনার হাতের বাক্স B-তে আছে, নয়তো টেবিলে থাকা বাক্স C-তে আছে। যেহেতু দুটি বাক্স বাকি, তাই আপনার কাছে চাবি থাকার সম্ভাবনা এখন অর্ধেক (১/২)। আমি আপনার বাক্সটার বদলে আপনাকে নগদ ১০০০ ডলার দেব!
০.৯৯৯...এবং ১ কি সমানমনে রাখবেন, আপনার বাক্সে চাবি থাকার সম্ভাবনা ৩ ভাগের ১ ভাগ। আর বাক্স খালি হওয়ার সম্ভাবনা ৩ ভাগের ২ ভাগ। আমি আপনাকে ৫০০ ডলার দেব।
পাঠক একটু দাঁড়ান! আপনাদের একটু থামিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছি। এখানে মন্টি কি ঠিক বলছেন? প্রতিযোগী এখন জানেন যে টেবিলের অন্তত একটি বাক্স খালি। তিনি চোখের সামনে দেখলেন, বাক্স A খালি। এই নতুন তথ্যটি কি তাঁর হাতের বাক্সে চাবি থাকার সম্ভাবনা ৩ ভাগের ১ ভাগ থেকে বদলে অর্ধেক (১/২) করে দিল? মন্টি কি সত্যিই খালি বাক্সটি খুলে দিয়ে প্রতিযোগীর কোনো উপকার করলেন? এখন প্রতিযোগির গাড়ি জেতার সম্ভাবনা কি আসলে অর্ধেক? নাকি এখনও তিন ভাগের এক ভাগ?
আচ্ছা আবার প্রতিযোগীর কাছে ফিরে যাই। পরে আমরা এর ব্যাখ্যায় যাবো।
প্রতিযোগী: আমি আমার বাক্স B-এর বদলে টেবিলের ওপর থাকা বাক্স C নিতে চাই!
মন্টি হল: কী অদ্ভুত ব্যাপার!!
হিন্ট: প্রতিযোগী খুব ভালো করেই জানেন তিনি কী করছেন!
অধ্যাপক সেলভিন তাঁর এই লেখায় খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলেন, যা পরে বিশাল বিতর্কের জন্ম দেয়। তিনি পরিষ্কার করে বলেননি, উপস্থাপক মন্টি হল কিন্তু আগে থেকেই জানতেন কোন বাক্সে চাবি আছে! তাই তিনি কখনোই চাবিওয়ালা বাক্সটি খুলবেন না। ১৯৭৫ সালের আগস্টে সেলভিনকে আরেকটি চিঠিতে এটা পরিষ্কার করতে হয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার সমাধানের মূল ভিত্তিটাই হলো, মন্টি হল আগে থেকেই জানেন চাবিটি কোথায় আছে।’
যাহোক, প্যারেড ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় সংস্করণে বাক্সগুলোর বদলে তিনটি দরজার কথা বলা হয়েছিল এবং খালি বাক্সের বদলে দরজার পেছনে ছাগল থাকার কথা বলা হয়েছিল।
ধাঁধাটি হলো: আপনার সামনে তিনটি দরজা। একটির পেছনে গাড়ি, বাকি দুটির পেছনে ছাগল। আপনি ‘দরজা A’ বেছে নিলেন। উপস্থাপক, যিনি জানেন কোথায় কী আছে, তিনি ‘দরজা B’ খুলে দেখালেন সেখানে একটি ছাগল আছে। এরপর তিনি আপনাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি সিদ্ধান্ত বদলে দরজা C বেছে নিতে চান?’
মেরিলিন ভস সাভান্ত এবং স্টিভ সেলভিন দুজনেই বলেছিলেন—হ্যাঁ! সব সময় সিদ্ধান্ত বদলানো উচিত। কারণ এতে জেতার সম্ভাবনা ১/৩ থেকে বেড়ে ২/৩ (দ্বিগুণ) হয়ে যায়। কিন্তু কীভাবে?
চতুর্থ মাত্রায় কি গিট দেওয়া সম্ভব১৯৭৫ সালের আগস্টে সেলভিনকে আরেকটি চিঠিতে এটা পরিষ্কার করতে হয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার সমাধানের মূল ভিত্তিটাই হলো, মন্টি হল আগে থেকেই জানেন চাবিটি কোথায় আছে।’
প্রথম প্রমাণ: সম্ভাবনার হিসাব মেলানো
সবচেয়ে নিখুঁত গাণিতিক প্রমাণ এটি। মনে রাখবেন, আপনি প্রথমে দরজা A বেছে নিয়েছেন। গাড়িটি যেকোনো দরজার পেছনেই থাকার সম্ভাবনা সমান, মানে তিন ভাগের এক ভাগ। আপনি যদি সিদ্ধান্ত না বদলান, গাড়ি যদি A-এর পেছনে থাকে এবং উপস্থাপক B বা C যেটাই খুলুক না কেন, আপনি জিতবেন। কিন্তু গাড়ি যদি B-এর পেছনে থাকে, তাহলে উপস্থাপক বাধ্য হয়ে C খুলবেন। আপনি A-তেই অটল থাকায় হারবেন। আবার গাড়ি যদি C-এর পেছনে থাকে, তাহলে উপস্থাপক বাধ্য হয়ে B খুলবেন। আপনি A-তেই অটল থাকায় হারবেন। অর্থাৎ, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে আপনি ৩ বারের মধ্যে মাত্র ১ বার জিতবেন।
এবার ধরুন, আপনি সব সময় সিদ্ধান্ত বদলাবেন। গাড়ি যদি A-এর পেছনে থাকে, তাহলে উপস্থাপক B বা C খুলবেন। আপনি সিদ্ধান্ত বদলে খালি দরজায় যাবেন এবং হারবেন। কিন্তু গাড়ি যদি B-এর পেছনে থাকে, তাহলে উপস্থাপক বাধ্য হয়ে ছাগলওয়ালা দরজা C খুলবেন। আপনি তখন A থেকে সিদ্ধান্ত বদলে B-তে যাবেন এবং জিতবেন! আবার গাড়ি যদি C-এর পেছনে থাকে, তাহলে উপস্থাপক বাধ্য হয়ে ছাগলওয়ালা দরজা B খুলবেন। আপনি তখন A থেকে সিদ্ধান্ত বদলে C-তে যাবেন এবং জিতবেন! দেখলেন তো! সিদ্ধান্ত বদলালে আপনি ৩ বারের মধ্যে ২ বারই জিতছেন। জেতার সম্ভাবনা সোজাসুজি দ্বিগুণ!
জুতার ফিতা বাঁধার জ্যামিতি!আপনি যদি সিদ্ধান্ত না বদলান, গাড়ি যদি A-এর পেছনে থাকে এবং উপস্থাপক B বা C যেটাই খুলুক না কেন, আপনি জিতবেন। কিন্তু গাড়ি যদি B-এর পেছনে থাকে, তাহলে উপস্থাপক বাধ্য হয়ে C খুলবেন।
দ্বিতীয় প্রমাণ: ১০০০ দরজার উদাহরণ
গণিতের মারপ্যাঁচ ভালো না লাগলে এই উদাহরণটি আপনার জন্য। ধরুন, তিনটি নয়, আপনার সামনে ১০০০টি দরজা আছে! একটির পেছনে গাড়ি আর ৯৯৯টির পেছনে ছাগল। আপনি একটি দরজা (ধরুন দরজা নং ৭৭৭) বেছে নিলেন। এখানে আপনার গাড়ি পাওয়ার সম্ভাবনা ১০০০ ভাগের মাত্র ১ ভাগ।
এবার সবজান্তা উপস্থাপক আপনার দরজাটি বাদে বাকি ৯৯৮টি দরজা খুলে দিলেন এবং সবগুলোর পেছনেই ছাগল বেরোল! এখন আপনার সামনে শুধু আপনার বেছে নেওয়া দরজা ৭৭৭ এবং উপস্থাপকের না খোলা একটি দরজা (ধরুন ২৩৮ নম্বর) বন্ধ আছে।
এবার বলুন তো, আপনি কি নিজের দরজায় অটল থাকবেন, নাকি সিদ্ধান্ত বদলাবেন? একটু ভাবুন, ৯৯৯টি দরজার মধ্যে উপস্থাপক ইচ্ছা করে শুধু ২৩৮ নম্বর দরজাকেই কেন বাঁচিয়ে রাখলেন? কারণ তিনি জানেন, সেটার পেছনেই গাড়ি আছে! আপনার প্রথম সিদ্ধান্তে গাড়ি থাকার সম্ভাবনা ছিল ১/১০০০। বাকি ৯৯৯টি দরজার কোথাও গাড়ি থাকার সম্ভাবনা ছিল ৯৯৯/১০০০। উপস্থাপক ৯৯৮টি দরজা খুলে দিলেও সম্ভাবনা কিন্তু কমে যায়নি, পুরো ৯৯৯/১০০০ সম্ভাবনার সবটুকু ভার এসে পড়েছে ওই বেঁচে যাওয়া একটি দরজা ওপর! অর্থাৎ ২৩৮ নম্বর দরজার ওপর!
টাকা দ্বিগুণ করার জাদুকরী সংখ্যাআপনার প্রথম সিদ্ধান্তে গাড়ি থাকার সম্ভাবনা ছিল ১/১০০০। বাকি ৯৯৯টি দরজার কোথাও গাড়ি থাকার সম্ভাবনা ছিল ৯৯৯/১০০০। উপস্থাপক ৯৯৮টি দরজা খুলে দিলেও সম্ভাবনা কিন্তু কমে যায়নি!
তৃতীয় প্রমাণ: পূর্বজ্ঞানের ম্যাজিক
এই বিষয়টি আরও একটু পরিষ্কার করার জন্য চলুন বিড়ালের ছানার একটা গল্প বলি। ধরুন আপনি দুটি বিড়াল ছানা কিনতে চান। দোকানের মালিক আপনাকে ফোন করে জানালেন, তাঁর কাছে আজই দুটি ভাইবোন বিড়াল এসেছে—একটি কালো রঙের এবং একটি ডোরাকাটা রঙের। আপনি জানতে চাইলেন তারা ছেলে নাকি মেয়ে। এবার দোকানের মালিকের দুটি ভিন্ন উত্তরের দিকে খেয়াল করুন:
(ক) ‘আমি শুধু একটি ছানা চেক করেছি। সেটি ছেলে।’ অন্য কোনো তথ্য ছাড়া এখন দুটি ছানাই ছেলে হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
(খ) ‘আমি ডোরাকাটা বিড়ালটিকে চেক করেছি, ওইটা ছেলে।’ এবার দুটি ছানাই ছেলে হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
শুনতে একই রকম মনে হলেও দুটির উত্তর সম্পূর্ণ আলাদা! চলুন হিসাব করে দেখি। দুটি বিড়ালের ক্ষেত্রে মোট ৪টি সম্ভাবনা থাকতে পারে।
১. কালোটি ছেলে, ডোরাকাটাটিও ছেলে।
২. কালোটি ছেলে, ডোড়াকাটাটা মেয়ে।
৩. কালোটি মেয়ে, ডোড়াকাটাটা ছেলে।
৪. কালোটি মেয়ে, ডোড়াকাটাটিও মেয়ে।
(ক) নম্বর ক্ষেত্রে মালিক শুধু বলেছেন ‘অন্তত একটি ছেলে।’ এর মানে ৪ নম্বর অপশনটি (দুটিই মেয়ে) বাদ। বাকি ৩টি অপশনের যেকোনোটি হতে পারে। তাই দুটিই ছেলে হওয়ার সম্ভাবনা হলো ৩ ভাগের ১ ভাগ।
কিন্তু (খ) নম্বর ক্ষেত্রে যখন তিনি সুনির্দিষ্ট করে বলে দিলেন, ‘ডোরাকাটাটি ছেলে’, তখন আপনার কাছে একটি বাড়তি তথ্য চলে এল। এই তথ্যের কারণে ২ নম্বর অপশন (যেখানে ডোরাকাটাটি মেয়ে) এবং ৪ নম্বর অপশন সরাসরি বাতিল হয়ে গেল! বাকি থাকল শুধু ১ নম্বর এবং ৩ নম্বর অপশন। অর্থাৎ, এখন দুটিই ছেলে হওয়ার সম্ভাবনা হলো ২ ভাগের ১ ভাগ বা অর্ধেক!
ঠিক এভাবেই একটি নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাবনা এক-তৃতীয়াংশ থেকে বেড়ে অর্ধেক হয়ে যায়। মন্টি হল প্যারাডক্সে উপস্থাপক যখন ইচ্ছা করে একটি নির্দিষ্ট দরজা খোলেন, তখন তিনিও আপনাকে এমন একটি সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে দেন, যা হিসাবটাকে পাল্টে দেয়।
তরমুজ বিক্রির ২৫০ টাকা গেল কোথায়দোকানের মালিক আপনাকে ফোন করে জানালেন, তাঁর কাছে আজই দুটি ভাইবোন বিড়াল এসেছে—একটি কালো রঙের এবং একটি ডোরাকাটা রঙের। আপনি জানতে চাইলেন তারা ছেলে নাকি মেয়ে।
চতুর্থ প্রমাণ: উপস্থাপক যদি না জানতেন
কট্টর অবিশ্বাসীরা হয়তো এখনো বলবেন, বিড়ালের দোকানের মালিক তো আপনাকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন, মন্টি হল তো তা করেননি। তাহলে চলুন হিসাব একটু বদলে দিই। মন্টি হল যদি না জানতেন কোথায় গাড়ি আছে, তখন কী হতো?
ধরুন, এই গেম শোটি আপনি ১৫০ বার খেললেন। একজন বিচারক প্রতিবার গাড়িটি লুকিয়ে রাখেন, মন্টি নিজেও জানেন না গাড়ি কোথায়। আপনি প্রতিবার দরজা A বেছে নিলেন। মন্টি প্রতিবার দৈবচয়নে বাকি দুটি থেকে একটি দরজা খুললেন। যেহেতু তিনি জানেন না গাড়ি কোথায়, তাই গড়ে ১৫০ বারের মধ্যে ৫০ বার তিনি গাড়িওয়ালা দরজাই খুলে ফেলবেন! তখন তো খেলা সেখানেই শেষ, আপনার আর জেতার কোনো সুযোগই নেই।
বাকি ১০০ বার তিনি ছাগলওয়ালা দরজা খুলবেন। এই ১০০ বারের মধ্যে ৫০ বার গাড়ি থাকবে আপনার দরজা A-এর পেছনে, বাকি ৫০ বার থাকবে দরজা C-এর পেছনে। অর্থাৎ, উপস্থাপক যদি না জানেন, তবেই কেবল সম্ভাবনা ঠিক অর্ধেক হয়। তখন সিদ্ধান্ত বদলালে যা, না বদলালেও তা-ই।
কিন্তু মন্টি হল তো জানেন! তাই তিনি কখনোই ওই প্রথম ৫০ বার গাড়িওয়ালা দরজা খুলে নিজের ভুল করবেন না। তিনি সব সময় ছাগলওয়ালা দরজাই খুলবেন। এ কারণেই সিদ্ধান্ত বদলালে আপনার জেতার সম্ভাবনা ওই দুই-তৃতীয়াংশ থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
গড়ের গোলকধাঁধা: লটারি, কয়েন ও মহাকাশে হারিয়ে যাওয়াএকজন বিচারক প্রতিবার গাড়িটি লুকিয়ে রাখেন, মন্টি নিজেও জানেন না গাড়ি কোথায়। আপনি প্রতিবার দরজা A বেছে নিলেন। মন্টি প্রতিবার দৈবচয়নে বাকি দুটি থেকে একটি দরজা খুললেন।
নিজেই পরীক্ষা করে দেখুন
মেরিলিন ভস সাভান্ত তাঁর কলামে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্কুলে এই ধাঁধার ওপর ১০০০টিরও বেশি পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। প্রতিবারই প্রমাণিত হয়েছে, সিদ্ধান্ত বদলানোই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
এ ব্যাপারে জিম আল-খলিলির একটা অভিজ্ঞতা বলি। তিনি জানান, ‘আমারও একবার ঠিক এই অভিজ্ঞতাই হয়েছিল। বিবিসির একটি বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যচিত্রের শুটিংয়ের কাজে দীর্ঘ গাড়িযাত্রায় আমার ক্যামেরাম্যান অ্যান্ডি জ্যাকসনকে এই প্যারাডক্সটি বোঝাচ্ছিলাম। সে কিছুতেই বিশ্বাস করছিল না। বাধ্য হয়ে আমি তাসের প্যাকেট বের করলাম। একটি লাল তাস (গাড়ি) এবং দুটি কালো তাস (ছাগল) নিলাম। তাসগুলো উল্টে রেখে তাকে একটা তাস বাছতে বললাম। আমি নিজে যেহেতু জানতাম লাল তাসটি কোথায়, তাই আমি ইচ্ছা করে একটি কালো তাস উল্টে দিলাম। তারপর তাকে সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগ দিলাম। মাত্র ২০ বার খেলার পরই অ্যান্ডি অবাক হয়ে দেখল, সিদ্ধান্ত বদলানোর ফলে সে প্রায় দ্বিগুণ বার লাল তাসটি জিতে নিচ্ছে! সে হয়তো অঙ্কের লজিকটা পুরোপুরি বোঝেনি, কিন্তু এটা মেনে নিয়েছিল যে আমিই সঠিক। আশা করি আপনিও এতক্ষণে বুঝে গেছেন!’
যাই হোক, সাধারণ যুক্তির এই গোলকধাঁধা নিয়ে অনেক কথা হলো। এবার একটু নড়েচড়ে বসুন। কারণ, পরের পর্বে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে পদার্থবিজ্ঞানের আসল মাথা ঘোরানো সব প্যারাডক্স!
সূত্র: জিম আল খলিলি, প্যারাডক্স: দ্য নাইন গ্রেটেস্ট এনিগমাস ইন ফিজিক্স; নেচার এবং হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলতোমার অর্ধেক আমার অর্ধেকের চেয়ে বড়!