রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান প্রদর্শনালয়ে ‘বিস্তৃত বর্তমান’ নামে চার প্রজন্মের ১৫ জন চারুশিল্পীর অংশগ্রহণে তাঁদের ৪৬টি চিত্রকর্মের প্রদর্শনী শুরু হয়েছে গত শনিবার।
Visit freshyourfeel.org for more information.
প্রদর্শনীতে হাশেম খান, রফিকুন নবী, আবদুস শাকুর শাহ, নাজলী লায়লা মনসুর, ফরিদা জামান, রনজিৎ দাসসহ পাঁচ দশকের শিল্পীরা সবাই স্বনামধন্য।
আয়োজকেরা বলছেন, ষাটের দশকের পর থেকে এ সময় পর্যন্ত এই ১৫ শিল্পীর শিল্পযাত্রা ও অভিজ্ঞতার ভিন্নতাকে একই পরিসরে ধারণ করাই প্রদর্শনীর মূল ভাবনা। তাঁদের ভাষ্য, এটি কোনো ধারাবাহিক শৈলীর ইতিহাস নয়; বরং সময় কীভাবে শিল্পীর ক্যানভাসে থিতু হয়, তারই এক জীবন্ত অনুসন্ধান।
দেখা যাচ্ছে, ষাট ও সত্তরের চিত্রকরদের কাজ, প্রকরণ ও ভাবনায় সহজ জীবন ও ঐতিহ্য সচেতনতার ঐক্য অনুভূত হলেও আশির দশকের শিল্পীদের কাজে উত্তর–আধুনিকতার ছাপ, সেটি আরও প্রগাঢ় হয়েছে নব্বই ও শূন্য দশকের শিল্পীদের প্রকাশভঙ্গিতে। ফলে মোটাদাগে আমাদের চারুশিল্পের ৫০ বছরের একপ্রকার ধারাবাহিক বদলকে দর্শক ও বোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ করার সুযোগ এ প্রদর্শনীতে থাকছে।
‘ছাগল নিয়ে কম্পোজিশন’, রফিকুন নবীএখন এ দেশের শিল্পীদের মধ্যে বর্ষীয়ান হাশেম খান ও রফিকুন নবী চারুকলা অনুষদের ইমেরিটাস অধ্যাপক।
হাশেম খানের চারটি কাজের একটি ‘দলবদ্ধ কাক’। রূপদর্শী শিল্পীর কুশলী অঙ্কন, চিত্রের গঠন, বর্ণবিন্যাস আর উপস্থাপনার সম্পন্নতা দর্শক ও বোদ্ধাদের আকৃষ্ট করে। এ বছরই আঁকা ‘ইলিশের ঘর মেঘনা’ নামের চিত্রে জালবদ্ধ হওয়ার পর এক ঝাঁক মৃত ইলিশের ছবি। শিল্পীর আরেকটি চিত্রকর্ম ‘লাল সঙ্গীত’।
কাগজে অ্যাক্রিলিক রঙে আঁকা রফিকুন নবীর চারটি চিত্রকর্মের তিনটিতে তাঁর সৃজিত কার্টুনচরিত্র টোকাইয়ের ভিন্ন ভিন্ন কাজ ও সময়ের ছবি। আরেকটি কাজে দেখা গেল—সারিবদ্ধ ছাগলের নানা ভঙ্গিমা নিয়ে তাঁর চিত্রগঠন।
‘গ্রামের গল্প’, আবদুস শাকুর শাহএগুলো ২০২৪ সালের কাজ। অসামান্য অঙ্কনদক্ষতা আর চিত্রগঠনে সারল্য ও সহজিয়া মনোভঙ্গির সঙ্গে রসবোধ তাঁর চিত্রের প্রধান গুণ।
ময়মনসিংহ গীতিকার লোক গল্প-গাথার চরিত্র মহুয়া, মলুয়া, কাজল রেখা, নদের চাঁদ, ব্যাঙ্গমা–ব্যাঙ্গমী পাখি, বাঘ-ব্যাধ এবং গল্পের অংশ সাজিয়ে শিল্পী আবদুস শাকুর শাহ তিন যুগ ধরে তাঁর চিত্রগঠন করে জলরং ও অ্যাক্রিলিক রঙে কাগজে কিংবা ক্যানভাসে আঁকেন। তাঁর তিনটি কাজের মধ্যে একটির শিরোনাম ‘কাজল রেখা’, অন্য দুটির নাম ‘গ্রামের গল্প’।
‘গঠন’, মোহাম্মদ ইউনুসনাজলী লায়লা মনসুর ধারাবাহিকভাবে কিউবিজমকে কেন্দ্রে রেখে আমাদের দেশের সামাজিক সমস্যা, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা—এসব বিষয়কে সামনে আনেন, এখানেও এনেছেন।
ফরিদা জামানও তাঁর অগ্রজ শিল্পীদের মতো বাংলার গ্রামীণ জীবনের বিশেষ একটি গোত্র—জেলে সমাজের বিষয় উত্থাপন করেন তাঁর চিত্রপটে। তাঁর তিনটি কাজের নাম—‘মাছ ধরার জাল’, ‘জলের গান’ ও ‘আমার দেশ’।
রনজিৎ দাস ও শিশির ভট্টাচার্যের চিত্রকর্মে সমসাময়িক জীবনধারার ছবি দেখা যায়। রনজিৎ যেখানে সমকালের মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির যোগসূত্রকে চিহ্নিত করেন, শিশির সেখানে সমকালের তারুণ্যের জীবন যন্ত্রণা, স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা, অপ্রাপ্তির হতাশা এসব তুলে ধরেন সমাজবদ্ধতার সূত্রে রেখা থেকে রেখায়।
‘শিমুল’, আহমেদ সামসুদ্দোহাএ প্রদর্শনীতে তাঁদের তিনটি করে চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে। রনজিতের তিনটি কাজের শিরোনাম ‘জীবনের গল্প’, শিশিরের ‘ছবি’।
সত্তরের দশকের দুই শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস ও জামাল আহমেদ সমসাময়িক হলেও তাঁদের চিত্রকর্ম রচনার ধরন বিপরীতমুখী। ইউনুস বিমূর্তধারায় ছবি আঁকেন। প্রদর্শনীতে ‘গঠন’ শিরোনামে তাঁর তিনটি কাজই অভিনব, প্রায় শাড়ির মতো লম্বা গড়নের ক্যানভাসে নানা বর্ণের আকর্ষণীয় রূপ ও রেখার সঙ্গে বিচিত্র টেক্সচারসমৃদ্ধ। অন্যদিকে ছবি আঁকায় জামাল বাস্তবানুগ। এ প্রদর্শনীতে তিনটি কাজের শিরোনাম ‘বেদেনী’, ‘বুড়িগঙ্গা’ ও ‘শাপলা’।
‘ছবি’, শিশির ভট্টাচার্যআহমেদ সামসুদ্দোহা বাস্তবানুগ ছবি আঁকেন। প্রদর্শনীতে তাঁর দুটি কাজ ফুল নিয়ে আঁকা। শিমুল ফুল নিয়ে বিশাল পেইন্টিং দর্শকদের অভিভূত করে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবন ও সংস্কৃতির ছবির শিল্পী কনক চাঁপা চাকমার চারটি চিত্রকর্ম স্থান নিয়েছে চিত্রশালায়। পাহাড়ি পাঁচ নারীর পেছন ফেরা অবয়বের সামনে রক্তলাল হওয়া সূর্যাস্তের ছবি। অন্য দুটি চিত্রের নাম ‘বসন্তের শ্বাস’ ও ‘সঙ্গীত-শিল্প’।
আশির দশকের শিল্পী মোহাম্মদ ইকবাল অবয়বধর্মী কাজ করেন। তিনি এখন আঁকছেন ‘শান্তি আকাঙ্ক্ষার ছবি’। অন্য দুটি কাজের শিরোনাম ‘পবিত্র বৃত্ত’।
‘পাহাড়ে সূর্যাস্ত’, কনক চাঁপা চাকমামাকসুদা ইকবাল নীপা বর্ণের শুদ্ধতাকে ধারণ করেন। এই বিশ্বাস নিয়ে বড় ক্যানভাসজুড়ে অজস্র দাগ ও বিন্দু প্রয়োগ দেখা যায় তাঁর চিত্রপটে।
অপেক্ষাকৃত তরুণশিল্পী কামালউদ্দিন ‘বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়’ শিরোনামে মিশ্র মাধ্যমে তিনটি প্রতীকী ছবি এঁকেছেন। এর একটিতে এক বালিকার অবয়বের ওপরে চুপসে যাওয়া পৃথিবী-গোলক, অন্যটিতে বস্তা আকৃতির মানচিত্রে দেহের ঊর্ধ্বাংশ ঢাকা এক বালক, নিচে একটি কাক। শেষ ছবিতে উন্নত বিশ্বের প্রতীক এক সার্কাসের ভাঁড়ের পায়ের নিচে সেই চুপসানো পৃথিবী-গোলক যেন সমকালীন বিশ্বরাজনীতির অবস্থাকে শনাক্ত করে।
‘মুখোশ আবৃত মৃত মুখ’, সহিদ কাজীআরেক তরুণ কাজী সহিদের তিনটি চিত্রকর্মই বাস্তবানুগ ডিটেইলিংয়ে সমৃদ্ধ। প্রথম দুটি কাজই টেক্সচার ভরপুর তেলরঙে আঁকা। একটি পথের ধারের শুকিয়ে যাওয়া ফুল ও শুঁটকি মাছ। শেষটি বড় ও ছোট দুটি ক্যানভাসে শিল্পীর আত্মপ্রতিকৃতিনির্ভর কাজ হলেও শিরোনাম অভিনব—‘মুখোশ আবৃত মৃত মুখ’! আঠাবিহীন পিগমেন্ট দিয়ে আঁকা।
৪৬টি কাজের ভেতরে মানুষের সুখ, স্বপ্ন, দুঃখবোধ ও ইতিহাস-ঐতিহ্য যেমন আছে তেমন আছে বিহ্বলতা এবং আশাহত বিমূঢ়তার প্রতিক্রিয়া। চার প্রজন্মের শিল্পীরা গুরু–শিষ্যের বন্ধনে আবদ্ধ হলেও অপেক্ষাকৃত নবীনরা এযাবৎকালের শিল্পধারা থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত রেখেছেন এ প্রদর্শনীতে।
প্রদর্শনীটি ৪ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা তিনটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে।
