শামসুর রাহমান বাংলাদেশের কবিতার ‘শামস’ বা সূর্য। বিংশ শতাব্দীর উত্তরার্ধ্ব জুড়ে এ দেশের কবিতায় তিনি সূর্যকিরণ ছড়িয়েছেন। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের আধুনিক কবিতার নন্দন-অভিজ্ঞতাকে দেশ-কাল-পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে সমন্বিত করে তিনি কবিতায় এক নতুন নান্দনিকতা প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা একই সঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক।
কবি শামসুর রাহমান স্মরণে শনিবার সেমিনারের মূল প্রবন্ধে এভাবেই কবির অবদানের মূল্যায়ন করা হয়। বাংলা একাডেমিতে কবির নামাঙ্কিত শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে ‘শামসুর রাহমানের কবিতার শৈলী’ বিষয়ে এই প্রবন্ধ পড়েন অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক তারানা নূপুর।
Visit casino-promo.biz for more information.
বাংলা একাডেমি গত সপ্তাহ থেকে দেশের সাহিত্যক্ষেত্রের কৃতী ব্যক্তিদের জীবন ও কর্ম নিয়ে ধারাবাহিক সেমিনার সিরিজ আয়োজন করছে। এর দ্বিতীয় পর্বে গতকাল দিনভর সেমিনার সিরিজের শেষ সেমিনারটি ছিল কবি শামসুর রাহমানকে নিয়ে। এর আগে চিন্তক, ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমর, কথাশিল্পী শহীদুল জহির এবং প্রাবন্ধিক ও লেখক আবদুল হককে নিয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১০টায় ছিল এই সেমিনার সিরিজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন একাডেমির পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ড. সরকার আমিন।
কবি শামসুর রাহমানকে নিয়ে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত সেমিনারের মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক তারানা নূপুর কবির সমগ্র কবিতা পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করে প্রতিটি পর্যায়ের বৈশিষ্ট্য এবং তারপর সামগ্রিকভাবে কবিতা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, প্রথম পর্যায়ের কাব্যশৈলীতে মিথ-প্রতীক-চিত্রকল্প-রূপকল্প চেতনার অন্তর্বায়ন প্রাধান্য পেয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে পুনরাবৃত্তি, তালিকায়ন, শব্দ ও ভাষার বিন্যাস। তৃতীয় পর্যায়ে স্বপ্ন-কল্পনা, পরাবাস্তবতা, চেতন-অবচেতনের রূপায়ণ। চতুর্থ পর্যায়ে ব্যঙ্গ–বিদ্রূপ, সমকালীন রাজনীতি ও পঞ্চম পর্যায়ের কবিতায় রূপান্তর কৌশলের মাধ্যমে ব্যক্তিসত্তার প্রকাশ ঘটেছে।
প্রবন্ধকার প্রধানত কবিতার নান্দনিকতার বিষয়েই তার আলোচনা কেন্দ্রীভূত রেখেছিলেন। তিনি বলেন, তাঁর কবিতায় নগর ঢাকার আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা নান্দনিকতা পেয়েছে। এ শহর যেমন তাঁর কবিতার নিয়ামক, তেমনি তাঁর কবিতাও এই শহরের আরশি। বাংলাদেশের কবিতাকে তিনি তিল তিল করে মূর্ত করে তুলেছেন। বাংলাদেশ ও এই দেশের মানুষের জীবনকে অন্ধকার থেকে আলোক-অভিসারীরূপে দেখতে চাওয়ার আমরণ বাসনা প্রকাশ করে গেছেন তিনি।
আলোচক কবি জহির হাসান বলেন, শামসুর রাহমান বাংলা কবিতার বড় কবিদের অন্যতম। তিনি স্তম্ভের মতো। বাংলাদেশের কবিদের ওপরে যখন কলকাতার ত্রিশের দশকের কবিদের প্রবল প্রভাব ক্রিয়াশীল ছিল, তখন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরীদের মতো কবিরাই সেই প্রভাব কাটিয়ে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। শামসুর রাহমান নিজেকে বৈশ্বিক পর্যায়ের কবি বলে মনে করতেন। ঢাকা শহরকে তিনি কবিতার ভেতরে যেভাবে চালিত করেছেন, তা অসাধারণ। তবে পশ্চিমা মিথের বিপুল ব্যবহার ও শেষ দিকের কবিতায় রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রাধান্যের কারণে তাঁর কবিতা নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।
সভাপতি কবি ও প্রাবন্ধিক ফয়েজ আলম বলেন, কোনো বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি শামসুর রাহমানের পক্ষপাত ছিল না। তবে তিনি সাম্প্রদায়িকতা, স্বৈরাচার, সমাজের অন্যায় অবিচারের প্রতি বরাবর সোচ্চার ছিলেন। যেসব বিষয় জনসাধারণের স্বার্থের বাইরে গেছে, তিনি তার প্রতিবাদ করে কবিতা লিখেছেন। সে কারণে তাঁর কবিতা অনেক সময় বর্ণনাধর্মী ও চিত্রকল্পময় মনে হতে পারে; কিন্তু তিনি ছিলেন নবায়নশীল। তাঁর কবিতা শৈলীগতভাবে যেমন নিজস্বতাময়, তেমনি তাঁর কাব্যভাষা ও বিষয়বিস্তার স্বতন্ত্র সুন্দর।
বদরুদ্দীন উমর ছিলেন প্রধান চিন্তাবিদ
বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের রাজনীতির বিকাশে বদরুদ্দীন উমরের চিন্তা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম পর্বের প্রধান চিন্তাবিদ। তিনি চাননি, তাঁর নামের সঙ্গে কোনো উপাধি যুক্ত হোক। কোনো পুরস্কারের প্রত্যাশা করেননি। কোনো তালিকাভুক্ত হতে চাননি। নিজেকে তিনি চিন্তাবিদ ও রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
বদরুদ্দীন উমর স্মরণে আয়োজিত সেমিনারে ‘বদরুদ্দীন উমরের রাজনৈতিক চিন্তা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক আফজালুল বাসার। শনিবার বাংলা একাডেমিতে শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষেবদরুদ্দীন উমর স্মরণে সেমিনারে প্রাবন্ধিক ও গবেষক আফজালুল বাসার এই মন্তব্য করেন। দুপুরে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে ‘বদরুদ্দীন উমরের রাজনৈতিক চিন্তা’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বলেন, বদরুদ্দীন উমর সব সময় মানুষকে চিন্তা করতে অনুপ্রাণিত করেছেন। কেউ তাঁর চিন্তা ও মতের বিরোধিতা করলে তিনি ক্ষুব্ধ হতেন না, বরং সানন্দে তাঁদের সঙ্গে বিতর্ক করতেন। এই বিতর্কের ভেতর থেকেই নতুন চিন্তা, যুক্তি ও পথ তৈরি হবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।
আফজালুল বাসার দীর্ঘ প্রবন্ধে বদরুদ্দীন উমরের জীবন, বাম রাজনৈতিক আদর্শ, সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, ভাষা আন্দোলন থেকে ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে তাঁর বিপুল গ্রন্থমালা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ওপরে তাঁর গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রচলিত রাজনীতি ও পার্টির সমালোচনা করে ব্যর্থতার দিকগুলো দেখিয়েছেন।
প্রাবন্ধিক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সমন্বয়কারী ফয়জুল হাকিম তাঁর আলোচনায় বলেন, আমাদের ইতিহাসচর্চা ও রাজনৈতিক তৎপরতায় বদরুদ্দীন উমর এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের নাম। তিনি আমাদের ইতিহাসবোধ সৃষ্টি করেছেন। রাষ্ট্র ও সংবিধান ও শাসকশ্রেণির চরিত্র উন্মোচন করেছেন। কীভাবে শাসকশ্রেণির চরিত্র ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠেছে, সেই প্রক্রিয়া তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি তিনি নিজের দলেরও কড়া সমালোচনা করেছেন।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক ও চিন্তক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, তিনি আমাদের শ্রেষ্ঠ চিন্তক ও রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, চিন্তার সঙ্গে সততা, দৃঢ়চিত্ত, সাহসিকতা ও সংগঠন গড়ে তোলার প্রক্রিয়া থাকতে হবে। রাজনৈতিক আদর্শ ও কর্মীর জন্য রাজনৈতিক দল গঠন অনিবার্য। তবেই সমাজে পরিবর্তন আসবে। এই পরিবর্তন ঘটবে বলে তিনি আমৃত্যু বিশ্বাস করতেন।
শহীদুল জহির স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছেন
শহীদুল জহির বাংলা কথাসাহিত্যে বাস্তবতার ধারণাকে পরিবর্তন করেছেন। তিনি ঘটনাকে সামাজিক পুনঃকথনে, স্থানকে স্মৃতির যন্ত্রে, ভাষাকে সামাজিক শ্রবণে রূপান্তর করেন। শহীদুল জহির স্মরণে আয়োজিত সেমিনারে প্রবন্ধকার গবেষক ও সাহিত্য-সমালোচক সৈকত আরেফিন এই মন্তব্য করেন।
‘মহল্লার অন্তঃশব্দ: শহীদুল জহিরের কথাসাহিত্যে মায়া স্মৃতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’বিষয়ক প্রবন্ধ পাঠ করেন গবেষক ও সাহিত্য-সমালোচক সৈকত আরেফিন। শনিবার বাংলা একাডেমিতেদুপুর সাড়ে ১২টায় আয়োজিত এই সেমিনারে ‘মহল্লার অন্তঃশব্দ: শহীদুল জহিরের কথাসাহিত্যে মায়া স্মৃতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’বিষয়ক প্রবন্ধে প্রবন্ধকার বলেন, তাঁর কথাসাহিত্য আমাদের শেখায় প্রকৃত বাস্তব অনেক সময় সবচেয়ে দৃশ্যমান স্থানে নয়; বরং তার আড়ালে জন্ম নেওয়া শব্দে, স্মৃতিতে, ভয়ে ও ফিসফাসে বসবাস করে।
প্রবন্ধের ওপর আলোচনায় বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, শহীদুল জহিরকে অনেকে জাদুবাস্তবতার লেখক বলে মনে করেন। তবে তিনি লাতিন ধারার জাদুবাস্তবতার লেখক নন, তিনি এই বিশেষ আঙ্গিকটিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিজের মতো করে প্রয়োগ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সেরা লেখকদের একজন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে কবি ও কথাসাহিত্যিক সুমন রহমান বলেন, তিনি কথাসাহিত্যে স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছেন। তাঁর গল্প-উপন্যাসের পরিসরে পুরান ঢাকা থেকে শুরু করে বাংলার গ্রাম গহিনের আত্মার স্পন্দন টের পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন কম, তবে বাংলার এক গুরুত্বপূর্ণ লেখক তিনি।
আবদুল হক মননশীল সাহিত্যে স্মরণীয় থাকবেন
সেমিনার সিরিজ শুরু হয়েছিল সকাল সাড়ে ১০টায় প্রাবন্ধিক আবদুল হক স্মরণে। এতে ‘আবদুল হক: জীবন ও রাজনীতি’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, আবদুল হক আমাদের মননশীল সাহিত্যের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় এক লেখক। তিনি অনুবাদ নাটকের মধ্য দিয়ে নাট্যসাহিত্যে যেমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, তেমনি কথাসাহিত্যিক হিসেবেও তিনি তাৎপর্যপূর্ণ।
আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক মাহবুব বোরহান। সভাপতিত্ব করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক মোরশেদ শফিউল হাসান। তাঁরা বলেন, আবদুল হক হেনরিক ইবসেনের বহু নাটকের সাবলীল অনুবাদ করে বঙ্গীয় মননের সঙ্গে ইবসেনের সংযোগ ঘটিয়েছেন। তাঁর প্রবন্ধ-নিবন্ধে আমাদের জাতীয়তা, মুক্তবুদ্ধি এবং ইহজাগতিক বোধ সম্পর্কে যে প্রাগ্রসর দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়, তা এককথায় অনন্য। এ ছাড়া আবদুল হকের কয়েক দশকের দিনলিপিতে এ অঞ্চলের সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস নির্মোহ নিষ্ঠায় ধরা পড়েছে।