নতুন অর্থবছরের বাজেট নিয়ে আমরা একদিকে আশান্বিত, অন্যদিকে কিছুটা হলেও আশঙ্কিত। বড় বাজেট মানে খারাপ কিছু নয়। কারণ, অর্থনীতি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজেটের আকার বৃদ্ধি পাওয়াও স্বাভাবিক। বাজেটের প্রবৃদ্ধির দুটি চালিকা শক্তি থাকে—একটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অন্যটি রাজনৈতিক সরকারের জন্য আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রয়াস। তবে বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে, গত ১৮ থেকে ২৪ মাস যে অর্থনৈতিক মন্দাভাব দেখেছি, সেটি এখনো চলমান। আগামী বছরও হয়তো স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি হবে না। তিন মাসের পুরোনো একটি নির্বাচিত সরকারের পক্ষে আমূল পরিবর্তন আনা কঠিন। তবে মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চাপ তাদের ওপর রয়েছে। আমরা সে প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখতে চাইব।
Visit turconews.click for more information.
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ইতিহাসের সর্বনিম্ন বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও নেতিবাচক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আমাদের শঙ্কিত করে। এ ছাড়া আগামী অর্থবছরে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার বিপরীতে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা দেশের জন্য একটি বড় নেতিবাচক বাস্তবতা।
বাজেটের সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হলো রাজস্ব আহরণের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা। বর্তমান অর্থবছরেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যেখানে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে নতুন বাজেটে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা স্পষ্ট নয়। বাজেটে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামানো এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশে উন্নীত করার যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তা মাঠপর্যায়ের বেসরকারি খাতের প্রতিফলন ছাড়া অর্জন করা অসম্ভব।
আমরা বেসরকারি খাত থেকে সব সময়ই জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের উদ্বেগের কথা বলে আসছি। বিদ্যুৎ সরবরাহকে আরও নির্ভরযোগ্য করতে এবং সিস্টেম লস (অপচয়) কমাতে বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের আধুনিকায়নসহ ‘স্মার্ট গ্রিড’ গড়ে তোলা দরকার। বিশেষ করে আমরা যদি সৌরবিদ্যুতের (সোলার) ব্যবহার বাড়াতে চাই, তবে স্মার্ট গ্রিড তৈরি করা খুবই জরুরি। কিন্তু বাজেটে এর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আমরা দেখিনি।
করসংক্রান্ত প্রস্তাবে পাঁচ বছরের আয়কর হার নির্ধারণের মাধ্যমে ‘ট্যাক্স প্রেডিক্টেবিলিটি’ বা করব্যবস্থার পূর্বানুমান যোগ্যতা আনা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে করপোরেট কর কমানোর কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না থাকা এবং সর্বোচ্চ করহার অপরিবর্তিত রাখায় আমরা ভীষণভাবে আশাহত হয়েছি। এ বছর থেকেই করপোরেট কর কমানো উচিত ছিল। অর্ধশতাধিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর কমানোর প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানাই। তবে এর সুফল যেন ভোক্তারা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যবসা সহজীকরণে সিঙ্গেল উইন্ডো, ৭ দিনে ব্যবসায় নিবন্ধন ও ৪৮ ঘণ্টায় কোম্পানি নিবন্ধন এবং মানুষের উপস্থিতি ছাড়া ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা ও ই-রিটার্ন ব্যবস্থার দ্রুত বাস্তবায়ন আমরা দেখতে চাই। রপ্তানি বহুমুখীকরণে আটটি নতুন খাতকে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা ইতিবাচক। তবে এটি খাতভিত্তিক পুনর্বিবেচনা করা দরকার।
পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আনতে সম্পদ মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল। বাজেটে বেসরকারীকরণের কোনো রূপরেখা না থাকাটা বড় ব্যর্থতা। তবে বাজেটের এই ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো সমন্বয় করে মাঠের বাস্তবতা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করাই এখন সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ।