জাঁকজমকের চেয়ে আন্তরিকতাই ছিল বেশি। আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ। শিল্পী, নির্মাতা, সাংবাদিক, সংগীতশিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও উদ্যোক্তাদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল রাজধানীর উত্তরা লিবার্টি ক্লাব লিমিটেড। কেউ সম্মাননা গ্রহণ করেছেন, কেউ গান গেয়েছেন, কেউ আবার দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশ ও নেপালের সৃজনশীল অঙ্গনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এমনই এক উষ্ণ ও প্রাণবন্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্মাননা অনুষ্ঠান ‘গ্লোবাল এক্সিলেন্স অনার ২০২৬’।
গতকাল মঙ্গলবার রাতে বাংলাদেশের আইডিয়া এক্সচেঞ্জ এবং নেপালের বিলক্ষণ ক্রিয়েশন প্রাইভেট লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে শিল্প, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, গণমাধ্যম, সংগীত, গবেষণা, ব্যবসা, সামাজিক নেতৃত্ব এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের ৩০ জন এবং নেপালের ১৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল্লাহ। অনুষ্ঠানের সার্বিক আয়োজন ও সমন্বয়ে নেতৃত্ব দেন আইডিয়া এক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্মাতা খন্দকার সুমন। পুরো আয়োজনেই ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। অতিথি অভ্যর্থনা, সম্মাননাপ্রাপ্তদের সমন্বয়, মঞ্চ পরিচালনা থেকে শুরু করে অনুষ্ঠানসংশ্লিষ্ট নানা দায়িত্ব অনেকটাই এক হাতে সামলাতে দেখা যায় তাঁকে। ফলে আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যেও তৈরি হয় একধরনের পারিবারিক ও আন্তরিক আবহ। উপস্থিত ছিলেন বিলক্ষণ ক্রিয়েশন প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান ডাব্বু ক্ষেত্রি। তাঁর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও নেপালের সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হাতে সম্মাননা স্মারক, সনদপত্র এবং উত্তরীয় তুলে দেওয়া হয়।
একে একে মঞ্চে গান পরিবেশন করেন শিল্পীরাবাংলাদেশ থেকে সম্মাননা পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা খিজির হায়াত খান, আকতানিন খায়ের, সুপিন বর্মণ ও শ্যামল শিশির। অভিনেত্রীদের মধ্যে ছিলেন কাজী নওশাবা আহমেদ, নাজিয়া হক অর্ষা, মৌসুমী হামিদ,আইনূন পুতুল প্রমুখ। সম্মাননা পান অভিনেতা মোস্তাফিজুর নূর ইমরান,সরকার রওনক রিপন প্রমুখ। এ তালিকায় আরও ছিলেন গীতিকবি আল মাহমুদ মানজুর, নাট্যকার আহমেদ তাওকির, সংগীতশিল্পী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল কুদ্দুস, লালনসংগীতশিল্পী আকরাম হোসেন, গজলশিল্পী সৈয়দ ইসমাইল হোসেনসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
অনুষ্ঠানের আইডিয়া এক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্মাতা খন্দকার সুমন, বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল্লাহ, বিলক্ষণ ক্রিয়েশন প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান ডাব্বু ক্ষেত্রিদুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে শুরু হয় সম্মাননা প্রদান পর্ব। একে একে মঞ্চে উঠে সম্মাননা গ্রহণ করেন অতিথিরা। আনুষ্ঠানিক এ আয়োজনের মধ্যেও ছিল প্রাণবন্ত আড্ডা, হাস্যরস আর পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের দৃশ্য।
দর্শকসারিতেও ছিল তারকাদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত চলচ্চিত্র ‘রইদ’-এ সাধু চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসিত অভিনেতা মোস্তাফিজুর নূর ইমরানকে দেখা যায় স্ত্রী অভিনেত্রী নাজিয়া হক অর্ষার সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠতে। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন অভিনেত্রী মৌসুমী হামিদ এবং নির্মাতা-অভিনেতা রওনক রিপন। কিছুক্ষণ পর সেই আড্ডায় যুক্ত হন ‘সাতাও’ চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী আইনূন পুতুলও। চলচ্চিত্র, অভিনয়, নতুন কাজ, সমসাময়িক সংস্কৃতি এবং দুই দেশের সাংস্কৃতিক বিনিময় নিয়ে তাঁদের প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠানস্থলে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ ও নেপালের অতিথিদের মধ্যে ছিল আন্তরিক মতবিনিময়। কেউ নিজেদের কাজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন, কেউ ভবিষ্যতে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। নেপাল থেকে আসা অতিথিদের অনেকেই বাংলাদেশের আতিথেয়তা, উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রশংসা করেন। তাঁদের ভাষায়, দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আরও গভীর হলে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের ৩০ জন এবং নেপালের ১৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান করা হয়সম্মাননা প্রদান পর্ব শেষে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। দুই দেশের শিল্পীরা নিজেদের মতো করে গান পরিবেশন করেন। আনুষ্ঠানিক মঞ্চের বাইরেও চলতে থাকে আড্ডা, পরিচয়পর্ব ও অভিজ্ঞতা বিনিময়। ফলে অনুষ্ঠানটি কেবল একটি সম্মাননা প্রদান আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং দুই দেশের সংস্কৃতিকর্মী ও সৃজনশীল মানুষের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
নেপালের শিল্পীর একক পরিবেশনাঅনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে আইডিয়া এক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্মাতা খন্দকার সুমন বলেন, ‘গ্লোবাল এক্সিলেন্স অনার কেবল একটি সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা, পেশাগত উৎকর্ষ এবং মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সহযোগিতার একটি সেতুবন্ধ। আমরা বিশ্বাস করি, শিল্প, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, ব্যবসা ও সামাজিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রাখা ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দেওয়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। এ আয়োজনের মাধ্যমে দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতার নতুন দিক উন্মোচিত হবে।’
আনুষ্ঠানিক এ আয়োজনের মধ্যেও ছিল প্রাণবন্ত আড্ডা, হাস্যরস আর পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের দৃশ্যবক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়, সৃজনশীল সহযোগিতা এবং পেশাগত উৎকর্ষের স্বীকৃতি প্রদানের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের আয়োজন ভবিষ্যতে দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা, ব্যবসা ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
একক পরিবেশনানৈশভোজ ও সৌহার্দ্য বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আয়োজন। তবে সমাগত অনেকের মতে, সম্মাননা কিংবা আনুষ্ঠানিকতার চেয়েও বড় অর্জন ছিল দুই দেশের মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া নতুন সংযোগ, বন্ধুত্ব এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা। সেই অর্থে ‘গ্লোবাল এক্সিলেন্স অনার ২০২৬’ হয়ে উঠেছিল কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং বাংলাদেশ ও নেপালের সাংস্কৃতিক বন্ধনের একটা উদাহরণও।
