দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন

· Prothom Alo

রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি নাগরিক অধিকারের একটি ন্যূনতম স্বীকৃতি। বিশেষত প্রতিবন্ধী নাগরিকদের জন্য প্রদত্ত ভাতা কেবল অর্থনৈতিক সহায়তা নয়; এটি মানবিক মর্যাদা রক্ষার একটি নৈতিক প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতির ভেতরেই যদি প্রতারণা, অনিয়ম ও লুণ্ঠনের অন্ধকার বাসা বাঁধে, তবে তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি রাষ্ট্রনৈতিক বিবেকের এক গভীর অবক্ষয়ের লক্ষণ।

মাদারীপুর সদর উপজেলায় প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা ‘গায়েবি নম্বরে’ চলে যাওয়ার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি একটি পদ্ধতিগত দুর্নীতির ইঙ্গিত বহন করে, যেখানে দুর্বলতম মানুষদের অধিকারই সবচেয়ে সহজে লঙ্ঘিত হয়। জন্মগত বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কিশোরী আরিফা কিংবা শাকিল, তাদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কেউ ভাতা গ্রহণ করছে; মৃত ব্যক্তির নামে ভাতা চলমান থেকে তা অন্যের পকেটে যাচ্ছে—এসব ঘটনা কেবল আইনি অপরাধ নয়, নৈতিকভাবে বড় প্রতারণা।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

দর্শনের ভাষায় রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে ন্যায় ও সহমর্মিতার ওপর। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ সেই সমাজ, যেখানে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির অধিকার সর্বাগ্রে সুরক্ষিত হয়। অথচ আমাদের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, সেই দুর্বলতম মানুষটিকেই সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হতে হচ্ছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্র কি নিজস্ব নৈতিক চুক্তি ভঙ্গ করছে না? আরও উদ্বেগজনক হলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়সারা বক্তব্য ও দায় এড়ানোর প্রবণতা। ‘ভুলে অন্য নম্বরে যেতে পারে’, ‘আবেদনকারী ভুল করেছে’—এ ধরনের মন্তব্য প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক। আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় যেখানে প্রতিটি লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব, সেখানে শতাধিক ভাতাভোগীর অর্থ গায়েবি নম্বরে চলে যাওয়াকে ‘ভুল’ বলে উড়িয়ে দেওয়া কেবল অগ্রহণযোগ্য নয়; বরং সন্দেহজনক।

প্রশ্ন উঠছে—কারা এই নম্বর পরিবর্তন করছে? কীভাবে মৃত ব্যক্তির ভাতা অন্যের কাছে যাচ্ছে? কেন অভিযোগের পরও মাসের পর মাস কোনো প্রতিকার মিলছে না? তদন্ত কমিটি গঠন করেও কেন কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে না? বদলি কি শাস্তির সমার্থক?

এ অবস্থার দ্রুত অবসান জরুরি। প্রথমত, প্রত্যেক ভাতাভোগীর তথ্য ডিজিটালভাবে আবার যাচাই করে মোবাইল নম্বর ও অ্যাকাউন্টের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের সরাসরি সংযুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্বচ্ছ অডিট ও তৃতীয় পক্ষের নজরদারি চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য একটি কার্যকর, সময়সীমাবদ্ধ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে এবং সর্বোপরি যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মিলবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে; কোনো প্রকার প্রশাসনিক আপস চলবে না।

প্রতিবন্ধী মানুষের ভাতা আত্মসাৎ করা শুধু অর্থ চুরি নয়, এটি তাদের বেঁচে থাকার অধিকার হরণ। এটি মানবিকতার বিরুদ্ধে এক নীরব সহিংসতা। রাষ্ট্র যদি এই সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান না নেয়, তবে সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

Read full story at source