আজাদ খান, জনস্বাস্থ্যের এক আজীবন অভিযাত্রী

· Prothom Alo

জাতীয় অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ খানের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাঁর জীবনের দীর্ঘ পথচলার অনেক গল্প শোনা গেল। ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ শীর্ষক নিয়মিত সাক্ষাৎকারের অংশ হিসেবে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম তাঁর। গল্পের শুরু বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণকাঠী গ্রামে।

Visit tr-sport.bond for more information.

১৯৪১ সালে সেখানে তাঁর জন্ম। প্রাথমিক শিক্ষা পাশের গ্রাম পাদ্রীশিবপুরে। তিনি বলছিলেন, তাঁদের সময়ে অনেকেই বাড়িতে পড়াশোনা করে পরে স্কুলে ভর্তি হতেন। তাঁকে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করার কথা উঠলেও তাঁর বাবা মৌলভী ফজলুর রহমান খান বলেছিলেন, ‘না, ক্লাস টুতে ভর্তি করো। গোড়াটা শক্ত হোক।’

পাদ্রীশিবপুরের মিশন স্কুলে পড়েছেন এ কে আজাদ খান। সেই মিশনের ইতিহাস বলতে গিয়ে তিনি পর্তুগিজদের আগমন, চার্চ প্রতিষ্ঠা এবং এলাকার শিক্ষাব্যবস্থার কথাও স্মরণ করলেন।

১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকায় আসেন। প্রথমে নটর ডেম কলেজে ভর্তি হলেও থাকার সমস্যার কারণে ঢাকা কলেজে চলে যান। তিনি মনে করেন, সেটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ, সে সময় ঢাকা কলেজে কবীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মতো শিক্ষক ছিলেন।

১৯৬০ সালে এ কে আজাদ খান ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তাঁর ভাষায়, সে সময় ডাক্তারি পড়া খুব জনপ্রিয় বিষয় ছিল না। তাঁর ব্যাচে প্রথম বিভাগ পাওয়া ছাত্রদের মধ্যে তিনিই একমাত্র মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিলেন।

মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিতে। গ্রামের মানুষের পেটের নানা রোগ দেখে এই আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

১৯৭২ সালে কমনওয়েলথ ফেলোশিপ নিয়ে এ কে আজাদ খান অক্সফোর্ডে যান। সেখানে গিয়ে তাঁর গবেষণাজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তিনি বলছিলেন, অক্সফোর্ড তাঁকে শিখিয়েছে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে। শুধু মুখস্থবিদ্যা নয়, বোঝার ক্ষমতা এবং নতুন প্রশ্ন করার ক্ষমতাই সেখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অক্সফোর্ডে এ কে আজাদ আলসারেটিভ কোলাইটিস নিয়ে গবেষণা করেন। সে সময় ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে তাঁর গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিক উন্মোচন করে। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় ল্যানসেট সাময়িকীতে। তাঁর গবেষণা থেকে পরে আরও কার্যকর ও কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত ওষুধ তৈরির পথ খুলে যায়।

এ কে আজাদ খান জানান, এই আবিষ্কারের পেটেন্ট নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু তাঁরা ইচ্ছে করেই পেটেন্ট নেননি। কারণ, পেটেন্ট নিলে ওষুধের দাম বেড়ে যেত।

এ কে আজাদ খানের জীবনের আরেকটি বড় অধ্যায় বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি।

ড. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটি কঠিন সময় পার করেছে। পরে তিনি সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে বারডেম, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারিত হয়েছে।

ডায়াবেটিস সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ছিল খুবই স্পষ্ট। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর জন্য সবচেয়ে জরুরি দুটি বিষয় হলো শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং অতিরিক্ত খাবার না খাওয়া।

এ কে আজাদ খান বলছিলেন, আধুনিক জীবনে মানুষ ক্রমেই কম শারীরিক পরিশ্রম করছে। অথচ নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা ডায়াবেটিসসহ অনেক রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধে মানুষের আচরণ পরিবর্তনের বিষয়েও এ কে আজাদ খান কাজ করেছেন। ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিষয়ক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি গবেষণার কথা তিনি উল্লেখ করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় খুতবার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির সেই উদ্যোগ ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে বলেও তিনি জানান।

স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে এ কে আজাদ খানের দুটি সুপারিশ উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, স্বাস্থ্যসেবাকে ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসাশিক্ষার বিভাগগুলোকে আরও স্থিতিশীলভাবে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে।

বরিশালের একটি গ্রামের স্কুল থেকে শুরু করে অক্সফোর্ডের গবেষণাগার, সেখান থেকে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব—ড. এ কে আজাদ খানের জীবনপথে শিক্ষা, গবেষণা, সংগঠন ও জনস্বাস্থ্যের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়।

Read full story at source