তাপমাত্রার সমস্যাও একান্তই ভুল উন্নয়ন মডেলজনিত সমস্যা, যা ধীরলয়ে অস্তিত্বকে ধ্বংসের দিকে নিচ্ছে। এ রকম অবস্থায় কেমন বাজেট প্রয়োজন, তা নিয়ে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ
দেশে ‘গরমকাল’ চলছে। এখনো হয়তো মূল অধ্যায় আসেনি। এর মধ্যে ২২ এপ্রিল এক জেলায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে। আগে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে গেলে তাপপ্রবাহ পত্রপত্রিকার বড় খবর হয়ে উঠত। এখন ৪০ পেরোলে সে রকম ঘটে। তবে এবার গরমজনিত ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি ফিরে আসতে পারে বলেও আন্তর্জাতিক পরিসরে বলাবলি হচ্ছে। দৈনিক সমকাল ১৬ মে লিখেছে, এবার ‘সুপার এল নিনো’ হতে পারে।
Visit umafrika.club for more information.
সবশেষ এল নিনোকালে, ২০২৩-২৪–এ ইতিহাসের উষ্ণতম বছরগুলো পেয়েছিল বিশ্ব। বাংলাদেশেও অনেকের হয়তো ২০২৪–এ টানা ৩৬ দিন দুর্বিষহ গরমের কথা মনে আছে। আসন্ন মাসগুলোতে সেই পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, এখনই সেটা নিশ্চিত করে বলছে না কেউ। তবে এটা বলা হচ্ছে, তাপমাত্রা ৪০–এর আশপাশে থাকলেও গরমের অনুভূতি বেশি।
এই ‘গরম’ কেবল আবহাওয়াজনিত ঋতুভিত্তিক অসুবিধার বিষয় নয় এখন আর। এটা আমাদেরই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কুকর্মের বাস্তব ফল। একই সঙ্গে গরম একটা শ্রেণিযুদ্ধের চেহারা নিয়েও হাজির হচ্ছে। এর ভোগান্তি যাচ্ছে প্রধানত নিচুতলার কর্মজীবীদের ওপর দিয়ে। অথচ সমস্যা বাধিয়েছে শ্রেণি সমীকরণের ওপর দিকের ভোগবাদীরা।
ভবিষ্যতের ‘লাল জুলাই’ এড়ানোর অর্থনৈতিক পথ কী২০২৪–এর কথা মনে পড়ে কি?
গরম যে কেবল প্রকৃতির বিচ্ছিন্ন কোনো দুষ্ট বিষয় নয় এবং সমাজ-অর্থনীতির জন্য এটা যে কত ভয়াবহ হতে পারে, তার মোটাদাগের শিক্ষা পায় বাংলাদেশ ২০২৪–এ। ২০২৫–এর সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছিল, আগের বছরে তাপজনিত অসুস্থতায় বাংলাদেশে ২৫ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। তাতে অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় পৌনে দুই বিলিয়ন ডলার।
মানুষের শারীরিক-মানসিক ক্ষতির পাশাপাশি গরম যত বাড়ছে, অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাও তত কমছে। গরমে মানুষের আয়রোজগারে বেশি ক্ষতি হয় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির দেশে। বাংলাদেশে সে রকম ক্ষতির শিকার বেশি রাজধানী ঢাকার মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত সমাজ। ঢাকায় তাপমাত্রা যত থাকে, গরম অনুভূত হয় তার চেয়ে ৪-৫ ডিগ্রি বেশি। অর্থনৈতিক ক্ষতিও সেভাবে হয়। কোনো নির্দিষ্ট শত্রুর স্পষ্ট আক্রমণ বা আগ্রাসনের শিকার না হয়েও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ড এ রকম বাৎসরিক ক্ষতির মুখে এখন। যদিও এ থেকে মুক্তির আলাপ নেই তেমন।
আপাতত গরমে ক্ষতিগ্রস্তদের বড় অংশ সমাজের প্রভাবশালী নীতিনির্ধারকেরা নয়। তাপমাত্রার তীব্রতা ও বজ্রপাত হাত ধরাধরি করে বাড়ছে। বজ্রপাতে প্রতিবছর যারা আহত-নিহত হচ্ছে, তারও ৮০-৯০ শতাংশই মাঠে-ময়দানে কাজ করা শ্রমজীবী। এই মৌসুমে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার ৪ দিন আগে ১৮ এপ্রিল কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বজ্রপাতে ১৩ জন মারা গেল। বজ্রপাতসহ চলতি সময়ের অনেক ‘প্রাকৃতিক সংকট’ই শ্রেণিগত এক চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছে। বায়ুদূষণে ঢাকা ইতিমধ্যে অন্যতম বিশ্বসেরা। এই ক্ষতিরও বেশি শিকার কাজের সূত্রে ঘরের বাইরে থাকা মানুষেরা।
গরমের তীব্রতায় হিটস্ট্রোকের বাইরেও অবসাদ থেকে ডায়রিয়া পর্যন্ত বহু ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে কর্মঘণ্টা হারানোর পাশাপাশি চিকিৎসা খরচ বাড়ছে নাগরিক সমাজে। গবেষণা বলছে, ধনীদের চেয়ে গরিবেরা গরমে দ্বিগুণ-তিন গুণ কর্মসময় হারায়। এবার বিদ্যুৎসহ নানান জ্বালানির টানাটানির মধ্যে এই সমস্যার বাড়তি প্রকোপ চলছে। মূল্যস্ফীতি বাড়ার মুখে এ রকম মানুষদের আরও বাড়তি কাজ করতে হচ্ছে। প্রতিটি বাজেটের পর এই মানুষদের কর্মঘণ্টা বাড়াতে হয়।
যেভাবে চারপাশকে উত্তপ্ত করছি আমরা
দেশে যে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং অসহনীয় গরম অনুভূত হচ্ছে, তার মূলে অপরিকল্পিত ও দ্রুতলয়ের নগরায়ণ এবং দূষণ। পাকিস্তান আমলের পর থেকে নগরায়ণ হচ্ছে মুখ্য অপরিকল্পিতভাবে। ঢাকাসহ সব শহরে একই চিত্র। ঢাকা সাধারণ মানুষের ভাষায়, ইতিমধ্যে ‘দোজখ’–এর বৈশিষ্ট্য নিয়েছে। বাংলাদেশের কুলীন সমাজের ৫৫ বছরের মেধা-মনীষার স্বাক্ষর এই রাজধানী। বিশ্বে যত কুৎসিত সূচক আছে, তার প্রায় সব কটিতে ঢাকা এক থেকে পাঁচে আছে।
গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রথম আলো এক গবেষণা তথ্য তুলে ধরে লিখেছিল, যেখানে জলাভূমি আছে, ঢাকার সেদিকে তাপ বাড়ার হার কম। মুশকিল হলো, শহরটিতে তিন দশকে জলাভূমি কমেছে ৬৯ শতাংশ। চলতি ধারা বজায় থাকলে ২৫-৩০ বছর পর এই শহরে জলাভূমি বলে তেমন কিছু থাকবে না। ঢাকার সামান্য যেসব খোলা জায়গা আছে, সেখানেও অনেক সময় সবুজের নিবিড় কোনো আচ্ছাদন নেই। জলাভূমি ও সবুজ কমিয়ে নানান ‘প্রকল্প’ বাস্তবায়নকারীদের এই সমাজে সম্মানিত ‘উদ্যোক্তা’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
সর্বজনের জন্য অর্থনীতিগরম বাড়িয়ে তোলার মতো বিধ্বংসী পদক্ষেপ জেনে-না জেনে পুরো সমাজ বেশ ইন্ধন দিয়ে যায়। সম্প্রতি এ রকম খবরও দেখা গেছে, ঢাকার একাংশের খণ্ডকালীন এক নগরপিতা সবুজ অঞ্চল তৈরির কথা বলে রাজউক থেকে জায়গা নিয়ে ব্যবসায়ীদের খাবারের দোকান বসানোর অনুমতি দিয়েছিলেন। ছোট ছোট এ রকম প্রবণতার বৃহৎ ফলাফল অনুমান করা কঠিন নয়। অতি ঘন আবাসিক এলাকার ভেতর তাপ উৎপাদনের বহু উৎস আছে এই শহরে। সেটা হতে পারে শত শত ওয়েল্ডিং কারখানা থেকে শুরু করে হাজার হাজার জেনারেটর কিংবা উচ্চ এসিশক্তির গাড়ি।
রাজনীতি ও প্রশাসন নগরায়ণের এই নৈরাজ্য থামাতে পরিকল্পিত কোনো ভূমিকা রাখেনি; সক্রিয়ও নয়। তাদের পরিকল্পনায় পুরো ‘সিস্টেম’ আছে মূলত মুনাফার খোঁজে। যত্ন এবং নিরাপত্তা শব্দটা বাদ পড়েছে যে সিস্টেম থেকে।
রাজনীতির কুপ্রভাবে আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিকের গোডাউন বা প্লাস্টিক তৈরির কারখানা সরানো যায় না এখানে। প্রশাসনকে প্রভাবিত করায় সক্ষমেরাই মাইলের পর মাইল জলাভূমি ভরাট করে ‘ডেভেলপার’ তকমা পায়। বালু ভরাট করা সেসব জমিতে গড়ে তোলা হয় কেবল সারি সারি দালান। কত সরু রাস্তার পাশে কত উঁচু ভবন, আশপাশে কত কম জায়গা ছেড়ে করা যাবে, তা নিয়ে প্রতি সরকারের আমলে তদবির হয়। এ রকম তদবির ব্যর্থ হওয়ার নজিরও কম।
এখানকার নগর-নেতাদের আরেক অবদান: ঢাকায় প্রতিবছর ২০ শতাংশ হারে এসির ব্যবহার বাড়ছে। এই এসি ব্যবহারকারীরা ভর্তুকি দামে যে বিদ্যুৎ পোড়ায়, তাতে রয়েছে সুদূর গ্রামের মানুষদের ভ্যাটের অর্থও—যাদের ঘরে হয়তো মাঝরাতেও আলো জ্বলে না লোডশেডিংয়ে।
শহরগুলোতে লাখ লাখ এসির ব্যবহার সমাজে কেবল বাড়তি উষ্ণতা ছড়াচ্ছে না—দেশজুড়ে বিদ্যুৎ–বৈষম্যও বাড়াচ্ছে। এই বৈষম্যের অভিভাবক অবশ্যই রাজনীতি। দমবন্ধ করা ভবন এসি অপরিহার্য করে তোলে। এ রকম বাড়ির নকশাগুলো অনুমোদনকারী এ দেশেরই সম্মানিত প্রশাসকেরা। এভাবে আমরা ক্রমে একটা দুষ্টচক্রে আটকা পড়ছি: আলো–বাতাসহীন বাড়ি বানানো, তারপর এসি বসানো। সেই এসি চালাতে ভর্তুকিতে পাওয়া বাড়তি জ্বালানি পোড়ানো এবং তার মাধ্যমে চারপাশে বাড়তি তাপমাত্রা ছড়ানো।
এ রকম চক্রের প্রভাবে আমাদের উন্নয়নচিন্তাও বিকৃত হয়েছে। এসির ব্যবহারকে আমরা ধনাঢ্যের প্রতীক মনে করি। এটা যে আশপাশের জন্য একধরনের দূষণ এবং এ রকম জীবনধারার বিস্তার যে একটা পরিবেশগত অপরাধ—যা সবাইকে ক্ষতিকর ভবিষ্যতের দিকে টানছে, সেটা ভাবার সময় নেই আমাদের।
মানুষ যখন ফ্যান হাতে ঘোরে
গরমে নাগরিকদের দেহ-মনের পাশাপাশি দেশের কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হলেও উন্নয়নদর্শন না পাল্টিয়ে গরম মোকাবিলার কৃত্রিম বিকল্প খুঁজতে গিয়ে নানান অর্থনীতির জন্ম হচ্ছে। ছোট টাইফুন ফ্যানেরও কয়েক শ কোটি টাকার বাজার আজকের বাংলাদেশ। প্রতিবেশ ধ্বংস করে যখনই আমরা কোনো বিপদে পড়ছি, তখন তার মুনাফামুখী সমাধান হাজির করছি—যা আবার নতুন সমস্যা তৈরি করছে। অনেকেই এখন ব্যাটারিচালিত হ্যান্ডফ্যান নিয়ে চলাফেরা করেন। এটা স্বাভাবিক বাতাসের চেয়ে অতিরিক্ত ধুলাবালু নাকে-মুখে ঢোকায়। এসবের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে গরম উৎপাদক আরেক বিপদ।
প্রতিবছর দেশে জমছে হাজার হাজার টন ই-বর্জ্য। যে বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে বছরে ৩০ শতাংশ হারে। উৎপাদক বা বিক্রেতা কেউ এর দায়িত্ব নেওয়ার অবস্থায় নেই। অনেকে এসব সামগ্রী নষ্ট হওয়ার পরও ঘরে-দোকানে রেখে দেন। তাতেও বাড়ছে গরম। বহু ই-পণ্যে তাপ উৎপাদক নানান উপাদান আছে। যেগুলো আবার অপচনশীল।
রম, দূষণ ও বজ্রপাতের মতো বিষয়গুলোতে মূলত শ্রমজীবীরাই ভুগছে বেশিদেখা যাচ্ছে, গরম বাড়ার কারণগুলো পুরোদস্তুর আমাদের জীবনধারা এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত বিষয়। পুঁজিতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণহীন বিকাশ ও তাপমাত্রা বাড়া আন্তসম্পর্কিত। কোনোভাবে এটা আবহাওয়াজনিত কোনো নিরীহ সমস্যা নয়। যদিও গরম, দূষণ ও বজ্রপাতের মতো বিষয়গুলোতে মূলত শ্রমজীবীরাই ভুগছে বেশি, কিন্তু এসব সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাও কমাবে।
রাজনীতি ও সরকার যদি ভবিষ্যৎ সমাজকে এসব সমস্যার ভয়াবহতা থেকে রেহাই দিতে চায়, তাহলে পরিবেশবিরোধী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থকে অবজ্ঞা করে কঠোর নীতি-সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন দরকার। রাজউক ও চউকের কাজ নিশ্চয়ই স্থানীয় বসতি ও স্থানীয় সমাজকে উচ্ছেদ করে করে সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর হাতে একটা একটা করে প্লট ধরিয়ে দেওয়া এবং সেসব জায়গায় ইচ্ছেমতো ভবন বানিয়ে ব্যবসা করতে দেওয়া নয়। কথা ছিল, সবার নিরাপদ ও সুস্থ আবাসনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে তারা। কিন্তু তাদের অভিভাবকত্বে শহুরে প্লটমালিকদের স্বেচ্ছাচারিতায় নগরগুলো নরক বনছে।
এ মুহূর্তে গ্রাম-শহর সর্বত্র সব ধরনের জলাধার যেকোনো মূল্যে রক্ষা জরুরি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ করতে সব স্তরের স্থানীয় সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজে নামানো দরকার। শহরে প্রতিটি বাড়ির মালিককে নিজ আঙিনার একাংশে যেকোনো উপায়ে কিছু পরিমাণ গাছপালা রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এ ক্ষেত্রে হোল্ডিং ট্যাক্সে প্রণোদনামূলক ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া যেতে পারে।
তথাকথিত ডেভেলপারদের জলাভূমি ভরাট কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ দরকার। এসবের জন্য আবার শুরুতে যেটা জরুরি: বাজেটসহ জাতীয় পরিকল্পনা দলিলগুলো তৈরির সময় প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর অন্ধ ও মুখস্থ বিকার থেকে মুক্তি এবং সেগুলো তৈরির প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সমাজ ও প্রতিবেশচিন্তাকে যুক্ত করা।
বাজেটে উন্নয়নদর্শন বদলাবে কি সরকার?
আমাদের বাজেটচিন্তা, উন্নয়ন মডেল অনেক সময়ই পশ্চিমের ফর্দ ও পরামর্শে হয়। উন্নয়ন দলিলগুলো তৈরির এই কলোনিয়াল প্রক্রিয়ার বাইরে এসে করপোরেট মুনাফার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মানবকল্যাণের ওপর নীতিগত জোর দরকার। পূর্বাপর বিবেচনাহীন প্রবৃদ্ধি ও জিডিপির দৌড় সমাজকে যে বিপদে ফেলতে পারে, ইতিমধ্যে তার বৈশ্বিক নজির শহর ঢাকা।
একই মডেল কর্মসংস্থানসহ বাংলাদেশের কোনো সংকটেরই সমাধান দিতে পারেনি, কেবল কিছু গ্রুপ অব কোম্পানির জন্ম দিয়েছে তা। ব্যক্তিমুখী ভোগবাদী এই মডেলের বিকল্প হিসেবে সম্পদ পুনর্বণ্টনমূলক, প্রাণপ্রকৃতির সঙ্গে মানানসই অংশীদারত্বমূলক উন্নয়ন মডেলের দিকে নবযাত্রা প্রয়োজন আজ। যেখানে মানুষ হাতে ফ্যান নিয়ে ঘুরবে না, ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা উপভোগ করবে প্রতিমুহূর্তে।
এ জন্য বিগত ৫৫ বছরে প্রতিটি খাতে আমরা যে ভুল পথে এগিয়েছি, সেই পথযাত্রার মোড়বদল দরকার। তাপমাত্রার সমস্যাও একান্তই ভুল উন্নয়ন মডেলজনিত সমস্যা, যা ধীরলয়ে আমাদের শারীরিক ও মনোজাগতিক অস্তিত্বকে ধ্বংসের দিকে নিচ্ছে। জিডিপির প্রতি শতাংশ বৃদ্ধি আবহাওয়া, প্রাকৃতিক সম্পদ, জল-মাটির কতটা ক্ষয়ক্ষতি-দূষণ ঘটাল, জীববৈচিত্র্য কতটা কমাল, পুরো জনসংখ্যার চিকিৎসা ব্যয় কতটা বাড়াল—সেসবের বাস্তব নিরীক্ষা বা হিসাবকৃত তথ্য-উপাত্ত যদি জানা যেত, তাহলে বহু আগে নাগরিক সমাজ এই ধারার ‘উন্নয়ন’ প্রত্যাখ্যান করত।
আমাদের ‘উদ্যোক্তা’দের সফলতা হলো, জিডিপি ও প্রবৃদ্ধির মরীচিকায় নাগরিক সমাজের মনোজগৎকে অনেকাংশে সম্মোহিত করতে পেরেছেন। ফলে আমাদের ভবিষ্যৎ এখন ৪০ ডিগ্রির বেশি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বরণ করে নেওয়ার দিকে, যা একদিকে মানবদেহে বহু ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে বাধ্য, অন্যদিকে চারপাশের সমাজে গাছপালা, মাটি, বায়ুতে বহুমাত্রিক বিকৃতি ঘটাতে চলেছে।
এসবের সামগ্রিক ফল, কর্মজগতে অচিন্তনীয় সব অদলবদল। কোটি কোটি কর্মঘণ্টা হারিয়ে যাওয়া। শুরুতে এটা আয় ও ধনবৈষম্য বাড়ার যে পর্যায়ের ভেতর দিয়ে যায়, আপাতত বাংলাদেশ সেই অধ্যায় অতিক্রম করছে। প্রশ্ন হলো, নতুন সরকার প্রথম বাজেটে আমাদের উন্নয়নদর্শন বদলের সাহস দেখাবে কি? মানুষের জীবন নিশ্চয়ই কেবল কারখানার পণ্য উৎপাদনের জন্য নয়।
আলতাফ পারভেজ গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
