বাঘের থাবা থেকে ছেলে জিয়ারুলকে বাঁচাতে প্রাণ দিয়েছিলেন বাবা

· Prothom Alo

সুন্দরবনের গহিনে সেদিন বাঘের সঙ্গে শুধু এক কিশোর নয়, লড়াই হয়েছিল সন্তানের জীবন বাঁচাতে মরিয়া এক বাবারও। ১৫ বছর বয়সী জিয়ারুল গাজীকে বাঘের মুখ থেকে ছিনিয়ে আনতে খালি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাঁর বাবা জিন্নাহ গাজী। দীর্ঘক্ষণ বাঘের সঙ্গে লড়াই করে ছেলেকে বাঁচাতে পারলেও শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন হারান জিন্নাহ।

Visit tr-sport.click for more information.

ঘটনাটি প্রায় ৩০ বছর আগের। কিন্তু সেই ভয়াল দুপুরের স্মৃতি আজও জিয়ারুল গাজীর বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে। সুন্দরবনঘেঁষা জনপদের বহু পরিবারের মতো জিয়ারুলদের পরিবারেও বাঘের আক্রমণের স্মৃতি গভীর ক্ষত হয়ে আছে।

এ অঞ্চলের অনেক বনজীবীর বাবা, ভাই, চাচা কিংবা স্বজন বাঘের আক্রমণে নিহত হয়েছেন। তবু জীবিকার তাগিদে তাঁদের বারবার ফিরতে হয় সুন্দরবনে, ফিরেছেন জিয়ারুলও। মাছ, কাঁকড়া আর মধুর ওপর নির্ভরশীল এসব মানুষের জীবনসংগ্রাম বছরের পর বছর ধরে চলছেই।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের তিন দিক কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীবেষ্টিত। অন্য পাশে সুন্দরবন। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সুন্দরবনের বুকের ভেতর ছোট্ট একটি দ্বীপ গাবুরা। প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ইউনিয়নে সরকারি হিসাবে জনসংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার। তবে কাজের সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দারিদ্র্যের কারণে প্রতিবছরই অনেকে এলাকা ছাড়ছেন। কেউ যাচ্ছেন অন্য জেলায়।

গাবুরার চাঁদনিমোখা গ্রামে কয়েক পুরুষ ধরে বসবাস জিয়ারুলদের। ৪৫ বছর বয়সী জিয়ারুল পেশায় বনজীবী। কখনো সুন্দরবনের নদীতে মাছ বা কাঁকড়া ধরেন, কখনো মধু সংগ্রহ করেন।

হঠাৎ বাঘ ঝাঁপ দিয়ে পড়ল মৌয়ালের ওপর, কী করলেন সঙ্গীরা

সম্প্রতি এক দুপুরে নিজের মামি আকলিমা খাতুনের বাড়িতে বসে জীবনের সেই বিভীষিকাময় ঘটনার বর্ণনা দেন জিয়ারুল। বলেন, ‘১৯৯৬ সালের কথা। সুন্দরবনের বুড়িগোয়লিরী স্টেশন থেকে পাস কুরে কয়েক দিন আগে ছয়জন জঙ্গলে ঢুকেছি। ওই গণে ভালো মাছ পুড়ত। কপোতাক্ষের সাপখালী নদীর বাউনে জাল টানতি সুকালবেলায় গেছি আমি, বাবা (জিন্নাহ গাজী), বড় মামু রহিম বক্স, বড় চাচা কদ্দুস গাজী ও আমার এক দাদা মোহাম্মাদ গাজী। যেই আমি খালে বাড়ে গিছি, ওমনি বাঘ আমারে ধুরে জঙ্গলের ওপরে টেনে তুলার চেষ্টা করে। আমি চিৎকার দিলে বাপ দেরি না করে খালি হাতেই বাঘের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে।’

কথোপকথনের এ পর্যায়ে একটু থেমে আবার শুরু করলেন জিয়ারুল, ‘৮ থেকে ১০ মিনিট পরে বাঘ আমারে ছেড়ে দে বাপের ওপর হামলে পড়ে। বাপে প্রাণপণ নড়াই করে। আরও ১৪ থেকে ১৫ মিনিট নড়াইয়ের পর বাপ হেরে যায়। বাপে কাবু হয়ে পড়লে তারে মুখে নে বাঘ জঙ্গলের গহিনে চলি যায়। ততক্ষণে আমার শরীরের হাত, পা, মাজায় জখম।’

সুন্দরবনে তখন ভয় ছিল ‘বাঘ মামা’র, এখন ঈমান আলী কাকে ভয় পান

জিয়ারুল গাজী শরীরের ক্ষতচিহ্ন দেখিয়ে বলেন, ‘বাপ মারা যাওয়ার পর প্রায় এক বছর জঙ্গলে যাইনি। মনে কুরেছিলাম জঙ্গল আর কুরবো না। কিন্তু কী কুরবো। এলাকায় কোনো কাজ নেই, খালি অভাব আর অভাব। ঠিকমতো খাওয়া হয় না। ঝুঁকি আছে জেনেও আবার জঙ্গল করি।’

পাশ থেকে আকলিমা খাতুন বলে ওঠেন, ‘বাগে ধুরার পর জিয়ারুলকে মানুষ করেছি আমি। ওর বাপকে বাঘে খেলো। আর বাঘে ধরলি ওর শরীরে কিছু ছেলো না। এখনো শরীরে দাগ নইছে।’

বর্তমানে স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে জিয়ারুলের ছয় সদস্যের সংসার। নিজের কোনো জমি নেই। গ্রামেও কাজের সুযোগ সীমিত। তিনি বলেন, এখন জঙ্গলে যেতেও নানা ঝুঁকি। বনদস্যুদের অনুমতি নিতে হয়, টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। গত বছর বনদস্যুদের হাতে মারধরের শিকারও হয়েছেন তিনি। আক্ষেপের সুরে জিয়ারুল বলেন, ‘সংসার কীভাবে চলে, সেটা কেউ জানতে চায় না। এভাবেই সুন্দরবনের মানুষগো জীবন চলে।’

Read full story at source