বাইক থেকে নেমে মাথায় হেলমেট পরা অবস্থায়ই দ্রুত বনানীর ‘ট্রাভেল ইস্ট’ রেস্তোরাঁর ভেতরে ঢুকে পড়লেন এক তরুণ। উচ্চতা ৬ ফুট, মাথায় হেলমেট—না চাইলেও মানুষটাকে আলাদা করে চোখে পড়ে। টেবিলে বসা অন্য লোকজন তাই কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রইলেন। আগে থেকে রিজার্ভ করে রাখা রুমে গিয়ে মাথা থেকে হেলমেটটি খুলতেই বেরিয়ে এল এক চেনা মুখ—‘রাফসান দ্য ছোট ভাই’। জনপ্রিয় এই কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সঙ্গে আড্ডা দিলেন রয়া মুনতাসীর
Visit mwafrika.life for more information.
অনলাইন দুনিয়ায় ‘রাফসান দ্য ছোট ভাই’ নামে পরিচিত ইফতেখার রাফসান রাস্তায় দাঁড়ালেই যে ভিড় জমে যায়, বর্ণিল খাবারদাবার ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের ফটোশুট করতে গিয়ে কিছুক্ষণ আগেই সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। মিলেনিয়াল থেকে জেন–জি পার হয়ে আলফা প্রজন্মের কাছেও মানুষটা সমান জনপ্রিয়।
আলাপের শুরুতেই বললেন, ‘বাইরে গিয়ে ছবি তুলতে হবে, এটা ভাবলে এখন হার্ট ধুকধুক করে। ভিডিও করাও আগের চেয়ে অনেক কঠিন লাগে।’ খাবার নিয়ে দুই শতাধিক ভিডিও বানিয়েছেন, তবু নাকি নতুন ভিডিও বানাতে গেলে এখনো নার্ভাস থাকেন। যেহেতু খাবার নিয়ে ভ্লগ বানান, তাই ক্যামেরার সামনে তো আসতেই হয়। কিন্তু এর বাইরে একটু আড়ালে থাকতেই পছন্দ করেন রাফসান।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম ভিডিও বানিয়েছিলেন, অনেকেই তখন সেটা নিয়ে হাসাহাসি করেছিল। কয়েক বছর আর তাই ওপথ মাড়াননি। পাঁচ বছর পর ‘রাফসান দ্য ছোট ভাই’ নামে আবার শুরু করেন। বাড়ির ছোট ছেলে, তাই নামের শেষে জুড়ে দেন দ্য ছোট ভাই। তারপর ‘হ্যালো গাইজ, দিস ইজ রাফসান দ্য ছোট ভাই...’ কথাগুলো যেন একটা ব্র্যান্ড হয়ে গেছে।
সারা দিন বাইরে ঘুরে ঘুরে খেলেও বাড়ির খাবারই প্রিয় রাফসানেরখাবার নিয়ে এত যে ভ্লগ বানান, রাঁধতে পারেন? রাফসান জানালেন, রান্নার প্রতিও তাঁর আলাদা একটা আগ্রহ আছে, বিশেষ করে কন্টিনেন্টাল খাবার। স্প্যাগেটি, পাস্তা, আইয়ো এ অলিও, পিৎজা, গার্লিক ব্রেড থেকে শুরু করে ব্রাউনি, কুকিজ—সবই বানাতে পারেন।
নতুন স্বাদ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভালো লাগে, আর এই জায়গা থেকেই রান্না করার প্রতি টানটা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া খাবারের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানালেন, ‘ফু ওয়াংয়ের বিফ শর্মা আমার খুব পছন্দ।’ ঢাকার খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটার একটা নিয়ন্ত্রণ দরকার।’
সারা দিন বাইরে ঘুরে ঘুরে খেলেও বাড়ির খাবারই তাঁর কাছে প্রিয়। রাফসান ভাতপাগল মানুষ। দিনে পাঁচ বেলা ভাত খেতেন একসময়। তখন ওজন ছিল ১২০-১২৫ কেজি। এখনো খান, তবে কিছুটা কমিয়েছেন।
এই খাবারটি তাঁর এতটাই পছন্দ যে ভাত খাওয়ার জন্য একবার বিদেশে সফর ছোট করে দেশে চলে এসেছিলেন। গল্পচ্ছলেই জানালেন, ‘দুবাই হয়ে টার্কিতে আমার একটা ট্যুর ছিল। হঠাৎ করে বাড়ির কথা মনে পড়ল, আর মনে হলো ভাত খেতে হবে। আমাদের স্টাইলের ভাত। আর এ কারণেই দুই দিন আগে বাড়ি চলে এসেছিলাম।’
ঢাকার যে রেস্তোরাঁয় নিজের খাবার নিজেকেই রান্না করে খেতে হয়রেস্তোরাঁ থেকে কি টাকা নেন রাফসান
ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রে আগে থেকেই একটি পরিকল্পনা করে রাখেন রাফসানখাবার ছাড়াও এখন নানা ধরনের ভিডিও কনটেন্ট বানাচ্ছেন রাফসান দ্য ছোট ভাই। স্ক্রিনে একজন মানুষকে দেখা গেলেও এর পেছনে একটা পুরো টিম কাজ করে। দলে এখন আছেন ৯ জন সদস্য। দুটি ক্যামেরা আর একাধিক ফোন আর গো প্রো।
দেশের বাইরে গিয়েও এখন নিয়মিত ভিডিও বানাচ্ছেন তিনি। কয়েক দিন আগেই ঘুরে এলেন পাকিস্তান। এর আগে গেছেন জাপান, দুবাই, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনসহ বেশ কয়েকটি দেশে। বিদেশের মাটিতে করা ভিডিও আপলোডের পর সেখানকার দর্শকদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন। কমেন্টে অনেকের ভালো ভালো কথা তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে।
‘রাফসান কি রেস্তোরাঁ থেকে টাকা নিয়ে ভিডিও বানান?’ অনেক সময়ই রাফসানকে শুনতে হয় এই প্রশ্ন। প্রশ্ন করতেই ইফতেখার রাফসান হেসে বলেন, ‘আমাদের দেশে একটা ধারণা আছে, কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে ভিডিও করা মানে মালিকপক্ষ টাকা দিয়েছে। অথচ আমি যে রেস্তোরাঁয়ই যাই না কেন, আগে থেকে কোনো ধরনের যোগাযোগ করি না, সরাসরি অভিজ্ঞতা নেওয়ার চেষ্টা করি।’
ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রে আগে থেকেই একটি পরিকল্পনা করে রাখেন রাফসান, ‘ডেটা অ্যানালাইসিস করি। জানি ভিডিওর শুরুটা কেমন হলে দর্শক শেষ পর্যন্ত দেখবে। ইউটিউবার মি. বিস্টের (MrBeast) ভিডিও দেখলে বুঝবেন, তিনি মাঝখান থেকে ভিডিও ব্রেক করে দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখেন।’
রাফসানের লক্ষ্য থাকে—নিজস্বতা ও সততা। ভিডিওর শেষে একটি সামাজিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন সব সময়। আর সেটা তিনি সচেতনভাবেই করেন, ‘মনে করি, শুধু বিনোদন নয়, একটা বার্তাও থাকা উচিত।’
যাঁরা তাঁর ফলোয়ার, তাঁরা নিশ্চয় জানেন, গেমিংয়ে রাফসানের প্রবল আগ্রহ। আগে নিয়মিত ‘কাউন্টার-স্ট্রাইক: গ্লোবাল অফেনসিভ’ খেলতেন। পরে ‘ভ্যালোরেন্ট’-এ অংশ নেন।
মাটির চুলায় রান্না শিখেছেন সুনেরাহঈদের দিন কী করেন
ঈদের দিনও রাফসানের প্রথম পছন্দ মায়ের হাতে রান্না করা খাবারঈদের দিন তাঁর কীভাবে সময় কাটে? ঈদে তাঁর পছন্দের খাবারই–বা কী, জানতে চাইলাম। একটুও চিন্তা না করে জানালেন, ‘মায়ের হাতের রান্নার ওপর পৃথিবীতে আর কিছু নেই। আম্মু রান্না করে, সেই খাবারই সাধারণত খাই।
ঈদের দিনও আমার প্রথম পছন্দ মায়ের হাতে রান্না করা খাবার। মায়ের হাতে তেহারি ভালো লাগে। মা বেস্ট তেহারি বানায়। আপনারা যদি কখনো খান, তাহলে বুঝবেন।’
ঈদে বাইরেও খেতে যান ইফতেখার রাফসান, ‘ওটা মনে হয় আমার চোখের খিদা। বাসায় যখন খাই, তখন মনে হয় পেট আর মন দুটো ভরেই খেলাম।’
ঈদের দিনের সবচেয়ে প্রিয় অংশ কী—জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘সবার সঙ্গে বসে খাওয়ার সময়টাই সবচেয়ে ভালো লাগে। এটা যেন আলাদা করে মনে থেকে যায়।’ ছোটবেলায় এই একসঙ্গে খাওয়াটা তাঁকে তেমন টানত না, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর গুরুত্ব বুঝেছেন। এখন এই সময়টাকেই তিনি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেন।
সকালে নামাজ শেষে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। বিকেল, সন্ধ্যা বা রাতে একটু বের হন, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, আড্ডা। ঈদের দিনেও আরেকটা রুটিন মিস করেন না। হাসতে হাসতে বললেন, ‘তারপর আবার ফিরে এসে গেম খেলি।’
ঈদের আগের রাতে তো সময়ের হিসাবই থাকে না। রাত তিন-চারটা পর্যন্ত গেম খেলেন, তারপর খুব অল্প সময়ের জন্য ঘুম। মাত্র তিন ঘণ্টা পরই আবার উঠতে হয়—ঈদের সকাল তো আর মিস করা যাবে না।
জেফার–রাফসান হানিমুনে কোথায় গেছেন, দেখুন ১০টি ছবিতে