গবেষণা করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত অতিমাত্রার গামা রশ্মিতে বিকিরিত হয় ব্রুস ব্যানার। ফলে তার ডিএনএতে পরিবর্তন আসে। এরপর তার ডিএনএর সঙ্গে রাগ এমনভাবে সম্পর্কিত হয়ে যায় যে পরে যখনই সে রেগে যেত, তার গায়ের রং সবুজ হয়ে যেত। সে পরিণত হতো অতি শক্তিশালী এক বিশাল আকারের দৈত্যে। এটাই মার্ভেল কমিকসের বিখ্যাত চরিত্র দ্য হাল্ক। এভাবে কমিকস বই ঘাঁটতে থাকলে পরপর এমন অনেক চরিত্র পাওয়া যাবে, যারা হয় গবেষণার বস্তু ছিল অথবা গবেষণাগারে দুর্ঘটনার কারণে অতিমানবীয় ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে।
Visit playerbros.org for more information.
আসলেই কি এমন দুর্ঘটনা ঘটে? কী ঘটে সেসব দুর্ঘটনাকবলিত মানুষদের ভাগ্যে? কমিকস বইয়ে যেমন দুর্ঘটনার বর্ণনা থাকে, তার কাছাকাছি দুটি বাস্তব দুর্ঘটনার গল্প তুলে ধরছি এখানে। দুটি দুর্ঘটনাতেই কণা ত্বরকের ব্যবহার জড়িত। কণা ত্বরক যন্ত্রে তড়িৎক্ষেত্র ও চৌম্বকক্ষেত্র ব্যবহার করে বিভিন্ন কণা রশ্মির গতি বৃদ্ধি করা হয় এবং উচ্চ গতির সেসব কণা নিয়ে বিভিন্ন রকম গবেষণা পরিচালনা করা হয়।
তেজস্ক্রিয়তায় ক্ষত-বিক্ষত পৃথিবীর ৭ জায়গাসোভিয়েত ইউনিয়নের প্রোতভিনো শহর বিখ্যাত ছিল ইউ-৭০ নামে সিনক্রোটন যন্ত্রের কারণে। প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ বায়ুশূন্য টিউবসহ এ যন্ত্রটিই ছিল সে সময়কার সবচেয়ে বড় কণা ত্বরক।
সোভিয়েত বিজ্ঞানী আনাতোলি বুগরস্কি
আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগের কথা। ৩৬ বছর বয়সী এক বিজ্ঞানীকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মস্কোর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে সময় তাঁর চেহারার এক পাশ ফোলা ছিল। তাঁর মেডিকেল রেকর্ডে উল্লেখ করা হয়: ‘তীব্র মাত্রার প্রোটন রশ্মি তাঁর মস্তিষ্কের পেছন দিয়ে প্রবেশ করে বাঁ নাসারন্ধ্র হয়ে বের হয়ে গেছে।’
তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক দুর্ঘটনা বলতে আমরা কেবল চেরনোবিল দুর্ঘটনাকেই বুঝি, কিন্তু এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল চেরনোবিল দুর্ঘটনার আরও আট বছর আগে। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রোতভিনো শহর বিখ্যাত ছিল ইউ-৭০ নামে সিনক্রোটন যন্ত্রের কারণে। প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ বায়ুশূন্য টিউবসহ এ যন্ত্রটিই ছিল সে সময়কার সবচেয়ে বড় কণা ত্বরক। এটি ৭৬ বিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তিসম্পন্ন প্রোটন রশ্মি উৎপাদন করতে পারত। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন ইনস্টিটিউট ফর হাই এনার্জি ফিজিকসের এক গবেষক আনাতোলি বুগরস্কি ইউ-৭০ সিনক্রোটনের কক্ষে প্রবেশ করেন। তিনি সেখানে গিয়েছিলেন ডিটেকশন সিস্টেমের একটি ত্রুটি সারানোর জন্য।
সাধারণত যেসব গবেষণাগারে এমন উচ্চ শক্তির গবেষণা হয়, সেখানে কর্মরত গবেষকদের নিরাপদে কাজ করার জন্য বিভিন্ন সুরক্ষাব্যবস্থা থাকে। সেদিন বুগরস্কি যে কক্ষে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলেন, সে কক্ষের বাইরে একটি নিরাপত্তাবাতি ছিল। যদি কক্ষের ভেতরে যন্ত্র চালু থাকে, তবে বাতিটি জ্বলার কথা। আর বাতিটি জ্বলন্ত অবস্থায় থাকলে কক্ষে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেদিন বাতিটি নষ্ট ছিল এবং ভেতরে যন্ত্রটি চালু ছিল। সে কারণে কক্ষের ভেতরে ডিটেকশন টিউবে আবর্তিত হচ্ছিল অতি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রোটন রশ্মি।
চেরনোবিল বিপর্যয়ের চার দশক: মিথ বনাম বাস্তবতাসাধারণত যেসব গবেষণাগারে এমন উচ্চ শক্তির গবেষণা হয়, সেখানে কর্মরত গবেষকদের নিরাপদে কাজ করার জন্য বিভিন্ন সুরক্ষাব্যবস্থা থাকে।
কক্ষের বাইরের বাতিটি নেভানো দেখে বুগরস্কি কোনো বিপদের আঁচ করতে পারেননি। তিনি কক্ষের দরজা খোলেন, ভেতরে প্রবেশ করেন এবং ত্রুটি সারাতে থাকেন। কাজ করতে গিয়ে সিনক্রোটন যন্ত্র থেকে ছুটে আসা উচ্চ শক্তির প্রোটন রশ্মি তাঁর মাথার পেছন দিক দিয়ে প্রবেশ করে মস্তিষ্ক ভেদ করে বাঁ নাসারন্ধ্র দিয়ে বের হয়ে যায়! যেন একটি উচ্চ গতির বুলেট তাঁর মাথার পেছন দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্ক এফোঁড়-ওফোঁড় করে নাকের গোড়া দিয়ে বেরিয়ে গেল। তাঁর নিজের ভাষ্যমতে, দুর্ঘটনাকালে তিনি এত তীব্র আলোর ঝলকানি অনুভব করেছিলেন, যেটার উজ্জ্বলতা ১ হাজারটা সূর্যের চেয়েও বেশি ছিল!
দুর্ঘটনাকালে প্রোটন রশ্মির গতিপথএরপর কী হলো? এই দুর্ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে বুগরস্কি অসুস্থ হননি। তিনি তাঁর কাজ শেষ করেন। কক্ষের বাইরে আসেন এবং যথারীতি লগবুক এন্ট্রি সম্পন্ন করেন। কিন্তু বিপত্তি শুরু হয় সেদিন রাত থেকে। তাঁর চেহারার বাঁ পাশ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যেতে থাকে। পরদিন সকালে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল মস্কোর হাসপাতাল নম্বর-৬ এ। বিকিরণজনিত দুর্ঘটনার চিকিৎসায় এই হাসপাতাল বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে চেরনোবিল দুর্ঘটনায় পীড়িতদেরও এই হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল।
যাহোক, বুগরস্কির চিকিৎসা অনেকাংশেই গোপন রাখা হয়েছিল। প্রায় দেড় বছর পর তিনি মোটামুটি সুস্থ হয়ে আবার কর্মক্ষেত্রে যোগ দেন। একজন মানুষের জন্য বিকিরণের মারাত্মক মাত্রা যেখানে ৫-৬ গ্রে (Gy), সেখানে দুর্ঘটনাকালে বুগরস্কি প্রায় ২ হাজার গ্রে ডোজের বিকিরণে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এত তীব্র গতির প্রোটন রশ্মি তাঁর মস্তিষ্ক ভেদ করা সত্ত্বেও তিনি জীবিত ফিরলেন কীভাবে?
এ বছর চল্লিশে পা দিল বিজ্ঞানের ছয়টি যুগান্তকারী ঘটনাবুগরস্কির চেহারার বাঁ পাশ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যেতে থাকে। পরদিন সকালে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল মস্কোর হাসপাতাল নম্বর-৬ এ।
তাঁকে প্রাণে বাঁচানোর পেছনে দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, তাঁর মাথায় যে প্রোটন রশ্মি আঘাত করেছিল, সেটি অবশ্যই উচ্চ শক্তির ছিল, কিন্তু রশ্মিটি ছিল কেন্দ্রীভূত। এর প্রস্থচ্ছেদ ছিল মাত্র ২ বাই ৩ মিলিমিটার (২ × ৩ মিমি), অর্থাৎ রশ্মিটি ছিল অত্যন্ত সরু। সে কারণে এটি পুরো মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়েনি, বরং মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশ দিয়ে গেছে এবং শুধু ওই অংশটুকুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আর দ্বিতীয় কারণটি ছিল, রশ্মিটি পুরোপুরি তাঁর শরীরে শোষিত হয়নি। রশ্মিটি তাঁর মাথার পেছন দিয়ে প্রবেশ করে বাঁ নাসারন্ধ্রের নিচ দিয়ে বের হয়ে যায়। সুতরাং বলা যেতে পারে, রশ্মিটি অল্প সময়ের জন্য তাঁর শরীরের খুব অল্প অংশের মধ্য দিয়ে গিয়ে তাঁর যতটুকু শারীরিক ক্ষতি হওয়ার ছিল, তা এই সামান্য সময়েই সাধিত হয়।
বুগরস্কি যদি মার্ভেল বা ডিসি কমিকসের কোনো চরিত্র হতেন, তাহলে হয়তো এমন দুর্ঘটনার পর অতিমানবীয় শক্তি লাভ করে ফেলতেন। কিন্তু বাস্তব জীবনে তাঁকে বেশ কিছু শারীরিক বিকলাঙ্গতা মেনে নিতে হয়েছিল, যেগুলো পরে আর কখনোই ভালো হয়নি। যেমন বাঁ কানের শ্রবণশক্তি তিনি সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেন। সব সময় কানে একধরনের গুঞ্জন শুনতেন, মাঝেমধ্যেই তাঁর খিঁচুনি হতো এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। তবে সৌভাগ্যবশত বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো সমস্যা তাঁর হয়নি। সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান এবং পরে পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেন। আশার কথা হচ্ছে, তিনি এখনো জীবিত আছেন এবং ২০২০ সালে ৭৭ বছর বয়সে তিনি অবসরে যান। চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর তিনিও রেডিয়েশন ভিকটিম হিসেবে রাষ্ট্র থেকে সহযোগিতা পেয়েছিলেন।
যে পাঁচ উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানীর নিজের আবিষ্কারই হয়েছে তাঁদের মৃত্যুর কারণবাস্তব জীবনে বুগরস্কিকে বেশ কিছু শারীরিক বিকলাঙ্গতা মেনে নিতে হয়েছিল, যেগুলো পরে আর কখনোই ভালো হয়নি। যেমন বাঁ কানের শ্রবণশক্তি তিনি সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেন।
ভিয়েতনামের হ্যানয় দুর্ঘটনা
এই গল্প ভিয়েতনামের। রাজধানী শহর হ্যানয়ে অবস্থিত হ্যানয় ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিকস। এখানে পরিচালিত হতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিউক্লিয়ার গবেষণা। এই প্রতিষ্ঠানের দুটি কণা ত্বরক যন্ত্র ছিল। প্রথমটি আনা হয়েছিল হাঙ্গেরি থেকে, যা ১৪ মেগাইলেকট্রন ভোল্টের নিউট্রন তৈরি করতে পারত। আর অন্য কণা ত্বরক যন্ত্রটি ছিল এম-১৭ মাইক্রোটন, যা প্রায় ১৫ মেগাইলেকট্রন ভোল্টের ইলেকট্রন ব্যবহার করে উচ্চ শক্তির ইলেকট্রন রশ্মি এবং এক্স-রে উৎপাদনে সক্ষম ছিল।
১৯৯১ সালে এসে প্রথম কণা ত্বরক যন্ত্রটি বিকল হয়ে যায়। তাই সব গবেষণা এম-১৭ মাইক্রোটন দিয়েই পরিচালিত হতো। এই যন্ত্রে বৃত্তাকার পথে ইলেকট্রন রশ্মিকে ত্বরান্বিত করা হতো। এরপর যখন ইলেকট্রন রশ্মি পর্যাপ্ত গতিশক্তিসম্পন্ন হতো, তখন সেটি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করা হতো। এই যন্ত্রের দুটি গাইডিং টিউব ছিল। একটি টিউবে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ছিল টাংস্টেন। যখন উচ্চ গতির ইলেকট্রন রশ্মি এটিকে আঘাত করত, তখন এক্স-রে উৎপাদিত হতো।
হ্যানয় দুর্ঘটনার কল্পিত দৃশ্য১৯৯২ সালের ১৭ নভেম্বর দুপুরের দিকে একদল গবেষক সেখানে আসেন। সেই দলটির প্রধান ছিলেন স্বয়ং ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। তাঁদের গবেষণার লক্ষ্য ছিল, কণা ত্বরক যন্ত্রের সাহায্যে উচ্চ শক্তির এক্স-রে উৎপাদন করে তা স্বর্ণের আকরিকের নমুনার ওপর আপতিত করে দেখা।
পরিচালক সাহেব নিজেই তাঁর দুজন সহকারীসহ কণা ত্বরক যন্ত্রের কক্ষে ঢুকলেন। তিনি নিজেই সোনার আকরিকের নমুনাটিকে যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করলেন। এরপর তাঁরা কণা ত্বরক যন্ত্রের কক্ষ থেকে বের হয়ে মূল নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দিকে রওনা দিলেন। কিন্তু করিডরের মাঝামাঝি এসে পরিচালক তাঁর একজন সহকারীকে বললেন হাত ধোয়ার সাবান আনতে। সহকারী সাবান আনতে গেলেন, আর পরিচালক সাহেব হাঁটা শুরু করলেন বেসিনের দিকে।
যদি পারমাণবিক হামলা হয়…১৯৯১ সালে এসে প্রথম কণা ত্বরক যন্ত্রটি বিকল হয়ে যায়। তাই সব গবেষণা এম-১৭ মাইক্রোটন দিয়েই পরিচালিত হতো। এই যন্ত্রে বৃত্তাকার পথে ইলেকট্রন রশ্মিকে ত্বরান্বিত করা হতো।
এদিকে সহকারী সাবান আনতে গিয়ে মূল নিয়ন্ত্রণ কক্ষের অপারেটরকে জানিয়ে এলেন, পরীক্ষা পরিচালনা করার জন্য যন্ত্র প্রস্তুত, চাইলেই শুরু করা যেতে পারে। অন্যদিকে পরিচালক সাহেব বেসিনের দিকে না গিয়ে কী মনে করে আবার কণা ত্বরক যন্ত্রের কক্ষে প্রবেশ করলেন। একটু আগেই যথাস্থানে রেখে যাওয়া আকরিকের নমুনাটিকে তিনি আরেকটু নাড়াচাড়া করে আরও ভালোভাবে রাখতে চাচ্ছিলেন।
দুর্ভাগ্যবশত এরই মধ্যে অপারেটর যন্ত্র চালু করে দেন। সাবান নিয়ে ফিরে এসে সহকারী বেসিনের কাছে পরিচালককে দেখতে পেলেন না। তিনি চিৎকার করে ডাকলেন, কিন্তু কোনো সাড়া পেলেন না। দৌড়ে কণা ত্বরক যন্ত্রের কক্ষের কাছে গিয়ে দেখলেন কক্ষের দরজা খোলা। সহকারী চিৎকার করে পরিচালক সাহেবের নাম ধরে ডাকলেন, কিন্তু তিনি শুনতে পেলেন না। কারণ, কক্ষের ভেতরে জেনারেটর চলছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র চলছে, কুলিং সিস্টেম চলছে। এত কিছুর আওয়াজে বাইরের চিৎকার কানে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
সোনার নমুনার স্থান হাত দিয়ে ঠিক করছেন পরিচালকউপায় না পেয়ে সহকারী দৌড়ে মূল নিয়ন্ত্রণকক্ষে গেলেন, অপারেটরকে জরুরি ভিত্তিতে যন্ত্র বন্ধ করতে বললেন। ততক্ষণে যন্ত্রটি ২ থেকে ৪ মিনিট চলেছে। যন্ত্র বন্ধ করে তড়িঘড়ি মূল নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে দুজন ছুটে গেলেন কণা ত্বরক যন্ত্রের দিকে। গিয়ে দেখেন, পরিচালক সাহেব তখনো নমুনার স্থান ঠিক করায় মগ্ন! পরিচালক সাহেব তখনো বুঝতে পারেননি কী হয়েছে; তিনি বেশ শান্ত ভঙ্গিতেই হাত ধোয়ার জন্য কক্ষ থেকে বের হলেন। তারপর তাঁকে জানানো হলো যে তিনি যখন কক্ষের ভেতরে ছিলেন, তখন কিছুক্ষণের জন্য যন্ত্রটি চালু ছিল। শুনে তিনি কিছুক্ষণ বেশ চুপচাপ রইলেন। বিকিরণ পরীক্ষা করে দেখলেন, তাঁর হাত থেকে ৫১১ কিলো ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তির গামা রশ্মি নির্গত হচ্ছে।
রেডিয়াম কেন বিপজ্জনক ধাতুদৌড়ে কণা ত্বরক যন্ত্রের কক্ষের কাছে গিয়ে দেখলেন কক্ষের দরজা খোলা। সহকারী চিৎকার করে পরিচালক সাহেবের নাম ধরে ডাকলেন, কিন্তু তিনি শুনতে পেলেন না।
তিনি নিশ্চিত হলেন যে তাঁর হাত আসলে বিকিরিত হয়েছে, কিন্তু তখনো তিনি জানতেন না বিকিরণের মাত্রা কতটা গুরুতর। কিছুক্ষণ পর তিনি আবারও নিজ হাতের বিকিরণ পরীক্ষা করলেন, এবার আগের মতো বিকিরণ পেলেন না। তিনি ধরেই নিলেন সবকিছু স্বাভাবিক।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইনস্টিটিউটের সবাই জেনে গেল দুর্ঘটনার ব্যাপারে, কিন্তু কেউই কোনো পদক্ষেপ নিল না। সেদিন সন্ধ্যায় তিনি তাঁর হাতে অদ্ভুত অনুভূতি টের পেলেন, কিন্তু তখনো তিনি বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, আর্থ্রাইটিসের জন্য এমন হচ্ছে। এরপর আট দিন তিনি কোনো সমস্যা ছাড়াই নিয়মিত কাজে যান। দশম দিনে এসে তাঁর হাত ফুলে যায় এবং তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসার শুরুতে বিকিরণ দুর্ঘটনার বিষয়টিকে সেভাবে বিবেচনায় আনা হয়নি। প্রায় দুই সপ্তাহের বেশি সময় পর, যখন ক্ষতের অবস্থা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করল, তখন বিকিরণের বিষয়টি বিবেচনায় আনা হয়।
পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ফ্রান্সের প্যারিসেও নেওয়া হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর একটি পুরো হাত এবং অন্য হাতের সব কটি আঙুল কেটে বাদ দিতে হয়। প্রায় দুই বছর চিকিৎসা শেষে ১৯৯৪ সালে তিনি আবার হ্যানয়ে ফিরে আসেন।
রেডিয়াম কেন বিপজ্জনক ধাতুবিজ্ঞানী মেরি কুরি ছিলেন রেডিয়ামের আবিষ্কারক। তাঁর এই আবিষ্কারই শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়েছিল।
শিশু-কিশোরদের একটা বড় অংশের মুগ্ধতা আছে কমিকস, সুপারহিরো এবং সুপার পাওয়ার শক্তি নিয়ে। সুপারহিরোরা কীভাবে সুপার পাওয়ার পেল, সেসব নিছকই কল্পকাহিনি হলেও অনেকের কাছেই এটি কৌতূহল-উদ্দীপক। সম্ভবত এই কৌতূহল থেকেই ২০২৩ সালে জনৈক ১৫ বছর বয়সী ভারতীয় কিশোর থার্মোমিটার ভেঙে পারদ নিয়ে নিজের শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করায় এবং সেই সঙ্গে স্বেচ্ছায় মাকড়সার কামড়ও খায়। তার উদ্দেশ্য ছিল স্পাইডার-ম্যান এবং এক্স-ম্যান চরিত্রের মার্কিউরির মতো অতিপ্রাকৃতিক শক্তি অর্জন করা। কিন্তু অনিরাময়যোগ্য আলসার ছাড়া আর কিছুই সে পায়নি।
পারদের মতো ভারী ধাতু বা কোনো অজানা রাসায়নিক কিংবা কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ সব সময়ই বিপজ্জনক। যদিও এসব বিপজ্জনক জিনিসের ব্যবহার বা গবেষণা মানবকল্যাণের জন্যই করা হয় এবং যাঁরা এসব নিয়ে কাজ করেন, তাঁরা সব সময়ই পেশাগত নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কেউ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কাজ করতে না পারলে মানবকল্যাণ করতে গিয়ে উল্টো নিজের বিপদই ডেকে আনেন। যেমন বিজ্ঞানী মেরি কুরি ছিলেন রেডিয়ামের আবিষ্কারক। তাঁর এই আবিষ্কারই শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। যেখানে অনিরাপদভাবে কাজ করাই মারাত্মক, সেখানে ল্যাব দুর্ঘটনায় কারও জীবন বিপন্ন হোক বা না হোক, এসব দুর্ঘটনায় নিশ্চিতভাবেই কোনো সুপারহিরোর জন্ম হবে না। তেজস্ক্রিয়তা বা উচ্চ শক্তির গবেষণাক্ষেত্রে তাই নিরাপত্তার গুরুত্বই সর্বোচ্চ।
লেখক: উপ-সহকারী ব্যবস্থাপক, নিউক্লিয়ার পাওয়ারপ্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডসূত্র: রিসার্চগেট, আইএইএ টেকডক এবং ল্যাডবাইবেলতেজস্ক্রিয়তা ও কুরি দম্পতির কারিকুরি