যশোরে হাটের ঝুঁকি এড়িয়ে বাড়িতেই কোরবানির পশু বিক্রি, স্বস্তিতে ক্রেতা–বিক্রেতা

· Prothom Alo

যশোর সদর উপজেলার বলাডাঙ্গা গ্রামের একরাম আলী খাঁ কোরবানির ঈদ সামনে রেখে তিনটি গরু লালনপালন করেছেন। দুটি গরু ইতিমধ্যে বাড়ি থেকে বিক্রি হয়ে গেছে। অপর গরুটিও ঈদের আগে বাড়ি থেকেই বিক্রি হয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদী।

একরাম আলীর মতো এই গ্রামের শিউলি বেগমের একমাত্র গরুটি কেনার জন্য প্রতিদিন বাড়িতে ক্রেতাদের ভিড় জমছে। শুধু বলাডাঙ্গা নয়, পাশের শ্রীকণ্ঠনগর, মোবারককাঠি ও কাজিপুর গ্রামের কোনো খামারির গরু অন্তত পাঁচ বছর ধরে পশুর হাটে তোলা হয় না। বাড়ি থেকেই ক্রেতারা তাঁদের গরু কিনে নিচ্ছেন। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই লাভবান হচ্ছেন।

Visit tr-sport.click for more information.

গরু-ছাগল হাটে তোলার ঝামেলা ও ঝুঁকি দুটোই আছে। হাটে তোলার পর অন্যান্য পশুর সংস্পর্শে রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। তা ছাড়া একটা এঁড়ে গরু বাজারে নিতে কমপক্ষে তিনজন মানুষ লাগে। গোয়াল থেকে বের করা বেশ ঝামেলাপূর্ণ কাজ বলে উদ্যোক্তারা মনে করেন। অপর দিকে ক্রেতারা গরুটি কিনে ওই বাড়িতেই রেখে আসেন। কোরবানির ঈদের আগের দিন তাঁরা গরুটি নিয়ে আসেন। এতে ওই গরু রক্ষণাবেক্ষণের বাড়তি ঝামেলা তাঁদের থাকে না। এ কারণে ক্রেতারাও বাড়ি থেকে গরু কিনতে বেশি আগ্রহী।

গত মঙ্গলবার বিকেলে বলাডাঙ্গা গ্রামে একরাম আলী খাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনজনের একটি দলের সঙ্গে গরুর দাম নিয়ে দর–কষাকষি করছেন তিনি।

গরুর পরিচর্যা করছেন উদ্যোক্তা শিউলি বেগম। মঙ্গলবার বিকেলে যশোর সদর উপজেলার শ্রীকণ্ঠনগর গ্রামে

একরাম আলী বলেন, ‘এ বছর কোরবানির ঈদের আগেই বিক্রির জন্য তিনটি গরু লালনপালন করেছি। এর মধ্যে ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকায় ২টি গরু বিক্রি করেছি। যাঁরা গরু দুটি কিনেছেন, তাঁরা ঈদের আগের দিন গরু নেবেন। আমার খামারেই কিনে রেখে গেছেন। আরেকটি গরু কেনার জন্য প্রতিদিন অনেক ক্রেতা বাড়িতে আসছেন। আশা করছি, ঈদের আগে সেটিও বিক্রি হয়ে যাবে।’ তিনি জানান, এ বছর মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি। তিনি পাঁচ বছর ধরে কোরবানির ঈদে বিক্রির জন্য গরু লালনপালন করেন। কোনো বছর তিনি গরু বিক্রির জন্য হাটে তোলেননি।

শ্রীকণ্ঠনগর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, আবদুস সালাম গরুর খামারে কাজ করছেন। তিনি ও তাঁর ভাই আবুল কালাম এ বছর কোরবানির আগে বিক্রির জন্য তিনটি গরু বড় করেছেন।

আবদুস সালাম বলেন, ‘আমাদের দুই ভাইয়ের তিনটি গরুর মধ্যে দুটি বিক্রি হয়ে গেছে। একটি গরু বাকি আছে। আরও তিনজন ক্রেতা সেটির দাম বলে গেছেন। আশা করছি, ঈদের আগেই সেটা বিক্রি হয়ে যাবে।’

একই গ্রামের উদ্যোক্তা শিউলি বেগম বলেন, ‘তিন বছর ধরে একটা গরু লালনপালন করছি। ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকায় বিক্রির জন্য গরুটি রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে তিনজন ক্রেতা বাড়িতে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা গরুটির দাম বলে গেছেন। আমরা গরু কখনো হাটে তুলি না। বাড়ি থেকে বিক্রি হয়ে যায়।’

এ বছর গরু বিক্রি করে কেমন লাভ হচ্ছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে উদ্যোক্তা শিউলি বেগম বলেন, ‘নিজেদের পরিবারে গরু রেখে খাওয়ানো ও দেখাশোনা করি। লাভ-লোকসান তেমন বুঝতে পারি না। গরুটা আমাদের পরিবারের সদস্যের মতো হয়ে গেছে। গরু বিক্রি করতে খুব মায়া হয়।’

আবদুস সালাম খামারে তাঁর গরুর পরিচর্যা করছেন। মঙ্গলবার বিকেলে যশোর সদর উপজেলার শ্রীকণ্ঠনগর গ্রামে

বলাডাঙ্গা গ্রামে গরু কিনতে আসা তিনজনের দলের একজন ক্রেতা বলেন, ‘এই গ্রামে গরু কিনতে আজ তৃতীয় দিন এলাম। এর আগে দুই দিন এসে দাম বলে গেছি। সামনে আরও কয়েক দিন সময় পাব। তবে ঈদের আগেই একটা গরু কিনে ফেলব। গরুটি খামারেই রেখে দেওয়া যায়। এতে ঈদের আগের কয় দিন গরু লালনপালনের ঝামেলা থাকে না। এ জন্য আমরা হাটের চেয়ে খামারির বাড়ি থেকে গরু কিনতে বেশি আগ্রহী।’

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর যশোর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর যশোর জেলায় কোরবানিযোগ্য গরু রয়েছে ৩৬ হাজার এবং ছাগল রয়েছে ৮১ হাজার। যশোরে ছাগল ও গরু মিলিয়ে চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ২ হাজারের মতো। সেখানে এই জেলায় উদ্বৃত্ত রয়েছে।

বাড়ি থেকে গরু–ছাগল কেনাবেচার বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. সিদ্দিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাটে না তুলে বাড়ি থেকে গরু-ছাগল কেনাবেচার বিষয়ে আমরা খামারিদের উদ্বুদ্ধ করি। গরু-ছাগল হাটে তোলার পর অন্যান্য পশুর সঙ্গে মিশে কোনো না কোনো জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। দেখা যায়, দু–এক দিন পরেই হাট থেকে ফেরা ওই গরু বা ছাগলটি রোগাক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া খামারের অন্যান্য গরু–ছাগলও সংক্রমিত হয়। এ জন্য গরু–ছাগল হাটে না তোলার জন্য আমরা বেশি উদ্বুদ্ধ করি। এখন হাটের তুলনায় বাড়ি থেকেই গরু–ছাগল বেচাকেনা বেশি হচ্ছে।’

Read full story at source