স্কুল থেকে ফিরে মাত্র দরজায় পা দিয়েছ। ড্রয়িংরুম পেরোতেই হঠাৎ নাকে এল দারুণ সুবাস। মায়ের হাতের গরম–গরম বিরিয়ানি! নিমেষেই মুখের ভেতর পানি চলে এল, মনটা ভরে উঠল খুশিতে। আবার ধরো, পরদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ রাস্তার ধারের ডাস্টবিনের পচা গন্ধ নাকে এল, সঙ্গে সঙ্গে তোমার মুখ বিকৃত হয়ে গেল। তারপর সেখান থেকে দুই আঙুলে নাক চেপে দৌড়ে পালালে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছ, এই যে একই নাক দিয়ে তুমি গন্ধ নিচ্ছ, তোমার মস্তিষ্ক কীভাবে বুঝতে পারে কোনটা ভালো গন্ধ আর কোনটা খারাপ?
Visit newsbetting.club for more information.
নাক তো শুধু একটা পথ, আসল জাদুকর তো আমাদের মস্তিষ্ক। চলো, আজ জেনে নিই আমাদের মাথা কীভাবে সুগন্ধ ও দুর্গন্ধের পার্থক্য ধরতে পারে।
গন্ধের যাত্রা শুরু যেভাবে
বাতাসে সব সময়ই নানা রকম বস্তুর অতি ক্ষুদ্র অণু ভেসে বেড়ায়। তুমি যখন শ্বাস নাও, তখন বাতাসের সঙ্গে সেই অণুগুলো তোমার নাকের ভেতর ঢুকে পড়ে। আমাদের নাকের ভেতরে মিউকাস নামের একধরনের আঠালো ও ভেজা আস্তরণ থাকে। বাতাসে ভেসে আসা ওই ক্ষুদ্র অণুগুলো নাকের ভেতর ঢুকে প্রথমেই এই মিউকাসের স্তরে গলে যায়।
অণুগুলো গলে যাওয়ার পর সেখানে অপেক্ষায় থাকে একদল খুদে গোয়েন্দা! বিজ্ঞানের ভাষায় এদের বলা হয় অলফ্যাক্টরি রিসেপ্টর। এই গোয়েন্দারা গন্ধের অণুগুলোকে শনাক্ত করে এবং সঙ্গে সঙ্গে বৈদ্যুতিক সংকেত হিসেবে আমাদের মস্তিষ্কে সেই খবর পাঠিয়ে দেয়।
মায়ের রান্না কেন আমাদের এত ভালো লাগেমস্তিষ্কের ভেতরে দুটি রাস্তা
মানুষ বা বনমানুষের মতো প্রাইমেট বর্গের প্রাণীদের ক্ষেত্রে গন্ধের সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছানোর পর দুটি আলাদা রাস্তায় ভাগ হয়ে যায়। এর মধ্যে প্রথম রাস্তাটি চলে যায় মস্তিষ্কের অলফ্যাক্টরি কর্টেক্স নামের একটি অংশে। এই অংশের কাজ হলো গন্ধটিকে চেনা। অর্থাৎ তুমি যে গন্ধটা পাচ্ছ, সেটা কি গোলাপ ফুলের, নাকি পচা ডিমের, সেটা শনাক্ত করে এই অংশ।
তবে আসল কাজটা হয় দ্বিতীয় রাস্তায়! এ রাস্তাটি চলে যায় মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস নামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশে। আমাদের আবেগ, অনুপ্রেরণা ও স্মৃতির মতো দারুণ সব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের এ অংশটি।
ভালো খারাপের বিচারক
তোমার নাকে আসা গন্ধটা কি তোমার ভালো লাগবে, নাকি তুমি সেটাকে চরম বিরক্তিতে প্রত্যাখ্যান করবে, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় হাইপোথ্যালামাস। যেহেতু এই অংশ আমাদের আবেগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তাই কোনো গন্ধ পেলে আমাদের শরীর ও মন সেভাবেই সাড়া দেয়। বিরিয়ানির গন্ধে আমাদের মস্তিষ্ক খুশির সংকেত দেয়, আর পচা গন্ধে মস্তিষ্ক আমাদের সতর্ক করে দূরে সরে যেতে।
তুমি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ, বৃষ্টির পর ভেজা মাটির গন্ধ বা পুরোনো বইয়ের গন্ধ পেলে হঠাৎ পুরোনো কোনো স্মৃতির কথা মনে পড়ে যায়। এর কারণও কিন্তু ওই হাইপোথ্যালামাস! যেহেতু গন্ধের সংকেত সরাসরি মস্তিষ্কের আবেগের ও স্মৃতির কেন্দ্রে গিয়ে আঘাত করে, তাই গন্ধ ও স্মৃতির মধ্যে সব সময়ই একটি গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক থাকে।
শহরের তাপমাত্রা কমাতে গাছের ক্ষমতা আসলে কতটুকুসফেদ বুনো ফুলটির ওপর এসে বসেছে মাছিমানুষের ঘ্রাণশক্তি
কুকুর বা অন্যান্য অনেক প্রাণীর তুলনায় মানুষের ঘ্রাণশক্তি বেশ দুর্বল। কিন্তু তারপরও বেঁচে থাকার জন্য আমাদের ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত জরুরি। বিজ্ঞানীদের পরীক্ষা থেকে জানা গেছে, মাত্র এক দিন বয়সী একটি শিশুও গন্ধের পার্থক্য বুঝতে পারে! এত ছোট একটি শিশুর নাকের কাছে যদি মাছের আঁশটে গন্ধ বা পচা ডিমের দুর্গন্ধ নেওয়া হয়, তবে সে বিরক্তি প্রকাশ করে এবং মুখ বিকৃত করে ফেলে।
আরেকটু বড় শিশুদের ঘ্রাণশক্তি আরও প্রখর হয়। তারা শুধু গন্ধ শুঁকেই নিজের ভাইবোনদের সঙ্গে একই বয়সী অন্য শিশুদের পার্থক্য করতে পারে। একইভাবে একটি ছোট্ট শিশু তার মায়ের গায়ের গন্ধ চিনতে পারে এবং একজন মা–ও গন্ধ শুঁকে নিজের সন্তানকে চিনে নিতে পারেন। এ ঘ্রাণশক্তিই আদিম যুগে মানুষকে পচা বা বিষাক্ত খাবার থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করত।
শুধু মানুষ বা বড় প্রাণীরাই নয়, গন্ধ শোঁকার এই জটিল প্রক্রিয়াটি ছোট্ট প্রাণীদের মধ্যেও আছে। উদাহরণ হিসেবে ফলের মাছির কথা বলা যায়। এই ছোট্ট ও সাধারণ মাছির ঘ্রাণ নেওয়ার পদ্ধতিও বেশ জটিল ও উন্নত। এদের শরীরেও আলাদা দুটি সিস্টেম কাজ করে। একটি সিস্টেম গন্ধ শনাক্ত করে যে জিনিসটা আসলে কী। অন্য সিস্টেমটি বিচার করে, সেই গন্ধ ভালো নাকি খারাপ!
অর্থাৎ আমাদের চারপাশে থাকা এই অদৃশ্য গন্ধগুলো আসলে আমাদের মস্তিষ্ক ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এটা আসলে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের কাজ!
সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস ম্যাগাজিনশরীর থেকে খসে পড়া চামড়া থেকে যেভাবে তৈরি হয় ঘরের ধুলা