রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা যত পড়া যায়, ততই তিনি নতুনভাবে ধরা দেন বলে উল্লেখ করেছেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ এমন এক কালজয়ী সাহিত্যিক, যাঁর রচনা সময়ের ব্যবধানে পাঠকের কাছে নতুন অর্থ ও নতুন উপলব্ধি নিয়ে ফিরে আসে। রবীন্দ্রনাথকে পড়ার কোনো শেষ নেই; প্রতিবার পাঠেই তিনি নতুনভাবে আবিষ্কৃত হন।
Visit turconews.click for more information.
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে সভাপ্রধান হিসেবে বক্তব্য দেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। বাংলা একাডেমির আয়োজনে আজ সোমবার বিকেলে একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে এই সেমিনার হয়। এতে রবীন্দ্র পুরস্কার ২০২৬ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের সঙ্গে তুলনা করলেও রবীন্দ্রনাথের বিশেষত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর সাহিত্য শুধু সৌন্দর্যচেতনা নয়, মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং জীবনের প্রতি অনন্ত অনুরাগের প্রকাশ ঘটিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্যজুড়ে মানুষ ও পৃথিবীর প্রতি সীমাহীন মমত্ববোধ কাজ করেছে বলে উল্লেখ করেন বাংলার অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি বলেন, এই মানবপ্রেমই রবীন্দ্রচেতনার কেন্দ্রীয় শক্তি।
রবীন্দ্রসংগীতের প্রসঙ্গ তুলে বাংলা একাডেমির সভাপতি বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীতের আবেদন আরও বেড়েছে। বক্তব্যে বই পড়ার গুরুত্ব নিয়েও কথা বলেন তিনি। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, প্রযুক্তির বিস্তারে বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ কিছুটা কমলেও সমাজ ও মানুষের চিন্তায় গভীর পরিবর্তন আনতে বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। পাঠকের উচিত ভালো বই খুঁজে নেওয়া এবং গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়া।
রবীন্দ্রনাথ মানুষের মনোজগতে প্রবেশ করেছেন
অনুষ্ঠানে ‘রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্য’ বিষয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন কথাসাহিত্যিক প্রশান্ত মৃধা। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত শক্তি ধরা পড়ে ১৮৯১ থেকে ১৮৯৫ সালের মধ্যে রচিত ছোটগল্পগুলোতে। এই সময় তিনি জমিদারি তদারকির কাজে শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে অবস্থান করেন। নদী, প্রকৃতি ও গ্রামীণ মানুষের জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় তাঁর সাহিত্যচিন্তাকে বদলে দেয়। কলকাতাকেন্দ্রিক অভিজাত জীবনের বাইরে বাংলার সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, বঞ্চনা ও সম্পর্কের জটিলতা তিনি নতুন চোখে দেখতে শুরু করেন।
প্রশান্ত মৃধা বলেন, ‘পোস্টমাস্টার’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘দেনাপাওনা’, ‘শাস্তি’, ‘জীবিত ও মৃত’—একটির পর একটি গল্পে উঠে আসে মানুষের অন্তর্গত বেদনা ও সামাজিক বাস্তবতা। বিশেষ করে নারীর অবস্থান, দারিদ্র্য, নিঃসঙ্গতা ও ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থার চাপ তাঁর গল্পে নতুন মাত্রা পায়।
রবীন্দ্রনাথ শুধু গল্প বলেননি; মানুষের মনোজগতের ভেতরে প্রবেশ করেছেন উল্লেখ করে প্রশান্ত মৃধা বলেন, তাঁর গল্পে বাহ্যিক ঘটনার চেয়ে অন্তর্গত অনুভূতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ কারণেই বাংলা ছোটগল্প আধুনিকতার স্বাদ পায় তাঁর হাতে।
প্রতিবার পাঠে নতুন প্রশ্ন তোলে
প্রশান্ত মৃধা বলেন, রবীন্দ্রনাথ নিজেই একসময় লিখেছিলেন, উপন্যাস কেবল গল্প বলার জন্য নয়; মানুষের ভেতরের জটিল সত্যকে উন্মোচনের জন্যও। তাঁর উপন্যাসে তাই কাহিনির পাশাপাশি চিন্তার গভীরতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্যে ‘ভাষা’ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে উল্লেখ করেন প্রশান্ত মৃধা। তিনি বলেন, প্রতিটি গল্পে তিনি ভিন্ন ভিন্ন গদ্যভঙ্গি ব্যবহার করেছেন। কখনো কবিতার মতো মৃদু, কখনো তীক্ষ্ণ ও সংক্ষিপ্ত, আবার কখনো দার্শনিক ভাবনায় পূর্ণ। বাংলা গদ্যের বিবর্তনে এই বৈচিত্র্য এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করে।
প্রশান্ত মৃধা বলেন, রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে পড়ার প্রয়োজন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। কারণ তাঁর গল্প ও উপন্যাস প্রতিবার পাঠে নতুন অর্থ তৈরি করে, নতুন প্রশ্ন তোলে এবং পাঠককে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
শিল্পী বুলবুল ইসলামের হাতে রবীন্দ্র পুরস্কার তুলে দিচ্ছেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। আজ সোমবার বিকেলে একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনেরবীন্দ্রনাথ বাংলা গদ্য নিজস্ব শক্তিতে নির্মাণ করেছেন
আলোচনায় কথাসাহিত্যিক নাসিমা আনিস বলেন, রবীন্দ্রনাথকে শুধু কবি হিসেবে দেখলে তাঁর সাহিত্যিক ব্যাপ্তিকে ছোট করে দেখা হয়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ‘ভিখারিনী’ গল্প ও ‘করুণা’ উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে তিনি যে অসামান্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে তা আরও গভীরতা পায় শিলাইদহ, পতিসর ও শাহজাদপুরের জীবনাভিজ্ঞতায়। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষা ও গদ্যকে নিজস্ব শক্তিতে নির্মাণ করেছেন।
আরেক আলোচক কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক রায়হান রাইন বলেন, ঔপনিবেশিক শাসন, জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় পুনরুজ্জীবন, রেনেসাঁ-চেতনা ও বাউল-সুফি ভাবধারার বহুস্বর রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে পাশাপাশি উপস্থিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের কাছে ‘সত্য’ কোনো বিচ্ছিন্ন তথ্য নয়; বরং বহু অভিজ্ঞতা ও চরিত্রের সম্মিলনে অর্জিত এক সামগ্রিক উপলব্ধি। এ কারণেই তাঁর উপন্যাসে ব্যক্তি, সমাজ ও দর্শনের সম্পর্ক এক গভীর মানবিক বোধে রূপ নেয়।
‘রবীন্দ্রচর্চা প্রায়ই অযৌক্তিক বিরোধিতার মধ্যে আটকে পড়ে’
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম বলেন, বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা প্রায়ই অন্ধ ভক্তি ও অযৌক্তিক বিরোধিতার মধ্যে আটকে পড়ে; অথচ প্রয়োজন ছিল নতুন সময়ের আলোকে রবীন্দ্রনাথকে নতুনভাবে পাঠ ও বিশ্লেষণ করা। তিনি বলেন, ‘আমরা যতটা ভক্তি করেছি, যতটা বিরোধিতা করেছি, ততটা ভালো বিশ্লেষণ তৈরি করতে পারিনি।’
রবীন্দ্র পুরস্কার ২০২৬
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য, সাহিত্যের সমালোচনা কিংবা অনুবাদে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে রবীন্দ্র পুরস্কার দেয় বাংলা একাডেমি। এবার রবীন্দ্রসংগীতচর্চায় শিল্পী বুলবুল ইসলাম ও রবীন্দ্রসাহিত্যের গবেষণার জন্য অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ এ পুরস্কার পেয়েছেন। অনুষ্ঠানে তাঁদের হাতে পুরস্কার, সনদ ও সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। এরপর অনুষ্ঠানে অনুভূতি ব্যক্ত করেন তাঁরা।
আলোচনা শেষে অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী লাইসা আহমদ লিসা ও ফারহিন খান জয়িতা; আবৃত্তি করেন শিল্পী নাসিম আহমেদ।
