গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে গুলি চালিয়ে দুজনকে হত্যা করেন ফিনিক্স আইকনার। এ ঘটনায় আরও ছয়জন আহত হন। নিজের ক্যাম্পাসে গিয়ে গুলি চালানোর আগে আইকনার একজনের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।
তবে যার সঙ্গে আইকনার কথা বলেছিলেন, সে তাঁর বন্ধু নয়, বাবা–মা নয় বা এমন কেউ নয়, যে বা যারা তাঁকে এই কাজ করা থেকে বিরত রাখতে পারত। ২০ বছর বয়সী আইকনার কথা বলেছিলেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) চ্যাটবট চ্যাটজিপিটির সঙ্গে।
Visit mchezo.life for more information.
সম্প্রতি ফ্লোরিডায় আরও একটি ঘটনায় চ্যাটজিপিটির নাম উঠে এসেছে। গত মাসে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের টাম্পা বে এলাকায় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী নিখোঁজ হন। পরে তাঁদের ক্ষতবিক্ষত ও টুকরা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
দুজনের সন্দেহভাজন খুনি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টির আরেক সাবেক শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর নাম হিশাম আবুঘরবেহ। তিনি খুন হওয়া পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের রুমমেট ছিলেন। খুন হওয়া অন্য শিক্ষার্থীর নাম নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি।
তদন্ত কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার আগে সন্দেহভাজন খুনি আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটির কাছে মরদেহ আবর্জনা ফেলার কালো রঙের পলিথিনে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার উপায় নিয়ে নানা প্রশ্ন করেছিলেন। চ্যাটজিপিটির কাছে আবুঘরবেহর এসব প্রশ্নের সূত্র ধরেই পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করেছে।
ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির ঘটনায় ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল যেসব তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছেন, সে অনুযায়ী, শিক্ষার্থী আইকনার এআইভিত্তিক চ্যাটবট চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—তাঁর হামলার জন্য কোন অস্ত্র ও গুলি সবচেয়ে উপযুক্ত হবে এবং কখন ও কোথায় তিনি সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটাতে পারবেন।
চ্যাটজিপিটি আইকনারের এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তারা।
এখন অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমিয়ার জানতে চান, এসব কারণে ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ করা যায় কি না।
উথমিয়ার বলেন, ‘যদি স্ক্রিনের অন্যপাশে থাকা জিনিসটি একজন মানুষ হতেন, তাহলে আমরা তাঁর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ দায়ের করতাম।’
এরপর তিনি চ্যাটজিপিটি নির্মাতা কোম্পানি ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি তদন্তের ঘোষণা দেন। সেই সঙ্গে কোম্পানিটি বা এর কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার দ্বারও উন্মুক্ত রাখেন।
অপরাধমূলক পণ্য
যুক্তরাষ্ট্রের আইনে কোনো প্রতিষ্ঠান বা করপোরেশনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চালানো সম্ভব। যদিও তুলনামূলকভাবে এমনটা খুব বেশি দেখা যায় না।
গত মাসের শেষ দিকে, ‘ওপিওয়েড’ সংকট উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকার অভিযোগে ফৌজদারি মামলায় পারডিউ ফার্মাকে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি জরিমানা ও শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছে।
শক্তিশালী ব্যথানাশক ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং এর ওপর আসক্ত হয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রে একটি বড় আকারের সামাজিক সংকট হয়ে উঠেছে। ফলে ওষুধের ‘ওভারডোজ’–এর কারণে মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে। একে সংক্ষেপে ‘ওপিওয়েড’ সংকট বলা হচ্ছে।
এ ছাড়া ফক্সভাগেনকে অতীতে তাদের নির্গমন পরীক্ষায় প্রতারণার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, ফাইজারকে তাদের প্রদাহনাশক ওষুধ বেক্সট্রার প্রচারের জন্য এবং এক্সনকে আলাস্কায় তেল ছড়ানোর ঘটনায় দায়ী করা হয়েছিল।
কিন্তু এসব ঘটনার পেছনে মানুষ ছিল এবং মানুষই নিয়ম না মানা বা নিয়ম এড়িয়ে যাওয়ার এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন।
আইকনারের ঘটনাটি এগুলোর থেকে ভিন্ন এবং এই ভিন্নতাই এটিকে আইনগতভাবে অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
এ নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ইউটাহ-এর আইন বিষয়ের অধ্যাপক ম্যাথিউ টোকসন বলেন, ‘সর্বোপরি এটি এমন একটি পণ্য, যা এই অপরাধকে উৎসাহিত করেছে এবং অপরাধমূলক কাজ সম্পাদনে ভূমিকা রেখেছে। এসব কারণে এই মামলাকে নজিরবিহীন এবং এতটা জটিল করে তুলেছে।’
আইনবিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে সম্ভাব্য দুটি অভিযোগ হতে পারে অবহেলা অথবা বেপরোয়াভাব—যার মধ্যে শেষটির অর্থ হলো জানা ঝুঁকিকে বা নিরাপত্তা দায়িত্বকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা।
লিমন–বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার আগে চ্যাটজিপিটির কাছে কী কী জানতে চেয়েছিলেন সন্দেহভাজন খুনিএ ধরনের অভিযোগ সাধারণত গুরুতর অপরাধ না হয়ে তুলনামূলক হালকা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, যার ফলে দোষী সাব্যস্ত হলে শাস্তিও তুলনামূলক কম হয়।
এদিকে এসব অভিযোগ নিয়ে ওপেনএআই বলেছে, চ্যাটজিপিটি এই হামলার জন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়।
কোম্পানিটি বলেছে, ‘আমরা আমাদের সুরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি, যাতে ক্ষতিকর উদ্দেশ্য শনাক্ত করা যায়, অপব্যবহার সীমিত করা যায় এবং নিরাপত্তাঝুঁকি দেখা দিলে যথাযথভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো যায়।’
লিমন-বৃষ্টি হত্যাকাণ্ড কীভাবে ঘটল, উঠে এল তদন্তকারীদের বর্ণনায়