বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা সম্ভাবনাময় তরুণদের নিয়ে প্রতি বৈশাখেই বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দেও ক্রীড়া, অভিনয়, সংগীত, ব্যবসা, গবেষণায় অগ্রগামী ৭ তরুণকে নিয়ে হাজির হয়েছে। এখানে পড়ুন তরুণ উদ্যোক্তা মীর মেহেদীর গল্প।
মীর মেহেদী তখন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়েন। পড়াশোনার পাশাপাশি গ্রামীণফোনের কলসেন্টারে খণ্ডকালীন চাকরি আর টিউশনি করেন। আয়রোজগারও খারাপ না। কিছু টাকা জমিয়েও ফেলেন। এরপর ২০১৫–১৬ সালের দিকে চার বন্ধু মিলে মিরপুর ৭-এ চালু করেন ‘কফি এক্সপ্রেস’। ছোট্ট রেস্তোরাঁটিতে কফির পাশাপাশি বার্গারসহ বিভিন্ন ফাস্ট ফুডও বিক্রি করতেন তাঁরা। অল্প সময়ের মধ্যে ফুড ব্লগারদের কল্যাণে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে তাদের ‘নাগা বার্গার’। প্রথম মাসেই লাভ হয় প্রায় ছয় লাখ টাকা।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
কিন্তু এ সাফল্যই হয়ে ওঠে প্রথম ধাক্কার কারণ। ‘জীবনে টাকা যেমন স্বস্তি আনে, তেমনি অশান্তিরও কারণ—ব্যবসার প্রথম মাসে অপ্রত্যাশিত লাভের পর সেটি টের পেলাম। ছয় লাখ টাকা লাভের পর বন্ধুদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিল। কে বেশি সময় দেবে, কে কত টাকা পাবে—এসব নিয়ে ঝামেলা। একপর্যায়ে নিজেকে প্রতারিত মনে হওয়ায় সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম,’ প্রথম ব্যবসা উদ্যোগ নিয়ে বলছিলেন মেহেদী।
তত দিনে মেহেদীর মধ্যে ব্যবসার নেশা চেপে বসেছে। নতুন করে শুরু করেন ‘প্যারি পাস্তা’। মিরপুর ২-এ এই নতুন উদ্যোগে তাঁর অংশীদার বাবা আর ফুফা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া আগের যোগাযোগ কাজে লাগান তিনি। প্রথম দিনেই বিক্রি হয় ৯ হাজার টাকা, আর চার দিনের মাথায় অর্ধলাখ ছাড়িয়ে যায়। ব্যবসা দ্রুত বাড়তে থাকে। কিন্তু মতপার্থক্য হওয়ায় ২০১৭ সালে সেখান থেকেও সরে দাঁড়ান মেহেদী।
এরপরই আসে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ‘পিৎজাবার্গ’। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে মিরপুর ২-এ, প্যারি পাস্তার ওপর তলায় বাবাকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেন নতুন এই ব্র্যান্ড। প্রাথমিক বিনিয়োগ ছিল ৩৩ লাখ টাকা, যার মধ্যে ১৮ লাখই ধার। মাত্র চার মাসের মাথায় ব্যবসাটি লাভজনক হয়ে ওঠে।
মীর মেহেদীকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মিরপুরের একটি আউটলেট থেকে শুরু করে এখন ঢাকায় ১২টি আর ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রাজশাহী, ফেনী, খুলনা, ময়মনসিংহ, বরিশাল ও নোয়াখালীতে মোট ২২টি আউটলেটে বিস্তৃত হয়েছে পিৎজাবার্গ। এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন প্রায় এক হাজার মানুষ, যাঁদের বড় একটি অংশই তরুণ ও শিক্ষার্থী। প্রতিদিন বিক্রি হয় চার হাজারের বেশি পিৎজা, সঙ্গে রয়েছে বার্গারসহ অন্যান্য খাবার।
তরুণ উদ্যোক্তা মীর মেহেদীমজার বিষয় হলো, রেস্তোরাঁ ব্যবসায় আসার পেছনে মেহেদীর কোনো বিশেষ দক্ষতা বা আগ্রহ ছিল না। তিনি নিজেই বলেন, ‘আমি জীবনে কোনো দিন ভাতও রান্না করিনি। যে সময় ব্যবসা শুরু করি, তখন রেস্তোরাঁ ব্যবসাই ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। অন্য কিছু জনপ্রিয় থাকলে হয়তো সেটাই করতাম।’
প্রতিটি ব্যবসারই একটা মোড় বদলের সময় থাকে, আপনার কোনটা? এক কথায় মীর মেহেদীর জবাব, ‘কোভিডই ছিল আমাদের টার্নিং পয়েন্ট।’ করোনাকালে যখন অধিকাংশ ব্যবসা ধুঁকছিল, রেস্টুরেন্টগুলো বন্ধ হওয়ার দশা হয়েছিল, তখনই পিৎজাবার্গ খুঁজে নেয় ভিন্ন পথ। সামাজিক মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে তারা ঘোষণা করে অভিনব এক উদ্যোগ—ঘরে থাকা নির্ধারিতসংখ্যক মানুষকে প্রতিদিন বিনা মূল্যে পিৎজা খাওয়ানো হবে।
এই অফারে সাড়া পড়ে যায় ব্যাপক। আগ্রহ দেখায় লাখ লাখ মানুষ। সেখান থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক গ্রাহককে বেছে নিয়ে তাঁদের বাসায় বিনা মূল্যে পৌঁছে দেওয়া হয় পিৎজা। আর যাঁরা সুযোগ পাননি, তাঁরাও অর্ডার করতে শুরু করেন। চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে পরিস্থিতি সামাল দিতে চালু করতে হয় একাধিক ক্লাউড কিচেন। সেই কঠিন সময়টাকেই সুযোগে পরিণত করে নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছে যায় পিৎজাবার্গ।
মেহেদীর কাছে ব্যবসার মূল শক্তি একটাই, গ্রাহক। শুরু থেকেই গ্রাহকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরিতে গুরুত্ব দিয়েছেন। জন্মদিনে শুভেচ্ছা পাঠানো থেকে শুরু করে নিয়মিত ফিডব্যাক নেওয়া, সবকিছুতেই তিনি সচেতন। এখন ব্যবসা বড় হওয়ায় নিজে সব সামলাতে পারেন না, তাই গড়ে তুলেছেন বড়সড় এক পিআর টিম, তারাই সরাসরি গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এবং অভিজ্ঞতা উন্নত করার কাজ করে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর স্বপ্নও বড়, একদিন নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে ‘পিৎজাবার্গ’-এর আউটলেট খুলতে চান। পিৎজাবার্গের প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা ও প্রধান নির্বাহী মীর মেহেদী বলেন, ‘আমার কাছে ব্যবসাটা একটা নেশা। আর যে আয় হয়, সেটি নেশার বাই প্রোডাক্ট। আমি বিশ্বাস করি, যে কাজই করি না কেন, সেটি যদি পূর্ণ মনোযোগ, ভালো লাগা ও ভালোবাসা থেকে করি, তাহলে সফলতা আসবেই।’
পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরন কমে গেলে যেসব সমস্যা হতে পারে