কবি, গীতিকার, সুরকার, গায়ক, গল্পকার, নাট্যকার, চিন্তাবিদ ইত্যাদি নানান পরিচয়ের বাইরে চিত্রকর হিসেবেও যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি পরিচিতি রয়েছে, তা আমাদের অজানা নয়। তবে এটি নিয়ে এখনো আমাদের অনেকের মধ্যে কিঞ্চিৎ অস্বস্তি রয়ে গেছে।
Visit biznow.biz for more information.
এর বাস্তব কিছু কারণও রয়েছে বৈকি। মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সংস্কৃতিপ্রেমী বাঙালি সাধারণত সাহিত্য পাঠ করে, গান শোনে, নাটক-চলচ্চিত্রেও একটু-আধটু ঢুঁ মারে; তবে চিত্র-ভাস্কর্যের প্রদর্শনীতে তার আগ্রহ তেমন দেখা যায় না। আধুনিক কালের দৃশ্যকলা তার কাছে অনেকটাই দুর্বোধ্য বা অবোধ্য। ফলে এর প্রতি বিরূপতাও তাকে খানিকটা অনাগ্রহী করে তোলে। যেহেতু চিত্র বা ভাস্কর্যের ভাষা উপলব্ধির কোনো ব্যবস্থা আমাদের শিক্ষালয়গুলোতে নেই, নেই জাদুঘর বা প্রদর্শনী দেখার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, ফলে শিল্পকর্ম দেখার বা অনুধাবনের কোনো প্রশিক্ষণ আমাদের হয়ে ওঠে না। আমরা চিত্রে বা ভাস্কর্যে সদৃশ রূপ দেখতেই আগ্রহী। বিগত এক-দেড় শ বছরে শিল্পের জগতে যে বড়সড় রূপান্তর ঘটে গেছে, তা আমাদের বোধের বাইরে রয়ে গেছে।
সাহিত্যসৃষ্টি এবং চিন্তা ও দর্শনের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঐতিহ্য ও পরম্পরাকে স্বীকার করেই অগ্রসর হয়েছেন। কিন্তু তাঁর ছবির ক্ষেত্রে তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে ঐতিহ্যবিমুখ।
রবীন্দ্রনাথ ছবি আঁকতে শুরু করেছেন আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে, তাঁর ৬৫ বছর বয়সে। তারও ৫০ বছর আগে থেকে চিত্র-ভাস্কর্যের জগৎ নানাভাবে বদলে যেতে শুরু করে। বিশেষ করে আলোকচিত্র আবিষ্কারের পর বাস্তবের হুবহু প্রতিরূপ নির্মাণ আর দৃশ্যকলার আকাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য হয়ে রইল না, বরং বাস্তবকে পেরিয়ে যাওয়া অনুভব, অভিব্যক্তি ও চিন্তনের নানা প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠল।
সাহিত্যসৃষ্টি এবং চিন্তা ও দর্শনের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঐতিহ্য ও পরম্পরাকে স্বীকার করেই অগ্রসর হয়েছেন। কিন্তু তাঁর ছবির ক্ষেত্রে তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে ঐতিহ্যবিমুখ। এ দেশের সমৃদ্ধ শিল্প-পরম্পরা থেকে তিনি কিছুই গ্রহণ করেননি। আবার পশ্চিমের যে ত্রিমাত্রিক স্পর্শযোগ্য বাস্তবতা আমাদের কাছে আদরণীয়, তার থেকেও অনেক দূরে তাঁর চিত্রকর্ম। রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মে কোনো অনুপ্রেরণা বা প্রভাবের খোঁজ যদি করতেই হয়, তবে তা তাঁর সমকালে চর্চিত ইউরোপের বিভিন্ন শিল্পধারায় পাওয়া যেতে পারে—মূলত ফবিজম, কিউবিজম, এক্সপ্রেশনিজমে। ওই সময় আফ্রিকা-ওশেনিয়ার বিভিন্ন আদিবাসীর নিজস্ব শিল্প-নিদর্শনে বাস্তব-অতিক্রমী ভিন্ন রকম শক্তি ও অভিব্যক্তির প্রকাশ শিল্পী ও শিল্পরসিকজনদের বিমুগ্ধ করে।
১৯৩০ সালে প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয়। বিশ্বময় প্রশংসিত হয় কবির আঁকা চিত্রকর্ম। এ যাত্রায়ই ছবিগুলো প্রদর্শিত হয় সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ও যুক্তরাষ্ট্রে।রবীন্দ্রনাথের আত্মপ্রতিকৃতি
এসব শিল্পের মাহাত্ম্য বিশ্বময় ঘুরে বেড়ানো রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি ও মনোযোগ এড়ায়নি। তিনি যখন ছবি আঁকলেন, তখন সেখানে এসবের নানান ছায়া এসে ধরা দিল। চিত্রাঙ্কনে রবীন্দ্রনাথের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই, চিত্রকর হওয়ার কোনো পরিকল্পনাও তাঁর ছিল না। লেখার কাটাকুটি থেকেই তাঁর ছবির সূচনা। তাঁর পরবর্তী আঁকাজোকার সঙ্গেও প্রশিক্ষিত দক্ষতার কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁকে বোঝার ক্ষেত্রে সেটিও একটি প্রতিবন্ধকতা।
১৯৩০ সালে প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয়। বিশ্বময় প্রশংসিত হয় কবির আঁকা চিত্রকর্ম। এ যাত্রায়ই ছবিগুলো প্রদর্শিত হয় সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ও যুক্তরাষ্ট্রে। পরবর্তীকালে কোনো না কোনো সময় পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে তাঁর চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হয়েছে। বিস্তর প্রশংসাও জুটেছে সেসবের। একটু-আধটু সমালোচনা বা বিতর্কও যে হয়নি, তা নয়। তবে সবকিছু ছাপিয়ে রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় আধুনিক শিল্পের এক অন্যতম প্রতিভূ হিসেবে আজ বিশ্বময় স্বীকৃত হয়ে উঠেছেন। তাঁর চিত্রকর্মের বাজার-চাহিদাও আজ ক্রমবর্ধমান। ক্রিস্টি বা সদবির মতো বিশ্বখ্যাত নিলামঘরে তাঁর ছবির দাম এখন বেড়ে চলেছে। এমনকি তাঁর ছবির নকলও বাজারে চালানোর চেষ্টা চলছে।
তবু রবীন্দ্রনাথের শিল্পকর্ম বিষয়ে আমাদের অস্বস্তি ও ধাঁধা পুরোপুরি দূর হয়েছে, এমনটি বলা যাবে না। বাস্তবের হুবহু অনুকৃতির দক্ষতা ছাড়াও যে ছবি আঁকা চলতে পারে এবং রং-রেখার স্বাধীন সঞ্চালনে বাস্তবানুগতাবিহীন পটও চিত্রকলা হিসেবে গৃহীত হয়েছে, এটি আমরা এখনো মন থেকে মানতে পারি না। তবে দৃশ্যরূপের এই বিবর্তন চিত্রকর রবীন্দ্রনাথকে আশ্বস্ত ও আস্থাবান করেছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ঘনায়মান সংকট ও বিশ্বাসের পতনও তাঁর মনোজগতে আলোড়ন তুলছিল, দ্বন্দ্ব ও প্রশ্নের জন্ম দিতে শুরু করেছিল।
তাই কবির ছবি বলে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মকে গৌণতায় ঠেলে দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই, বরং বলা চলে লেখনীতে তিনি যে শান্তি-পারাবারের অভিলাষী ও অমৃতলোকের যাত্রী, ছবির জগতে তিনি এসে দাঁড়ান চৈতন্যের এক বিপরীতলোকে, এক ভিন্ন পরিচয়ে।
চিত্রাঙ্কনে রবীন্দ্রনাথ ঐতিহ্য বা পরম্পরাকে স্বীকার করেননি, তাই হয়তো ছবিতেই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে সমকালের পীড়িত মানসলোকের আর্তিকে নিঃসংকোচে প্রকাশমান করা। কবির অন্তর্লোকে যে সংশয় ও আর্তি দানা বেঁধেছিল, সেটিকে রূপ দেওয়ার জন্য তিনি চিত্রকলাকেই বেছে নিয়েছিলেন, যথাযথভাবে। অসুন্দর, কুৎসিত, আদিম, জান্তব চেতনার জগৎ, যাকে রবীন্দ্রনাথ লেখনীতে ধারণ করতে পারেননি, সেসব রূপ পেয়েছে তাঁর ছবিতে।
তাই কবির ছবি বলে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মকে গৌণতায় ঠেলে দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই, বরং বলা চলে লেখনীতে তিনি যে শান্তি-পারাবারের অভিলাষী ও অমৃতলোকের যাত্রী, ছবির জগতে তিনি এসে দাঁড়ান চৈতন্যের এক বিপরীতলোকে, এক ভিন্ন পরিচয়ে।
বলা বাহুল্য, এ পরিচয় ছাড়া রবীন্দ্র-পরিক্রমা সম্পূর্ণ নয়।