শরণার্থীশিবির থেকে মুম্বাইয়ের বিলাসবহুল জীবন, ইরানি অভিনেত্রীর অবিশ্বাস্য গল্প

· Prothom Alo

ইরানের এক ছোট ঘর থেকে শুরু, তারপর শরণার্থীজীবন পেরিয়ে জার্মানি, আর সেখান থেকে বলিউড। এই দীর্ঘ, কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে আজ মুম্বাইয়ে নিজের স্বপ্নের বাড়ির মালিক অভিনেত্রী এলনাজ নরৌজি। সম্প্রতি সেই বাড়িতে হাজির হন নির্মাতা ও কোরিওগ্রাফার ফারাহ খান। তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত সেই ‘হাউস ট্যুর’-এ উঠে আসে এক নারীর অসাধারণ জীবনসংগ্রামের গল্প।

Visit grenadier.co.za for more information.

পারস্যের ছোঁয়ায় সাজানো এক স্বপ্নের ঠিকানা
মুম্বাইয়ের বাড়িটি শুধু বিলাসিতার প্রতীক নয়; বরং এলনাজের শিকড়েরও প্রতিফলন। ঘরের কার্পেট, দেয়ালের শিল্পকর্ম, ডাইনিং স্পেস—সবখানেই রয়েছে পারস্য সংস্কৃতির ছাপ।

বাড়ির সাজসজ্জা দেখে মুগ্ধ হয়ে ফারাহ খান বলেন, ‘তোমার বাড়ির ভাইবটা দারুণ, বিশেষ করে এই পার্সিয়ান কার্পেট!’

এলনাজ জানান, তিনি একাই থাকেন ভারতে এবং প্রায় এক দশক ধরে এখানেই তাঁর জীবন। এই সময়ের মধ্যেই তিনি কাজ করেছেন জনপ্রিয় সিরিজ ‘স্যাক্রেড গেমস’-এ, যা তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়।

ব্যক্তিগত স্মৃতির দেয়াল
হাউস ট্যুরের এক পর্যায়ে দেখা যায় এলনাজের গ্ল্যামারাস ওয়াক-ইন ওয়ার্ডরোব, যেখানে সাজানো দামি ব্যাগ, জুতা আর পোশাকের সংগ্রহ।

এর পাশাপাশি রয়েছে একেবারেই ব্যক্তিগত একটি কোণ—শৈশবের ছবি দিয়ে সাজানো দেয়াল, যেখানে ধরা আছে তেহরান ও জার্মানিতে কাটানো সময়ের স্মৃতি।
শোবার ঘরটিও এলনাজ নিজেই ডিজাইন করেছেন। সাদা ও বেইজের শান্ত রঙের মাঝে নীলাভ ওয়ালপেপার, একটি রাজকীয় চেয়ার এবং স্টেটমেন্ট ল্যাম্প—সব মিলিয়ে এক সংযত অথচ অভিজাত পরিবেশ।

রান্নাঘর থেকে বাগান—সবখানেই যত্নের ছাপ
বাড়ির ছোট্ট বাগান দেখে ফারাহ খান মজা করে বলেন, ‘এখানে দাঁড়িয়ে শাহরুখ খানের মতো হাত নাড়লে কেমন হয়?’

আর রান্নাঘর? একেবারে ঝকঝকে, নিখুঁতভাবে সাজানো, যা দেখে ফারাহর প্রশংসা লেগেই থাকে।

এলনাজ নরৌজি। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

গল্পের শুরুটা একেবারেই অন্য রকম
আজকের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক কঠিন অতীত। এলনাজ নিজেই বলেন, ‘অনেকে ভাবে আমি ধনী পরিবার থেকে এসেছি, কিন্তু তা নয়। আমরা ইরানে খুব ছোট একটি বাড়িতে থাকতাম।’

তেহরান ছেড়ে পরিবারসহ জার্মানিতে যেতে হয় রাজনৈতিক আশ্রয়ের খোঁজে। শুরুতে তারা থাকতেন একটি শরণার্থীশিবিরে।

‘আমরা কোনো কাগজপত্র ছাড়া গিয়েছিলাম। একটা ছোট ঘরে তিনটি বিছানা—অন্যান্য পরিবারের সঙ্গে রান্নাঘর আর বাথরুম শেয়ার করতে হতো,’ স্মৃতিচারণা করেন তিনি।
খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে একটুকরো আলু আর একটি ডিম পাওয়া, সেটাই ছিল তখনকার বাস্তবতা।

সন্তানদের টিভি–ইন্টারনেট থেকে দূরে রাখেন এই অভিনেত্রী

‘আমরা শূন্য থেকে শুরু করেছি’
নিজের জীবনযাত্রার পরিবর্তন নিয়ে এলনাজ বলেন, ‘আমি জন্মের সময় আমার মা–বাবা বেজমেন্টে থাকতেন। আমরা কোনো ধনী পরিবার ছিলাম না। দেশ বদলেছি, সংস্কৃতি বদলেছি। আমরা শূন্য থেকে শুরু করেছি।’
এই ‘শূন্য থেকে শুরু’—এ বাক্যই যেন এলনাজের জীবনের সারসংক্ষেপ।

ভাষা, শিক্ষা আর নিজেকে প্রমাণের লড়াই
ভারতে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য এলনাজকে নতুন করে শিখতে হয়েছে অনেক কিছু। দেবনাগরী লিপি, উর্দু—সবই তিনি শিখেছেন, যাতে তাঁকে ‘বহিরাগত’ মনে না হয়।
এলনাজ বলেন, ‘আমি চাইনি কেউ ভাবুক আমি সুবিধাপ্রাপ্ত। কাজ করতে হলে ভাষা জানতে হবে। আমি সাতটি ভাষায় কথা বলতে পারি, এমনকি জাভা দিয়ে প্রোগ্রামিংও শিখেছি।’

জার্মানিতে এলনাজ ছিলেন মেধাবী ছাত্রীদের একজন, এমনকি রোবট প্রোগ্রামিংও শিখেছিলেন, যা তাঁর বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ।

এলনাজ নরৌজি। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

পর্দার সামনে নতুন পরিচয়
আজ এলনাজ নরৌজি শুধু একজন অভিনেত্রী নন, তিনি এক সংগ্রামের প্রতীক। তাঁর কাজের তালিকায় রয়েছে ‘মেড ইন হেভেন’, ‘দ্য ট্রেটরস’-এর মতো জনপ্রিয় প্রজেক্ট।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে

Read full story at source