মেয়েরা কি সত্যিই ছেলেদের চেয়ে মাল্টিটাস্কিংয়ে ভালো

· Prothom Alo

পড়ার টেবিলে বসে অঙ্কের জটিল সব হিসাব মেলাচ্ছ। এর মধ্যেই হঠাৎ বেজে উঠল তোমার ফোন। এক হাতে কল রিসিভ করে কথা বলছ, ঠিক তখনই মনে পড়ল আগামীকালের বিজ্ঞান প্রজেক্টের একটা জরুরি জিনিস ড্রয়ার থেকে বের করা হয়নি। তুমি ফোন কানে রেখেই ড্রয়ার হাতড়াতে শুরু করলে!

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এমন ঘটনা খুব সাধারণ। একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ সামলানোর এই বিষয়টিকে আমরা ইংরেজিতে বলি মাল্টিটাস্কিং। সমাজে একটা প্রচলিত ধারণা আছে, ছেলেরা নাকি একসঙ্গে অনেক কাজ করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে, কিন্তু মেয়েরা খুব সহজেই একসঙ্গে কয়েকটা কাজ সামলে নিতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞান আসলে কী বলছে? মেয়েরা কি সত্যিই মাল্টিটাস্কিংয়ে ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে? চলো, মস্তিষ্কের ভেতরে উঁকি দিয়ে এই রহস্যের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি।

Visit freshyourfeel.org for more information.

একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ সামলানোর বিষয়টিকে আমরা ইংরেজিতে বলি মাল্টিটাস্কিং

শুরুতেই একটা বড় ভুল ধারণা ভেঙে দেওয়া যাক। আমরা ভাবি, আমরা হয়তো একই সঙ্গে দুই-তিনটি কাজ করছি। কিন্তু স্নায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের মস্তিষ্ক আসলে একই সঙ্গে দুটি জটিল কাজ করতে পারে না!

তুমি যখন গান শুনতে শুনতে অঙ্ক করো, তখন তোমার মস্তিষ্ক আসলে কাজ দুটির মধ্যে খুব দ্রুত আসা-যাওয়া করে। অর্থাৎ, সে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য অঙ্কে মনোযোগ দেয়, আবার পরের মুহূর্তেই গানে মনোযোগ সরিয়ে নেয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে মাল্টিটাস্কিং না বলে টাস্ক-সুইচিং বলা উচিত।

পুরুষেরা কেন নারীদের চেয়ে কম দিন বাঁচে
আমরা ভাবি, আমরা হয়তো একই সঙ্গে দুই-তিনটি কাজ করছি। কিন্তু স্নায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের মস্তিষ্ক আসলে একই সঙ্গে দুটি জটিল কাজ করতে পারে না!

সমস্যা হলো, কাজ করার এই পদ্ধতিটা একদমই কার্যকর নয়। কারণ, যখনই মস্তিষ্ক একটা কাজ থেকে আরেকটা কাজে যায়, তখন তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কোন কাজটি আগে করবে। পাশাপাশি আগের কাজটি ঠিক কোন জায়গায় শেষ করেছিল, তা-ও তাকে মনে করতে হয়। এই বারবার মনোযোগ বদলাতে গিয়ে মস্তিষ্কের প্রচুর শক্তি খরচ হয়, কাজে ভুল হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে এবং অনেক বেশি সময় নষ্ট হয়।

এবার আসি ছেলে ও মেয়েদের মাল্টিটাস্কিংয়ের পার্থক্য নিয়ে। বিজ্ঞানীরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনেক গবেষণা করেছেন। ল্যাবরেটরিতে ছেলে ও মেয়েদের ওপর সাধারণ কিছু পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, ছেলে ও মেয়ে উভয়েই সমান দক্ষতায় কাজগুলো করছে। সেখানে মাল্টিটাস্কিংয়ের ক্ষেত্রে নারী বা পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্যই পাওয়া যায় না।

হারিয়ে যাওয়া চাবি খোঁজার জন্য একজন নারীর (বামে) এবং একজন পুরুষের (ডানে) কৌশলের উদাহরণ

কিন্তু যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীরা একবার ল্যাবরেটরির বাইরে গিয়ে একদম বাস্তব জীবনের মতো করে একটি দারুণ গবেষণার আয়োজন করেন। সেখানে নারী ও পুরুষ স্বেচ্ছাসেবকদের বেশ চাপের মুখে একসঙ্গে কয়েকটি কাজ করতে বলা হয়। কাজগুলো ছিল সাধারণ কিছু অঙ্কের সমাধান করা, হঠাৎ বেজে ওঠা টেলিফোনের উত্তর দেওয়া এবং একটি বিশাল মাঠের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া কোনো চাবি বা বস্তুকে কীভাবে খুঁজে বের করা যায়, তার একটি কৌশল তৈরি করা।

এই বাস্তবসম্মত গবেষণায় দেখা যায়, এমন একটি বিশৃঙ্খল এবং চাপের মূহূর্তে ছেলেরা যতটা অস্থির হয়ে পড়েছিল, মেয়েরা তার চেয়ে অনেক বেশি শান্ত ছিল। মেয়েরা কাজগুলো অনেক বেশি গোছানো উপায়ে এবং ঠাণ্ডা মাথায় সামলে নিতে পেরেছিল।

কিছু পরিবারে কেন ছেলে সন্তান বেশি হয়
পরীক্ষায় দেখা যায়, ছেলে ও মেয়ে উভয়েই সমান দক্ষতায় কাজগুলো করছে। সেখানে মাল্টিটাস্কিংয়ের ক্ষেত্রে নারী বা পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্যই পাওয়া যায় না।

ওই গবেষণার পর প্রশ্ন উঠল, মেয়েরা যে চাপের মূহূর্তে একসঙ্গে কয়েকটি কাজ একটু বেশি শান্তভাবে সামলাতে পারল, এর পেছনের কারণটা কী? এটা কি তাদের জন্মগত বা শারীরিক কোনো বৈশিষ্ট্য, নাকি সমাজ তাদের এভাবেই তৈরি করেছে?

বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো এর কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। তবে অনেক সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন, এর পেছনে আমাদের সংস্কৃতির একটা বড় প্রভাব থাকতে পারে। যুগের পর যুগ ধরে আমাদের সমাজব্যবস্থায় নারীদের সাধারণত ঘরের নানা দিক একসঙ্গে সামলাতে হয়। একজন মাকে হয়তো একই সঙ্গে রান্না করতে হয়, বাচ্চার খেয়াল রাখতে হয়, আবার নিজের অফিসের কাজও সামলাতে হয়। ছোটবেলা থেকেই পরিবেশ ও চারপাশের পরিস্থিতি মেয়েদের এই একসঙ্গে অনেক কাজ সামলানোর অনুশীলন করতে বাধ্য করে। আমরা জানি, যেকোনো কাজ বারবার করলে মস্তিষ্ক সেই কাজে এমনিতেই দক্ষ হয়ে ওঠে।

একজন মাকে হয়তো একই সঙ্গে বাচ্চার খেয়াল রাখতে হয়, আবার নিজের অফিসের কাজও সামলাতে হয়

তার মানে এই নয় যে, ছেলেদের মস্তিষ্ক মাল্টিটাস্কিং (বলা ভালো টাস্ক-সুইচিং) করতে পারে না বা মেয়েদের মস্তিষ্ক জন্মগতভাবেই মাল্টিটাস্কিংয়ের জন্য তৈরি। বরং পরিস্থিতি ও অভ্যাসের কারণে মেয়েরা হয়তো এই দ্রুত কাজ বদলানোর চাপের সঙ্গে ছেলেদের চেয়ে একটু ভালোভাবে মানিয়ে নিতে শিখেছে।

পুরুষেরা কেন সাধারণত নারীর চেয়ে বেশি লম্বা হয়
একজন মাকে হয়তো একই সঙ্গে রান্না করতে হয়, বাচ্চার খেয়াল রাখতে হয়, আবার নিজের অফিসের কাজও সামলাতে হয়।

তাহলে আসল কথা কী দাঁড়াল? আসল কথা হলো, নারী হোক বা পুরুষ—মাল্টিটাস্কিং বা টাস্ক-সুইচিং আসলে কারও মস্তিষ্কের জন্যই ভালো কিছু নয়। এটি সবার কাজেরই গতি কমিয়ে দেয় এবং মনোযোগ নষ্ট করে। তাই একসঙ্গে অনেক কাজ সামলে নিজেকে খুব দক্ষ ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং নিজের মস্তিষ্কের ওপর থেকে চাপ কমাতে যেকোনো মুহূর্তে শুধু একটি কাজেই পুরো মনোযোগ দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। এতে কাজ যেমন দ্রুত শেষ হবে, তেমনি ভুল হওয়ার আশঙ্কাও কম থাকবে!

সূত্র: আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, বিবিসি সায়েন্স ফোকাস ও ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকনারীদের ডিপ্রেশনের ঝুঁকি কেন পুরুষের চেয়ে দ্বিগুণ

Read full story at source