এক বাওই কালা রে,
আরেক বাওই ধলা রে,
Visit h-doctor.club for more information.
আরেক বাওয়ের কপালে লাল টিপ।
রংবেরঙের বাওই রে,
ধানের খেতে পড়ে রে,
এই খেতে আর বুনব না রে ধান।
আমরা যে যুবতী নারী,
বাওই কি খেদাইতে পারি,
বদনে চুয়ায়ে পড়ে ঘাম।
ওই খেতে আর বুনব না রে ধান...
ধানকাটা শ্রমিকের দলপতির কণ্ঠে এভাবেই বেজে চলেছে সুমধুর গান। আ..হা, আ..হা বলে গানের আবেদনে সাড়া দিচ্ছেন অন্য শ্রমিকেরা। সুরের ছন্দে ছন্দে তাঁদের হাতে দুর্বার গতিতে কাটা পড়ছে আঁটি আঁটি পাকা ধান। গত শনিবার কাকডাকা সকালে নাটোরের সিংড়া উপজেলার সাতপুকুরিয়া এলাকার চলনবিলে দেখা মেলে এই দৃশ্যের।
চলনবিলের দিগন্তজুড়ে চলছে ধানকাটার এই উৎসব। সুয্যি মামা জেগে ওঠার আগেই ধানকাটা শ্রমিকেরা খেতে গিয়ে হাজির হন। দল বেঁধে গানের তালে তালে চলে ধানকাটা। আটটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকেরা ধানকাটা বন্ধ রেখে গৃহস্থের বাড়ি থেকে আনা পান্তাভাত দিয়ে নাশতা সেরে ফেলেন। আধা ঘণ্টার ব্যবধানে শুরু হয় আবার ধানকাটা।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাটা ধান মাথায় নিয়ে ছুটে চলেন গৃহস্থের খৈলানে (উঠান)। আগে থেকেই গরুর গোবরে লেপে–মুছে তৈরি করে রাখা হয় খৈলান। খৈলান তৈরির এই কাজটা করেন গৃহস্থের পরিবারের লোকজন। এমনকি পরিবারের নারী-শিশুরাও এই কাজে শরিক হয়।
চলনবিলের দিগন্তজুড়ে চলছে ধানকাটার এই উৎসব। সুয্যি মামা জেগে ওঠার আগেই ধানকাটা শ্রমিকেরা খেতে গিয়ে হাজির হন। দল বেঁধে গানের তালে তালে চলে ধানকাটা।
দুপুর গড়াতেই অধিকাংশ খৈলানে মাড়াই যন্ত্র দিয়ে ধানমাড়াই শুরু হয়। একই যন্ত্রে মাড়াই, বাছাই ও বস্তাবন্দী হয়ে সোনালি ধান চলে যায় গৃহস্থের বাড়িতে। তবে কেউ কেউ খৈলানের এক কোণে তৈরি করেছেন মাটির চুলা। সেই চুলায় ধান সেদ্ধ করে শুকিয়ে বাড়িতে নেওয়া হয়। খেত থেকে ধান ওঠার পরপরই কৃষক তাঁর পরিবারের সারা বছরের চাল করে নেন। বিশেষ পদ্ধতিতে সেই চাল সংরক্ষণ করে রাখা হয়।
ধানকাটা শ্রমিকদের দলপতি শোয়াইব মালিথা জানান, ‘এক বাওই কালা রে’ গানটি তাঁরই লেখা। এখানে বাওই মানে বাবুই। বাবুই পাখির ওপর অভিমান করেই গানটি লিখেছেন তিনি। ধানের মৌসুমে বাবুই পাখি অনেক ধান খেয়ে নেয়।
শোয়াইব মালিথার ভাষ্য, চলনবিলে মাইলের পর মাইল শুধু ধান আর ধান। মাথার ওপর নেই কোনো ছাউনি। তাই রোদ ওঠার আগেই তাঁদের বিরামহীনভাবে ধান কাটতে হয়। শরীর চাঙা রাখতেই গাওয়া হয় গান। দুই যুগ ধরে তিনি এভাবেই ধান কেটে চলেছেন। তাঁর বাড়ি সিংড়া উপজেলার নূরপুর এলাকায়। দলের অন্য সব সদস্যের বাড়িও একই এলাকায়।
ধানকাটা শ্রমিকদের দলপতি শোয়াইব মালিথা জানান, ‘এক বাওই কালা রে’ গানটি তাঁরই লেখা। এখানে বাওই মানে বাবুই। বাবুই পাখির ওপর অভিমান করেই গানটি লিখেছেন তিনি। ধানের মৌসুমে বাবুই পাখি অনেক ধান খেয়ে নেয়।
শোয়াইব মালিথার মতো রাজশাহী, কুষ্টিয়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলা থেকে শত শত ধানকাটা শ্রমিক এসেছেন চলনবিলে ধান কাটতে। খেতের আশপাশেই টিনের ছাপড়া দিয়ে বানানো শিবিরে তাঁরা রাত যাপন করেন। গৃহস্থ চাল, ডাল দিলেও রান্না করতে হয় তাঁদেরই। গৃহস্থের পাশাপাশি তাঁদেরও একটা দুশ্চিন্তা, ঝড়বৃষ্টি। কারণ, ফাঁকা মাঠে বজ্রবৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো ব্যবস্থাই তাঁদের নেই। এ ছাড়া সামান্য বৃষ্টির পানিতেই বিলের মাটি পিচ্ছিল হয়ে যায়। কাটা ধান বয়ে নিয়ে যাওয়া তখন প্রায় অসাধ্য হয়ে পড়ে।
আর কিছুদিন পরই বদলে যাবে এই দৃশ্য। উজানের পানিতে ভরে উঠবে চলনবিল। সোনালি ধানের মাঠ হারিয়ে গিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে থইথই পানি। তখন নৌকাই হবে একমাত্র বাহন, আর জীবিকার প্রধান ভরসা হবে মাছ ধরা।
নাটোরের সিংড়া ও গুরুদাসপুর, পাবনার চাটমোহর এবং সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার প্রায় ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলনবিল বিস্তৃত। এ বছর এর ২ লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে।
সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদের ভাষ্য, চলনবিলের অধিকাংশ জমিতে বছরে বোরো ধানের চাষ হয়। প্রায় একই সময়ে ধান কাটা শুরু হয়েছে। আগামী এক মাস চলবে ধানকাটা।
আর কিছুদিন পরই বদলে যাবে এই দৃশ্য। উজানের পানিতে ভরে উঠবে চলনবিল। সোনালি ধানের মাঠ হারিয়ে গিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে থইথই পানি। তখন নৌকাই হবে একমাত্র বাহন, আর জীবিকার প্রধান ভরসা হবে মাছ ধরা।
