সরকার গণভোটের রায় মেনে না নিলে সংসদের পাশাপাশি রাজপথে আন্দোলন চলমান থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, গণভোটের রায় মেনে না নিলে আন্দোলনে কোনো বিশ্রাম নেওয়া হবে না। আন্দোলন চলবে সংসদে, আন্দোলন চলবে রাজপথে। রাজপথ ও সংসদ যেদিন একাকার হয়ে যাবে, সেদিন বালুর বাঁধ দিয়ে নদী আর সমুদ্রের জোয়ার থামানো যাবে না।
Visit betsport.cv for more information.
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক সমাবেশে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে এই গণসমাবেশের আয়োজন করে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।
সমাবেশে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, গণরায়কে অমান্য করায় ১৯৭১ সালে যুদ্ধ অনিবার্য হয়েছিল। যারা রায় অস্বীকার করেছিল, তাদের পরিণতি ভালো হয়নি। এবার যারা রায় অস্বীকার করছে, তারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত অংশ মনে করে। সেই মুক্তিযুদ্ধকে সম্মান করে তারা যেন রায় মেনে নেয়।
বিএনপি অতীতে মজলুম ছিল, ক্ষমতায় গিয়ে সেটি ভুলে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, তারা (বিএনপি) স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কার্যকর আইনি পদ্ধতি হিসেবে গণভোটের বিকল্প নেই। এ জন্য তাদেরই একজন গণভোটের প্রস্তাব করেছিলেন। তাদের নেতা আবু সাঈদের স্মৃতিবিজড়িত রংপুরে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে বলেছিলেন। এখন তারা গণভোটকে অবৈধ বলছেন।
ফ্যাসিবাদীরা বিভিন্ন নেতিবাচক বয়ান তৈরি করে জাতিকে বিভক্ত করেছিল উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘আপনারা (বিএনপি নেতারা) নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, আমরা নির্বাচিত হলে, সরকার গঠন করলে সবাইকে নিয়ে আমরা সরকার গঠন করে দেশ চালাব। এখন আপনারা কী করছেন? এক দলকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন পাকিস্তানে, আরেক দলকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন পেশোয়ারে, আরেক দলকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন আরও কোনো দেশে। আর নিজেরা এই দেশের জমিদারি দখল নিতে চাচ্ছেন। মনে রাখবেন, জুলাইয়ের দুটি স্লোগান ছিল বড় শক্তিশালী। একটা ছিল “উই ওয়ান্ট জাস্টিস” আরেকটা ছিল “দেশটা কারও বাপের নয়”।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘তাঁরা সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, এটি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার।’ এ সময় সমাবেশে উপস্থিত সবাই ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দেওয়া শুরু করে। এরপর জামায়াত আমির বলেন, ‘সরকার যদি সুষ্ঠু নির্বাচনেই গঠিত হয়, তাহলে বারবার দাঁড়িয়ে বলতে হয় কেন? ম্যাকিয়াভেলির একটা কথা আছে, তুমি যদি কোনো মিথ্যাকে এস্টাবলিশড (প্রতিষ্ঠিত) করতে পারো, তাহলে একবার বললে হবে না, শতবার বলতে থাকো।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘নতুন করে কেউ ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে গেলে তাদেরকে অনুরোধ করব, নিকট অতীতের যাদেরকে এখন বুকে টেনে নিয়ে আপনারা এই নির্বাচনের বৈতরণি পার হয়েছেন, যাদের হাতে–পায়ে ধরে ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় এসেছেন, তাদের পরিণতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন।’
নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দুজন রাজসাক্ষী পাওয়া গেছে দাবি করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা বলেছেন, তাঁদের মেইনস্ট্রিম হতে দেননি। একজন নিরপেক্ষ সরকারের অংশ হয়ে তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তবে তিনি একজন নন, এ ক্ষেত্রে বহুবচন ব্যবহার করেছেন। বাকিরা কারা তা জানতে চান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ক্যাপ্টেনের হাতে আগেই লন্ডনে গিয়ে ট্রফি দিয়ে এসেছেন। ট্রফি আগেই ক্যাপ্টেনের হাতে চলে গেলে এটি ছিল নির্বাচন নামের তামাশা। সেটি তারা স্বীকার করে নিচ্ছেন।
সমাবেশে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা সংসদে আছি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোট বাস্তবায়নের পক্ষে কথা বলার জন্য। আর রাজপথে আছেন আল্লামা মামুনুল হকসহ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীরা। ইনশা আল্লাহ আমরা একত্রে আছি। যদি সময়মতো দাবি আদায় না হয়, সংসদ এবং রাজপথ একাকার হয়ে যাবে।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের মানুষ ভালো নেই। দেশে জ্বালানিসংকট, মানুষের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বিরোধী দল থেকে সরকারকে সহযোগিতা করতে চাওয়া হয়েছে। অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে রাজনীতি করতে চায় না বিরোধী দল। কিন্তু সরকার বারবার কথার বরখেলাপ করছে। দেশের মানুষ নতুন করে জেগে ওঠা স্বৈরতন্ত্রকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেবে না ।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, সরকার যদি গায়ের জোরে গণভোটের রায় এড়িয়ে যেতে চায়, তবে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে। বিরোধী দল চায় সরকার যেন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আয়োজিত সমাবেশের মঞ্চে ১১–দলীয় ঐক্যভুক্ত দলগুলোর নেতারা। আজ শুক্রবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেনির্বাচন কমিশনারদের সমালোচনা করে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনে বসে আছে আরেক চোর। তার মাধ্যমে এসব রিগিং (জালিয়াতি) হয়েছে।’
বিরোধীদলীয় নেতা সরকারকে সবদিক থেকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করলেও সরকার সেটি গ্রহণ করছে না অভিযোগ করে অলি আহমদ বলেন, ‘তাদের সঙ্গে আর বেশি খাতির করে লাভ নাই। সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না।’
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান (মঞ্জু) বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনরায় বাস্তবায়িত হতে দেয়নি তৎকালীন পাকিস্তানি ইয়াহিয়া সরকার। ক্ষমতার জোরে সেই গণরায়কে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। ৫৫ বছর পর এসে বাংলাদেশের এমন এক দলের ওপরে আবার পাকিস্তানি জান্তা ভর করেছে, যারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে দিতে চায় না। তারা আবার ইয়াহিয়া সরকারের পথে হাঁটছে। ক্ষমতায় গিয়ে সবাই অতীত ভুলে যায়। গণভোটের রায় বাস্তবায়িত না হলে আবার একাত্তরের মতো মুক্তিযুদ্ধ হবে, জীবন দিয়ে দেশে নতুন বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করা হবে।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, যারা ইসলামকে ভালোবাসে, বাংলাদেশকে ভালোবাসে এবং বাংলাদেশের শতবর্ষের ঐতিহ্যকে ধারণ করে, তারা জুলাই বিপ্লবের বিপক্ষে থাকতে পারে না। বিএনপি যেন তাদের ঐতিহ্যের ৫০ বছরের রাজনীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করে। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আদর্শের সঙ্গে গাদ্দারি করে বিএনপি টিকতে পারবে না। বিএনপি গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নিলে তাদের লাল কার্ড দেখানো হবে।
বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার সমালোচনা করে মামুনুল বলেন, বিশ্বের সব কূটনৈতিক রেওয়াজ ভঙ্গ করে বাংলাদেশে একটি দেশ থেকে একজনকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিজেপির দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তাঁকে কূটনীতিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশের সরকার এর কোনো প্রতিবাদ জানায়নি। বাংলাদেশ সমতার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়। বাংলাদেশকে বিজেপির কোনো দলীয় ফোরামে পরিণত করতে দেওয়া হবে না।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ, নায়েবে আমির ইউসুফ আশরাফ, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ আতহারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আলী ওসমান, মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমাদ (হানজালা), ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম, ইনকিলাব মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল জাবের প্রমুখ।