‘বই’ শব্দটির উৎস ‘বহি’ থেকে। বইকে আমরা ‘গ্রন্থ’ নামেও সম্বোধন করি। ‘বহি’ শব্দ এসেছে আরবি শব্দ ‘ওহি’ থেকে। ‘ওহি’ শব্দের অর্থ ‘বার্তা’। বই প্রকৃত পাঠকদের কাছে নিত্যনতুন বার্তার মতো, যা জ্ঞানের জগৎকে বৃদ্ধি করে। তাই বই নামটিতেই কল্পনা, মনস্তাত্ত্বিক ও অলৌকিক উদ্ভাস অনুভব করা যায়। নিয়মিত বই পাঠ করলে সঠিক চিন্তাধারা, যথাযথ পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও যৌক্তিক সমাধান পাওয়া যায়। ভালো বই পাঠ করলে মনে হবে, যেন পঠিত বিষয় পাঠককে নিয়ে উড়াল দেবে অচেনা পৃথিবীর বাইরে কিংবা অজানা রোমাঞ্চের ভুবনে।
Visit turconews.click for more information.
আধুনিক যুগে এসেও কারও কারও প্রশ্ন থাকতে পারে—বই পড়ে কী হয়? এর জবাবে একেকজন একেক রকম মন্তব্য করেন। শুধু বইপড়ুয়ারাই জানেন, বই পড়লে আসলে কী হয়! ভালো একটি নতুন বই যেন প্রিয়জনের সান্নিধ্য পাওয়ার ন্যায় মধুর অনুভূতি। চারপাশ তখন কেমন যেন অপার্থিব হয়ে ওঠে। আনন্দে হৃদয় অলৌকিক আলোয় ভরে যায়। বই পাঠকদের কাছে প্রেমিকার ন্যায়, প্রিয়জনের মতো। সংগ্রহের পর প্রচ্ছদের গায়ে হাত বোলানো। প্রতিটি পাতার ভাঁজে নাক ডুবিয়ে বুক ভরে মিষ্টি গন্ধ গ্রহণ করা। প্রতিদিন বালিশের পাশে রাখা। তারপর ধীরে ধীরে পাঠ করা। বই পড়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের মারাত্মক ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে। গবেষণা অনুযায়ী, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিশক্তি ভুলে যাওয়ার মতো অস্বাভাবিক রোগকে হ্রাস করতে সাহায্য করে।
তবে দুঃখজনক বিষয়, বর্তমান সময়ের প্রযুক্তির জগতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা নবীন ও তরুণ প্রজন্মের যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার প্রয়োজন, তা ছাপা বইয়ের জগৎ থেকে ক্রমশ চলে যাচ্ছে ইন্টারনেটে। বিকল্প হিসেবে ই-বুকের আবির্ভাব ও অডিও বই শোনার ব্যবস্থা থাকলেও ছাপা বইয়ের দিন এখন অস্তে যাচ্ছে, যা গভীর উদ্বিগ্নের।
শিকাগোর রাশ ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টারের গবেষকেরা বলেছেন, পড়াশোনা, লেখালেখি বা নতুন ভাষা শেখার মতো কাজগুলো ডিমেনশিয়া বা স্মৃতি ভুলে যাওয়ার মতো ঝুঁকি প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যা ১৫ কোটির বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ভবিষ্যতের সুরক্ষায় বই পড়ার অভ্যাস বা লেখালেখির মতো দক্ষতা অর্জন আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকেরা গড়ে ৮০ বছর বয়সী ১ হাজার ৯৩৯ জন মানুষের ওপর দীর্ঘ ৮ বছর ধরে গবেষণা চালিয়েছেন। ফলাফলে দেখা গেছে, যাঁরা জীবনজুড়ে মস্তিষ্ককে কর্মক্ষম রেখেছেন, যেমন লাইব্রেরিতে যাওয়া, বই-পত্রিকা পড়া বা নতুন কিছু শেখা, তাদের আলঝেইমার রোগের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় অনেক কম। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বা ‘কগনিটিভ এনরিচমেন্ট’ মস্তিষ্ককে সচল রাখে এবং বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার গতি কমিয়ে দেয়।
সবচেয়ে আশার কথা হলো, যাঁরা মানসিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ছিলেন, বই পড়ে তাঁদের ক্ষেত্রে স্মৃতি ভুলে যাওয়ার মতো রোগ (আলঝেইমার) প্রায় পাঁচ বছর এবং জ্ঞানচর্চায় হালকা প্রতিবন্ধকতার সমস্যা প্রায় সাত বছর দেরিতে দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখা বার্ধক্যজনিত রোগ প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার বই পড়া। তাই কেবল বিনোদন নয়, সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য এখন থেকেই বই পড়া অথবা নতুন কোনো দক্ষতা অর্জনের অভ্যাস গড়ে তোলা অপরিহার্য।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
বন্ধু, কক্সবাজার বন্ধুসভা
