সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে পাস না হওয়ায় বিচার বিভাগ আবার প্রশাসনের ‘পকেটে চলে যাবে’ বলে মনে করেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন। তাঁর মতে, নিজেদের ‘পছন্দমতো’ বিচারক নিয়োগ দিতেই সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যাঁরা সংস্কারকে সংশোধনের নামে ব্যর্থ করে দিতে চান, তাঁদের চক্রান্ত জাতি মেনে নেবে না।
আজ মঙ্গলবার ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংস্কার: সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, আদালতের নির্দেশনা ও জন–আকাঙ্ক্ষা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিচারপতি এম এ মতিন। এ গোলটেবিলের আয়োজক সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
Visit rouesnews.click for more information.
মূল প্রবন্ধে বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, বিচার বিভাগের সুরক্ষার প্রয়োজনে এবং জাতীয় আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নের জন্য বিচারক নিয়োগ এবং সচিবালয়–সংক্রান্ত অধ্যাদেশ দুটি করা হয়েছিল। বর্তমান সংসদের কর্তব্য বিচার বিভাগ–সংক্রান্ত অধ্যাদেশ দুটিকে ‘অ্যাক্ট অব পার্লামেন্ট’ করা।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে নির্বাহী ও আইন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা রাখার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু সাংবিধানিক বিধান থাকলেও ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত কোনো সরকার এ নিয়ে পদক্ষেপ নেয়নি। ‘মাসদার হোসেন বনাম বাংলাদেশ’ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১৯৯৯ সালে ১২টি নির্দেশনা দিয়ে বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার জন্য ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন; কিন্তু সেই রায় পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। পরে অন্তর্বর্তী সরকার দুটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়; কিন্তু বিএনপি সরকার অধ্যাদেশ দুটিকে সংসদের মাধ্যমে আইনে পরিণত না করায় তা বাতিল হয়ে যায়।
বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, বার এবং বেঞ্চের সমন্বয়ে বিচারব্যবস্থা চলে। বার যদি স্বাধীন না হয়, যদি বিজ্ঞ না হয়, তাহলে বিচারকের রায়ও দুর্বল হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে এখন বার হয়ে গেছে পরাধীন। যে দল সরকারে আসে, তারা সেই দলের ‘চামচা’ হয়ে যায়। এতে সরকার সাহস পেয়ে অধ্যাদেশ দুটি বাতিল করতে পেরেছে।
এম এ মতিন,অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আপিল বিভাগযাঁরা সংস্কারকে সংশোধনের নামে ব্যর্থ করে দিতে চান, তাঁদের চক্রান্ত জাতি মেনে নেবে না।জনগণের ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
অধ্যাদেশ দুটির বিলুপ্তি নিঃসন্দেহে পেছনের দিকে হাঁটার মতো ঘটনা বলে গোলটেবিলে আলোচনায় মন্তব্য করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, এমন সিদ্ধান্ত উদ্বেগজনক এবং জাতির জন্যও ভালো ফল বয়ে আনবে না। বর্তমান আইনমন্ত্রী আরও ভালো আইন করার আশ্বাস দিলেও রাজনীতিবিদদের আশ্বাসে কতটুকু আস্থা রাখা যায়, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।
মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিচারিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে জনগণের ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি জনগণের ধারণা হয় যে বিচার বিভাগ স্বাধীন নয়, তবে বিচার বিভাগের কোনো অবস্থান থাকে না। তিনি বলেন, ‘আসুন, আমরা এমন একটি বিচার বিভাগ গড়ে তুলি যেখানে রংপুরের একজন পোশাকশ্রমিক, সিলেটের একজন হকার বা খুলনার একজন রিকশাচালক বলতে পারেন—আমরা আদালতকে বিশ্বাস করি, আমরা বিচার বিভাগকে বিশ্বাস করি।’
ঐকমত্য কমিশনকে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলা যায় না: সারা হোসেনএ গোলটেবিল আলোচনায় সঞ্চালক ছিলে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, অধ্যাদেশগুলো তৈরি করার পাছনে অনেক প্রস্তুতি ছিল, অনেক গবেষণা ছিল। কেউ একদিন হঠাৎ সকালবেলা উঠে এগুলো চিন্তা করে বলেছেন, বিষয়টা তা নয়।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সরকার আরও ভালো আইন করার কথা বলেছে; কিন্তু সরকারের কর্মকাণ্ডের কারণে নাগরিকেরা আশ্বস্ত হতে পারছে না। তিনি বলেন, সরকার বলছে, তারা জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে। সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে, তাহলে তাদের উচিত হবে দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা।
বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুজনসরকার আরও ভালো আইন করার কথা বলেছে; কিন্তু সরকারের কর্মকাণ্ডের কারণে নাগরিকেরা আশ্বস্ত হতে পারছে না।ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই হবে
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, সবাই ইতিবাচক পরিবর্তন চাইছে। নির্বাহী বিভাগে যাঁরা আছেন, তাঁরা বিচার বিভাগকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন করার জন্য ব্যবহার করবেন—এমনটা কেউ চান না। এই মৌলিক পরিবর্তনের জন্যই আইন দুটি প্রয়োজন ছিল।
সারা হোসেন বলেন, বিচারপ্রার্থীরা যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ন্যায়বিচার পেতে পারেন। যাঁদের প্রতিপক্ষ বলে মনে করা হচ্ছে, তাঁদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলা যায় না বলেও গোলটেবিল আলোচনায় মন্তব্য করেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, ‘এটা সিলেক্টিভ প্রসেস। কয়েকজনকে নিয়ে আপনারা বসে ডিসিশন নিয়েছেন। গণতন্ত্র এখানে কোথায় ছিল? কিসের নির্বাচন, কে এসছে? বাইরে থেকে কে কথা বলতে পেরেছে? কেউ না।’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে একজনও নারী সদস্য ছিলেন না। বিচারব্যবস্থা সংস্কার কমিশনেও কোনো নারী আইনজীবী কিংবা নারী বিচারপতিকে সম্পৃক্ত করা হয়নি।
ছেলে ভোলানো গল্প
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, ‘পারফেক্ট’ কিছু দেওয়ার কথা বলে সরকার আসলে ছেলে ভোলানো গল্প বলছে।
বিচার বিভাগ–সংক্রান্ত অধ্যাদেশ দুটির খসড়া কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানিম হোসেইন শাওন। আলোচনায় তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। অথচ আইনের কোথায় দুর্বলতা আছে, তা না বলেই সরকার এটি বাতিল করেছে।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিক বলেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এক রায়ে হাইকোর্ট সরকারকে সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে এখনো কোনো আপিল করা হয়নি। আপিল দায়ের না করে এবং স্থগিতাদেশ না নিয়ে সরকারের পক্ষে এই রায় উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। এ পরিস্থিতিতে সচিবালয় বিলুপ্ত করা এবং সচিবালয়ের তহবিল আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত আদালত অবমাননার শামিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গোলটেবিল আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন নাগরিক কোয়ালিশনের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন প্রমুখ।
