দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে আয়োজিত শাড়ি প্রদর্শনীতে টাঙ্গাইল ও পাবনার ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্পের অনন্য নিদর্শন উঠে এসেছে, যেখানে প্রতিটি শাড়িতে জড়িয়ে আছে দক্ষতা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির গল্প।
Visit grenadier.co.za for more information.
বয়নশিল্পীর দক্ষ হাতে মাকুর খটা খট শব্দ করে মাকুর ছন্দায়িত চলনে তৈরি হয় সুনিপুণ নকশার প্রতিটি শাড়ি। প্রতিটি শাড়ির রয়েছে আলাদা গল্প, আলাদা আবেদন। এই অনুভূতিকেই সামনে রেখে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের শাড়ির প্রদর্শনী; যেটা শেষ হচ্ছে আজ। এই প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া শাড়িতে ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ বয়ন ঐতিহ্য।
১৮ এপ্রিল উদ্বোধনী আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম. রিয়াজ হামিদুল্লাহ। মঞ্চে নিজেদের ভাবনা তুলে ধরেন খ্যাতনামা ডিজাইনার পদ্মশ্রী সুনীতা কোহলি এবং ডিজাইনার, লেখক ও কারুশিল্প আন্দোলনকর্মী পদ্মশ্রী লায়লা তায়াবজি। আরও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট লেখক জয়া জেটলি। এই প্রদর্শনী আয়োজনের ভাবনা ও পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন দুই কিউরেটর, বাংলাদেশের চন্দ্রশেখর সাহা ও ভারতের চন্দ্রশেখর বেদ।
এই প্রদর্শনী ভারতের টেক্সটাইলপ্রেমীদের সামনে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় বয়নশিল্পের এক অনন্য ঝলক তুলে ধরছে। বিশেষভাবে তুলে আনা হয়েছে দেশের দুই ঐতিহ্যবাহী তাঁতকেন্দ্র—টাঙ্গাইল ও পাবনার দক্ষ বয়নশিল্পাীদের তৈরি সেরা সব শাড়ি। বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের বয়ন প্রক্রিয়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইউনেস্কোর ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটির তালিকায় স্থান পেয়েছে। বৈশ্বিক স্বীকৃতি পাওয়া এই বয়নের ফল অনন্য সব শাড়িকে সবার সামনে উপস্থাপন করাই ছিল এই প্রদর্শনীর অন্যতম লক্ষ্য।
প্রদর্শনীতে অংশ নেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত দুই বয়নশিল্পী—টাঙ্গাইলের বসাক পরিবারের প্রতিনিধি খোকন বসাক ও রূপগঞ্জের মোহাম্মদ সাজীব। দুই দশকের অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁরা সরাসরি দর্শকদের সামনে দেখাচ্ছেন শাড়ি বুননের জটিল ও সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া।
যন্ত্রচালিত পাওয়ারলুম যেখানে নির্ভুল গতিতে কাজ করে, সেখানে হাতের তাঁত বোনা একেবারেই অন্য গল্প; এখানে বয়নশিল্পীর হৃদস্পন্দনের ছন্দে তৈরি হয় প্রতিটি নকশা, প্রতিটি শাড়ি। এই অনুভূতিকেই সামনে রেখে সাজানো হয়েছে পুরো প্রদর্শনী, যেখানে ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের বয়নশিল্পের ঐতিহ্য ও দক্ষতা।
প্রদর্শনীস্থলে ঢুকলেই চোখে পড়ে রঙের সমারোহ। গাঢ় লাল থেকে নীল, হলুদ-কমলার নানা শেড থেকে শুরু করে অফ-হোয়াইটের শান্ত সৌন্দর্য। তিন শতাধিক শাড়ির এই সমাহারের এই প্রদর্শনীর প্রতিটি শাড়িই যেন একেকটি গল্প, যা দর্শককে বারবার টেনে নিয়ে যায় নতুন করে দেখার অভিজ্ঞতায়।
টাঙ্গাইলের শাড়ি বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। সূক্ষ্ম সুতি কাপড়, হালকা গঠন আর নিখুঁত নকশার জন্য এই শাড়িগুলো যেমন দৈনন্দিন ব্যবহারে আরামদায়ক, তেমনি উৎসব বা আনুষ্ঠানিক পরিবেশেও সমানভাবে মানানসই।
অন্যদিকে পাবনার শাড়ি পরিচিত এর টেকসই গঠন, সংযত নকশা এবং আরামদায়ক পরিধানের জন্য। টাঙ্গাইলের সূক্ষ্মতার সঙ্গে পাবনার স্থায়িত্ব মিলে যেন বাংলাদেশের তাঁত ঐতিহ্যে তৈরি করে এক অনন্য ভারসাম্য—যার পেছনে রয়েছে যমুনা নদীবিধৌত ভূপ্রকৃতির প্রভাব।
এই প্রদর্শনী শুধু শাড়ির সৌন্দর্য নয়, তুলে ধরছে বয়নশিল্পীদের জীবন ও উত্তরাধিকারকেও। প্রজন্মান্তরে যাঁরা এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাঁদের শ্রম, সময় এবং আবেগই তৈরি হয় প্রতিটি শাড়ির ভেতরের গল্প।
ভারতের চন্দ্রশেখর বেদ বলেন, বয়নশিল্পীরা কেবল কাপড় বোনেন না, তাঁরা সংস্কৃতির পরিচয় নির্মাণ করেন। তাঁতের ওপর সুতো ওঠানামার মধ্য দিয়েই তৈরি হয় এক জাতির ঐতিহ্য—যা সংরক্ষণ করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
এই আয়োজন কেবল শাড়ি কেনাবেচার জায়গা নয়—এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মানুষের গল্পকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার এক আন্তরিক প্রয়াস। এখানে প্রতিটি শাড়ি কেবল পোশাক নয়, বরং সময়, শ্রম আর হৃদয়ের স্পন্দনে বোনা এক জীবন্ত শিল্পকর্ম।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
ছবি: বাংলাদেশ হাইকমিশনের ফেসবুক
