মানুষের গড় আয়ু ৭২ থেকে ৭৪ বছর। কিন্তু মাঝেমধ্যে অনেকে ১০০ বছরও বাঁচে। এই রকম বহু মানুষ আছে যারা ১০০ বছরেরও বেশি সময় বেঁচে ছিল বা আছে। প্রশ্ন হলো, ওই মানুষগুলোর সঙ্গে সাধারণ মানুষের পার্থক্য কোথায়? কেন কিছু মানুষ স্বাভাবিক গড় আয়ুর তুলনায় বেশি দিন বাঁচে? সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের শরীরের মেকানিজম কি আলাদা? চলুন, এই রহস্যের খোলাসা করা যাক।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
শতবর্ষী মানুষের শরীরে বার্ধক্য যেন একটু অন্যভাবে কাজ করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে তাদের শরীরের ভেতরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক বৈশিষ্ট্যও আশ্চর্যজনকভাবে তরুণ অবস্থায়ই থেকে যায়। সুইজারল্যান্ডে মাত্র ০.০২ শতাংশ মানুষ ১০০ বছর বয়সে পৌঁছাতে পারেন। তাহলে এই মানুষগুলোকে আলাদা করে কী? তাদের শরীরেই কি লুকিয়ে আছে বার্ধক্যের প্রভাব ধীর করার রহস্য?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয় এবং লাউসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বিভিন্ন বয়সের মানুষের রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের গবেষণা দেখায়, বার্ধক্য সব সময় একরৈখিক নয়, বরং কিছু ক্ষেত্রে এটি ভিন্নভাবে অগ্রসর হতে পারে। ‘সুইস ১০০’ নামে একটি প্রকল্পের অধীনে গবেষকেরা তিনটি বয়সের গ্রুপ করেন। তারপর শতবর্ষী, আশি বছরের বেশি বয়সী এবং ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের রক্ত পরীক্ষা করেন।
কত বছর বাঁচবেন, তা নির্ভর করে আপনি কোন দেশে আছেন তার ওপরগবেষকেরা বিভিন্ন বয়সের মানুষের রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের গবেষণা দেখায়, বার্ধক্য সব সময় একরৈখিক নয়, বরং কিছু ক্ষেত্রে এটি ভিন্নভাবে অগ্রসর হতে পারে।
এতে দেখা যায়, শতবর্ষীদের শরীরে এমন ৩৭টি প্রোটিন রয়েছে, যেগুলো অনেকটা তরুণদের শরীরে পাওয়া প্রোটিনের মতোই। বিশেষ করে, এসব প্রোটিন কম অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা তাদের শরীরকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এই প্রোটিনগুলোর কিছু কিছু আমাদের শরীরের এক্সট্রাসেলুলার ম্যাট্রিক্স অর্থাৎ কোষের মাঝখানে থাকা সিমেন্টের মতো কাঠামোগুলোকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। আবার কিছু প্রোটিন টিউমার তৈরি হওয়া প্রতিরোধ করতে পারে। কিছু চর্বি ও শর্করার বিপাক নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
এই গবেষণায় মোট ৩৯ জন শতবর্ষী (বয়স ১০০-১০৫ বছর, যাঁদের মধ্যে ৮৫ ভাগ নারী), ৫৯ জন আশি বছরের বেশি বয়সী এবং ৪০ জন তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক (বয়স ৩০-৬০ বছর) অংশ নেন। গবেষকদের মতে, আশি বছরের বেশি বয়সীদের অন্তর্ভুক্ত করার ফলে জীবনভর রক্তের বিভিন্ন সূচক কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা আরও সূক্ষ্মভাবে বোঝা যায়। পাশাপাশি এটি স্বাভাবিক বার্ধক্য এবং শতবর্ষীদের ব্যতিক্রমী বার্ধক্যের পার্থক্য স্পষ্ট করে।
গবেষকেরা রক্তের সিরামে মোট ৭২৪টি প্রোটিন পরিমাপ করেন। এর মধ্যে ৩৫৮টি প্রোটিন বিভিন্ন প্রদাহের সঙ্গে এবং ৩৬৬টি প্রোটিন হৃদ্রোগসংক্রান্ত জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষকেরা বলেন, এই ৭২৪টি প্রোটিনের মধ্যে ৩৭টি প্রোটিন একেবারেই চমকপ্রদ ফল দেখিয়েছে। শতবর্ষীদের ক্ষেত্রে এই ৩৭টি প্রোটিনের ধরন আশি বছরের বেশি বয়সীদের তুলনায় তরুণদের সঙ্গে বেশি মেলে। এর পরিমাণ মোট প্রোটিনের প্রায় ৫ শতাংশ। অর্থাৎ, শতবর্ষীরা পুরোপুরি বার্ধক্য এড়িয়ে যেতে পারেন না, তবে তাঁদের শরীরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়া অনেকটাই ধীরগতিতে চলে, যা তাঁদের দীর্ঘায়ুর একটি বড় কারণ।
বয়স বাড়লেও কিছু মানুষ কীভাবে সুস্থ থাকেগবেষকেরা রক্তের সিরামে মোট ৭২৪টি প্রোটিন পরিমাপ করেন। এর মধ্যে ৩৫৮টি প্রোটিন বিভিন্ন প্রদাহের সঙ্গে এবং ৩৬৬টি প্রোটিন হৃদ্রোগসংক্রান্ত জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই ৩৭টি প্রোটিনের মধ্যে আবার ৫টি প্রোটিন সরাসরি অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের সঙ্গে সম্পর্কিত। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যা ফ্রি র্যাডিক্যাল দ্বারা চালিত হয় এবং বার্ধক্যকে দ্রুততর করতে পারে। ফ্রি র্যাডিক্যাল সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সময় তৈরি হয়। এ ছাড়া, ত্রুটিপূর্ণ মাইটোকন্ড্রিয়াও অতিরিক্ত ক্ষতিকর অণু তৈরি করতে পারে, যা এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, শতবর্ষীরা কি তাহলে কম ফ্রি র্যাডিক্যাল তৈরি করে, নাকি তাদের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশি শক্তিশালী? আসলে শতবর্ষীদের শরীরে সাধারণ বয়স্কদের তুলনায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রোটিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে। প্রথমে ব্যাপারটা একটু অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এর মানে হলো, তাঁদের শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসই যেহেতু কম, তাই সেটা মোকাবিলা করার জন্য অতিরিক্ত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রোটিন তৈরি করার প্রয়োজনও কম পড়ে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এক্সট্রাসেলুলার ম্যাট্রিক্স বা কোষগুলোর মাঝে থাকা সিমেন্টের মতো গঠনগত ভিত্তি বজায় রাখতে যেসব প্রোটিন কাজ করে, সেগুলো শতবর্ষীদের শরীরে তুলনামূলকভাবে তরুণদের মতোই থাকে। এর পাশাপাশি কিছু প্রোটিন ক্যানসার প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখে।
কিছু মানুষ অল্প ঘুমিয়েও কীভাবে ভালো থাকেজিএলপি-১ ভেঙে দিয়ে ডিপিপি-৪ শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম রাখতে সাহায্য করে। ফলে অতিরিক্ত ইনসুলিন ও মেটাবলিক সিনড্রোমের ঝুঁকি কমে।
সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চর্বি বিপাকের সঙ্গে যুক্ত প্রোটিনের মাত্রা বেড়ে যায়। কিন্তু শতবর্ষীদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি অনেক কম হয়। একইভাবে, গুরুত্বপূর্ণ প্রদাহজনিত প্রোটিন ইন্টারলিউকিন-১ আলফার মাত্রাও তাঁদের শরীরে তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া গেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো ডিপিপি-৪ নামে একটি প্রোটিনকে ঘিরে। এই প্রোটিন জিএলপি-১ নামে একটি হরমোনকে ভেঙে দেয়। এই হরমোন ইনসুলিন উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে এবং ডায়াবেটিস ও স্থূলতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। শতবর্ষীদের ক্ষেত্রে ডিপিপি-৪ প্রোটিনটি বেশ ভালোভাবে সংরক্ষিত থাকে।
অর্থাৎ, জিএলপি-১ ভেঙে দিয়ে ডিপিপি-৪ শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম রাখতে সাহায্য করে। ফলে অতিরিক্ত ইনসুলিন ও মেটাবলিক সিনড্রোমের ঝুঁকি কমে।
লেখক: শিক্ষার্থী, কৃষিবিজ্ঞান বিভাগ, হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্স অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসূত্র: সাইটেকডেইলি ডটকমকিছু মানুষ অতীতের স্মৃতি কল্পনা করতে পারে না কেন