২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাল আইএমএফ, হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ

· Prothom Alo

করোনা মহামারি ও রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা সামলে বিশ্ব অর্থনীতি একরকম স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি পথ হারাতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

এ বাস্তবতায় বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস হ্রাস করেছে আইএমএফ। ২০২৬ সালের জন্য তাদের পূর্বাভাস—প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। আগের পূর্বাভাসের তুলনায় শূন্য দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট হ্রাস করেছে তারা। ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশে উঠতে পারে। বৈশ্বিক গড় মূল্যস্ফীতির হার উঠতে পারে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

Visit freshyourfeel.com for more information.

এটাই শেষ কথা নয়, যুদ্ধের প্রভাব শেষমেশ কী দাঁড়ায়, তা নির্ভর করবে মূলত যুদ্ধের সময়সীমা ও পরিসরের ওপর। অর্থাৎ যদি যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হয় এবং আরও অনেক দেশ এতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার আরও কমতে পারে। সে ক্ষেত্রে চলতি বছর প্রবৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৫ শতাংশে নামতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের চলমান বসন্তকালীন সভা উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ বা ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ।

ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়েরে–অলিভিয়ে গোরিনশা বলেন, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। এই হিসাবের পটভূমি হলো, ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দ্রুত থেমে যাবে এবং বছরের দ্বিতীয়ার্ধে জ্বালানির বাজার কিছুটা স্বাভাবিক হবে। তবে তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, বাস্তব পরিস্থিতি প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে, অর্থাৎ ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।

গোরিনশার ভাষায়, ‘আমরা এখন মূল পূর্বাভাস (৩ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি) ও প্রতিকূল পরিস্থিতির (২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি) মাঝামাঝি কোথাও আছি।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, সময় যত গড়াচ্ছে ও জ্বালানির সরবরাহ যতই বিঘ্নিত হচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতি ততই প্রতিকূল পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

আইএমএফ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক শীর্ষক প্রতিবেদনে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নীতিনির্ধারকদের কঠিন চ্যালেঞ্জের দিকে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, এর সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়া এবং একই সময়ে রাজস্ব সক্ষমতা পুনর্গঠন—সব মিলিয়ে একাধিক চাপ একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য মোটাদাগে যেসব ঝুঁকির ক্ষেত্র তারা চিহ্নিত করেছে, সেগুলো হলো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য বিরোধ, এআই খাত নিয়ে অতি আশা, বৃহৎ ঋণ ও আর্থিক ঘাটতি, সেই সঙ্গে কিছু ইতিবাচক দিকও চিহ্নিত করেছে আইএমএফ। সেগুলো হলো এআই ব্যবহারের মধ্য দিয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কাঠামোগত সংস্কারের চাপ, বাণিজ্য বিরোধের তীব্রতা হ্রাস, অসম বাস্তবতা করোনা মহামারির সময় যেমনটা হয়েছিল, এবারও তেমনটা হবে বলে মনে করে আইএমএফ। অর্থাৎ এই যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বের সব দেশে একইভাবে পড়বে না। সেই সঙ্গে এই অসমতার মাত্রাও হবে বেশি।

গোরিনশা বলেন, যেসব দেশ এই সংঘাতের মধ্যে পড়ে যাবে বা জড়িয়ে পড়বে, তারা এবং পণ্য আমদানিকারক, উদীয়মান ও নিম্ন আয়ের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হবে। তিনটি ক্ষেত্রে তারা সবচেয়ে আক্রান্ত হবে। প্রথমত, জ্বালানি ও খাদ্যের উচ্চ মূল্যের কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির চাপ। তৃতীয়ত, আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে আর্থিক বাজারে যে ধাক্কা আসবে, তা সামলানো।

গোরিনশা আরও বলেন, এখন যে বাস্তবতা, তাতে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার শঙ্কা আছে। অন্যদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার ও বিশ্ববাণিজ্যের বিদ্যমান বাধা অপসারণ করা হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে গতি আসতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে পরিষ্কার বলে দিতে হবে, প্রয়োজন হলে তারা ব্যবস্থা নেবে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে অর্থনীতির লাগাম টানতে সুদের হার বাড়ানো হবে। তবে যুদ্ধ স্বল্পস্থায়ী হলে ও মূল্যস্ফীতি সীমার মধ্যে থাকলে, তারা সময় নিয়ে দেখতে পারে।

হাতে সময় বেশি নেই। এই পরিস্থিতিতে রাজস্ব নীতি প্রণয়নে প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে বলে মনে করে আইএমএফ। আর্থিক প্রণোদনা দিতে হলে সবচেয়ে অরক্ষিত জনগোষ্ঠীকেই দিতে হবে। সেই সঙ্গে তাদের বার্তা, এই প্রণোদনার মেয়াদ হবে স্বল্পস্থায়ী; সেই নীতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ থাকতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই আর্থিক প্রণোদনার কারণে যেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ জটিল হয়ে না যায়।

তাৎক্ষণিক সমাধান খুঁজলেই চলবে না বলে মনে করে আইএমএফ। তাদের বার্তা, এই পরিস্থিতিতেও বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজতে হবে। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের কথা বলেছে তারা।

আইএমএফ মনে করে, যথাযথ নীতি প্রণয়ন ও শক্তিশালী বৈশ্বিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। সেই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির রাশ টেনে ধরা যাবে।

কোন দেশে কত প্রবৃদ্ধি

আইএমএফের পূর্বাভাস, চলতি ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ৩ এবং ২০২৭ সালে তা আরও কমে ২ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। ২০২৬ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি হবে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪ শতাংশ। ২০২৬ সালে ইউরো অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি হবে ১ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ১ দশমিক ২ শতাংশ।

গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে থাকবে ভারত। চলতি ২০২৬ সালে তাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে তা একই থাকবে। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে তা হবে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ ও ১ দশমিক ৩ শতাংশ।

এদিকে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছুটা পিছিয়ে পড়বে। এ বছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এমন পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। আগামী অর্থবছরে এই জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে মনে করছে আইএমএফ।

Read full story at source