নাসার আর্টেমিস–২ মিশনের নভোচারীরা নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ৫০ বছরের বেশি সময় পর চাঁদের চারপাশে প্রথম মানববাহী অভিযানটি সফলভাবে শেষ হলো।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে প্রবেশের পর ওরিয়ন নভোযানটি গত শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৭ মিনিটে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে, যা বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা ৭ মিনিটে হয়। ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলের কাছে এই অবতরণের মাধ্যমে নভোচারীরা তাঁদের যাত্রা শেষ করলেন।
Visit sports24.club for more information.
নভোযানটি সাগরে অবতরণের আগেই উদ্ধারকারী দলগুলো সেখানে প্রস্তুত ছিল। ক্যাপসুলটি সুরক্ষিত করতে ও ভেতরে থাকা নভোচারীদের বের করে আনতে দলের সদস্যরা দ্রুত কাজ শুরু করেন।
এই অভিযানে ছিলেন নাসার তিন মহাকাশচারী। তাঁরা হলেন রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডার মহাকাশচারী জেরেমি হ্যানসেন।
আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীদের সঙ্গে ৮ বছরের শিশুর তৈরি পুতুল কেনপৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের কয়েক মিনিট আগে মিশন কমান্ডার ওয়াইজম্যান রেডিওর মাধ্যমে জানান, তাঁরা জানালা দিয়ে চাঁদের একটি দৃশ্য দেখেছেন। তিনি রসিকতা করে বলেন, আগের দিনের তুলনায় চাঁদকে আজ কিছুটা ছোট দেখাচ্ছে। এর জবাবে হিউস্টন কন্ট্রোল রুম থেকে জানানো হয়, চাঁদ ছোট মনে হওয়ার অর্থ হলো তাঁরা এখন পৃথিবীর খুব কাছে ও তাঁদের ফিরে আসার সময় হয়েছে।
নাসার আর্টেমিস-২ চন্দ্রাভিযানের সাফল্যের পর সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন চার নভোচারীলকহিড মার্টিনের তৈরি ওরিয়ন মহাকাশযানের জন্য এই ফিরে আসার প্রক্রিয়াটি ছিল একটি বড় পরীক্ষা। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো চাঁদ থেকে পৃথিবীতে ফেরার সময় যে প্রচণ্ড তাপ ও চাপের সৃষ্টি হয়, এই যান তা নিরাপদে সহ্য করতে পারে।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় ক্যাপসুলটি ১৩ মিনিটের একটি কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। প্রচণ্ড গতিতে প্রবেশের ফলে বাতাসের ঘর্ষণে এর বাইরের অংশের তাপমাত্রা প্রায় ২ হাজার ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। এই অতিরিক্ত তাপের কারণে মহাকাশযানের চারপাশে ‘প্লাজমা’ নামের একটি গ্যাসের স্তর তৈরি হয়। যার ফলে কিছুক্ষণের জন্য মহাকাশচারীদের সঙ্গে কন্ট্রোল রুমের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
চাঁদে মানুষ পাঠাতে এখন কেন দেরি হচ্ছে, যদি ১৯৬৯ সালে সত্যই গিয়ে থাকেতবে প্যারাস্যুটগুলো খুলে যাওয়ার পর আবার যোগাযোগ চালু হয়। প্যারাস্যুটগুলো ওরিয়নের গতি কমিয়ে দেয় এবং মহাকাশযানটি ধীরে ধীরে সাগরের পানিতে অবতরণ করে।
আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারীকে ওরিয়ন ক্যাপসুল থেকে নিরাপদে বের করতে দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছে উদ্ধারকারী দলের স্পিডবোটঅবতরণের পর উদ্ধারকারী দল মহাকাশযানের দরজা খুলে একে একে নভোচারীদের বের করে আনে। নভোচারীরা জানান, ফেরার পথে সামান্য যোগাযোগ সমস্যা হয়েছিল। এ ছাড়া তাঁরা শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন।
মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে নাসার প্রতিনিধি জ্যারেড আইজ্যাকম্যান জানান, তাঁরা আবারও নভোচারীদের চাঁদে পাঠানো ও নিরাপদে ফিরিয়ে আনার সক্ষমতা অর্জন করেছেন। তিনি আরও জানান, নাসা পরবর্তী অভিযানগুলোর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।
এই চার নভোচারী প্রায় ১০ দিন আগে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। গত ১০ দিনে তাঁরা পৃথিবী থেকে এতটাই দূরে ভ্রমণ করেছেন, যা অ্যাপোলো মিশনের পর আর কোনো মানুষ করেনি। পৃথিবীতে ফিরে আসার আগে তাঁরা চাঁদের উল্টো পাশে ভ্রমণ করেন। সেই সময় ভবিষ্যতের অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন যান্ত্রিক ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখেন তাঁরা।
আর্টেমিস–২ মিশনের নভোচারীরা পৃথিবীতে ফিরবেন যেভাবেআর্টেমিস–২ অভিযানটি ভবিষ্যতের বড় বড় চন্দ্রাভিযানের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এর মূল লক্ষ্য হলো আর্টেমিস–৪ অভিযানের জন্য পথ তৈরি করা, যার মাধ্যমে অ্যাপোলো যুগের পর প্রথমবারের মতো মানুষ আবার চাঁদের মাটিতে নামবে।
প্রকৌশলীরা এখন এই অভিযান থেকে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই করে দেখবেন। বিশেষ করে ওরিয়ন ক্যাপসুলের তাপরোধী ঢাল কতটা ভালো কাজ করেছে এবং মহাকাশযানের দিকনির্ণয় ও অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা ঠিক ছিল কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। মানুষকে মহাকাশে নিরাপদে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই প্রযুক্তিগুলো অত্যন্ত জরুরি।
এই অভিযান বেশ কিছু নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে। ভিক্টর গ্লোভার প্রথম অশ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি, ক্রিস্টিনা কোচ প্রথম নারী ও জেরেমি হ্যানসেন প্রথম ব্যক্তি। তিনি আমেরিকান না হয়েও নাসার মিশনে চাঁদের চারপাশে ভ্রমণ করার রেকর্ড গড়েছেন।
আইসক্রিম খাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা মহাকাশআর্টেমিস ২ অভিযানে অংশ নেওয়া চার নভোচারীযাত্রাপথে নভোচারীরা চাঁদের উপরিভাগ দেখেন এবং এর বর্ণনা দেন। এ ছাড়া তাঁরা মহাকাশ থেকে একটি সূর্যগ্রহণ ও উল্কাপাতের দৃশ্যও সরাসরি দেখার সুযোগ পান।
মিশন কমান্ডার ওয়াইজম্যান বলেন, ‘তাঁরা এই অভিযানের মাধ্যমে সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন আমাদের পৃথিবী মহাবিশ্বের এক অনন্য ও সুন্দর জায়গা। আমাদের এই গ্রহের যত্ন নেওয়া উচিত।’
নাসার একটি মজার নিয়ম অনুযায়ী এই অভিযানের সময় প্রতিদিন সকালে নভোচারীদের ঘুম ভাঙানোর জন্য একটি করে গান পাঠানো হতো। শুক্রবার তাঁদের শেষ সকালে ‘রান টু দ্য ওয়াটার’ ও ‘ফ্রি’ নামের দুটি গানের মাধ্যমে ঘুম থেকে জাগানো হয়।
সূত্র: সিএনএন, নাসা, আল–জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ানসব কোকিল কালো নয়