টোল প্লাজার ভোগান্তিতে নষ্ট হওয়া দরিয়ার মাছ

· Prothom Alo

ঢাকার বাজারে মাছ বিক্রেতারা ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে হরহামেশা বলে থাকেন, ‘অরিজিনাল নদীর মাছ। মাছ খাইয়া তারপর পয়সা দিয়েন, স্যার।’ মাছ খাওয়ার পর আসলেও ভালো না লাগলে পয়সা দেওয়া বা না দেওয়ার ব্যাপারটা কীভাবে সমাধান হবে, সেটি কৌতূহল উদ্দীপক ব্যাপার বটে।

Visit extonnews.click for more information.

তবে গত ঈদে বাড়ি গিয়ে নদীর মাছ কিনতে গেলে দেখি, এখানে বলে ‘দরিয়ার’ মাছ। ট্যাংরা, বাটা, কোরাল, বাইলা, আরও কত–কী। ঢাকা শহরে বসে তরতাজা এই দরিয়ার মাছের স্বাদ পাওয়াটা কিছুটা হলেও স্বপ্নের মতো।

তার সঙ্গে আবার যুক্ত হয় মায়ের হাতের রান্না। চকচকে বিজ্ঞাপনে টিভিতে দেখানো গুঁড়া মসলার রান্না নয়, শিলপাটায় বাটা লাল মরিচের টকটকে লাল ঝাল দিয়ে মাটির চুলায় রান্না। ফিরতি পথে সেই সুস্বাদু দরিয়ার মাছ টিফিন বক্সে নিয়ে রওনা হলাম রাজধানীর উদ্দেশে। বাড়ি যাওয়ার সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এবারের ঈদযাত্রা খারাপ ছিল না। ঈদের দুই দিন আগে খুব বেশি জ্যাম বা রাস্তার কাজে বিকল্প সড়ক ব্যবহারজাতীয় কিছুর সম্মুখীন আমাকে অন্তত হতে হয়নি।

ঢাকায় ফেরার পথে সড়কে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত গাড়ির চাপ থাকলেও ঠিকই এগিয়ে চলছিল গাড়িগুলো। কিন্তু সেই স্বস্তি ধূলিসাৎ হয়ে গেল টোল প্লাজায় এসে। দাউদকান্দি ব্রিজে ওঠার আগে কয়েক কিলোমিটার লম্বা টোল প্লাজার লাইনের জ্যাম, কয়েক ঘণ্টার বসে থাকা, কয়েক হাজার লিটারের জ্বালানি নষ্ট। বৈশ্বিক তেলের সংকটে জ্বালানি সাশ্রয়ের যে নির্দেশনা সরকার দিয়েছিল, নির্দেশনা ছাড়াই তার অনেক বেশি পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় করা যেত শুধু টোল প্লাজাগুলোর সুব্যবস্থাপনা করতে পারলে।

দাউদকান্দি ব্রিজ, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে টোল দেওয়ার লাইনে অপেক্ষার কারণে পুরো রাস্তা ফাঁকা থাকার পরও সাড়ে চার ঘণ্টার পথ সাড়ে সাত ঘণ্টায় শেষ করে যেই না একটু বাসায় এসে খাবার খেতে বসেছি, দরিয়ার মাছ ততক্ষণে নষ্ট হয়ে গেছে।

ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘আ চেইন ইজ অনলি অ্যাজ স্ট্রং অ্যাজ ইটস উইকেস্ট লিংক’, অর্থাৎ একটি চেইন বা দড়ি সেটির সবচেয়ে দুর্বল অংশের সমান শক্তিশালী। দড়ির অন্য অংশ যত মজবুতই হোক না কেন, জোরে টান পড়লে সেটি সরু অংশ দিয়ে ছিঁড়ে যাবে। পুরো মহাসড়কে কোনো ধরনের জ্যাম বা ভোগান্তি ছাড়া চলে এলেও শুধু এই টোল প্লাজার লাইনে আটকে পড়ার কারণে না কমল যাত্রার সময়, না কমল ভোগান্তি। অথচ পূর্বপরিকল্পনা করলে এই ভোগান্তি দূর করা সম্ভব।

রেলসেবা ও ১০ টাকার পাবলিক টয়লেট–নির্ভর পর্যটন

কে জানে না ঈদে, পূজায় বা বড় কোনো ছুটির সময়ে সড়কে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি গাড়ি থাকবে? কে জানে না টোল দেওয়ার জন্য গাড়িগুলোকে লম্বা লাইনে অপেক্ষা করতে হবে? গাড়ি না থামিয়ে টোল দেওয়ার যে ‘ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন’ পদ্ধতি, সেটি সিঙ্গাপুর প্রথম নিয়ে এসেছিল ১৯৭৫ সালে। বর্তমানে প্রযুক্তি আরও উন্নত ও সহজতর। এখন হাতে হাতে স্মার্টফোন, দেশব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগ, অর্থ পরিশোধের জন্য আছে এমএফএস, ক্রেডিট কার্ডসহ নানা উপায়। ধরে নিলাম, আমাদের চালকদের অনীহা বা প্রযুক্তি জনপ্রিয়করণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ব্যর্থতায় প্রযুক্তিগত সমাধান অকার্যকর। কিন্তু সেটি ছাড়াও অন্তত এক ডজন উপায় আছে, যাতে সমস্যাগুলোর সমাধান বা আংশিক সমাধান করা যায়।

সবচেয়ে সহজ সমাধান উৎসবের সময় সরকারের পক্ষ থেকে টোল মওকুফ করার ব্যবস্থা করা। তাতে যদি সরকারের রাজভান্ডার খালি হয়ে খাঁ খাঁ করার উপক্রম হয়, তাহলে আছে জরুরি ভিত্তিতে কয়েক দিনের জন্য বিকল্প পন্থা অবলম্বন করা। যেমন গাড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে টোল প্লাজায় যাবে না, বেশ কিছু লোক টোল সংগ্রহের দায়িত্বে থাকবেন এবং তাঁরা গাড়ির কাছে এসে নির্দিষ্ট টাকা নিয়ে রসিদ দিয়ে দেবেন। হতে পারে, শুধু নির্দিষ্ট এক জায়গায় টোল দেওয়ার ব্যবস্থা না রেখে, সেতু এলাকার আগে পাঁচ কিলোমিটার পরপর একাধিক টোল স্টেশন থাকবে। একটিতে লাইন বড় হয়ে গেলে, গাড়িগুলো পরেরটিতে যাবে।

শুধু ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করাকেই গ্রাহকসেবা বলে না

এমনটাও হতে পারে যে ভাংতি দিতে হয়, সে রকম ফির বদলে অল্প কয়েক দিনের জন্য সহজে লেনদেন করা যায়, সে পরিমাণ ফি নির্ধারণ করা। যেমন ৫৫ টাকা টোল দেওয়ার জন্য ১০০ টাকার নোট দেওয়া হলে, কর্তব্যরত ব্যক্তি ভাংতি দিতে দিতে আর টাকা গুনতে গুনতেই বেশির ভাগ সময় নিয়ে ফেলেন। এখানে যদি ফি পরিবর্তন করে কয়েক দিনের জন্য ৫০ টাকা করা হয়, তাতেও সমস্যার আংশিক সমাধান হয়ে যায়।

এ সব কটি সমাধানেরই বাস্তবায়ন করার কিছু অসুবিধা আছে, সেটি থাকবেই। অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনায় এগুলো হয়তো বাস্তবায়নযোগ্যও হবে না। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান ঠিকই বের করতে পারা উচিত। নাগরিক সেবা প্রদান যদি সরকারের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের আগামী ঈদের আগেই এই বিকল্প ব্যবস্থাগুলো নিয়ে পরিকল্পনা করা উচিত।

দাউদকান্দি ব্রিজ, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে টোল দেওয়ার লাইনে অপেক্ষার কারণে পুরো রাস্তা ফাঁকা থাকার পরও সাড়ে চার ঘণ্টার পথ সাড়ে সাত ঘণ্টায় শেষ করে যেই না একটু বাসায় এসে খাবার খেতে বসেছি, দরিয়ার মাছ ততক্ষণে নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ বলবে মাছ বরফ দিয়ে আনা উচিত ছিল, কেউ বলবে রাস্তায় বসে খেয়ে নেওয়া উচিত ছিল, কেউ কেউ আবার বলবে বাড়ি থেকে খেয়ে এলেই হতো, আবার সঙ্গে আনার কী দরকার। হয়তো কেউই বলবে না, টোল প্লাজায় লম্বা লাইনে অপেক্ষার সমাধান হওয়া উচিত। হয়তো আমরা সবাই মেনে নিয়েছি, এসব ভোগান্তিই আমাদের নিয়তি। দরিয়ার নষ্ট মাছ সামনে রেখে আমার কানে তখন বাজছে, ‘অরিজিনাল নদীর মাছ। মাছ খাইয়া তারপর পয়সা দিয়েন, স্যার।’

  • ড. বি এম মইনুল হোসেন অধ্যাপক ও পরিচালক, তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ই–মেইল: [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source