হাজার বছর আগের কথা। কোনো এক গ্রামের একটি শিশুর গায়ে এক সকালে হালকা জ্বর এল। মা ভাবলেন, সাধারণ সর্দি-কাশি। কিন্তু দুদিন যেতে না যেতেই শিশুর চোখ দুটি জবা ফুলের মতো লাল হয়ে উঠল। সঙ্গে শুরু হলো প্রচণ্ড কাশি। তার পরেই দেখা দিল গালের ভেতরে লবণের দানার মতো ছোট ছোট সেই ভয়ংকর চিহ্ন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই চিহ্ন ছড়িয়ে পড়লকানের পেছন থেকে শুরু করে সারা শরীরে। শিশুর সারা শরীর ভরে গেল লাল লাল ফুসকুড়িতে। গ্রামজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কারণ সবাই জানে, এই লাল দানব একবার ধরলে আর রক্ষা নেই!
Visit casino-promo.biz for more information.
আজকের আলোচিত হাম বা মিজলসই হলো ইতিহাসের সেই লাল দানব। এই ভাইরাসের সঙ্গে মানুষের লড়াইয়ের গল্পটি কোনো থ্রিলার উপন্যাসের চেয়ে কম নয়।
হামের ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম মিজলস মরবিলিভাইরাস (Measles morbillivirus)। এটি প্যারামিক্সোভিরিডি পরিবারের এবং মরবিলিভাইরাস গণের সদস্য। তবে আমাদের এই চিরচেনা হাম ভাইরাসটি কিন্তু চিরকাল মানুষের ছিল না। হামের ভাইরাস মূলত একটি জুনোটিক রোগ। অর্থাৎ এটি অন্য প্রাণী থেকে মানুষের দেহে এসেছে।
মিজলস মরবিলিভাইরাসপ্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, যখন মানুষ কেবল পশুপালন শিখছে, তখন গরুর মধ্যে রিন্ডারপেস্ট নামে এক মহামারি চলত। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, গরুর সেই ভাইরাসটিই বিবর্তিত হয়ে মানুষের শরীরে জায়গা করে নেয়। মিজলস মরবিলিভাইরাস একটি আরএনএ ভাইরাস হওয়ায় এই ধারণাটিই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য। আমাদের শরীরে যেমন ডিএনএ থাকে, এই ভাইরাসের ভেতরে তেমনি থাকে আরএনএ। এটি অনেকটা ভাইরাসের ব্লু-প্রিন্ট বা নির্দেশিকা বইয়ের মতো কাজ করে। সেটা ব্যবহার করে ভাইরাসটি মানুষের শরীরের ভেতর নিজের লাখ লাখ কপি তৈরি করতে পারে।
হাম, চিকেন পক্স, চোখ ওঠা একবারই আক্রমণ করে?হামের ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম মিজলস মরবিলিভাইরাস। এটি প্যারামিক্সোভিরিডি পরিবারের এবং মরবিলিভাইরাস গণের সদস্য।
দশম শতাব্দীর পারস্যের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আল-রাজি একদিন পাণ্ডুলিপিতে রোগের লক্ষণ লিখতে লিখতে খেয়াল করলেন, গুটিবসন্ত ও হাম এক জিনিস নয়। ভিন্ন দুটি রোগ, তাই এদের প্রতিকারও হবে ভিন্ন। শত্রুকে আলাদা করে চিনে রাখার শুরুটা মূলত সেখান থেকেই। এরপর কয়েক শতাব্দী ধরে এই ভাইরাসটি মানুষের শরীরে চেপে, জাহাজে চড়ে ইউরোপ থেকে আমেরিকায় গিয়ে সেখানকার আদিবাসীদের রীতিমতো নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। এই অদৃশ্য ভাইরাসটি তখন ছিল ধারালো তলোয়ারের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।
সত্যি বলতে, এই ভাইরাসটি এতই শক্তিশালী ও ছোঁয়াচে যে আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো ঘর থেকে চলে যাওয়ার ২ ঘণ্টা পরও সেই ঘরের বাতাসে ভাইরাসটি ভেসে বেড়াতে পারে এবং অন্য কাউকে সংক্রমিত করতে পারে!
দশম শতাব্দীর পারস্যের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আল-রাজির প্রতীকী ছবিভাইরাসের আক্রমণ পদ্ধতিটি কাজ করে অনেকটা তালা-চাবির মতো। এই ভাইরাসের চারদিকে চর্বির বা লিপিডের একটি পাতলা স্তর থাকে। এই স্তরের ওপর ছোট ছোট কাঁটার মতো থাকে প্রোটিন। এই কাঁটাগুলো অনেকটা চাবির মতো কাজ করে, যা আমাদের শরীরের সুস্থ কোষের ‘তালা’ খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে। আর ভাইরাসটি যখন একবার কোষের ভেতর ঢোকে, তখন কোষের নিজস্ব যন্ত্রপাতির দখল নিয়ে নেয় এবং কোষকে বাধ্য করে নিজের মতো আরও নতুন নতুন ভাইরাস তৈরি করতে। তবে আশার কথা হলো, হামের ভাইরাস কেবল মানুষের শরীরেই বাস করতে পারে। মশা বা অন্য কোনো পশুপাখির মাধ্যমে এটি ছড়ায় না।
আবার লাল দানবের গল্পে ফেরা যাক। ১৮৪৬ সাল। আটলান্টিকের বুকে ছোট একটি দ্বীপপুঞ্জ ফারো আইল্যান্ড। সেখানে দীর্ঘ ৬৫ বছরে কারও হাম হয়নি। হঠাৎ এক জাহাজ থেকে এক অসুস্থ যাত্রী সেখানে নামলেন, আর দাবানলের মতো পুরো দ্বীপে রোগটি ছড়িয়ে পড়ল।
নিপাহ ভাইরাস আবার কেন আলোচনায়হাম ভাইরাসটি এতটাই শক্তিশালী ও ছোঁয়াচে যে আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো ঘর থেকে চলে যাওয়ার ২ ঘণ্টা পরও সেই ঘরের বাতাসে ভাইরাসটি ভেসে বেড়াতে পারে এবং অন্য কাউকে সংক্রমিত করতে পারে!
সেখানে পাঠানো হলো তরুণ ড্যানিশ ডাক্তার পিটার প্যানামকে। তিনি এক অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করলেন। যারা ৬৫ বছর আগে একবার হামে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে গিয়েছিল, তারা এবার একদম সুস্থ! ভাইরাস তাদের গায়ে এতটুকু আঁচড়ও কাটতে পারছে না। ডাক্তার প্যানাম সেখান থেকেই বুঝতে পারলেন, হাম একবার হলে শরীর তাকে চিনে ফেলে এবং তৈরি করে এক অমর স্মৃতি বা লাইফটাইম ইমিউনিটি। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারই পরে টিকার মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়াল।
মরিস হিলম্যানহাম তখনকার সময়ের অন্যতম প্রাণঘাতী রোগ ছিল। বিজ্ঞানীরা এর হাত থেকে রক্ষা পেতে লাগাতার গবেষণা চালাতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪ সালে হার্ভার্ডের ল্যাবরেটরিতে জন এন্ডার্স এবং তাঁর সহকারী থমাস পিবলস নামে এক ছোট ছেলের শরীর থেকে ভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ করলেন। বারবার চেষ্টা ও দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর এন্ডার্স বাহিনী সেই ভাইরাসটিকে ল্যাবরেটরির টেস্ট টিউবে পোষ মানাতে সক্ষম হন। এভাবেই প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীদের হাতে এল মিজলস মরবিলিভাইরাস। এটি ছিল বিজ্ঞানের এক বিরাট জয়!
তবে আসল চমকটি আসে মরিস হিলম্যানের হাত ধরে। সাল ১৯৬৩, হঠাৎ এক দিন হিলম্যানের ছোট মেয়ে জেরিল লিন হামে আক্রান্ত হয়। বাবা হিসেবে হিলম্যান কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়লেও বিজ্ঞানী হিলম্যান দেখলেন এক চমৎকার সুযোগ হিসেবে! মেয়ের গলার ভেতর থেকে তিনি ভাইরাসের নমুনা নিলেন। সেই ভাইরাসটিকে ল্যাবরেটরিতে দিনের পর দিন দুর্বল করলেন। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে অ্যাটেনুয়েশন।
মাঙ্কিপক্স কী ও কেনহাম ভাইরাসটি আসলে অত্যন্ত দক্ষ অনুপ্রবেশকারী, যার কিছু নিজস্ব সিগনেচার লক্ষণ আছে। বাতাসের মাধ্যমে এটি ঢুকে পড়ে ফুসফুসে; সেখান থেকে রক্তের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে পুরো শরীরে।
হিলম্যান ভাইরাসটিকে নিয়ে ল্যাবরেটরিতে এক অদ্ভুত পরীক্ষা শুরু করলেন। তিনি ভাইরাসটিকে মানুষের কোষের বদলে মুরগির ভ্রূণের কোষে বারবার কালচার করতে থাকলেন। ভাইরাসটি অভ্যস্ত ছিল মানুষের শরীরে বংশবৃদ্ধি করতে, কিন্তু হিলম্যান তাকে বাধ্য করলেন ভিন্ন পরিবেশে, মুরগির কোষে বড় হতে। এভাবে প্রায় ৪০ বার এক কোষ থেকে অন্য কোষে স্থানান্তর করার পর, ভাইরাসটি তার আসল হিংস্রতা হারিয়ে ফেলল। মূলত মুরগির কোষের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে মানুষের শরীরে রোগ তৈরির ক্ষমতার স্মৃতি ভাইরাসটি তার আরএনএ থেকে প্রায় ভুলেই গেল!
এই দুর্বল হয়ে যাওয়া ভাইরাসটিই হলো আজকের লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড ভ্যাকসিন। এটি যখন টিকার মাধ্যমে শিশুর শরীরে ঢোকানো হয়, তখন এটি আর রোগ তৈরি করতে পারে না। কিন্তু আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম তাকে দেখে মনে করে, এ তো সেই ভয়ংকর শত্রু, লাল দানব!
তখন শিশুর শরীরের অ্যান্টিবডি এই দুর্বল ভাইরাসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাকে হারানোর কৌশল শিখে নেয়। ফলে ভবিষ্যতে যখন কোনো শক্তিশালী বা আসল হাম ভাইরাস শরীরে ঢোকার চেষ্টা করে, তখন শরীরের অ্যান্টিবডি আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে এবং মুহূর্তেই তাকে ধ্বংস করে দেয়।
হাম ভাইরাসটি আসলে অত্যন্ত দক্ষ অনুপ্রবেশকারী, যার কিছু নিজস্ব সিগনেচার লক্ষণ আছে। বাতাসের মাধ্যমে এটি ঢুকে পড়ে ফুসফুসে; সেখান থেকে রক্তের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে পুরো শরীরে। টিকার ডোজ নেওয়া না থাকলে শরীর প্রথমে বুঝতেই পারে না কী ঘটছে! প্রথমে এটি আসে সাধারণ জ্বরের ছদ্মবেশে। এর দু-তিন দিন পর গালের ভেতরে ছোট ছোট লবণের দানার মতো দাগ দেখা দেয়, যাকে বলা হয় কপলিক স্পট। এটিই হলো হামের নিজস্ব সিগনেচার।
অ্যান্টিবায়োটিকে ভাইরাস নির্মূল করা যায় না কেন?একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও হামের প্রকোপ মাঝেমধ্যে দেখা যায়। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেমন, ভ্যাকসিন হেজিটেন্সি বা টিকা নিয়ে মানুষের মনে থাকা নানা ভুল ধারণা বা ভয়।
তারপর শুরু হয় সারা শরীরে লাল ফুসকুড়ি। সঠিক সময়ে ভিটামিন এ এবং যত্ন না পেলে এই ভাইরাসটি শিশুর মস্তিষ্ক বা ফুসফুসকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে দিতে পারে। তাই হাম থেকে বাঁচতে টিকার কোনো বিকল্প নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী হামের টিকা সাধারণত দুই ডোজে দেওয়া হয়:
প্রথম ডোজ: শিশুর বয়স ৯ মাস পূর্ণ হলে (হাম-রুবেলা বা MR টিকা হিসেবে)।
দ্বিতীয় ডোজ: শিশুর বয়স ১৫ মাস পূর্ণ হলে।
হাম যখন শুরু হয় তখন সারা শরীরে লাল ফুসকুড়ি ওঠেমনে রাখা জরুরি, হামের টিকা শরীরে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং সমাজে হার্ড ইমিউনিটি তৈরিতে সাহায্য করে। তবে দুঃখের বিষয় হলো, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও হামের প্রকোপ মাঝেমধ্যে দেখা যায়। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেমন, ভ্যাকসিন হেজিটেন্সি বা টিকা নিয়ে মানুষের মনে থাকা নানা ভুল ধারণা বা ভয়। আবার আমরা অনেকেই জানি না যে ভিটামিন এ-এর অভাব শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় টিকার কোল্ড চেইন বজায় রাখা এবং সঠিক সময়ে টিকা পৌঁছানোও বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এগুলো আমাদের অবকাঠামোগত দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।
সব রোগের টিকা নেই কেনমনে রাখা জরুরি, হামের টিকা শরীরে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং সমাজে হার্ড ইমিউনিটি তৈরিতে সাহায্য করে।
হাম শুধু একটি সাধারণ অসুখ নয়, এটি মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হামের মহামারিতে জীবন দিয়েছে অগণিত শিশু ও বয়স্ক মানুষ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন আমাদের এই মরণব্যাধি থেকে মুক্তি দিয়েছে ঠিকই, তবে মানুষের মধ্যে সচেতনতা না বাড়লে এই শান্ত হয়ে থাকা ভাইরাসটি আবারও যেকোনো সময় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। তাই প্রতিটি শিশুকে সঠিক সময়ে টিকা দেওয়া এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যে বিশ্বাস রাখা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব।
লেখক: শিক্ষার্থী, চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল রিলেশনশিপ, গভ. কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড হিউম্যান সায়েন্সসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাদ্য কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অব ফিলাডেলফিয়া: হিস্ট্রি অব ভ্যাকসিনস টাইমলাইনসেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন: পিংক বুক অন ভ্যাকসিন-প্রিভেন্টেবল ডিজিজেসআল-রাজি: ট্রিটাইজ অন দ্য স্মলপক্স অ্যান্ড মিজলসপ্যানাম, পি. এল.: অবজারভেশনস মেড ডিউরিং দ্য এপিডেমিক অব মিজলস অন দ্য ফারো আইল্যান্ডস ইন দ্য ইয়ার ১৮৪৬অফিট, পল এ.: ভ্যাকসিনেটেড—ওয়ান ম্যানস কোয়েস্ট টু ডিফিট দ্য ওয়ার্ল্ডস ডেডলিয়েস্ট ডিজিজেসরোগমুক্ত পৃথিবী গড়া সম্ভব?