গত দুই বছর আগে পুরো বিশ্বকে আক্ষরিক অর্থেই এলোমেলো করে দিয়ে বিদায় নিয়েছিল এল নিনো। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জন্ম নেওয়া এই ভয়ংকর জলবায়ু চক্রের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাংশে দেখা দিয়েছিল স্মরণকালের ভয়াবহ বৃষ্টিপাত। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পুড়েছিল মারাত্মক খরায়। বৈশ্বিক তাপমাত্রার পারদ এমন জায়গায় পৌঁছেছিল, যা এর আগে পৃথিবী কখনো দেখেনি। এবার জাতিসংঘের আবহাওয়া পূর্বাভাসকেরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, ২০২৬ সালে এই ভয়ংকর এল নিনো আবারও ফিরে আসতে পারে! এখনই শতভাগ নিশ্চিত করে বলা না গেলেও বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এল নিনো এবং এর ঠিক বিপরীত অবস্থা লা নিনা—দুটি শব্দের সঙ্গে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। কিন্তু এদের আসল শক্তিটা ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছে?
Visit newsbetting.bond for more information.
এল নিনো এবং এর ঠিক বিপরীত অবস্থা লা নিনাএর পেছনের মূল কারিগর হলো প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা এবং বায়ুপ্রবাহের যুগলবন্দী! সাধারণ সময়ে বিষুবীয় অঞ্চলে পুবালি বাতাস মহাসাগরের গরম পানিকে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এল নিনোর সময় এই বাতাস দুর্বল হয়ে যায়। ফলে উল্টো ঘটনা ঘটে! প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম দিকের উষ্ণ পানি ধীরে ধীরে ফিরে এসে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের দিকে জমতে শুরু করে।
এল নিনো কী?সাধারণ সময়ে বিষুবীয় অঞ্চলে পুবালি বাতাস মহাসাগরের গরম পানিকে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এল নিনোর সময় এই বাতাস দুর্বল হয়ে যায়। ফলে উল্টো ঘটনা ঘটে!
মহাসাগরের এই তাপমাত্রার পরিবর্তন পুরো পৃথিবীর আবহাওয়ায় এক বিশাল ধারাবাহিক পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয়। ফলে একদিকে যেমন আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে মুষলধারে বৃষ্টি হয়, অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের অপর প্রান্তের দেশগুলো চরম শুষ্কতায় ভুগতে থাকে। বিপরীতক্রমে, লা নিনার সময় আমেরিকার উত্তরাঞ্চলে ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া বিরাজ করে, আটলান্টিক মহাসাগরে হারিকেনের প্রকোপ বাড়ে এবং এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।
এল নিনো এবং লা নিনা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট চক্র মেনে চলে। বর্তমানে পৃথিবীতে একটি দুর্বল লা নিনা চলছে, যা ইতিমধ্যেই শেষের পথে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এবং ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের দেওয়া ২০২৬ সালের মার্চের সবশেষ উপাত্ত বলছে, আবহাওয়া এখন একটি নিরপেক্ষ অবস্থার দিকে যাচ্ছে।
ডব্লিউএমওর মতে, এ বছরের মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে এল নিনো ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রায় ৪০ শতাংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া সংস্থা এনওএএ-এর পূর্বাভাস আরও একটু ভয়ংকর! তাদের মতে, গ্রীষ্মের মাঝামাঝি অর্থাৎ জুন থেকে আগস্টের মধ্যেই ৬২ শতাংশ সম্ভাবনা আছে, এল নিনো তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে ফিরে আসবে এবং ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত তা স্থায়ী হবে।
প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের নিচের পানি ইতিমধ্যেই অনেক বেশি গরম হতে শুরু করেছে। কিছু আবহাওয়া মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই বিপুল পরিমাণ তাপশক্তি যেভাবে পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে এটি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে একটি সুপার এল নিনোতে রূপ নিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না!
আসছে এল নিনো, বাড়তে পারে গরমলা নিনার সময় আমেরিকার উত্তরাঞ্চলে ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া বিরাজ করে, আটলান্টিক মহাসাগরে হারিকেনের প্রকোপ বাড়ে এবং এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।
বিজ্ঞানের ভাষায়, প্রশান্ত মহাসাগরের একটি নির্দিষ্ট অংশের গড় তাপমাত্রা যদি স্বাভাবিকের চেয়ে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায় এবং তা টানা অনেক দিন স্থায়ী হয়, তবে তাকে এল নিনো ঘোষণা করা হয়। আর যদি তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ০.৫ ডিগ্রি কমে যায়, তবে সেটি লা নিনা।
প্রকৃতির এই খামখেয়ালি আচরণ এত আগে থেকে নিখুঁতভাবে বলা বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং, বিশেষ করে বসন্তকালের এই সময়ে পূর্বাভাসের নিশ্চয়তা কিছুটা কম থাকে। কিন্তু এত অনিশ্চয়তার পরও এল নিনো আসছে—এমন একটি আগাম সতর্কতা পুরো বিশ্বের জন্য মহামূল্যবান।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সেক্রেটারি-জেনারেল সেলেস্টে সাউলো এই বিষয়ে জানিয়েছেন, ‘এল নিনো এবং লা নিনার এই আগাম পূর্বাভাসগুলো আমাদের কোটি কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। কৃষি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি এবং পানি ব্যবস্থাপনার মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতগুলোর জন্য এই পূর্বাভাসগুলো লাইফ জ্যাকেটের মতো কাজ করে। এটি শুধু দুর্যোগের ঝুঁকিই কমায় না, বরং শেষ পর্যন্ত অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচায়।’
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এই যুগে প্রকৃতির এই চরম আচরণগুলোর জন্য আগে থেকে প্রস্তুত থাকার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়, শশিকর, মাদারীপুরসূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকানঘূর্ণিঝড়গুলো কেন দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে?