বাঙালি জাতির জীবনে মার্চ মাসটি এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। ১৯৭১ সালের এই মাসেই তৎকালীন পাকিস্তানের বাঙালিরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারা আর সেই রাষ্ট্রের অংশ থাকবে না। দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে পশ্চিম পাকিস্তানিদের চরম বৈষম্য ও বঞ্চনাই বাঙালিদের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য করেছিল, অথচ ১৯৪৭ সালে এই মানুষগুলোই স্বেচ্ছায় পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিল। ২৫ মার্চের কালরাতেই আমাদের যেকোনো মূল্যে স্তব্ধ করে দিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়া হয়। আমি এখানে বাংলাদেশের ইতিহাস শোনাতে বসিনি; বরং সেই উত্তাল দিনগুলোতে আমাদের ‘হোসেন পরিবার’ কী অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, স্মৃতি হাতড়ে সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
আমাদের পরিবারটি এখন বেশ বড়, পৃথিবীর চারটি মহাদেশজুড়ে সবাই ছড়িয়ে আছে। তবে সে যুগে পরিবারটা নেহাতই ছোট ছিল। দাদা (আমার বড় ভাই মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন) তখন সপরিবার করাচিতে, আর ফারুক (ছোট ভাই মোহাম্মদ জাকির হোসেন) পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে সুই গ্যাস ফিল্ডে কর্মরত। পরিবারের বাকি সবাই আমরা ঢাকার খিলগাঁওয়ে থাকতাম।
Visit solvita.blog for more information.
একাত্তরের মার্চের সেই দিনগুলো ছিল দারুণ উত্তেজনাকর; প্রতিদিনই নতুন নতুন ঘটনা ঘটছিল, যা পাকিস্তানের চূড়ান্ত পতনকে একটু একটু করে এগিয়ে আনছিল।
ঢাকায় নবনির্বাচিত জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন বসার কথা ছিল, কিন্তু ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান হঠাৎ তা স্থগিত ঘোষণা করলেন। এর আগেই, ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে গোটা পাকিস্তানে প্রথমবারের মতো ‘এক ব্যক্তি এক ভোট’ ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি ছিল বাঙালি, তাই সংসদে পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে পূর্ব পাকিস্তানের আসন সংখ্যাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে এককভাবে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট লাভ করেছিল। এর অর্থ দাঁড়ায়, শেখ মুজিব হবেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং তিনি তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের সুযোগ পাবেন। আর ছয় দফা বাস্তবায়ন মানেই হলো একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম হওয়া, যার মাধ্যমে ক্ষমতার বড় একটি অংশ ঢাকার হাতে চলে আসবে।
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে পাকিস্তান শাসন করে আসা রাজনৈতিক-সামরিক আঁতাত কোনোভাবেই তা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।
অধিবেশন স্থগিতের এই ঘোষণায় গোটা পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। প্রতিবাদ-বিক্ষোভ শুরু হয় এবং পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন প্রাণ হারালে পরিস্থিতি আরও অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। ওই একই দিনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিমানে করে ঢাকায় ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ ঘটতে শুরু করে। কয়েক সপ্তাহ আগেই একটি ভারতীয় যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে লাহোরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ওই ঘটনায় পাকিস্তানের ইন্ধন থাকায় ভারত সরকার তাদের আকাশসীমায় পিআইএ (পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস)-এর বিমান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে পাকিস্তানি বিমানগুলোকে বাধ্য হয়ে কলম্বো ঘুরে অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হচ্ছিল। বিমানবাহিনীতে কর্মরত আমাদের এক বন্ধুর কাছ থেকে আমরা এই সৈন্য সমাবেশের খবরটি পাই এবং অন্য এক বন্ধুর মাধ্যমে তা বঙ্গবন্ধুর (নেতার) কাছে পৌঁছে দিই।
আমরা একরকম উপলব্ধি করতে পারছিলাম যে চোখের সামনেই যুগান্তকারী সব ঘটনা ঘটে চলেছে। প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, কিন্তু আমাদের চেতনা দেশের ও দশের সঙ্গেই ছিল। প্রায় প্রতিদিনই রাজনৈতিক জনসভা হচ্ছিল, আর প্রতিটি সমাবেশই জনমতকে একটু একটু করে স্বাধীনতার দিকে আরও বেশি উসকে দিচ্ছিল। এই জনমত তৈরিতে ছাত্রসমাজ অসামান্য অবদান রেখেছিল; অনেক ক্ষেত্রেই তারা মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর চিন্তাভাবনার চেয়েও এগিয়ে ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেই প্রথমবারের মতো স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা ওড়ানো হয়।
আজকালকার বেশির ভাগ ছাত্রনেতার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সেই দিনগুলোর কতই–না আকাশ-পাতাল তফাত!
আমরা সেই সভা-সমাবেশগুলোতে হাজির থাকতাম, বিশেষ করে ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক সমাবেশে। সে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা, বাঙালি জাতির জীবনে এক মাহেন্দ্রক্ষণ। শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ভাষণটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক মাস্টারপিস—বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক রাজনৈতিক মহাকাব্য।
রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র থেকে তাঁর ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার করার কথা থাকলেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী তা হতে দেয়নি। সেদিন সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার জন্য শেখ মুজিবের ওপর প্রচণ্ড চাপ ছিল। কিন্তু তিনি সরাসরি তা করেননি, যদিও যা বলার তা তিনি ঠিকই ভাষণের মোড়কে বলে দিয়েছিলেন। আমার বিশ্বাস, সেদিন তিনি যদি চাপের মুখে পড়ে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বসতেন, তবে রেসকোর্স ময়দানেই এক ভয়াবহ রক্তগঙ্গা বয়ে যেত। কারণ, মাঠের চারপাশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো মেশিনগান তাক করা ট্রাকে ঘেরা ছিল; মাথার ওপর চক্কর দিচ্ছিল একটি স্পটার প্লেন, যা চাইলেই ক্যান্টনমেন্ট থেকে কামানের গোলা ঠিক সমাবেশস্থলেই নিক্ষেপের সংকেত দিতে পারত। সমাবেশ শেষে বাড়ি ফিরে রেডিও ছাড়তেই দেখি, ঢাকা কেন্দ্র থেকে কোনো নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচার হচ্ছে না; বরং সেনাবাহিনী নিজেদের মধ্যে সাংকেতিক বার্তা আদান-প্রদান করছে। সম্ভবত তারা অন্যান্য ক্যান্টনমেন্টে সভার খবরাখবর জানাচ্ছিল।
দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি শাসনযন্ত্র অকেজো হয়ে পড়তে থাকে; গোটা দেশ তখন কার্যত শেখ মুজিব ও তাঁর অঘোষিত সরকারের অঙ্গুলি নির্দেশে চলছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বলতে তখন শুধু ক্যান্টনমেন্টগুলোর ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তাঁর জেনারেলদের নিয়ে ঢাকায় এলেন। সঙ্গে এলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা। দফায় দফায় আলোচনা চলতে লাগল, কিন্তু কোনো সুরাহা হলো না। আসলে সমাধান করাটা পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্যও ছিল না। তারা শুধু সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য সময়ক্ষেপণ করছিল। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস। সেদিন পাকিস্তানের পতাকা কেবল সেই জায়গাগুলোতেই উড়তে দেখা গেছে, যেখানে পাকিস্তানিদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছিল। আর গোটা দেশ ছেয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের নতুন পতাকায়। আমাদের বাড়ির ছাদেও উড়ছিল সগর্বে।
অবশেষে এল সেই ভয়াল ২৫ মার্চ। চারদিকের থমথমে বাতাসে বারুদের গন্ধ। সেদিনই আলোচনার চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টোটা—ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করলেন এবং ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ঢাকায় শুরু হলো ইতিহাসের অন্যতম বর্বর হত্যাযজ্ঞ ‘অপারেশন সার্চলাইট’। আর এই নারকীয় তাণ্ডবের শুরুটা নিজের চোখে দেখার জন্যই ভুট্টো সেদিন ঢাকায় থেকে গিয়েছিলেন। পরদিন তিনিও এই বলে বিদায় নিলেন যে ‘পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে!’
আলোচনার ফলাফল শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়, বুকের ভেতর সেই উৎকণ্ঠা নিয়েই রোজকার মতো আমরা রাতে শুতে গিয়েছিলাম। কিন্তু মধ্যরাতের দিকে চারপাশ থেকে ভেসে আসা মুহুর্মুহু গুলির শব্দ আর বিকট বিস্ফোরণে আচমকাই আমার ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলতেই সবার আগে আমার যে কথাটা মনে হলো তা হলো ‘এই তো, যা ঘটার শুরু হয়ে গেছে।’ আমাদের জাতি এখন রীতিমতো এক যুদ্ধে অবতীর্ণ; আর এই যুদ্ধে হারলে আমাদের অস্তিত্বই চিরতরে বিপন্ন হবে।
ততক্ষণে বাড়ির সবারই ঘুম ভেঙে গেছে। বাইরে ঠিক কী ঘটছে, তা বোঝার জন্য আমি ছাদে গেলাম। একাত্তর সালের ঢাকা শহরটা ছিল একেবারেই অন্য রকম; তখন এত উঁচু উঁচু দালানকোঠা ছিল না বললেই চলে। বরং শহরজুড়ে প্রচুর ফাঁকা জায়গা ছিল। শহরের চারদিক থেকেই ভারী গোলাগুলির আওয়াজ ভেসে আসছিল। এর কিছুক্ষণ পরই পাকিস্তানিরা রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে হামলা চালাল। সে যুগে পুলিশ লাইনসে বাঁশের ছাউনি দেওয়া বেশ কিছু ব্যারাক ছিল। লড়াইটা ছিল সংক্ষিপ্ত এবং একেবারেই অসম। মামুলি থ্রি নট থ্রি (.৩০৩) রাইফেল সম্বল করে পুলিশ সদস্যরা ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে বেশিক্ষণ টিকতে পারলেন না। অল্প সময়ের মধ্যেই গোলাগুলি থেমে গেল এবং ব্যারাকগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। আমাদের ছাদ থেকেই দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা সেই আগুনের লেলিহান শিখা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম।
ছাদ থেকে নিচে নেমে আসতেই হঠাৎ আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। রাতের আঁধারে সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলো নিশ্চয়ই ওয়্যারলেসের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে! আমার কাছে একটা ‘সনি টিআর-১০০০’ মডেলের ট্রানজিস্টর রেডিও ছিল। ফ্রিকোয়েন্সি ঘোরাতে শুরু করতেই মুহূর্তের মধ্যে শর্ট ওয়েভে আমি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের কথোপকথন ধরতে পারলাম।
বেশ কয়েকটি ইউনিট নিজেদের মধ্যে সাংকেতিক বার্তা আদান-প্রদান করছিল। তাদের কথাবার্তা শুনে ঢাকা শহরের ভয়াবহ পরিস্থিতির একটা পরিষ্কার চিত্র আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। তখনই উপলব্ধি করলাম, ইতিহাসের স্বার্থেই এই কথোপকথনগুলো রেকর্ড করে রাখা দরকার। তাই কালবিলম্ব না করে একটা কেব্লের মাধ্যমে রেডিও সেটটির সঙ্গে আমার ‘গ্রুন্ডিগ টিকে-২৪’ টেপ রেকর্ডারটি জুড়ে দিলাম। ইউরোপে উচ্চতর পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরার সময় আমি এই যন্ত্রগুলো সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম; কারণ গান আর খবর শোনাটা ছিল আমার অন্যতম শখ।
রেকর্ডিং চলার ফাঁকে ফাঁকে আমরাও রুদ্ধশ্বাসে সেই কথোপকথনগুলো শুনছিলাম। একপর্যায়ে ওয়্যারলেসে যখন নির্দেশ এল যে অবিলম্বে চারদিক থেকে বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে ফেলতে হবে, অন্যথায় কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হবে, তখন আমরা বাধ্য হয়েই ছাদে গেলাম। বুকের ভেতর চাপা কষ্ট নিয়ে, কয়েক দিন ধরে সগর্বে উড়তে থাকা আমাদের প্রাণের পতাকাটি আমরা নামিয়ে ফেললাম।
সারা রাত ধরেই আমরা ওয়্যারলেসের সেই কথাবার্তাগুলো রেকর্ড করেছি। অবশ্য যখন কোনো কথা হচ্ছিল না, তখন রেকর্ডিংয়ে মাঝেমধ্যে বিরতিও দিয়েছি। ২৬ মার্চের ভোরের আলো ফোটার আগেই তাদের মূল সামরিক অভিযানগুলো প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল।
আমার করা সেই রেকর্ডিংয়ের প্রতিলিপিটি নিচে তুলে ধরা হবে।
২৫ মার্চের কালরাত আর ২৬ মার্চের দিনভর সেই নারকীয় তাণ্ডব চলার পর, ২৭ মার্চ সকালে টানা কারফিউ শিথিল করা হলো। কারফিউ শিথিল হতেই মন্টু (আমার কাজিন ও ভগ্নিপতি ড. ফয়জুর রহমান) আর আমি ওর মোটরবাইকে চড়ে আমাদের অফিসে (পরমাণু শক্তি কেন্দ্র) গেলাম। সেখানে সহকর্মীদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে আমরা গেলাম ইকবাল হলে (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)। ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় ২৫ মার্চের রাতে হানাদার বাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল এই হল। হলের পাশের একটা রাস্তায় তখনো বেশ কয়েকটি ফুলে ওঠা লাশ পড়ে থাকতে দেখলাম আমরা। এরপর গেলাম স্টেডিয়াম এলাকায়। সেখানে দেখলাম, চারদিকে মানুষজন চরম আতঙ্কে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছে। পরিচিত এক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার কাছ থেকে আমরা নিশ্চিত হলাম যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছে; অবশ্য ২৫ মার্চের রাতে শোনা সেই ওয়্যারলেস বার্তার কথোপকথনেও তাঁর গ্রেপ্তারের কথা বলা হচ্ছিল।
এরপর আমরা খিলগাঁওয়ে ফিরে এলাম। বাড়িতে এসে দেখি, আমার সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ড. ওয়াজেদ মিয়া আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি নিজের, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী এবং স্ত্রীর এক কাজিনের জন্য আমাদের বাড়িতে একটু আশ্রয়ের অনুরোধ করলেন। আমরা আব্বাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এখন আমাদের কী করা উচিত? আব্বার উত্তর ছিল একেবারেই সোজাসাপ্টা এবং তাৎক্ষণিক: ‘তোমার বন্ধু বিপদে পড়ে আমাদের কাছে সাহায্য চেয়েছে। আমাদের সাধ্যমতো যা করার, আমরা তা-ই করব।’
তৎকালীন পরিস্থিতিটা একটু বোঝার চেষ্টা করুন। সেনাবাহিনী এমনিতেই সাধারণ বাঙালিদের খুঁজছিল, তার ওপর শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগের লোকজনকে তো তারা হন্যে হয়ে খুঁজছিল। সেই ভয়াল সময়ে শেখ মুজিবের পরিবারকে যেকোনো ধরনের সাহায্য করার জন্য রীতিমতো পাহাড়সমান সাহস আর বিশাল বড় একটা হৃদয়ের প্রয়োজন ছিল; বিশেষ করে আব্বার নিজেরই যখন এত বড় একটা পরিবার, যাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই ছিল।
ধানমন্ডির যে বাড়িতে পুরো পরিবারটি আশ্রয় নিয়েছিল, সেখান থেকে তাঁদের নিয়ে আসার জন্য ওয়াজেদ আর আমি রওনা হলাম। সেখানকার দৃশ্যটা ছিল বড়ই হৃদয়বিদারক আর বিশৃঙ্খল। যাহোক, ওয়াজেদ তাঁর গাড়ির ডিকিতে জিনিসপত্র তুললেন। কিন্তু তাড়াহুড়োয় চাবিটা ভেতরে রেখেই ভুল করে ডিকি আটকে দিলেন! এদিকে খুঁজলে বাড়তি চাবিটাও পাওয়া যাচ্ছিল না। বাড়িটা ছিল একেবারে মূল রাস্তার ওপর; তাই জোরে কোনো শব্দ হলেই তা আশপাশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। অথচ যেকোনো মূল্যেই হোক ডিকিটা খুলতেই হবে। এদিকে আবার কারফিউ শুরু হওয়ার সময়ও ঘনিয়ে আসছিল। খিলগাঁওয়ের বাড়িতে তখন কোনো টেলিফোন ছিল না। তাই আমি যদি সময়মতো বাড়ি না ফিরি, পরিবারের সবাই নির্ঘাত আমার বড় কোনো অমঙ্গলের আশঙ্কায় ভেঙে পড়বে। শেষমেশ অনেক কসরত করে কোনোমতে চাবিটা বের করা সম্ভব হলো এবং কারফিউ শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে আমরা খিলগাঁওয়ের বাড়িতে এসে পৌঁছালাম।
সপ্তাহখানেক তাঁরা আমাদের বাড়িতে অত্যন্ত সম্মানিত অতিথি হিসেবে ছিলেন। আম্মা তাঁর সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলেন তাঁদের সব রকম স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে। এমনিতেই বাড়িতে অনেক মানুষের ভিড়, কিন্তু আমাদের অন্য কোনো অতিথির ঘুণাক্ষরেও ধারণা ছিল না যে কোনার ওই বন্ধ ঘরটিতে আসলে কারা আছেন। সিঁড়ির নিচে ফাঁকা জায়গায় ওয়াজেদের গাড়িটি পার্ক করে রাখা হয়েছিল। আমাদের প্রতিবেশী একটি বিহারি পরিবারও এ ব্যাপারে কোনো অবাঞ্ছিত কৌতূহল দেখায়নি বা কোনো রকম ঝামেলাও তৈরি করেনি, যা অবশ্যই তাদের প্রশংসনীয় একটা দিক।
২৭ মার্চ কারফিউ শিথিল হওয়ার পর মানুষজন যে যেভাবে পারছিল, ঢাকা ছাড়তে শুরু করল। খিলগাঁওয়ে আমাদের বাড়ির ঠিক সামনে দিয়ে মানুষের এক অন্তহীন স্রোত পায়ে হেঁটে বাড্ডা বিলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। বছরের ওই সময়টায় বিলটা একদম শুকনা থাকত। সেখান থেকে বালু নদী, তারপর শীতলক্ষ্যা পার হয়ে তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের দিকে ছুটে যাচ্ছিল। এই জনস্রোত সকাল থেকে শুরু হয়ে টানা বিকেল পর্যন্ত চলত, যতক্ষণ না রাতের জন্য আবার কারফিউ জারি করা হতো। শুরুতে শহর ছাড়তে থাকা এই মানুষগুলো ছিল ঢাকার একেবারে দরিদ্র, ‘ভাসমান’ শ্রেণির। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই চিত্রটাও পাল্টে যেতে লাগল। শেষের দিকে আমরা দেখলাম, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও প্রাণভয়ে শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকা যেন এক জনমানবশূন্য ভুতুড়ে শহরে পরিণত হলো। আমরা কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করিনি, আর সেটা বড় ফ্যামিলি নিয়ে আমাদের পক্ষে খুব একটা বাস্তবসম্মতও ছিল না। তাই আমরা শুধু নিজেদের চোখে মানুষের এই গণহারে শহর ত্যাগ দেখছিলাম।
২৭ বা ২৮ মার্চের দিকে (সঠিক তারিখটি এখন আর মনে নেই) আমরা চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার সেই ঘোষণাটি শুনলাম। সিগন্যালটা বেশ দুর্বল ছিল, তবে আমার শক্তিশালী রেডিও সেটে আমরা সেটি ধরতে পেরেছিলাম। এখন আমার স্পষ্ট মনে নেই যে আমরা তাঁর ঘোষণার সেই প্রথম রূপটি শুনেছিলাম কি না, যেখানে তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দাবি করেছিলেন; নাকি আমরা সংশোধিত রূপটি শুনেছিলাম, যেখানে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে এই ঘোষণা পাঠ করেছিলেন। তবে যা-ই হোক না কেন, এই একটিমাত্র ঘোষণা তাঁকে একজন অপরিচিত মেজর থেকে রাতারাতি এক তাৎক্ষণিক নায়কে পরিণত করেছিল। অথচ এই মানুষটিই কিনা ২৫ মার্চ রাতে বিদ্রোহ করার আগমুহূর্ত পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে ‘সোয়াত’ জাহাজ থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য অস্ত্র খালাসের দায়িত্বে ছিলেন। রেডিওতে দেওয়া সেদিনের সেই ঘোষণার রাজনৈতিক রেশ আর বিতর্ক আমাদের দেশে আজও চলছে।
বাংলা একাডেমির ঠিক বিপরীতে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের (তখন এর নাম ছিল রেসকোর্স ময়দান) ভেতরে রমনা কালীবাড়ি নামে একটি পুরোনো হিন্দু মন্দির ছিল। আমরা শুনেছিলাম, ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানি সেনারা এর ভেতরের সবাইকে হত্যা করেছে। আমি নিজে গিয়ে একবার দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। ২৯ বা ৩০ মার্চের দিকে অফিস থেকে একটু হেঁটেই সেখানে গেলাম। গেটের কাছাকাছি পৌঁছাতেই দেখলাম, একজন লোক হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে আসছে। তার চোখেমুখে বন্য এক আতঙ্কের ছাপ, আর সে কেবলই বমি করছিল। আমি নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে ভেতরে ঢুকলাম। দৃশ্যটা ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক নরককুণ্ডের মতো। চারদিকে মৃতদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, ফুলেফেঁপে ওঠা লাশগুলো থেকে পচা দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। কাক আর কুকুরেরা সেই লাশগুলো খুবলে খাচ্ছে। আমি একনজর দেখেই দ্রুত বেরিয়ে এলাম। একেবারে ঠিক সময়ে। পাকিস্তানি সেনাদের বহনকারী একটি জিপ ঠিক তখনই ভেতরে ঢুকছিল; তারা আমার দিকে তাকাল, আমিও তাদের দিকে তাকালাম। আমাকে কেউ আটকাল না, আমি সোজা পরমাণু শক্তি কেন্দ্রে ফিরে এলাম।
কয়েক সপ্তাহ পর, মন্দির কমপ্লেক্সটি ইট ইট করে ভেঙে ফেলা হলো এবং সেই ইটগুলো সরিয়ে নেওয়া হলো। মন্দিরের সমস্ত অস্তিত্ব পুরোপুরি মুছে ফেলা হলো। মে বা জুনের দিকে খিলগাঁওয়ের বেশ কয়েকটি রাস্তা মেরামত করা হলো, যার মধ্যে আমাদের বাড়ি যাওয়ার রাস্তাও ছিল। রাস্তা মেরামতে যে সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছিল, আমার কাছে মনে হলো সেগুলো ওই মন্দিরেরই হতে পারে, সেই একই রকম পুরোনো, ছোট আকারের ইট। প্রায় ৫০ বছর পর এখন অবশ্য মন্দিরটি নতুন করে আবার গড়ে তোলা হয়েছে।
এপ্রিলের কোনো এক সময়ে রাতের অন্ধকারে ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ কিছু লোক পরমাণু শক্তি কেন্দ্রের বেশ কয়েকটি কিউবিকল (অফিস কক্ষ) তছনছ করে। ড্রয়ারগুলো ভাঙা অবস্থায় ছিল, চারদিকে কাগজপত্র ছড়ানো-ছিটানো ছিল। আমার কিউবিকলটিও এর হাত থেকে রেহাই পায়নি। সৌভাগ্যক্রমে, ২৫ মার্চের রাতের সেই টেপটি তখন সেখানে ছিল না; আমি টেপটা কয়েক দিন বাড়িতে রাখতাম, আবার কয়েক দিন অফিসে নিয়ে আসতাম। ওই রাতে টেপটি যদি সেখানে থাকত, তবে আমার আর আমার পরিবারের কী পরিণতি হতো, তা যে কেউই সহজেই অনুমান করতে পারবেন!
যাহোক, কেন্দ্রের পরিচালককে বিষয়টি জানানো হলে তিনি পরিদর্শনে এলেন। আমাদের মধ্যে কথাবার্তা চলাকালে হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, ‘যা–ই হোক না কেন, আমাদের সেনাবাহিনী কিন্তু বিশ্বের অন্যতম সেরা।’ কথাটি শোনামাত্রই আমি সতর্ক হয়ে গেলাম। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে একজন বাঙালির মুখে পাকিস্তান বাহিনীকে ‘আমাদের সেনাবাহিনী’ বলা কিংবা অন্য একজন বাঙালির সামনে তাদের স্তুতি গাওয়াটা ছিল চরম অস্বাভাবিক একটি ব্যাপার। আমি বুঝতে পারলাম, দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে আমাকে যথেষ্ট সাবধান হতে হবে।
খুব শিগগির এটা স্পষ্ট হয়ে উঠল যে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে হলে আমাদের একটি মুক্তিযুদ্ধ লড়তেই হবে। খণ্ডযুদ্ধ হয়তো সেনারা লড়েন, কিন্তু একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ পরিচালনা করে রাজনীতিকদের নেতৃত্বাধীন একটি সরকার। সীমান্তের ওপারে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে তাদেরকেই গেরিলা ও নিয়মিত সেনাদের নিয়ে একটি বাহিনী গঠন এবং পরিচালনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভারতের সাহায্য ছিল অপরিহার্য। পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলার পেছনে তাদেরও নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ ছিল। তবে আমাদের কাছে এটি ছিল অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। এ যুদ্ধে সময় লাগবে, কিন্তু ঠিক কতটা সময় লাগবে, সে সম্পর্কে কারও তেমন কোনো ধারণা ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং বেশির ভাগ মুসলিম দেশ আমাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল; এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে পাকিস্তানকে সাহায্যও করছিল। ভবিষ্যৎ ছিল ঘোর অমানিশায় ঢাকা, তবে একটি বিষয় ছিল জলের মতো পরিষ্কার—একটি জাতি হিসেবে টিকে থাকতে হলে এ যুদ্ধে আমাদের জিততেই হবে।
এভাবেই গোটা দেশ ‘মুক্তিযুদ্ধ’ সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করল, যা আমাদের জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এপ্রিলে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হয় এবং কুষ্টিয়ার মুজিবনগরে তারা শপথ গ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন রাষ্ট্রপতি, আর তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ অত্যন্ত যোগ্যতাসম্পন্ন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারের কার্যালয়গুলো ছিল কলকাতায়। খন্দকার মোশতাকও এই মন্ত্রিসভায় ছিলেন। তবে বড়ই পরিতাপের বিষয় হলো, তাজউদ্দীন আহমদ আজও তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি পুরোপুরি পাননি।
২৫ মার্চের রাতে শেখ মুজিব তাঁর বাসভবনেই থেকে গিয়েছিলেন, তবে তাঁর বিশ্বস্ত অনুসারীদের তিনি ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পাকিস্তানিরা তাঁদের হন্যে হয়ে খুঁজলেও পায়নি। সরকার গঠনের খবরটি আমরা কলকাতার ‘আকাশবাণী’ থেকে পাই, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের খবর প্রচারের ক্ষেত্রে এক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল। প্রতি রাতেই আমরা ‘আকাশবাণী’ শুনতাম, বিশেষ করে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘সংবাদ পরিক্রমা’। এর কিছুদিন পর বাংলাদেশ সরকার দেশের পশ্চিম সীমান্তের কাছাকাছি একটি মিডিয়াম ওয়েভ ট্রান্সমিটার দিয়ে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ স্থাপন করে; এর সিগন্যাল এতটা শক্তিশালী ছিল যে দেশের প্রায় সব প্রান্তেই তা পৌঁছাতে পারত। এটি ছিল বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সম্প্রচার কেন্দ্র, অবরুদ্ধ দেশের কোটি কোটি মানুষের কাছে যা ছিল আশার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।
আমাদের মনে হলো, ২৫ মার্চের রাতের সেই টেপের কিছু অংশ এখন বেতার কেন্দ্রে পাঠানো উচিত, যাতে তারা সেটি সম্প্রচার করতে পারে। মূল অংশগুলো স্পুল টেপ থেকে একটি কম্প্যাক্ট ক্যাসেটে ট্রান্সফার করা হলো এবং একজন পরিচিত বন্ধুর মাধ্যমে আমরা সেটি এমন দুজন ভদ্রলোকের হাতে তুলে দিলাম, যাঁরা সীমান্ত পার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। নিরাপত্তার স্বার্থে উভয় পক্ষের জন্যই একে অপর সম্পর্কে বেশি কিছু না জানাটাই তখন শ্রেয় ছিল। পরে আমরা জানতে পারি, তাঁদের একজন ছিলেন ঢাকা টেলিভিশনের জামিল চৌধুরী এবং অন্যজন ছিলেন ন্যাপের (ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি) রাজনীতিক মঈদুল হাসান। মে মাসের কোনো এক রাতে আমরা রেডিওতে সেই রেকর্ডিংয়ের কিছু অংশ শুনতে পেলাম। নিরাপত্তাজনিত সুস্পষ্ট কারণেই সেখানে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই দিনটির কথা, যেদিন ক্যাসেটটা হস্তান্তর করার জন্য খিলগাঁও থেকে বন্ধুর বাসায় নিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি একটা রিকশায় বসা, কোলের ওপর ছোট একটা ক্যাসেট প্লেয়ার আর পকেটে লুকানো সেই ক্যাসেট। চারদিকের রাস্তাঘাট প্রায় সুনসান, জনমানবহীন। আমি যখন রেলক্রসিং পার হয়ে মৌচাক মার্কেটের দিকে এগোচ্ছি, ঠিক তখনই শহরের দিক থেকে রামপুরাগামী সেনাবাহিনীর একটা জিপ আমার উল্টো দিক থেকে আসতে দেখলাম। জিপে থাকা সেনারা আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। বলা বাহুল্য, ভয়ে আমার তখন রীতিমতো কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। আমাকে শুধু একবার থামিয়ে পকেটটা চেক করলেই সব শেষ! কিন্তু ভাগ্যিস তারা তা করেনি। আমি স্বস্তির এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বন্ধুর বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম।
এপ্রিলের শেষের দিকে আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু নুরুদ্দিন মাহমুদ (বীর প্রতীক) আমাকে জানাল যে আমাদের হয়তো একবার কুমিল্লায় যেতে হতে পারে। তার ভগ্নিপতি মেজর কে এম সফিউল্লাহ এর আগেই ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। ২৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি ওই রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন। সব দিক থেকে শক্তিশালী এক শত্রুর মোকাবিলা করে তিনি লড়াই করতে করতে ভারতে গিয়ে পৌঁছেছিলেন, অথচ তখনো তাঁর স্ত্রী ও সন্তানেরা পড়ে ছিলেন কুমিল্লায় শ্বশুরবাড়িতে। দেশজুড়ে চলমান তুমুল লড়াই সামলাতে ব্যস্ত থাকায় সম্ভবত পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ তখনো তাঁদের খোঁজ করার ফুরসত পায়নি। তাই মনে করা হচ্ছিল, তাঁদের ঢাকা নিয়ে আসা গেলে হয়তো নিরাপদে লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
সুতরাং আমরা দুজন এই যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম; অফিস থেকে ছুটি নিলাম, নিজেদের পরিচয়পত্রগুলো ঠিকঠাক আছে কি না, তা যাচাই করে নিলাম। সেই দিনগুলোতে সবারই একটা পরিচয়পত্রের প্রয়োজন হতো, যা লোকমুখে ‘ডান্ডি কার্ড’ নামে পরিচিত ছিল। তবে এই কার্ড ইস্যু করার মতো কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ তখন ছিল না। তাই মানুষজন যে যেভাবে পারত, একটা কার্ড বানিয়ে নিত! তবে কার্ডে একটা ‘গোল সিল’ থাকাটা ছিল বাধ্যতামূলক; অন্য কোনো আকারের সিল হলে চলত না। আমরা বাসে চেপে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হলাম। পথে বেশ কয়েকটি মিলিটারি চেকপোস্ট পড়ল। অবশ্য আমাদের কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়নি। আমাদের সঙ্গে থাকা কাগজপত্র, অনর্গল উর্দু বলার দক্ষতা এবং সর্বোপরি পাকিস্তানি কায়দাকানুন রপ্ত থাকাটা আমাদের বেশ সাহায্য করেছিল। আমরা দুজনেই ছিলাম করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র।
কুমিল্লা পৌঁছে জানতে পারলাম, মেজর সফিউল্লাহ অবশেষে পরিবারের কথা ভাবার একটু সময় পেয়েছেন। তিনি তখন সীমান্তের ঠিক ওপারেই আগরতলায় ছিলেন এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই দিনগুলোতে মাঝেমধ্যেই সীমান্তের এপার-ওপার মর্টার শেল ছোড়াছুড়ি হতো। আমার খুব আশা ছিল ওই রাতে অন্তত একবার এ রকম গোলাগুলি হবে; মর্টারের শব্দটা কেমন হয়, তা শোনার জন্য আমি রীতিমতো উন্মুখ হয়ে ছিলাম! কিন্তু আমাকে হতাশ করে সেদিন রাতে কিছুই ঘটল না।
পরদিন সকালে এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী হলাম। আট-নয়টার মতো রিকশা ডাকা হলো। মিসেস সফিউল্লাহ, তাঁর ছেলেমেয়ে, মা, ভাই—অর্থাৎ পুরো পরিবারই সেই রিকশাগুলোতে চেপে বসলেন এবং সোজা সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে চলে গেলেন! আপনাদের মনে করিয়ে দিই, কুমিল্লায় তখন বিশাল একটা ক্যান্টনমেন্ট ছিল, আর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভেতরে তখন রীতিমতো একটা যুদ্ধ চলছিল। হয়তো তাঁরা লোকচক্ষুর অন্তরালে কোনো ‘বুশ রোড’ (আফ্রিকায় যেমনটা বলা হয়, অর্থাৎ ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে চোরাপথ) ধরে গিয়েছিলেন, তারপরও রিকশার সেই বহরটি কোনো রকম বাধা ছাড়াই নির্বিঘ্নে সীমান্ত পেরিয়ে গেল। পরে আমরা শুনেছিলাম, মেজর সফিউল্লাহ নিজেই তাঁদের রিসিভ করার জন্য সীমান্তে উপস্থিত ছিলেন। ওই দিন বিকেলেই একজন ফিরে এসে গৃহকর্মীকেও সঙ্গে করে ওপারে নিয়ে যায়।
এবার আমাদের দুজনের ঢাকায় ফেরার পালা; আমরা আবারও বাসে চড়ে বসলাম। ক্যান্টনমেন্টের চেকপোস্টে আমাদের থামানো হলো এবং কাগজপত্র চেক করা হলো। আমাদের বাসে একটা বাঙালি পরিবার ভ্রমণ করছিল—গ্রাম থেকে আসা একেবারে সাধারণ এক দম্পতি, সঙ্গে ছোট ছোট তিন ছেলেমেয়ে। বাচ্চাগুলোর বয়সের পার্থক্য ছিল খুবই কম। হঠাৎ একজন পাকিস্তানি সেনা তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠল, ‘আরে ভাই কুছ তো কম করো, অ্যায়সে ভি সাড়ে সাত ক্রোড় হো গয়া হ্যায়!’ (আরে ভাই একটু তো কমাও, এমনিতেই সাড়ে সাত কোটি হয়ে গেছে!)। সে সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। কথাটা হয়তো সে একটু রসিকতা করেই বলেছিল, কিন্তু আমার মনে আছে, এই খোঁটা দেওয়াটা আমার মোটেও ভালো লাগেনি। আমি মনে মনে বললাম, আমার হাতে যদি একটা একে-৪৭ থাকত, তাহলে আমিও এ রকম রসিকতাপূর্ণ মন্তব্য ছুড়ে দিতে পারতাম! বাকি রাস্তাটা একরকম নির্বিঘ্নেই কেটেছিল; আমরা নিরাপদে নিজেদের বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।
সেই সেনাসদস্যের মন্তব্যটা আমি আজও ভুলতে পারিনি; বিশেষ করে আজকাল কথাটি আমার প্রায়ই মনে পড়ে। ১৯৭১ সালে আমরা ছিলাম সাড়ে সাত কোটি প্রাণ, আর ২০২৩ সালে এসে আমরা ১৭ কোটি বা তারও বেশি। প্রায়ই আমি ভাবি, আমাদের বর্তমান জনসংখ্যা যদি সেই সাড়ে সাত কোটিই থাকত, তাহলে হয়তো আমাদের বড় বড় সমস্যাগুলোর অস্তিত্বই থাকত না। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ৩০ বছর পর, ২০৫০ সাল নাগাদ আমরা হয়তো ২৫ কোটির বেশি বাংলাদেশিতে পরিণত হব! এই বিপুল জনসংখ্যার জন্য কি পর্যাপ্ত বাসস্থান, খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসাব্যবস্থা, রাস্তাঘাট ইত্যাদির সংকুলান হবে? মানুষের এই বিশাল সমুদ্রকে জায়গা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ভৌগোলিক জায়গাটুকু কি আমাদের আছে? কোথায় এবং কীভাবে এই সংকুলান হবে? এর সঙ্গে যোগ করুন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও তার বিরূপ প্রভাবকে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যে শুরু হয়ে গেছে এবং মেরু অঞ্চলের বরফ যে গলতে শুরু করেছে, তা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস যদি সঠিক হয়, তবে ৪০-৫০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের স্থলভাগের ১৫ থেকে ২০ শতাংশই সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এখনকার চেয়েও কম জমি, অথচ মানুষ ২৫ কোটি? আমি স্রেফ দৃশ্যটা কল্পনাও করতে পারি না। এমনকি যদি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন না–ও থাকে, তবু জনসংখ্যার এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ চলতেই থাকবে।
আজকাল আমরা প্রায়ই শুনি যে আর কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। এ নিয়ে আমাদের কারও কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু আজ থেকে চল্লিশ বা পঞ্চাশ বছর পরের অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? কারও মনে কি এর অন্য কোনো চিত্র আছে? থাকলে দয়া করে আমাদের সঙ্গে শেয়ার করুন।
পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমরা ঢাকায় স্কুলে পড়তাম। সে সময় ‘কুও ভাদিস’ (Quo Vadis) নামের একটি ইংরেজি সিনেমা এসেছিল। এর মানে কী, তা আমরা একে অপরকে জিজ্ঞেস করতাম। একজন বলল, এটা নাকি ল্যাটিন শব্দ, যার অর্থ হলো ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ বা ‘তোমার গন্তব্য কোথায়?’
তাহলে ‘কুও ভাদিস বাংলাদেশ?’ বা বাংলাদেশের গন্তব্য কোথায়? আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন।
চলুন আবার ১৯৭১ সালের দিনগুলোতে ফিরে যাই। প্রবাসী সরকার তখন ধাপে ধাপে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শক্ত ভিত গড়ে তুলছে। সশস্ত্র বাহিনী, ইপিআরের (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, বিডিআরের পূর্বসূরি, বর্তমান বিজিবি), পুলিশ ও আনসারের যেসব অকুতোভয় সদস্য যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, ভারতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ক্যাম্পে তাঁদের সংগঠিত করা হচ্ছিল। দেশের টানে হাজার হাজার তরুণ পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে যুদ্ধে যোগ দিতে ছুটছিলেন। যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে সমগ্র দেশকে বেশ কয়েকটি সেক্টরে ভাগ করা হলো, যার প্রতিটির দায়িত্বে ছিলেন একজন করে সেক্টর কমান্ডার।
বেশ কিছুসংখ্যক গেরিলাযোদ্ধার প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর তাঁদের দেশের ভেতরে পাঠানো হতো। সাধারণত তাঁদের সঙ্গে থাকত একটি স্টেনগান আর কিছু বিস্ফোরক। দেশের ভেতরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অতর্কিত হামলা চালানোই ছিল তাঁদের মূল লক্ষ্য, যাতে পাকিস্তানি বাহিনী সব সময় একটা মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। এর পাশাপাশি দেশের সাধারণ মানুষকেও এই বার্তা দেওয়া যে যুদ্ধ চলছে, আমরা আসছি। খুব শিগগিরই আমরা রাতের বেলায় বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে শুরু করলাম, মাঝেমধ্যে শোনা যেত গোলাগুলির আওয়াজও। শেষের দিকে এটা রীতিমতো আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। বলতে গেলে প্রায় প্রতি রাতেই আমরা একটা না একটা বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকতাম; সেই কাঙ্ক্ষিত শব্দটা শোনার পরেই যেন আমরা শান্তিতে ঘুমাতে পারতাম!
সেই দিনগুলোতে আমাদের যেন আরও একটি অলিখিত ‘দায়িত্ব’ ছিল—স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের অনুষ্ঠান শোনা। সেই নয়টা মাস আমরা অন্য কোনো রেডিও স্টেশন খুব একটা শুনতাম না; আমাদের নিজস্ব বেতারকেন্দ্রটিই আমাদের জন্য যথেষ্ট ছিল। এর মধ্যে একটি অনুষ্ঠান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল—এম আর আখতার মুকুলের সেই নিজস্ব ও অননুকরণীয় ভঙ্গিতে পড়া ‘চরমপত্র’। দেশবাসীর মনোবল চাঙা রাখার জন্য এতে বাস্তব ঘটনা, খানিকটা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, প্রোপাগান্ডা আর ব্যঙ্গবিদ্রূপের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ থাকত। অনুষ্ঠানটি অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছিল। এর পাল্টা জবাব দিতে পাকিস্তানিরাও বেতারতরঙ্গে রীতিমতো একটা যুদ্ধ শুরু করে দিল। তাদের সম্প্রচারে থাকত উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, ডাহা মিথ্যাচার আর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ।
একজন বাঙালি নারী সম্প্রচারক তো মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে রীতিমতো কুখ্যাতি কুড়িয়েছিলেন। আমার এখনো তাঁর নাম মনে আছে। মাঝে মাঝে ভাবি, তিনি এখন কোথায় আছেন এবং সেদিনের সেই ন্যক্কারজনক ভূমিকা নিয়ে এখন তিনি কী ভাবেন। একবার তো শর্ট ওয়েভে সিলেটি উপভাষাতেও এ রকম একটা সম্প্রচার শুনেছিলাম!
একদিন খুব ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দিক থেকে একটা বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেলাম। পরে জানতে পারলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সেই জায়গাটাকে একটা মসজিদে পরিণত করা হয়েছিল, দেয়ালের গায়ে বাংলা ও আরবিতে সে কথাও লেখা ছিল। সেখানে আসলে কতজন মানুষ নামাজ পড়তেন তা আমার জানা নেই, তবে শেষ পর্যন্ত সেই মসজিদের আয়ু খুব বেশি দিন ছিল না।
জুন-জুলাই মাসের দিকে একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে খিলগাঁও-রামপুরা এলাকায় বড়সড় কোনো ‘অপারেশন’ হতে যাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা নাকি নৌকায় করে বিলের (তত দিনে বিল পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল) ভেতর দিয়ে এসে আক্রমণ চালাবেন। দুই পক্ষের গোলাগুলির মাঝে পড়ার ভয়ে অনেকেই এলাকা ছাড়তে শুরু করলেন; বিশেষ করে পরিবারগুলো অন্যত্র সরে যেতে লাগল। আমরাও নবাবপুর এলাকায় মেজ মামার (বেগম মতিয়া চৌধুরীর পৈতৃক বাড়ি) বাড়িতে চলে গেলাম। কেবল বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য আব্বা খিলগাঁওয়ে থেকে গেলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেখানে কিছুই ঘটল না, তাই কয়েক দিন পরই আমরা আবার বাড়িতে ফিরে এলাম।
এর কিছুদিন পর একদিন হঠাৎ করে আবার কারফিউ জারি করা হলো এবং আমাদের এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা বাড়ি বাড়ি তল্লাশি শুরু করল। ফারুক (ছোট ভাই) তখন বাড়িতেই ছিল। সে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ছুটিতে এসেছিল এবং আর ফিরে যায়নি। পরিস্থিতি সরাসরি মোকাবিলা করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না। ফারুক আর আমি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম এবং তিন-চারজনের যে সেনা দলটি এল, তাদের আমাদের সেরা উর্দু আর চওড়া হাসি দিয়ে বেশ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালাম। তারা প্রতিটি রুমে ঢুকে সব জায়গা তন্নতন্ন করে খুঁজল। আমাদের পরিবারের ধরন ও সদস্যসংখ্যা বিবেচনা করে আমরা প্রচণ্ড আতঙ্কে ছিলাম, কিন্তু কোনোভাবেই তা বাইরে প্রকাশ করতে পারছিলাম না। তবে সত্যি বলতে কী, শেষ পর্যন্ত তারা খারাপ কিছু করেনি বা বলেনি।
তারা যখন বেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাপার কী, হঠাৎ এই কারফিউ কেন ইত্যাদি। তারা জানাল যে তারা ইপিআরের (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, তত দিনে এটিকে পুনর্গঠন করে নাম দেওয়া হয়েছিল ইপকাফ—ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সেস) কয়েকজন পলাতক সৈন্যকে খুঁজছে। এই লোকগুলো ২৫ মার্চের পর ইপিআর থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, তারপর কিছুদিন পর আবার ফিরে আসে। যাচাই-বাছাইয়ের পর তাদের আবার চাকরিতে বহাল করা হয়। কিন্তু এবার তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়েই আবার পালিয়েছে। ফারুক আর আমি তখন বেশ ভাব দেখিয়ে তাদের বললাম যে এটা তো খুব খারাপ কাজ হয়েছে, তাদের ধরে অবশ্যই কঠিন শাস্তি দেওয়া উচিত। কিন্তু মনে মনে আমরা দারুণ খুশি ছিলাম; কারণ কয়েক দিন আগেই আমরা এই খবরটা কানাঘুষায় শুনেছিলাম।
পাকিস্তানি সেনাদের এই দলটি যখন আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছিল, তখন হঠাৎ একজন সৈন্য ফিরে এল। সে ফিসফিস করে বলল, ‘দেখুন, আমরা সব সৈন্য তো আর এক রকম নই। আমাদের পেছনে যে দলটি আসছে, তাদের মধ্যে দু-একজন “খুব একটা সুবিধার নয়”। তাই তারা যখন আপনাদের বাড়িতে আসবে, তখন আপনারা বলবেন যে এই বাড়িতে এরই মধ্যে তল্লাশি হয়ে গেছে।’ আমরা ঠিক তা-ই করলাম, ফলে দ্বিতীয় দলটি আর আমাদের বাড়িতে ঢুকল না। আমরা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। এই ভালো মানুষটিকে ধন্যবাদ দেওয়ার মতো কোনো ভাষা আমাদের ছিল না। আল্লাহই ভালো জানেন পরে তার ভাগ্যে কী ঘটেছিল, আর সে এই যুদ্ধে আদৌ বেঁচে ছিল কি না।
জুলাই মাসের শেষের দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়াজেদ মিয়ার ছেলের (সজীব ওয়াজেদ জয়) জন্ম হয়। খবর পেয়ে আমি আর ড. এম এ সুবহান (আমার সহকর্মী ও বন্ধু) তাকে দেখতে গেলাম। তখনকার গুমোট পরিস্থিতির কারণে সেখানে খুব একটা দর্শনার্থী ছিল না।
পরমাণু শক্তি কেন্দ্রে আমাদের অফিসে কয়েকজন বন্ধু মিলে আমরা একটা উদ্যোগ নিয়েছিলাম। প্রতি মাসে আমরা আমাদের নির্ভরযোগ্য সহকর্মীদের কাছ থেকে কিছু টাকা চাঁদা তুলতাম। সেই টাকা দিয়ে আমরা কাপড়চোপড়, ওষুধপত্র ইত্যাদি কিনতাম। তারপর একজন এসে সেগুলো নিয়ে যেত। এই পুরো ব্যাপারটি যেন অন্য কেউ ঘুণাক্ষরেও টের না পায়, সে ব্যাপারে আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতাম। দেশের এই চরম ক্রান্তিলগ্নে এর চেয়ে বেশি কিছু করার সামর্থ্য অন্তত আমাদের ছিল না।
সেপ্টেম্বরে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ‘দ্য গ্রেট ট্র্যাজেডি’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। আমার এক সহকর্মীর কল্যাণে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নিয়ে আসা বইটি পড়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। জনাব ভুট্টো এই সংকটের জন্য শেখ মুজিব, আওয়ামী লীগ এবং ‘বিপথগামী’ বাঙালিদের ওপর সব দায় চাপিয়েছিলেন। তার সমাধান বা ব্যবস্থাপত্র ছিল একেবারেই সোজাসাপ্টা: পূর্ব পাকিস্তানকে এমনভাবে ‘পরিষ্কার’ করা যাতে বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তার কোনো লেশমাত্র অবশিষ্ট না থাকে। তারপর বিহারি, পাকিস্তানের দালাল বাঙালি (সব জাতির মতোই আমাদের মধ্যেও এমন কিছু কুলাঙ্গার ছিল, যাদের অনেককে এখনো সদর্পে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়) এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নিয়ে আসা লোকদের দিয়ে এই অঞ্চল শাসন করা। তার মতে, হয়তো ৩০ বছর পর কিছু অশান্তি দেখা দিতে পারে, তবে তা সহজেই দমন করা যাবে। পরিকল্পনাটা ছিল বেশ নিপুণ, যদি তারা তা বাস্তবায়ন করতে পারত আরকি!
খুব শিগগিরই ঢাকা এবং অন্যান্য জায়গার রাস্তায় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনা পুলিশ সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেল। তবে তাদের এই অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর ছিল না; কারণ গেরিলা হামলা মোকাবিলা করার মতো কোনো প্রশিক্ষণ তাদের ছিল না। ফলে তারা সহজেই মুক্তিবাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতো। আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে পড়ায় কিছুদিন পরই তাদের আবার ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
ঠিক ওই একই সময়ে পাকিস্তানিরা ঢাকা শহরের কিছু জায়গা এবং রাস্তার নাম পরিবর্তন করতে শুরু করল। রমনার নাম বদলে রাখা হলো ‘ইরাম’, হাটখোলা রোডের নাম দেওয়া হলো ‘হাকিম আজমল খান রোড’ ইত্যাদি। তবে তারপরও একটা ‘রমনা’ কিন্তু অক্ষতই থেকে গিয়েছিল। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজধানী ইসলামাবাদের একটা এলাকার নামও ছিল ‘রমনা’; কে জানে, সেই এলাকাকে এখন তারা কী নামে ডাকে!
নভেম্বরের শেষের দিকে ঈদের দিন পরিস্থিতি বেশ ‘উত্তপ্ত’ হয়ে উঠল। পূর্ব দিকের কোনো এক জায়গা থেকে রামপুরা টিভি স্টেশনের দিকে বেশ কয়েকটি মর্টার শেল ছোড়া হলো। বোঝাই যাচ্ছিল, সম্মুখযুদ্ধ বেধে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। তত দিনে বিপুলসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শেষ করে ফেলেছেন, তাদের একটি বড় অংশ তখন দেশের ভেতরে অবস্থান নিচ্ছিলেন; আর ওদিকে ভারতও তখন সামরিক ও রাজনৈতিক—উভয় দিক থেকেই পুরোপুরি প্রস্তুত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বজনমত ও সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে বিশ্বের বড় রাজধানীগুলো চষে বেড়াচ্ছিলেন, বিশেষ করে তাদের বিশ্বস্ত মিত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন নিশ্চিত করতে।
তবে মজার ব্যাপার হলো, প্রথম আক্রমণটা ভারত নয়, করেছিল পাকিস্তানই। ইয়াহিয়া খান এবং তাঁর জেনারেলরা বুঝতে পেরেছিলেন যে পরিস্থিতি খুব দ্রুতই চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। তাই তারা আগেভাগেই ভারতের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলার সিদ্ধান্ত নিলেন। এটি ছিল বড়জোর একটা দায়সারা গোছের প্রচেষ্টা, যা তার মূল উদ্দেশ্য অর্জনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল; কিন্তু এর ফলে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধটা ঠিকই শুরু হয়ে গেল। মিসেস গান্ধী আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলেন যে দুই দেশের মধ্যে এখন যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। রেডিওতে আমরা তাঁর সেই ঘোষণা শুনলাম। এর কয়েক মিনিটের মাথায় ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান ঢাকা বিমানবন্দরে বোমাবর্ষণ করল। আমার যদি ঠিকঠাক মনে থাকে, ঘটনাটি ঘটেছিল ১ বা ২ ডিসেম্বরের রাতে।
পরের দিন সকাল থেকে পুরোদমে বিমান হামলা শুরু হয়ে গেল। সেই দিনগুলোতে শীতকালেও ঢাকার আকাশ বেশ পরিষ্কার থাকত। তখন ডিসেম্বর মাস, চারদিকে মিষ্টি রোদেলা দিন আর মাথার ওপর সুনীল আকাশ। একের পর এক ফাইটার বোম্বার (যুদ্ধবিমান) নিচ দিয়ে উড়ে এসে তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়েতে বোমা ফেলতে লাগল, যাতে সেটি সম্পূর্ণ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বর্তমানের বিমানবন্দরটির রানওয়েও তখন প্রস্তুত ছিল, যদিও তা ব্যবহৃত হতো না। যাহোক, সেটির রানওয়েতেও বোমা ফেলা হয়েছিল। বিমানগুলোকে লক্ষ্য করে নিচ থেকে প্রাণঘাতী অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট (বিমানবিধ্বংসী) গুলি ছোড়া হচ্ছিল। আমি সেই পাইলটদের অসীম সাহসিকতা দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে যেতাম।
এখন আমাদের একটা নতুন কাজ জুটল—আকাশে বিমানের মহড়া দেখা। একদিন সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য রিকশা খুঁজতে রামপুরা রোডের কাছাকাছি আসতেই দেখলাম, একটি ভারতীয় যুদ্ধবিমানকে ধাওয়া করছে একটি পাকিস্তানি ফাইটার। পাকিস্তানি বিমানটি থেকে একটি মিসাইল ছোড়া হলো এবং ভারতীয় বিমানটি মাঝ আকাশেই বিস্ফোরিত হলো। ঘটনাটি ঘটেছিল রামপুরা ব্রিজের কাছে উলন এলাকার আকাশে। আমাদের জন্য লড়তে গিয়ে প্রাণ হারানো সেই ভারতীয় পাইলটের জন্য আমার ভীষণ কষ্ট হলো। রাস্তাঘাট তখন প্রায় জনশূন্য। একটু পরই মৌচাকের দিক থেকে এক জিপভর্তি উল্লসিত পাকিস্তানি সেনা সেই জায়গায় ছুটে গেল, যেখানে ধ্বংসপ্রাপ্ত বিমানটি আছড়ে পড়েছিল। তারা আমার দিকে তাকাতেই, বাধ্য হয়ে আমাকেও হাত নেড়ে তাদের সঙ্গে উল্লাস প্রকাশের ভান করতে হলো। কয়েক মিনিট পরই তারা ভারতীয় বিমানটির ধ্বংসাবশেষের একটি টুকরো হাতে নিয়ে ফিরে এল। আমাকে আবারও তাদের সেই উদ্যাপনে শরিক হতে হলো।
অন্য একদিন, আমি আমাদের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ একটি ভারতীয় ফাইটার বোম্বার বেশ নিচ দিয়ে উড়ে এসে একটা বাঁক নিল। পাইলট আমাকে খুব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল, আর আমিও তাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। আমরা একে অপরের দিকে তাকালাম এবং চোখের পলকেই সে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল!
কয়েক দিনের মধ্যেই রানওয়েগুলো সম্পূর্ণ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ল এবং পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বিমানগুলো মাটিতেই আটকা পড়ে রইল। চারদিক থেকে ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করতে শুরু করল। স্থানীয় সাধারণ মানুষ তাদের সম্ভাব্য সব রকম সাহায্য করছিল। পাকিস্তানিদের পরাজয় তখন কেবলই সময়ের ব্যাপার। তারা সময়ক্ষেপণের চেষ্টা করছিল এই আশায় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। কিন্তু তা আর বাস্তবে রূপ নিল না। সোভিয়েত ইউনিয়ন কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখল যে এমন কিছু ঘটলে তারাও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। চীন এই নয় মাস ধরে পাকিস্তানকে সমর্থন ও সাহায্য জুগিয়ে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু তারাও সরাসরি এই যুদ্ধে জড়াতে কোনো উৎসাহ দেখাল না।
১০ বা ১১ ডিসেম্বরের দিকে গভীর রাতে আকাশে এক নতুন আপদ দেখা দিল। প্রপেলারচালিত একটি ছোট বিমান অন্ধকারে ডুবে থাকা শহরের ওপর চক্কর দিত এবং যত্রতত্র দু-চারটে বোমা ফেলে যেত। এমনই একটি বোমা একটি এতিমখানায় আঘাত হানে এবং বেশ কয়েকজন শিশু নিহত হয়। পাকিস্তানিরা স্বভাবতই এর দায় চাপাল ভারতীয়দের ওপর। বর্তমানে যেখানে সোনারগাঁও হোটেল, সেই এলাকাতেও কয়েকটি বোমা ফেলা হয়েছিল। এর ফলে পুরো শহরে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। খিলগাঁও শহরের উপকণ্ঠে হলেও, আমরাও বেশ আতঙ্কে ছিলাম। পরে আমরা জানতে পারি, ওটা আসলে ছিল উদ্ভিদ সংরক্ষণ বিভাগের (প্ল্যান্ট প্রোটেকশন ডিপার্টমেন্ট) একটি বিমান, যা পাকিস্তানিরা ব্যবহার করছিল। মূল রানওয়েটি অকেজো হয়ে পড়ায়, বিমানটি ওঠানামার জন্য বিমানবন্দরের ট্যাক্সিওয়ে ব্যবহার করত, যা এই ছোট বিমানটির জন্য যথেষ্ট দীর্ঘ ছিল।
যুদ্ধ যত এগোচ্ছিল, বিদেশিরা ততই দেশ ছাড়তে মরিয়া হয়ে উঠছিল। কয়েক ঘণ্টার জন্য একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করা হলো এবং রানওয়েটি তড়িঘড়ি করে মেরামত করা হলো, যাতে বিদেশি বিমানগুলো অবতরণ করতে পারে। বিমানবন্দর এলাকায় বিমান হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলো। মহাখালীতে পরমাণু শক্তি কমিশনের হাউজিং কলোনিতে থাকা আমাদের সহকর্মীরা সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হতেই তড়িঘড়ি করে এলাকা ছেড়েছিলেন। একদিন তাদের একজন বললেন যে যুদ্ধবিরতির এই সুযোগে ফ্ল্যাট থেকে তার খুব জরুরি কিছু জিনিসপত্র নিয়ে আসা দরকার, কিন্তু তিনি একা যাওয়ার সাহস পাচ্ছিলেন না। আমি তাঁর সঙ্গে গেলাম। পুরো এলাকাটা ছিল একদম ভুতুড়ে। তিনি তার ফ্ল্যাটে ঢুকলেন, দোতলায় গেলেন এবং একগাদা নেকটাই হাতে নিয়ে নিচে নেমে এলেন! আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার কি সত্যিই এগুলো খুব দরকার? তিনি বুঝতে পারলেন যে আতঙ্কে তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন এবং আবার ওপরে ফিরে গেলেন। শেষমেশ যেগুলোর জন্য আসা, সেগুলো গুছিয়ে নিয়ে আমরা দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম।
বিদেশিদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শেষ হয়ে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ পেরোতেই ভারতীয় ফাইটার বোম্বারগুলো আবার ফিরে এল। রানওয়েটাকে একেবারে অকেজো করে দিতে তারা আবারও সেখানে শুরু করল তীব্র বোমাবর্ষণ।
পাকিস্তানিরা তখন প্রতিদিন একটু একটু করে পিছু হটছে। আত্মসমর্পণ করা নাকি লড়তে লড়তে মরা—এই দুটোর যেকোনো একটা বেছে নেওয়াটা তাদের জন্য তখন কেবলই সময়ের ব্যাপার। ওদিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তান আর তার মিত্ররা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিল একটা যুদ্ধবিরতি চুক্তির, যাতে পাকিস্তান পরাজয়ের গ্লানি এড়াতে পারে এবং কোনোমতে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর তাদের দখলটা টিকিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের সেই সব চালে ভেটো দিয়ে বারবার তা নস্যাৎ করে দিচ্ছিল। যুদ্ধ তখন তার যৌক্তিক ও অনিবার্য পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। ভারতীয় বিমানগুলো থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ওপর লিফলেট ফেলে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হচ্ছিল।
১৪ ডিসেম্বরের পড়ন্ত বিকেলে একদল পাকিস্তানি সেনা আমাদের বাড়ি থেকে কয়েক শ মিটার পুবে মেশিনগানের ঘাঁটি গাড়ল এবং সারা রাত ধরে ডেমরার দিকে অবিরাম গুলি চালাল। ততক্ষণে মুক্তিবাহিনী শীতলক্ষ্যা নদী পেরিয়ে বালু নদের কাছাকাছি চলে এসেছে। আর শহরের অন্য প্রান্তে, ভারতীয় বাহিনী এসে পৌঁছেছে মিরপুর ব্রিজের কাছে। ডেমরার দিক থেকে ছোড়া বেশ কয়েকটি মর্টার শেল আমাদের বাড়ির কয়েক শ মিটারের মধ্যেই এসে পড়ল। ওই দিনগুলোতে আমাদের প্রধান চিন্তাই ছিল কোনোমতে বেঁচে থাকা। পাকিস্তানিরা যদি আত্মসমর্পণ না করত এবং ঢাকায় যদি রীতিমতো খণ্ডযুদ্ধ বেধে যেত, তাহলে আমরা একেবারে দুই পক্ষের মাঝখানে আটকা পড়তাম। ১৫ ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় পাকিস্তানিরা পুবের গ্রামটিতে আগুন ধরিয়ে দিল। পাকিস্তানিরা শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করবে কি করবে না, তা জানার জন্য আমরা অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছিলাম।
অবশেষে এল সেই বহু কাঙ্ক্ষিত ১৬ ডিসেম্বর। ভারতীয় সেনাপ্রধান (এবং বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর প্রধান) জেনারেল স্যাম মানেকশ আগেই চরমপত্র দিয়ে রেখেছিলেন যে পাকিস্তানিরা যদি সেদিন সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে আত্মসমর্পণে রাজি না হয়, তবে ঢাকার ওপর সর্বাত্মক হামলা চালানো হবে। তখন একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছিল, তাই শহরের আকাশে কোনো বিমানের আনাগোনা ছিল না। পাকিস্তানিরা এই নির্দেশ মানবে কি না, আমরা কেবল সেই খবরটুকু শোনার অপেক্ষায় ছিলাম। রেডিওর নব ঘুরিয়ে আমরা পাগলের মতো কোনো বার্তার খোঁজ করছিলাম। সকাল ১০টায় আকাশবাণী খবর দিল যে ঢাকা থেকে এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এর ঠিক পরপরই অন্য একটি ফ্রিকোয়েন্সিতে আমরা সেই পরম আরাধ্য বার্তাটি শুনতে পেলাম। ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টার্স থেকে পাকিস্তানি সেনাদের উদ্দেশে দেওয়া হচ্ছিল বার্তাটি। কেউ একজন অত্যন্ত ধীর, হতাশ ও আত্মসমর্পিত কণ্ঠে সেটি পাঠ করছিলেন। শুরুতে ফারুক আর আমি সেটি খাতায় লিখে নেওয়ার চেষ্টা করলাম, তারপর টেপ রেকর্ডার এনে পুরোটাই রেকর্ড করতে শুরু করলাম।
বার্তাটি ছিল ঠিক এ রকম:
‘চরম প্রতিকূলতার মুখেও আপনারা বীর বিক্রমে লড়াই করেছেন। আমি আপনাদের নিয়ে গর্বিত। আপনারা এখন এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছেন, যেখান থেকে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া আর কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়, আর তাতে কোনো লাভও হবে না। এতে কেবল আরও প্রাণহানি আর ধ্বংসযজ্ঞই বাড়বে।
যুদ্ধ থামাতে এবং সশস্ত্র বাহিনীর সকল সদস্য, পশ্চিমাংশের সকল নাগরিক ও আমাদের অনুগত সকল মানুষের জীবন রক্ষার্থে যেকোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা এখন আমাকে দেওয়া হয়েছে। ফলস্বরূপ, আমি একটি যুদ্ধবিরতির অনুরোধ জানিয়েছিলাম, যা এখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেনে নিয়েছেন।
অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, এর অর্থ হলো আমাদের অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে। ভালো সৈনিকের মতো আমি আশা করি, আপনারা চরম শৃঙ্খলার সাথে এই নির্দেশ মেনে চলবেন।...আমাকে আমাদের সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর সকলের নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন। পশ্চিমাংশের সকল কর্মীর সম্পূর্ণ সুরক্ষার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর সকল সদস্যকে একজন সৈনিকের প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মানের চোখে দেখা হবে এবং জেনেভা কনভেনশনের নিয়মাবলি কঠোরভাবে মেনে চলা হবে। সকল আহত ব্যক্তিকে, সে যে-ই হোক না কেন, যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে। তাঁর কমান্ডের অধীনে থাকা কোনো বাহিনী, যার মধ্যে মুক্তিফৌজও রয়েছে, কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেবে না।
আপনাদের বিপরীত পক্ষের কমান্ডারদের সাথে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতিটি কার্যকর করতে হবে। বিস্তারিত নির্দেশনা পরে জানানো হবে। তবে এটি ১৬ ডিসেম্বরের সকাল ৫টা থেকে কার্যকর হবে। আপনারা সকল ধরনের আক্রমণাত্মক কার্যকলাপ বন্ধ রাখবেন এবং আমার পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করবেন। তবে বিমান হামলার বিষয়ে সতর্ক থাকবেন।’
এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা নিজেদের ছাদ থেকে দেখতে পেলাম, বিকেলের আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা আয়োজনের জন্য অগ্রবর্তী দল (অ্যাডভান্সড পার্টি) নিয়ে বেশ কয়েকটি ভারতীয় হেলিকপ্টার ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করছে। জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির নেতৃত্বে প্রায় নব্বই হাজার পাকিস্তানি সেনা জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করে। জায়গাটা ছিল ঠিক সেখানেই, যেখানে ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। বর্তমানে সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলা হয়েছে।
অবশেষে আমরা মুক্ত হলাম, অবসান ঘটল দীর্ঘ নয় মাসের এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের। সেদিন সন্ধ্যায় আমরা আমাদের বাড়ির বারান্দায় মোমবাতি জ্বালালাম। কিন্তু চারপাশের পুরো এলাকা তখনো ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে আছে। চারপাশের পরিবেশটা ছিল রীতিমতো গা–ছমছমে। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের এক বিশাল সমুদ্রে আমাদের বাড়িটা যেন হয়ে উঠেছিল আলোর এক ছোট্ট দ্বীপ। আমার মনে হয়, আমাদের প্রতিবেশীরা তখনো হয়তো বিশ্বাসই করে উঠতে পারছিলেন না যে যুদ্ধ আর কারফিউর সেই অন্ধকার দিনগুলোর সত্যিই অবসান ঘটেছে।
১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর সকালে লেখকের বাড়ির সামনে সগর্বে জাতীয় পতাকা ওড়ানো হচ্ছে।পরদিন, ১৭ ডিসেম্বর সকালে আব্বা আর ফারুক আমাদের বাড়ির সামনে সগর্বে জাতীয় পতাকা ওড়ালেন। সেই ২৫ মার্চের কালরাতে যে পতাকাটা আমরা বাধ্য হয়ে নামিয়ে ফেলেছিলাম, দীর্ঘ এই নয়টি মাস তা সযত্নে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
বিজয়ের প্রথম দিনটায় আমি আর বাড়ি থেকে বের হইনি। টানা নয় মাস ধরে মনের ভেতর যে এক পাহাড়সম চাপ জমে ছিল, তা হঠাৎ নেমে যাওয়ায় আমি প্রচণ্ড ক্লান্তি অনুভব করছিলাম। তাই সেদিন বলতে গেলে আমি প্রায় সারা দিন ঘুমিয়েই কাটিয়েছি। পরদিন, ১৮ ডিসেম্বর ফারুক আর আমি একটু বাইরে বেরোলাম। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাউসের (বর্তমান সুগন্ধা) সামনে আমরা এক পাকিস্তানি অফিসারের লাশ পড়ে থাকতে দেখলাম; তার মাথার অর্ধেকটাই উড়ে গিয়েছিল। সেখানে হেঁটে বেড়ানো এক ভারতীয় সেনা কর্মকর্তার সাথেও আমাদের দেখা ও কথা হলো। স্টেডিয়ামে গিয়ে দেখলাম, সেকেন্ড বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনারা বিশ্রাম নিচ্ছেন। আমরা তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললাম। ওদিকে তেজগাঁও বিমানবন্দরে তখন ভারত থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ দেশে ফিরতে শুরু করেছেন।
রাস্তার বাইরের দৃশ্যটা ছিল বড়ই অদ্ভুত আর কৌতুককর। পাকিস্তানি সেনারা লাইন ধরে মার্চ করে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাচ্ছিল, যেখানে তাদের বন্দী করে রাখা হবে। আর দশটা পরাজিত বাহিনীর মতোই তাদের চেহারা ছিল চরম করুণ আর বিপর্যস্ত। সাধারণ মানুষ তাদের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিল না; বরং উত্তর দিক থেকে দলে দলে আসা বাসভর্তি ভারতীয় সেনাদের হর্ষধ্বনির মাধ্যমে স্বাগত জানাতেই তারা বেশি ব্যস্ত ছিল। পাকিস্তানি সেনাদের চোখেমুখে ছিল চরম বিভ্রান্তির ছাপ। ‘মুসলমান’ বাঙালিরা কিনা ‘হিন্দু’ সেনাদের দেখে উল্লাস করছে! আমার মনে হয়, এই যুদ্ধটা আসলে কিসের জন্য ছিল, সেটাই তারা বুঝে উঠতে পারেনি।
যেকোনো জাতির জীবনে মুক্তিযুদ্ধ এক অনন্য এবং অদ্বিতীয় ঘটনা। ইতিহাসে এর পুনরাবৃত্তি ঘটে না। যাঁরা এই যুদ্ধে সশরীরে অংশ নিতে পেরেছেন কিংবা অন্তত স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরা সত্যিই পরম সৌভাগ্যবান। ১৯৭১ সালে আমাদের পরিবারের যেসব সদস্য দেশে ছিলেন, তাঁরাও সেই সৌভাগ্যবানদেরই অংশ। আমরা হয়তো সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নিতে পারিনি; সবাই তো আর হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে যুদ্ধ করতে পারে না! কিন্তু হৃদয়ের গভীরে আমাদের প্রত্যেকেই ছিলাম একেকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সেই উত্তাল সময়ে দেশে থাকতে পেরে এবং নিজেদের সাধ্যমতো সামান্য কিছু অবদান রাখতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। চরম বিপদের মুখেও আমরা ছিলাম অত্যন্ত সাহসী এবং মানবিক এক জাতি; সেই হিসেবে ওই নয় মাস ছিল আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল সময়। তবে বড়ই দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেই আমরাই আজ অনেক বদলে গেছি।
এর পরের বছরগুলোতে, ২৫ মার্চ এবং ১৬ ডিসেম্বরের সেই টেপগুলো নিয়ে আমি কয়েকটি পত্রিকায় বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলাম। এ নিয়ে দু-একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানও হয়েছিল। প্রস্তাবিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে টেপটি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, তা যাচাই করার জন্য ওয়ার ক্রাইম অফিসের একজন কর্মকর্তা (ডিআইজি জনাব শুকুর) আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। যদিও আমরা জানি, সে সময়ে এর কোনো বাস্তব ফল পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে জেনারেল জিয়ার আমলে সরকারি প্রচার দপ্তর টেপের কিছু অংশ উদ্ধৃত করে পত্রিকায় একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল, যেখানে আমার নাম একবারের জন্যও উল্লেখ করা হয়নি!
কয়েক বছর আগে আমি সেই ঐতিহাসিক টেপ এবং তার ট্রান্সক্রিপ্ট বা প্রতিলিপির একটি কপি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের জনাব আক্কু চৌধুরীর কাছে হস্তান্তর করি, যাতে সেগুলো সেখানে প্রদর্শিত হতে পারে। গত কয়েক বছরে আমার ছোট বোন মনিরা (অধ্যাপক মনিরা হোসেন) টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং টেপের ওপর ভিত্তি করে একটি বই প্রকাশের (বইয়ের নাম:টিক্কা খান ফ্রম কন্ট্রোল রুম, মার্চ ১৯৯৭,আইএসবিএন ৯৮৪-৫৮২-০০০X) মাধ্যমে মানুষকে এই ইতিহাস জানানোর জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এখন আমাদের পরিবারের সবার জন্যই এটি অত্যন্ত গর্বের বিষয় যে স্বাধীনতা দিবসের আশেপাশে আমাদের কথাও একটু-আধটু স্মরণ করা হয়। এটাই আমাদের জন্য এক বাড়তি পাওয়া, এক পরম তৃপ্তি।
পুনশ্চ: আমাদের জাতি এবং আমাদের পরিবারের সেই যুগান্তকারী দিনগুলোর কথা আমি সম্পূর্ণ নিজের স্মৃতি থেকে লেখার চেষ্টা করেছি। আমি আশা করি, এতে বড় কোনো তথ্যের ঘাটতি বা ভুলভ্রান্তি নেই।
(প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক পিটার হ্যাজেলহার্স্ট ২ জুন ১৯৭১ সালে ‘দ্য টাইমস’ পত্রিকায় এই রেকর্ডিংয়ের কিছু অংশ উদ্ধৃত করে জানিয়েছিলেন যে পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানে রীতিমতো গণহত্যা চালাচ্ছে।)
অপারেশন সার্চলাইট
২৫ মার্চ ১৯৭১। ঢাকা
সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকা
২৬: তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাউসে অবস্থিত (বেইলি রোডে পাপা হাউস)।
৪১: ধানমন্ডি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পশ্চিমে।
৮৮: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
৯৯: তৎকালীন কমিশনারের কার্যালয় (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়)।
১৬: ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস লাইনস (পিলখানা)।
৫৫: ফার্মগেট এলাকা।
৫৪: হেডকোয়ার্টার পরিবহন শাখা।
হাইয়েস্ট কন্ট্রোল: ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাব বা জেনারেল টিক্কা খান।
ইমাম: কমান্ডার।
মারখোর: অ্যাডজুট্যান্ট।
ছোটা: গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
লিয়াকত/ইকবাল/জগন্নাথ: বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রাবাস (হল)।
বিগ ব্রাদার্স/বখতার: ট্যাংক বা বুলডোজার।
রোমিও রোমিও: রিকয়েললেস রাইফেল (ট্যাংক-বিধ্বংসী)।
নিচে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় কার্যরত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কয়েকটি ইউনিটের মধ্যকার কিছু বেতার যোগাযোগের টেপ রেকর্ডিংয়ের একটি আংশিক প্রতিলিপি দেওয়া হলো।
রেকর্ড করেছেন: ড. মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন, আণবিক শক্তি কেন্দ্র, ঢাকা।
রেকর্ডিংয়ের স্থান: খিলগাঁও চৌধুরীপাড়া, ঢাকা।
রেকর্ডিংয়ের সময়: ২৬ মার্চ ১৯৭১-এর আনুমানিক রাত ১টা ৩০ মিনিট থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত (মাঝে বিরতিসহ)।
[বেতার কথোপকথন শুরু]
কন্ট্রোল:...যা তাদের সাথে আছে এবং ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে; এলাকার প্রকৃতির কারণে এতে সময় লাগবে। ওভার। ৭৭, আপনি আমাকে কেমন শুনতে পাচ্ছেন? ওভার।
৭৭: স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। আপনার কাছে আমার জন্য কিছু আছে কি? ওভার।
কন্ট্রোল: সংশোধন, ৭৭, অপেক্ষা করুন, তিনি নিজেই কল করবেন...। ৭৭, অপেক্ষা করুন। আপনার জন্য বার্তা, হ্যালো ৯৯, পরামর্শ দিচ্ছি আপনি সংযুক্ত থাকুন; কারণ, অন্যথায় ২৬ এবং অন্যান্যদের দুইবার পরিস্থিতি জানাতে হবে। শুধু সংযুক্ত থাকুন, এখনো নতুন কিছু নেই; রিজার্ভ লাইন সুরক্ষিত এবং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এখনো লড়াই চলছে। আউট।
(ইমামের জন্য অপেক্ষা...)
অজ্ঞাত (৭৭-এর প্রান্ত থেকে): ৭৭-এর জন্য, ইমাম এখানে এসেছেন এবং আমার ইমাম তাঁর সাথে ব্যস্ত আছেন, তাই আমি এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারছি না। ওভার।
কন্ট্রোল: কন্ট্রোল অগ্রগতির তথ্য জানতে চাইছে। আপনি এটি জেনে নিজেই তা জানিয়ে দিন। ওভার।
অজ্ঞাত: অপেক্ষা করুন। আপনার জন্য বার্তা, হ্যালো, ৭৭, ইমাম শুনছেন, আপনার বার্তা পাঠান। ওভার।
৭৭: ৭৭, ৮৮-এর কাছ থেকে সর্বশেষ খবর হলো যে সে এগোচ্ছে, কিন্তু সেখানে এত বেশি ভবন আছে যে তাকে একে একে প্রতিটি ভবনের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিতে হচ্ছে। তার দিক থেকে এখনো কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে তার বিরুদ্ধে গুলি চালানো হচ্ছে। তার কাছে যা কিছু আছে, সে তার সবকিছুই ব্যবহার করছে। ওভার।
ইমাম (কন্ট্রোলের প্রান্তে): তাকে বলুন যে তার বড় ভাইয়েরাও (ট্যাংক) খুব শিগগিরই আসবে বলে আমি আশা করছি, তাই ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য এগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। এখন, অন্যদিকে আমার মনে হয় লিয়াকত এবং ইকবাল এখন শান্ত; আমি কি ঠিক বলছি? ওভার।
৭৭: ৭৭ এর আগের প্রতিবেদন শোনেনি, তবে তারা ওই দুটি সম্পর্কে অনেক খুশি ছিল। ওভার।
ইমাম: এটা খুবই ভালো। এখন ছেলেরা রাস্তায় কারফিউ সম্পর্কে ঘোষণা দিতে থাকুক, এটি হলো এক নম্বর। দুই নম্বর, তারা এটা বলতে থাকবে যে সমস্ত বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে ফেলতে হবে এবং যে বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা থাকবে, তার পরিণতির জন্য মালিক দায়ী থাকবে। শহরে কোনো কালো পতাকা থাকবে না এবং কোথাও বাংলাদেশের কোনো পতাকা দৃশ্যমান হবে না। এবং যদি সেগুলো নামানো না হয়, তবে এর পরিণতি সত্যিই, সত্যিই ভয়াবহ হবে। এটি অবশ্যই সবাইকে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। এখন পর্যন্ত রজার (বার্তা বুঝেছি)। ওভার।
৭৭: ৭৭। রজার। ওভার।
ইমাম: ৭৭। দ্বিতীয়ত, রাস্তার অবরোধ সম্পর্কেও ঘোষণা করতে হবে। যে কাউকে রাস্তার অবরোধ তৈরি করতে দেখলে তাকে ঘটনাস্থলেই গুলি করা হবে, এক নম্বর; দুই নম্বর, কোনো এলাকায় রাস্তার অবরোধ তৈরি করা হলে, সেই এলাকার লোকদের বিচার করা হবে এবং দায়ী করা হবে, আর সেই অবরোধের বাম এবং ডান দিকের বাড়িগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। এটি সবাইকে এবং স্বয়ং জনগণকে পরিষ্কার করে জানাতে হবে এবং এটি সারা রাত ধরে সকাল পর্যন্ত এবং আগামীকাল সারা দিন মাইকে ঘোষণা করতে হবে। ওভার।
৭৭: ৭৭। উইলকো (নির্দেশ পালন করা হবে)। আপনার জন্য বার্তা, হ্যালো ৪১, আপনি কি ইমামের কাছ থেকে পেয়েছেন? ওভার।
৪১: ৪১, ইমাম কি শুনছেন? ওভার।
ইমাম (কন্ট্রোলের প্রান্তে): ৪১, ইমামের পক্ষ থেকে। এক নম্বর, সমস্ত কালো পতাকা...বিভিন্ন ভবনের মালিকদের অবশ্যই এই পতাকাগুলো নামিয়ে ফেলতে হবে; কাউকে এই পতাকা ওড়াতে দেখা গেলে তার বিচার করা হবে। এটি আপনার পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে ঘোষণা করা উচিত। এখন পর্যন্ত রজার। ওভার।
ইমাম: ৪১, একইভাবে যেকোনো স্থানে রাস্তার অবরোধ সৃষ্টি করা একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। যে কাউকে এই কাজ করতে দেখলে দেখামাত্র গুলি করা হবে। রাস্তার অবরোধের উভয় পাশের ভবনের মালিকদের শাস্তি দেওয়া হবে এবং তাদের ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। এটি আপনার টহলদার দলগুলোর দ্বারা ঘোষণা করা উচিত। ওভার।
ইমাম: ৪১, আপনার জন্য বার্তা, হ্যালো ৮৮। অগ্রগতি জানান। ওভার।
৮৮: ৮৮, একটু অপেক্ষা করুন। আউট।
ইমাম (৮৮-এর প্রান্তে): ৮৮, ইমাম সেটে আছেন। আপনার বার্তা পাঠান। ওভার।
ইমাম (কন্ট্রোলের প্রান্তে): ৮৮, সমস্ত বাংলাদেশের পতাকা বা কালো পতাকার বিষয়ে ইমামের পক্ষ থেকে নির্দেশ হলো, যেসব ভবনের মালিকেরা এগুলো ওড়াচ্ছেন, তাঁদের এগুলো অবিলম্বে সরিয়ে ফেলতে সতর্ক করতে হবে; অন্যথায় তাঁদের বিচার করা হবে। এখন পর্যন্ত রজার। ওভার।
৮৮: ৮৮। উইলকো। ওভার।
ইমাম: ৮৮। যেকোনো স্থানে রাস্তার অবরোধ করা একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। কাউকে এই কাজে লিপ্ত দেখলে তাকে দেখামাত্র গুলি করতে হবে। উভয় পাশের বাড়িঘর ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। এটিও আপনার টহলদার দলগুলোর মাধ্যমে পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে ঘোষণা করা উচিত। ওভার।
৮৮: ৮৮। উইলকো। আর কিছু? ওভার।
ইমাম: ৮৮। আপনার ইমাম কি বলেছেন যে কাজটি শেষ করতে আপনার আনুমানিক তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগবে? ওভার।
৮৮: ৮৮। হ্যাঁ, কাজটি পুরোপুরি শেষ করতে প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগবে। ওভার।
কন্ট্রোল: ৮৮, ইমাম এখন ইমাম ২৬-এর সাথে আছেন। আপনার যদি কোনোভাবে আরও সহায়তার প্রয়োজন হয়, আপনি তাঁকে জানাতে পারেন। বখতার (ট্যাংক/বুলডোজার) উপাদানগুলোর বিষয়ে, তারা তাদের নিরাপদ অবস্থান থেকে যাত্রা শুরু করেছে এবং আপনার সামনের সমস্ত বাধা ধ্বংস করতে প্রথম আলো (ভোর) ফোটার পরপরই আপনাকে সাহায্য করতে পারবে। ওভার।
৮৮: ৮৮। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমার দিক থেকে আর কিছু বলার নেই। সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। ওভার।
কন্ট্রোল: ৮৮, রজার। আপনার জন্য বার্তা, হ্যালো ৪১, বার্তা। ওভার।
কন্ট্রোল: ৪১, রেললাইনের পশ্চিম দিকের পালানোর পথগুলো সম্পর্কে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পশ্চিমে, পুরোনো রেললাইন), যা আপনার এলাকায় পড়েছে, আশা করি প্রয়োজনীয় অবরোধগুলো যথাস্থানে বসে গেছে যাতে ২৬ এবং ৮৮-এর মুখোমুখি থাকা লোকেরা ক্যাম্পাসের পশ্চিম দিকে পালিয়ে যেতে না পারে। ওভার।
৪১: ৪১, আমরা খুব ব্যাপকভাবে এলাকায় টহল দিচ্ছি। প্রতি মিনিটে আমরা ওই পথ দিয়ে যাচ্ছি এবং পাহারায় আছি। ওভার।
কন্ট্রোল: ৪১, রজার। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আপনি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবেন। ২৬-এর ছেলেরা ‘ডেইলি পিপল’-এর ‘আমাদের বন্ধুদের’ শায়েস্তা করেছে। এতে আপনার খুশি হওয়া উচিত। আউট।
৯৯: হ্যালো, ৮৮-এর জন্য ৯৯। হাইয়েস্ট কন্ট্রোল জানতে চায়, অন্যদিক থেকে কী ধরনের গোলাগুলি এসেছে। ওভার।
৮৮: ৯৯-এর জন্য ৮৮, অপেক্ষা করুন। আমি আমার ইমামকে ডাকছি এবং তারপর আপনি তার সাথে কথা বলবেন। ৯৯-এর জন্য ৮৮। আমার ইমাম শুনছেন। আপনার বার্তা পাঠান। ওভার।
৯৯: ৮৮-এর জন্য ৯৯, হাইয়েস্ট কন্ট্রোল জানতে চায় জগন্নাথ, ইকবাল এবং লিয়াকত এলাকায় কী ধরনের প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছে। ওভার।
৮৮: ৯৯-এর জন্য ৮৮। শুরুতে জগন্নাথ এবং ইকবাল হল থেকে প্রচুর গুলি এসেছে। এখন পর্যন্ত রজার। ওভার।
৯৯: রজার। ওভার।
৮৮: ৮৮, একবার আমরা রোমিও রোমিও (ট্যাংক-বিধ্বংসী অস্ত্র) দিয়ে গুলি চালানোর পর আর কোনো গুলির শব্দ শুনিনি; তবে আমরা কয়েকজনকে শেষ করে দিয়েছি। এখন পর্যন্ত রজার। ওভার।
৯৯: ৮৮-এর জন্য ৯৯। রজার। ওভার।
৮৮: ৯৯-এর জন্য ৮৮। এখন আমি লিয়াকতে যাচ্ছি; কারণ, তাদের সেট নষ্ট হয়ে গেছে। আমি তাদের অগ্রগতি জানি না। সেটি পরীক্ষা করার পর আমি আপনাকে জানাব। ওভার।
৯৯: ৮৮-এর জন্য ৯৯। দয়া করে আমাদের জানান যে অন্যদিক থেকে কোনো স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ফায়ার হয়েছিল কি না এবং কোনো গ্রেনেড ইত্যাদি ছোড়া হয়েছিল কি না। ওভার।
৮৮: ৯৯-এর জন্য ৮৮। প্রচুর ৩০৩ ফায়ার হয়েছে। আমরা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের শব্দ শুনিনি, কোনো গ্রেনেডের শব্দও শুনিনি। ওভার।
৯৯: ৮৮। রজার। আউট।
২৬: ৯৯-এর জন্য ২৬। মারখোর সেটে আছেন। আপনার বার্তা পাঠান। ওভার।
৯৯: ২৬-এর জন্য ৯৯। দয়া করে আমাদের জানান যে এখন পর্যন্ত কী কী লক্ষ্যবস্তু দখল করা হয়েছে। ওভার।
২৬: ৯৯-এর জন্য ২৬। এরিয়া ‘টু থাউজেন্ড’ দখল করা হয়েছে, তারপর রমনা থানা দখল করা হয়েছে, কমলাপুর আরএস দখল করা হয়েছে, টিভি, রেডিও নিয়ন্ত্রণে, এক্সচেঞ্জ দখল করা হয়েছে। সব প্রথম পর্যায় ইয়া আলী। ওভার।
৯৯: কমিশনারের অফিসে (বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) আমাদের অবস্থান থেকে আমরা পুরানা পল্টন এলাকায় প্রচুর আগুন দেখতে পাচ্ছি। এটি কি প্রধান কার্যালয় (আওয়ামী লীগের), নাকি অন্য কোনো জায়গা? ওভার।
২৬: ৯৯-এর জন্য ২৬। এরিয়া ২০০০-এ আগুন জ্বলছে। আমি আবার বলছি, এরিয়া ২০০০-এ আগুন জ্বলছে। ওভার।
৯৯: ৮৮-এর জন্য ৯৯। ‘পিপলস ডেইলি’-এর কী অবস্থা? ওভার।
২৬: ৯৯-এর জন্য ২৬। উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, আমি আবার বলছি, উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের দুজন লোক গুরুতর আহত, তাদের সিএমএইচে (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং দুজন সামান্য আহত হয়েছে। ওভার।
৯৯: ২৬-এর জন্য ৯৯, অন্য পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির কোনো অনুমান করা যাচ্ছে? ওভার।
২৬: ২৬, না। এই মুহূর্তে বিচার করা কঠিন। জায়গাগুলোতে আগুন জ্বলছে অথবা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে কিছু বলা সম্ভব নয়। ওভার।
৯৯: ২৬-এর জন্য ৯৯। আপনারা কি পুলিশ লাইনসও শেষ করে দিয়েছেন? ওভার।
২৬: ৯৯-এর জন্য ২৬। হ্যাঁ, আমি বলছি, টু থাউজেন্ড, পুলিশ লাইনসে আগুন জ্বলছে। ওভার।
৯৯: ২৬-এর জন্য ৯৯। চমৎকার কাজ। আউট।
৫৫: ৫৫। স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ওভার।
মারখোর: ৫৫। মারখোর শুনছেন। পাঠান। ওভার।
৫৫: ৫৫। আপনার বার্তা পাঠান। ওভার।
মারখোর: ৫৫। আপনি কল করেছিলেন। বার্তা পাঠান। মারখোর শুনছেন। ৫৫, আপনার বার্তা পাঠান। ওভার।
৫৫: ৫৫...
মারখোর: ৫৫, আবার বলুন। ওভার।
২৬: ৮৮-এর জন্য ২৬। অগ্রগতি পাঠান। ওভার।
৫৫: ৫৫।
২৬: ৫৫। রজার। ঠিক কোথায় এদের সাথে যোগাযোগ হয়েছে? ওভার।
২৬: ৮৮-এর জন্য ২৬। আপনার কণ্ঠস্বর ভেঙে যাচ্ছে এবং আপনি জগন্নাথ হলের অগ্রগতি সম্পর্কে আমাদের জানাবেন। জগন্নাথ সম্পর্কে। ওভার।
৮৮: আপনাকে রিপোর্ট করতে...
২৬: ৮৮-এর জন্য ২৬। রজার। আউট।
৫৫: ৫৫। আমি আবার বলছি, আমাদের...সামনে একটি রাস্তার অবরোধ ছিল এবং আমরা সেটি ও অন্যান্য জিনিস সরিয়ে ফেলছি। ওভার।
২৬: ৫৫। দারুণ কাজ। ২৬-এ আপনার ছেলেদের আশা করা হচ্ছে। তারা বিশেষভাবে ৮৮-এর জন্য সহায়ক হবে, যার কিছু অসুবিধা হচ্ছে। আসতে থাকুন। আউট।
কন্ট্রোল: ৫৫। রি-নেট (ফ্রিকোয়েন্সি চেক করুন)। আপনার সেটের নেটিং পরীক্ষা করুন। আপনি কী বলছেন, তা বুঝতে পারছি না। ৫৫, ৫৫, ৫৫, ৫৫, ৫৫। নেটিং কল। এখন নেট করুন। নেটিং কল শেষ।
৫৫: ৫৫, ৫৫। আপনি আমাকে কেমন শুনতে পাচ্ছেন? ওভার।
কন্ট্রোল: ৫৫, ৫৬...ওভার।
কন্ট্রোল: ৫৫, এখনো বাঁশির মতো শব্দ আসছে। ট্রান্সমিটারটি আবারও নেট করুন। ৫৫, ৫৫, ৫৫, ৫৫, ৫৫। এখানে নেটিং কল। এখন নেট করুন। নেটিং কল শেষ।
৫৫: ৫৫। আপনি আমাকে কেমন শুনতে পাচ্ছেন? ওভার।
কন্ট্রোল: ৫৫...
কন্ট্রোল: ৫৫। রজার। কথা বলার সময় মাইক্রোফোনটি আপনার থেকে একটু দূরে রাখুন। ৫৫, আর কিছু নয়। আউট।
অজ্ঞাত: বার্তা। ওভার।
২৬: ৮৮-এর জন্য ২৬, ৮৮-এর জন্য ২৬, বার্তা। ওভার।
৮৮: ২৬-এর জন্য ৮৮। আমরা এগোচ্ছি...
২৬: ৮৮-এর জন্য ২৬। জগন্নাথের অগ্রগতি জানান, আমি আবার বলছি, জগন্নাথ। ওভার।
৮৮: ২৬-এর জন্য ৮৮। আমার ইমাম এগোচ্ছেন...
২৬: ৮৮-এর জন্য ২৬। রজার আউট।
মারখোর: মারখোর থেকে মারখোর। ওভার।
১৬: ১৬। অপেক্ষা করুন। আউট।
মারখোর: অন্য পক্ষের কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে? ওভার।
১৬: ১৬...চারজন নিহত।
মারখোর: রজার। আহতদের কি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসহায়তা দেওয়া হয়েছে?
কন্ট্রোল: ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) হাসপাতাল। ওভার।
মারখোর: ১৬। খুব ভালো। আপনার জন্য বার্তা, হ্যালো ২৬, হ্যালো ২৬, বার্তা। ওভার।
৫৫: ৫৫। অবস্থান। ওভার।
কন্ট্রোল: ৫৫। অবস্থান। ওভার।
৫৫: ৫৫, আমি ফার্মগেটের একটু আগে আছি এবং আমরা এখন বিস্ফোরণ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে রাস্তার অবরোধগুলো সরিয়ে দিচ্ছি। আমরা এখনো একই জায়গায় আছি। ওভার।
কন্ট্রোল: ৫৫। রজার। আশা করি কেউ আপনাদের বিরুদ্ধে বেরিয়ে আসার সাহস করেনি। ওভার।
৫৫: ৫৫। আমরা চারদিকে চিতা (পদাতিক বাহিনী) মোতায়েন করেছি। এখন পর্যন্ত নেতিবাচক (কেউ আসেনি)। ওভার।
কন্ট্রোল: ৫৫। রজার। ডোজার এবং রিকভারি সরঞ্জাম কি আপনার সাথে আছে? ওভার।
৫৫: ৫৫। হ্যাঁ। ডোজারটি এখন পুরো শক্তি দিয়ে সরানোর জন্য ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং তারাও আমাদের সাহায্য করছে। ওভার।
কন্ট্রোল: ৫৫। এটি চমৎকার। আসতে থাকুন। আমরা এই মূল ভবনের এলাকায় আছি। রাস্তার যেকোনো অপ্রয়োজনীয় ক্ষয়ক্ষতি যা বাঁচানো সম্ভব, তা এড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। আউট।
অজ্ঞাত:...৭৭-এর জন্য, ৭৭-এর জন্য ১৬। বার্তা। ওভার।
১৬: ১৬, মারখোরকে সেটে ডাকুন। ওভার।
মারখোর: ১৬ মারখোর। পাঠান। ওভার।
১৬: ১৬...
মারখোর: ১৬, আগের আলোচনা অনুযায়ী, আপনার মূল বাহিনীর ইমাম প্রয়োজনীয় মহড়া পরিচালনা করবেন এবং বিভিন্ন বিভাগ বাছাই করবেন, যে অনুযায়ী তারা পুনর্গঠিত হবে। পরামর্শ দিচ্ছি, প্রথম আলো ফোটা পর্যন্ত বা আপনার হোস্টের ইমাম উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত আপনি সেখানেই থাকুন। ওভার।
১৬: ১৬। উইলকো। আউট।
অজ্ঞাত: ইমামের জন্য। ওভার।
অজ্ঞাত: অপেক্ষা করুন। আউট।
ইমাম: ইমাম শুনছেন। আপনার বার্তা পাঠান। ওভার।
ইমাম: ৪১। ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং আপনার এলাকার থানাগুলোর অবস্থার কথা জানান। ওভার।
৪১: ৪১। ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তল্লাশি চালানো হয়নি, তবে আমরা সশস্ত্র সৈন্য মোতায়েন করেছি। এলাকায় কোনো থানা নেই। ওভার।
ইমাম: ৪১। ধন্যবাদ। আউট।
৪১: ৪১। আমাদের কাছে প্রচুর লোক আছে যারা বেশ কয়েকটি রাস্তার অবরোধ তৈরি করেছিল, তাদের জড়ো করা হয়েছে এবং রাস্তা পরিষ্কারের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের কি আপনার কাছে ফেরত পাঠাতে হবে, নাকি তাদের সরিয়ে ফেলা (মেরে ফেলা) যেতে পারে? ওভার।
ইমাম: ৪১। এটি শ্রমের ভালো ব্যবহার। পরামর্শ দিচ্ছি, আপনি আপাতত তাদের ব্যবহার করুন এবং ইমামের কাছ থেকে বিষয়টি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তাদের আটকে রাখুন। তারপর সেই অনুযায়ী আপনি তাদের ছেড়ে দিতে পারেন অথবা আমরা তাদের নিয়ে যাব। ওভার।
৪১: ৪১। রজার। আউট।
৮৮: ৮৮। বার্তা। ওভার।
কন্ট্রোল: ৮৮। আপনার বার্তা পাঠান। ওভার।
কন্ট্রোল: ৮৮। রোমিও সিয়েরা ইউনিফর্মের সাথে আপনার যে সৈন্যটি আছে, তার মাধ্যমে জিজ্ঞাসা করুন যে রোমিও সিয়েরা ইউনিফর্ম নদীতে টহল দিচ্ছে কি না। ওভার।
৮৮: ৮৮। রজার। ওভার।
৮৮: ৮৮। আউট।
কন্ট্রোল:...শুধু আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চেয়েছিলাম যে রোমিও সিয়েরা ইউনিফর্মের সাথে থাকা আপনার সৈন্যটির উচিত তাদের নদীর নৌকায় টহল দিতে বলা। ইমামের আলোচনা অনুযায়ী নদীতে টহল দিন। ওভার।
৮৮: ৮৮। আমরা ইতিমধ্যেই সেটি শুরু করেছি, আমি আবার বলছি, আমরা ইতিমধ্যেই সেটি শুরু করেছি। ওভার।
কন্ট্রোল: ৮৮। রজার। পরামর্শ হলো, এমন সব কার্যকলাপ আমাদের রিপোর্ট করতে হবে। আপনি আপনার এলাকায় কীভাবে এগোচ্ছেন? ওভার।
৮৮: ৮৮...আমি তাকে সব ধরনের...
কন্ট্রোল: ৮৮। খুব ভালো। চালিয়ে যান। আউট।
কন্ট্রোল: হ্যালো ২৬। ওভার।
২৬: ২৬। পাঠান। ওভার।
কন্ট্রোল: ২৬। আপনি কি ‘ডেইলি পিপল’ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাউকে ধরতে পেরেছেন? ওভার।
২৬: ২৬। না, নেতিবাচক। তবে আমাদের সৈন্যরা অন্য কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জন্য গেছে এবং আমরা তাদের অগ্রগতির জন্য অপেক্ষা করছি। ওভার।
কন্ট্রোল: ২৬। রজার। আলফা লিমার (আওয়ামী লীগ) অফিস কি এ পর্যন্ত দখল করা হয়েছে? ওভার।
২৬: ২৬। না। লক্ষ্যবস্তুটি ভোরবেলার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। ওভার।
কন্ট্রোল: ২৬। রজার। তবে ওই ভবনের দখলকারীরা হয়তো ইতিমধ্যেই যেকোনো রেকর্ড এবং কাগজপত্র পুড়িয়ে বা ধ্বংস করে দিয়েছে। যা–ই হোক, আপনি যেভাবে পরিকল্পনা করেছেন সেভাবেই করুন এবং আপনি চমৎকার অগ্রগতি করছেন। যা কিছু ঘটছে, তার প্রতিটি ছোটখাটো বিষয় আমাদের জানান। আউট।
মারখোর: হ্যালো ৯৯, ৯৯। মারখোর। ছোটাকে রেডিওতে দিন। ওভার।
৯৯: ৯৯। অপেক্ষা করুন। আউট।
অজ্ঞাত: আপনার বার্তা পাঠান। ওভার।
৭৭: আপনার জন্য বার্তা, হ্যালো ২৬, ২৬, ৭৭-এর পক্ষ থেকে বার্তা, মারখোরকে জানান যে ইমাম বলেছেন, প্রথম আলো ফোটার আগেই এই সমস্ত মৃতদেহ সরিয়ে ফেলতে হবে; এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়ে দিন। ওভার।
২৬: ২৬। রজার। আপনি আপনার নিজের ইমামকে এবং মারখোরকে এই খবর দিয়ে দিন।
৭৭: আপনার জন্য বার্তা, হ্যালো ৪১, হ্যালো সংশোধন, হ্যালো ১৬, হ্যালো ৪১, হ্যালো ৮৮, আপনারা কি পেয়েছেন? ওভার।
১৬: ১৬। উইলকো। ওভার।
৭৭: আপনার জন্য বার্তা, হ্যালো ৮৮, আপনি কি এই বার্তাটি পেয়েছেন, যা ৪১ এইমাত্র পড়ে শোনাল? ওভার।
৮৮: ৮৮...নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। ওভার।
৭৭: ৮৮। হ্যাঁ, তাদের সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করুন, আপনি স্থানীয় শ্রমিক ব্যবহার করতে পারেন এবং তাদের জনসাধারণের স্থান থেকে দূরে সরিয়ে ফেলতে পারেন। ওভার।
৭৭: ৮৮। অন্য পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির একটি হিসাব আপনি কখন আমাদের দিতে পারবেন? আর কিছু নয়। আউট।
কন্ট্রোল: আউট...এর জন্য প্রয়োজনীয় ডিটাচমেন্ট...এগুলোর ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। পরামর্শ দিচ্ছি, আপনি আজ সকাল আনুমানিক ০১:০০ ঘটিকা থেকে যা ঘটেছে, তার ভিত্তিতে আপনার পরিস্থিতি প্রতিবেদন তৈরি করতে পারেন। ওভার।
৯৯: ৯৯, হ্যালো ৯৯, ০১:০০ ঘটিকা থেকে প্রায় আধা ঘণ্টা আমরা আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি এবং এরপর আমাদের টেলিফোন ও এই জায়গার মধ্যে ছুটোছুটি করতে হয়েছে, যা বেশ খানিকটা দূরের। তাই আমরা বেশির ভাগ ট্রান্সমিশন মিস করেছি। ওভার।
কন্ট্রোল: ৯৯, পরবর্তীতে এগুলো আপনাকে জানানো হয়েছিল, বেলালের ছেলেদের থেকে শুরু করে যখন তারা ‘প্রধান পাখিকে খাঁচায় বন্দী করেছিল’ (শেখ মুজিবুর রহমান) এবং পরবর্তীতে দুটি টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, রমনা থানা, পিপলস ডেইলি, রিজার্ভ লাইন, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকায় এখনো যে অভিযান চলছে, সেই সাথে গুলশানের বাড়িগুলো, সংশোধন, ধানমন্ডির বাড়িগুলো, যেগুলোর বাসিন্দাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। ওভার।
৯৯:...শেষ ট্রান্সমিশন সম্পর্কে, ধানমন্ডি থেকে কোন বাসিন্দাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি?
কন্ট্রোল: ৯৯, তাজউদ্দীন এবং ভূঁইয়া সম্পর্কে, তাদের নিজেদের জায়গায় পাওয়া যায়নি; একইভাবে এই জায়গা ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, যেখানে অস্ত্র থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন পর্যন্ত কিছু পাওয়া যায়নি। ওভার।
৯৯: এটি কি মোহাম্মদপুর এলাকার সেই একই ফিজিক্যাল ইনস্টিটিউট? ওভার।
কন্ট্রোল: ৯৯, হ্যাঁ। তাই সেই দিকটায় এখনো কিছু নেই। আমরা মালখানা এবং লালবাগ কেল্লারও ব্যবস্থা নেব। তবে সেটি পরে হবে। সুতরাং আপনি বেশির ভাগ সারমর্ম পেয়েছেন। ওভার।
৯৯: ৯৯, আমরা কল সাইন ২৬ এবং ৮৮-এর কাছ থেকে সবকিছু শুনেছি, তবে অন্যান্য কল সাইনগুলোর কী খবর? ওভার।
কন্ট্রোল: ৯৯, ১৬-কে খুব সামান্য প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছে, যেখানে তারা চারজনকে হত্যা করেছে এবং প্রায় দশজনকে আহত করেছে, এরপর তারা এইচ-আওয়ারের প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যে অবস্থানের (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের পিলখানা) পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ৪১-এর বিষয়ে, তাজউদ্দীন, ভূঁইয়া এবং ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে তাদের অভিযানে, তারা অন্য কিছু লোককে ধরেছে, কিন্তু প্রধান লক্ষ্যবস্তুরা অনেক আগেই গুছিয়ে চলে গেছে। স্পষ্টতই তারা সবাই আতঙ্কিত হয়ে গতকাল কোনো এক সময় থেকে শহর ছেড়ে যেতে শুরু করেছে। তাই তারা সমস্ত রাস্তা অবরোধ করেছে এবং সেকেন্ড ক্যাপিটাল এক্সচেঞ্জ সুরক্ষিত করেছে এবং রেললাইন পার হয়ে পশ্চিম দিকে ক্যাম্পাস থেকে পালানোর চেষ্টাকারী যেকোনো ব্যক্তির জন্য অবরোধ স্থাপন করেছে। ওভার।
৯৯: ৯৯। রজার। ওভার।
কন্ট্রোল: ৯৯। আশা করি আপনি আপনার জিম্মিদের নিয়ে স্বস্তিতে আছেন। ওভার।
৯৯: ৯৯। আমি ভাবছি, এখন তাদের কীভাবে খাওয়ানো যায়। ওভার।
কন্ট্রোল: ৯৯। কিছুক্ষণের জন্য খাবার না দেখলে তাদের কোনো ক্ষতি হবে না। তাই গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আপনারা যে নীতি গ্রহণ করে আসছেন, তারাও একই নীতি গ্রহণ করতে পারে। আউট।
অজ্ঞাত: অপেক্ষা করুন, সে লোকটিকে ডাকতে গেছে। অপেক্ষা করুন। আউট।
অজ্ঞাত: মারখোর দূরে আছেন, তিনি আসতে পারবেন না, আপনি বার্তা দিন, আমরা তা পৌঁছে দেব। ওভার।
অজ্ঞাত:...বার্তা। ওভার।
৯৯: ৯৯। পাঠান। ওভার।
৯৯: ৯৯। রোমিও ইন্ডিয়া আলফা জুলু (রিয়াজ), তাকে কোন অবস্থানে ফেরত পাঠাতে হবে। এখনই যাবে, এমন যেকোনো গাড়ি পাওয়া গেলে, তা দিয়ে তাকে ফেরত পাঠাতে হবে। ওভার।
৯৯: ৯৯। কোন সেটটি ফেরত পাঠাতে হবে? ওভার।
৯৯: ৯৯। আমি আবার বলছি, লিমা নভেম্বর কিলো, রোমিও ইন্ডিয়া আলফা জুলু, আপনার অবস্থান থেকে ফিরে যাচ্ছে, এমন যেকোনো গাড়িতে করে তাকে সেখানে পাঠিয়ে দিন। ওভার।
৯৯: ৯৯। এখান থেকে তো কোনো গাড়ি যাওয়ার নেই; যা–ই হোক, আমি নিশ্চিত হয়ে নিচ্ছি। যদি কোনোটি থাকে, তবে তাকে পাঠিয়ে দেব। ওভার।
৯৯: ৯৯। আর কিছু নয়। আউট।
অজ্ঞাত: কেউ আসেনি। লোক পাঠানো হয়েছে, তাকে ডাকার জন্য। যখনই পাওয়া যাবে, ডেকে নেব। ওভার।
ইমাম: ৪১। আমি ইমাম বলছি। তাকে বলুন যে যা...করা হোক। ওভার।
৪১: ৪১। রজার। ওভার।
৪১: ৪১। রজার। আউট।
৮৮: ৮৮। বার্তা। ওভার।
৮৮: ৮৮। ইমাম কি শুনছেন? ওভার।
ইমাম: ৮৮, আপনি জানেন যে ৪১ ক্যাম্পাস এলাকার পশ্চিমে অবস্থান নিয়েছে। আপনার যদি তার কাছ থেকে কোনো সমর্থনের প্রয়োজন হয়, তবে আপনারা পারস্পরিক সমন্বয় করতে পারেন; কারণ, সে মনে করে যে সে পেছন থেকে এসে সেখানে থাকা যেকোনো প্রতিরোধের মোকাবিলা করতে পারবে। অবশ্যই, আপনাদের নিজেদের গোলাগুলির সমন্বয় করতে হবে। ওভার।
৮৮: ৮৮। রজার। আপনি কত দূর পৌঁছেছেন? আর কত বাকি? ওভার।
৮৮: ৮৮। আপনার অসুবিধাগুলো বুঝতে পারছি। আপনি রেললাইন থেকে কত দূরে আছেন? এখন যেহেতু ভোর হচ্ছে, আপনি কি আমাকে কোনো ল্যান্ডমার্ক দিতে পারবেন? ওভার।
কন্ট্রোল: ৮৮। এটি অত্যন্ত উৎসাহজনক। আপনার মারখোর যেকোনো নতুন অগ্রগতি ঘটলে আমাদের জানাতে পারে। আপাতত আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার জন্য বার্তা, হ্যালো ৪১, আপনি কি পেয়েছেন?
অজ্ঞাত: অপেক্ষা করুন। আউট। হ্যালো ২৬। মারখোর কি শুনছেন? ওভার।
মারখোর: হ্যালো ২৬, ২৬, ২৬। মারখোর থেকে মারখোর। ওভার।
মারখোর: ২৬, ২৬, ২৬, ২৬। ওভার।
৭৭: ৭৭। আপনি কি ২৬-কে শুনতে পাচ্ছেন? ওভার।
মারখোর: হ্যালো ৯৯। ছোটাকে (গোয়েন্দা কর্মকর্তা) সেটে ডাকুন। ওভার।
৪১: ৪১...
৯৯: ৯৯। অপেক্ষা করুন। আউট।
ইমাম: ইমাম শুনছেন। আপনার বার্তা পাঠান। ওভার।
৯৯: ৯৯। অপেক্ষা করুন। আউট।
৪১: ৪১। পশ্চিম দিক থেকে ৮৮-কে সহায়তা করার বিষয়ে আপনার শেষ ট্রান্সমিশন সম্পর্কে, আমি তার সাথে আলোচনা করেছি এবং সে মনে করে যে সে কমবেশি কাজ শেষ করেছে এবং তাই পশ্চিম দিক থেকে কেউ এলে নিজেদের সৈন্যদের মধ্যে গোলাগুলির নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয়গুলো জটিল করে তুলতে পারে। তাই সে পরামর্শ দেয় যে আপাতত আপনার না আসাই ভালো। ওভার।
ইমাম: রজার। ওভার।
৪১: ৪১। আপনি আপনার ইমামকে আপনার এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরির কাজ শুরু করতে বলতে পারেন। আপনি পরিচিত কারও সাথে যোগাযোগ করতে পারেন এবং সমস্ত বিশিষ্ট স্থানীয়দের (বাঙালিদের) একটি তালিকা তৈরি করতে পারেন, যাদের প্রতি আমাদের আগ্রহ থাকতে পারে। ওভার।
ইমাম: ৪১। রজার। ওভার।
৪১: ৪১। আপনার জন্য বার্তা, হ্যালো ৯৯, ৯৯। ছোটাকে রেডিওতে দিন। ওভার।
৯৯: ৯৯। অপেক্ষা করুন। অপেক্ষা করুন। আউট।
অজ্ঞাত: হ্যালো ২৬, ২৬, ২৬, হ্যালো ২৬। ওভার।
অজ্ঞাত: ২৬, ২৬, ২৬, ২৬, হ্যালো ২৬। ওভার।
২৬: ২৬। পাঠান। ওভার।
মারখোর: ২৬। মারখোর থেকে মারখোর। আপনার ইমামের অবস্থান কি হাউসে? পাপা হাউসে (তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ভবন)? ওভার।
২৬: ২৬। হ্যাঁ। ওভার।
মারখোর: ২৬। বখতার উপাদানটির এতক্ষণে আপনার কাছে পৌঁছে যাওয়ার কথা। এখানে একটি গোলমাল হয়েছে, তা হলো আপনার সাথে কল সাইন ১৬-এর চিতা আছে এবং আপনার চিতা এখানে আমাদের সাথে আছে। আমি আপনার চিতাকে পরিবহনে করে হাউসে আপনার কাছে পাঠাচ্ছি। অনুগ্রহ করে ১৬-এর চিতাকে একই পরিবহনে ফেরত পাঠান, যাতে তারা এখানে আমাদের অবস্থানে আসতে পারে। এটি কি বোঝা গেছে? ওভার।
২৬: ২৬। বার্তা বোঝা যায়নি। আবার বলুন। ওভার।
মারখোর: ২৬। চিতা এসকর্টসহ বখতার উপাদানটি কি আপনার সাথে যোগ দিয়েছে? ওভার।
২৬: হ্যাঁ, বখতার আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। ওভার।
মারখোর: ২৬। এই বখতারের সাথে থাকা চিতা উপাদানটি আপনার নয়। আপনার চিতা উপাদানটি ভুল করে এখানে আমাদের বর্তমান অবস্থানে চলে এসেছে। আমি তাদের পরিবহনে করে আপনার সাথে যোগ দিতে পাঠাচ্ছি এবং আপনি ১৬-এর চিতা উপাদানটিকে ফেরত পাঠাতে পারেন...
২৬: ২৬। উইলকো। ওভার।
মারখোর: ২৬। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে অগ্রগতি কী? ওভার। এই নেটে যাঁরা কাজ করছেন, অনুগ্রহ করে অন্যদের বিরক্ত করবেন না। আউট।
৯৯: ৯৯। পাঠান। ওভার।
৯৯: ৯৯। আমি কি জানতে পারি ফরমেশন কল সাইন ৪৪ কার সাথে কাজ করছে? এটি সিরিয়াল নম্বরে পাঠান।
কন্ট্রোল: শুধুমাত্র কল সাইন ৪১ আছে। ৪৪ আমাদের কোনো কল সাইন নয়। ওভার।
৯৯: ৯৯। একটু আগে মারখোর অন্য ওয়্যারের সাথে যোগাযোগ করতে এই বার্তাটি পাঠিয়েছিল, অন্য ওয়্যারের কল সাইন ৪১, ২৬ এবং ৪৪...ওভার।
কন্ট্রোল: শুধুমাত্র ২৬, ৪১ এবং ৮৮। ওই বার্তাটি ছিল শুধুমাত্র ২৬, ৪১ এবং ৮৮-এর জন্য। ওভার।
৯৯: ৯৯। রজার। আউট।
কন্ট্রোল: সমস্ত স্টেশন আলফা কিলো, যেমনটি আগে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, অনুগ্রহ করে জোর দিন, যাতে সমস্ত কালো পতাকা এবং সমস্ত বাংলাদেশের পতাকা অবিলম্বে সরিয়ে ফেলা হয়, যদি ইতিমধ্যে তা করা না হয়ে থাকে। অন্যথায় যারা এখনো সেগুলো ওড়াচ্ছে, তাদের ভালো একটি শিক্ষা দিন। আউট।
কন্ট্রোল: আমি আবার বলছি, যেমনটি ইতিমধ্যে আলোচনা করা হয়েছে, নিশ্চিত করুন যে কোনো ভবনে কালো বা বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে না...কাউকে বাংলাদেশ এবং কালো ধরনের কোনো পতাকা ওড়াতে দেবেন না। শুধুমাত্র এটাই বলার ছিল। আউট। এবং এটি কি, আপনি কি এটি নিয়েছেন? ওভার। তা অবশ্যই করতে হবে। অন্যথায়, আপনি জানেন, এতে অনেক জটিলতা এবং পরিণতির সৃষ্টি হতে পারে। তা ছাড়া আমি চাই বিশেষভাবে ধানমন্ডিতে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালানো হোক। আপনি সময় নিতে পারেন, আপনি ব্লক নির্বাচন করতে পারেন, প্রতিটি বাড়ি থেকে লোকজনকে ধরে আনুন, তাদের দিকে তাকান, যদি এমন কাউকে পান, যাকে আমাদের প্রয়োজন বলে আপনি জানেন বা যিনি গুরুত্বপূর্ণ, তাঁকে বেছে নিন, তারপর আপনি তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারেন, বাকিদের বাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে দিন। এটিই, এটিই আমার বলার ছিল। আপনার যদি আমার জন্য কিছু থাকে, তবে আপনি তা জানাতে পারেন। ওভার।
৭৭: ৭৭-এর জন্য। এখন পর্যন্ত রজার। ওভার।
৭৭:...ধানমন্ডির উদ্দেশে যাচ্ছি। আমি আবার বলছি, আমরা ধানমন্ডির উদ্দেশে যাব। ওভার।
কন্ট্রোল: ৭৭। আপনার এলাকায় এটিই আপনার কাজ হবে যেমনটি ইমাম বলেছেন, প্রতিটি ব্লক পুরোপুরি ঘিরে ফেলা হবে এবং যথাযথ সতর্কতার পর সমস্ত বাসিন্দাকে বেরিয়ে আসতে বলা হবে এবং কোনো বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব থাকলে তাদের শনাক্ত করা হবে। তারপর বাড়ির ভেতরে কেউ আছে কি না, তা দেখার জন্য তল্লাশি চালানো হবে। এখন পর্যন্ত রজার। ওভার।
কন্ট্রোল: ৪১-এর জন্য। এই বাড়ি বাড়ি তল্লাশি খুব পদ্ধতিগতভাবে আয়োজন করা উচিত, যাতে কোনো কিছু বাদ না যায়। তা ছাড়া আপনি এমন স্থানীয় লোকজনকে পাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন, যারা তাদের আলাদা করে চিনতে আপনাকে সাহায্য করার জন্য যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য। ওভার।
৭৭: ৭৭। রজার। আপনার জন্য বার্তা, হ্যালো ৮৮-এর জন্য ৭৭। আপনার কি কোনো বার্তা ছিল? ওভার।
৮৮: ৭৭। আপনার বার্তা পাঠান। ওভার।
৭৭: ৭৭। ওই বার্তাটি ৪১-এর জন্য ছিল। আপনার কি কিছু জানানোর আছে? ওভার।
৮৮: ৭৭-এর জন্য ৮৮। কিছু না। আউট।
কন্ট্রোল: ১৬, ১৬, ২৬, ৪১, ৮৮। অবস্থানের খবর জানান।
অজ্ঞাত: কোনো পরিবর্তন নেই।
১৬/৪১: পুরোনো অবস্থান থেকে কোনো পরিবর্তন নেই। যেখানে আগে ছিলাম, সেখানেই। ওভার।
২৬: ২৬। কোনো পরিবর্তন নেই। আগে যে জায়গায় ছিলাম, সেই জায়গাতেই আছি। পাপা বিগ হোটেল। ওভার।
৮৮: ৭৭-এর জন্য ৮৮। আমাদের অবস্থান ইকবাল হল। ওভার।
৭৭: ৮৮, ৮৮, আবার বলুন। ওভার।
৮৮: ৮৮। আমি আবার বলছি, আমার অবস্থান এই মুহূর্তে ইকবাল হল। ওভার।
৭৭: ৮৮। রজার। আপনার জন্য বার্তা, ১৬ এবং ৪১, অবস্থানের খবর পাঠান। ওভার।
অজ্ঞাত: বার্তা। ওভার। দয়া করে আমাকে আপনার কল সাইন বলুন। ওভার। আউট।
অজ্ঞাত: হ্যালো ২৬, হ্যালো ২৬, বার্তা। ওভার।
২৬: ২৬। পাঠান। ওভার।
অজ্ঞাত: ২৬। মারখোর কোথায়? ওভার।
২৬: ২৬। মারখোর ইমামের সাথে ব্যস্ত। আউট।
অজ্ঞাত: ২৬। পাঠান। ওভার।
২৬: ২৬। মারখোরকে জানান যে লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেমকে ধরতে গিয়েছিলাম, সে প্রতিরোধ করে, যাতে সে নিহত হয়। লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম নিহত হয়েছে। তার মৃতদেহ আমাদের কাছে আছে। ওভার।
অজ্ঞাত: ২৬। রজার। আউট।
মারখোর: ৮৮, ৮৮। ইমামের জন্য মারখোর। ওভার।
৮৮: ৮৮। ইমাম আছেন। ওভার।
মারখোর: ৮৮। এই এলাকা শেষ করে নদীর এবং রেললাইনের মাঝামাঝি আপনার মূল দায়িত্বের এলাকায় ফিরে যাওয়ার আগে আপনার আর কত সময় লাগবে? ওভার।
৭৭: ৭৭-এর জন্য। আবার বলুন। ওভার।
মারখোর: ৮৮। মারখোর বলছি। আপনার মূল দায়িত্বের এলাকায়, যা (পুরোনো) রেললাইন এবং নদীর মাঝে অবস্থিত, সেখানে নেমে যাওয়ার আগে আপনার আর কত সময় লাগবে? ওভার।
৮৮: ৭৭-এর জন্য ৮৮। এখন পৌনে সাতটা বাজে (২৬ মার্চ, ১৯৭১-এর সকাল)। আমি আটটায় এই জায়গা থেকে সরবো। লাশগুলো সংগ্রহ করে সেগুলো গুম (dispose off) করতে আমার আনুমানিক এক ঘণ্টা সময় লাগবে। ওভার।
মারখোর: ৮৮। রজার। আপনি সেগুলোকে এক জায়গায় জড়ো করতে পারেন এবং কল সাইন ২৬-কে তাদের সম্পর্কে বলা যেতে পারে, ইমাম বলেছেন তাদের চূড়ান্তভাবে সরানোর কাজ পরে করা যেতে পারে। আপাতত তাদের পুলিশ বা বেসামরিক নাগরিকের আলাদা বিভাগে গণনা করা যেতে পারে এবং কল সাইন ২৬ তাদের ওপর সাধারণ নজর রাখতে পারবে, যখন আপনি আপনার এলাকার দিকে নেমে যাবেন। ওভার।
৮৮: ৮৮। রজার। আপাতত আমরা তাদের জড়ো করছি। আমরা তাদের এক জায়গায় ফেলব এবং তারপর আমরা ২৬-কে জানাব। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আর কিছু? ওভার।
মারখোর: ৮৮। হ্যাঁ। কারফিউ ঘোষণা, পতাকা অপসারণ এবং রাস্তার অবরোধ সরানোর বিষয়ে, ইমাম চান যে এগুলো ‘নেটিভ ভাষা’ (বাংলা) এবং সেই সাথে ইংরেজি ও উর্দুতে সঠিকভাবে আয়োজন করা হোক এবং এগুলো ক্রমাগত চালিয়ে যাওয়া উচিত; কারণ, বিপুলসংখ্যক মানুষ জানে না যে নিয়ম ও বিধিনিষেধগুলো কী। আগামীকাল সকাল ০৭:০০ ঘটিকা পর্যন্ত কারফিউ চলবে। ওভার।
৮৮: ৮৮। উইলকো। এমনকি এখন পর্যন্ত তিন-চার ঘণ্টা ধরে আমরা ক্রমাগত এটি জানাচ্ছি।
মারখোর: ৮৮। এটি খুব ভালো। অন্যথায় ইমাম যেমন বলেছেন, আপনার পুনর্গঠন এবং প্রশাসনের কাজ চালিয়ে যান। আপনার জন্য বার্তা, হ্যালো ২৬, হ্যালো ৪১, আপনারা কি পেয়েছেন? ওভার।
২৬/৪১: আবার বলুন। ওভার।
মারখোর: ২৬, হ্যালো ৪১, আপনারা কি ৮৮-এর প্রতি আমার বার্তা পেয়েছেন? ওভার।
৪১: ৪১, আবার বলুন। ওভার।
৭৭: ৭৭। রজার। ওভার।
৪১: ৪১। ওভার।
৮৮: ৭৭-এর জন্য ৮৮। রজার।
মারখোর:...৮৮-এর প্রতি বার্তাটি ছিল যে এক ঘণ্টার মধ্যে সে দক্ষিণ দিকে তার মূল দায়িত্বের এলাকায় চলে যাবে এবং সে যেখানে ছিল, আপনি সেখানে দায়িত্ব নেবেন, যেখানে সংগৃহীত লাশগুলোসহ অভিযান চলছিল। আপনি, আপনার ইমাম, ইমাম ৮৮-এর সাথে সমন্বয় করতে পারেন। ওভার।
মারখোর:...অপেক্ষা করুন। আউট।
কন্ট্রোল: সমস্ত স্টেশন আলফা কিলো, দয়া করে নিশ্চিত করুন যেন সব সময় অন্তত একজন অফিসার এই নেটে শোনেন। অনেক বেশি পুনরাবৃত্তি হচ্ছে এবং অনেক বেশি ‘ওয়েট আউট’ বলা হচ্ছে; কারণ, আমরা যদি শুনতে থাকি, তবে সবাই জানবে কী ঘটছে। প্রতিটি সেটে পুরো সময় একজন অফিসারকে শুনতে হবে। আউট। বিভিন্ন ধরনের গোলাগুলি আলাদাভাবে, তাদের পরিমাণসহ। অতিরিক্ত কিছু থাকলে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের জানান। ওভার।
১৬: ১৬। রজার। আউট।
২৬: ২৬। রজার। ওভার।
কন্ট্রোল: অতিরিক্ত গোলাগুলির প্রয়োজন, ব্যয় নয়, আমি আবার বলছি, ব্যয় নয়। আপনি যদি আরও গোলাগুলি চান, তবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ধরন এবং পরিমাণ আমাদের জানান। এ ছাড়া যদি অন্য কোনো প্রশাসনিক সহায়তার প্রয়োজন হয়, তবে আমাদের জানান, যাতে আমরা এর ব্যবস্থা করতে পারি। আউট।
কন্ট্রোল: হ্যালো ৮৮। নদীর দক্ষিণে জিনজিরা নামে একটি অবস্থান আছে, আমি বানান করছি, জুলিয়েট, ইন্ডিয়া, নভেম্বর, জুলিয়েট, ইন্ডিয়া, রোমিও, আলফা, জিনজিরা। এটি নদীর ঠিক দক্ষিণে আপনার এলাকার ওপারে। এর আগে খবর পাওয়া গিয়েছিল যে সেখানে অস্ত্র ও গোলাগুলি মজুত করা হচ্ছে। রোমিও সিয়েরা ইউনিটের কাছে টহলের পর কিছু তথ্য থাকতে পারে। আপনি হয়তো এর ওপর নজর রাখতে চাইবেন। ওভার।
৮৮: আমি অবশ্যই এটি মোকাবিলা করতে যাচ্ছি। ওভার।
কন্ট্রোল: ৮৮ ধন্যবাদ। ক্যাম্পাস এলাকার কাজ শেষ করে আপনার নিজস্ব এলাকায় ফিরে গেলে আমাদের জানাবেন। আপনার এলাকায় কি এখনো কিছু গোলাগুলি চলছে? ওভার।
৮৮: কোনো গোলাগুলি নেই। তবে আমরা প্রায় রওনা দিচ্ছিলাম এবং একটি বাড়ি থেকে হঠাৎ এক রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে, তাই আমাদের ওই বাড়ি থেকে কয়েকজন লোককে বের করে আনতে হয়েছে। আমি মনে করি না, এখন আর কোনো ফায়ারিং হবে। ওভার।
কন্ট্রোল: ৮৮। রজার। আপনার জন্য বার্তা, হ্যালো ১৬, ১৬, আমার শেষ প্রশ্নের উত্তর দিন। ওভার।
১৬: ১৬। রজার। আর কোনো বিস্তারিত তথ্য কি সামনে এসেছে? সমস্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদ কি আপনাদের নিয়ন্ত্রণে? ওভার।
১৬ (৭৭-এর জন্য): হ্যাঁ, শুধু আট-দশজন লোক তাদের রাইফেল নিয়ে পালিয়ে গেছে, সেটি ছাড়া...ওভার।
কন্ট্রোল: ১৬। এটি একেবারেই নগণ্য। লাইনের ভেতরে এখন আপনি কতজনকে আটকে রেখেছেন? (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস পিলখানা লাইনস)। আপনি কি হিসাব করেছেন? ওভার।
১৬: আমরা এখনো বন্দী এবং সমস্ত কর্মকর্তাদের বাছাই করার কাজে আছি। যখন তাদের বাছাই করা হবে, আলাদা করা হবে, শুধুমাত্র তখনই আমরা তাদের গণনা শুরু করব। আমরা এখনো অন্য পক্ষের কাউকে, অর্থাৎ আমাদের প্রতিবেশীদের, এমনকি কর্মকর্তাদেরও ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি দিইনি। ওভার।
কন্ট্রোল: ১৬, এটা ঠিক আছে। আপনার কাছে যেটা সবচেয়ে ভালো মনে হয়, সেটাই করুন। এটি পুরোপুরি ঠিক আছে, কোনো তাড়া নেই। যদি আপনার গোলাগুলির কোনো প্রয়োজন থাকে, তবে আমার মনে হয় আপনার তা হওয়া উচিত নয়, শুধুমাত্র ৮৮-কে সাহায্য করতে যাওয়া আপনার উপাদানগুলো ছাড়া, তা আমাদের কাছে পাঠানো যেতে পারে। আউট।
১৬: ওই উপাদানটি আমাদের সাথে দরকার নেই। তাই আমি পরামর্শ দিচ্ছি, প্রয়োজনের বিষয়ে আপনি ৮৮-কে জিজ্ঞাসা করুন। ওভার।
কন্ট্রোল: ১৬। রজার। কিন্তু ৮৮ এখন তার মূল দায়িত্বের এলাকায় ফিরে যাচ্ছে, যা (পুরোনো) রেললাইনের দক্ষিণে অবস্থিত এবং আমার মনে হয়, আপনার উপাদানটি আপনার কাছে ফিরে আসবে। যা–ই হোক না কেন, আমরা তার কাছ থেকে চাহিদা সম্পর্কে জেনে নেব। আউট।
কন্ট্রোল: পাঠান। ওভার। ১০-এর জন্য। ওভার।
ইমাম: ৮৮। ইমাম চান, আপনি আপনার এলাকায় যাওয়ার পর, সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও সুরক্ষিত করুন। আমি আবার বলছি, সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্র, যেখানে আপনি শুরুতে কিছু উপাদান রেখেছিলেন। আপনার এলাকায় যাওয়ার সাথে সাথেই এটি আপনার সুরক্ষিত করা উচিত। ৮৮, ওভার।
৮৮: ৮৮, উইলকো। ওভার।
ইমাম: আর কিছু নয়। আউট।
কন্ট্রোল (সিনিয়র অফিসার):...আরও কিছু, ঠিক আছে আপনি এটি যোগ করুন, আপনি জানেন, অন্যান্য উৎস থেকে আপনি যে রাইফেলগুলোই পান না কেন, এর সাথে যোগ করুন এবং এটিকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বিপরীতে গণনা করুন এবং তারপর আমাদের চূড়ান্ত হিসাব দিন। দিনের বেলা এই প্রক্রিয়া অবশ্যই চালিয়ে যেতে হবে, তবে নিশ্চিত করুন যে লোকগুলো যেন, আপনি জানেন, খুব বেশি ক্লান্ত না হয়ে পড়ে, তাদের বিশ্রাম দেওয়া যেতে পারে এবং বিভিন্ন সময়ে কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নেওয়ার পর তাদের নির্দিষ্ট এলাকায় যাওয়ার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে এবং প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া যেতে পারে। এই এলাকায় অসাধারণ কাজ করার জন্য আপনার সাথে থাকা আজিজসহ সমস্ত ছেলেদের আমি আবারও ‘শাবাশ’ দিতে চাই। আমি খুবই খুশি। ওভার।
৮৮: রজার, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমি, আমি বলছিলাম যে আমরা জগন্নাথ থেকে দুটি ১২ বোর রাইফেল দখল করেছি এবং এই এলাকায় একটি ছোট ফায়ারিং রেঞ্জও রয়েছে। ওভার।
কন্ট্রোল: এটি বেশ ভালো হয়েছে। আপনার কী মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক সংখ্যা কত হবে, আমাকে শুধু আনুমানিক একটি সংখ্যা দিন, আপনার মতে, কতজন নিহত, বা আহত, বা বন্দী হবে; আমাকে শুধু একটি মোটামুটি হিসাব দিন। ওভার।
৮৮: ৮৮, অপেক্ষা করুন। আনুমানিক তিন শ। ওভার।
কন্ট্রোল: চমৎকার। তিন শ জন নিহত, নাকি কেউ আহত, বন্দী হয়েছে? ওভার।
৮৮: ৮৮, আমি শুধু একটি জিনিসেই বিশ্বাস করি। তা হলো তিন শ জন নিহত। ওভার।
কন্ট্রোল: ৮৮, হ্যাঁ। আমি আপনার সাথে একমত। এটি অনেক সহজ, আপনি জানেন, কোনো প্রশ্ন নেই, কিছুই করা হয়নি, আপনাকে কিছুর ব্যাখ্যা দিতে হবে না। আবারও, চমৎকার কাজ। আপনাকে এখন একটু কঠিন কাজ করতে হবে। আপনি এই আরএসইউ (RSU) উপাদানগুলোকেও সাথে নিতে পারেন এবং নদীতে টহল দেওয়া শুরু করতে পারেন; আপনি এটি বেশ কার্যকরভাবেই করতে পারেন। অবশ্যই আমি আপনাকে যে অন্য কাজটি দিয়েছিলাম, আপনি সেটিও শুরু করতে পারেন। তাই আমি না আসা পর্যন্ত সবকিছুর জন্য শুভকামনা, ইনশা আল্লাহ কোথাও দেখা হবে।
আমি অবশ্যই চাই যে আপনি নিশ্চিত করুন, যাতে কেউ কোনো রাস্তার অবরোধ তৈরি না করে। আর যদি কেউ তা করে, তবে আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ হলো, একই এলাকার লোকদের ধরুন, অবরোধের উভয় পাশের বাড়িঘর ধ্বংস করে দিন এবং সম্ভব হলে আপনি তাদের ‘পুরস্কৃত’ করতে পারেন, এমন একটি পুরস্কার, যা হলো শাস্তি, তাদের কয়েকজনের জন্য মৃত্যুদণ্ড এবং বাকিদের ছেড়ে দিন। এটি নিশ্চিত করবে যে বিষয়টি যেন আর পুনরাবৃত্তি না হয়। ওভার।
৮৮: ৮৮, উইলকো। ওভার।
কন্ট্রোল: ৮৮, আর কিছু নয়। আউট।
অজ্ঞাত: বার্তা। ওভার।
৫৪: ৫৪। আপনার বার্তা পাঠান। ওভার।
অজ্ঞাত: আপনার অবস্থান কি আমাদের লাইনে? ওভার।
৫৪: ৫৪। হ্যাঁ। এবং আমরা আমাদের নিজেদের অবস্থানে আছি।
অজ্ঞাত: হেডকোয়ার্টার এলাকায় বার্তা দিন যে এখান থেকে জুলিয়েট চার্লি অস্কার (JCO) সেখানে গেছে এবং সে ফেরার পথে যেন চারটি চেয়ার নিয়ে আসে। ওভার।
৫৪: এখানে আমাদের কাছে ব্যবস্থা নেই এখানে...ওভার।
অজ্ঞাত: ৫৪। আপনি যদি আপনার আগের অবস্থানে থাকেন, তবে সেখানে...
৫৪: এখানে কোনো লোক নেই।
অজ্ঞাত: আপনার অবস্থানটি কি তার নয়, যার কল সাইন ৫৪? ওভার।
৫৪: ৫৪। এটি তারই। সে তো আমাদের লাইনের কাছাকাছি, কিন্তু কাকে পাঠাব?
অজ্ঞাত: যদি...শুনতে থাকুন। আউট।
অজ্ঞাত: বার্তা। ওভার। পাঠান। ওভার। মারখোরকে সেটে ডাকুন। ওভার।
মারখোর: অপেক্ষা করুন। আউট। মারখোর শুনছেন। পাঠান। ওভার।
অজ্ঞাত: মিরপুর থেকে রিপোর্ট এসেছে যে পুলিশ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গুলি চালিয়েছে। বেসামরিক নাগরিকদের একটি গাড়ি জানানোর জন্য আইয়ুবনগরে যায়। আমরা নির্দেশের অপেক্ষায় আছি। ওভার।
মারখোর: পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করুন। আউট। আউট।
মারখোর: ৪১। ইমামের জন্য মারখোর। ওভার। জানাচ্ছে যে এই তথ্যটি মোহাম্মদপুরের দিক থেকে এসেছে এবং মেজর রিফাতের অধীন আমাদের একটি প্লাটুন ওই দিকে অগ্রসর হয়েছে। ইমাম এই মুহূর্তে সেটের কাছে নেই। ওভার।
৪১: ৪১। রজার। তাহলে এটি কি মিরপুর, নাকি মোহাম্মদপুর? ওভার।
মারখোর: ৪১। এটি মোহাম্মদপুরের শেষ প্রান্ত মিরপুরের দিকে। ওভার।
৪১: রজার। আপনি আপনার ইমামকে বলতে পারেন যে এখানকার ইমাম নির্দেশ দিয়েছেন যে অন্তত একটি ব্যাচ...
৮৮: ৮৮। উইলকো। ওভার।
৮৮: ৮৮। আর কিছু নয়। আউট।
অজ্ঞাত: এটি কি মারখোরের জন্য? ওভার।
২৬: ২৬। হ্যাঁ। ওভার।
মারখোর: ২৬। মারখোর শুনছেন। পাঠান। ওভার।
২৬: ২৬। একটু অপেক্ষা করুন। আউট।
২৬: ২৬। রাজারবাগ এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ দখল করা হয়েছে; সংগ্রহের ব্যবস্থা করুন। ওভার।
মারখোর: রজার। কয়টি গাড়ির প্রয়োজন হবে?
২৬: ২৬। প্রায় তিনটি ৩-টনের ট্রাক। ওভার।
মারখোর: রজার। এগুলো আপনার কাছে পাঠিয়ে দেব। আপনি আপনার ইমামকেও বলতে পারেন যে তিনি এই এলাকার ডেলটা আলফা সিয়েরা মাইক লিমা। আমি আবার বলছি, এই এলাকার ডেলটা সিয়েরা আলফা মাইক লিমা। ওভার।
২৬: ২৬। রজার। মৃতদেহগুলো এই মুহূর্তে গোনা সম্ভব নয় এবং পুলিশ সদস্যদের মৃতদেহ সম্পর্কে আমরা আপনাকে পরে জানাব। ওভার।
মারখোর: অস্ত্র আনুমানিক কতগুলো? কোনো কাছাকাছি হিসাব আছে কি? ওভার।
২৬: ২৬। লোকজন এখনো টহল দেওয়া ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত এবং তারা আসলে হিসাব করতে পারেনি পরিমাণটা ঠিক কত। ইমাম আমাকে বলেছেন যে সেগুলো খুব বিপুল পরিমাণে রয়েছে। ওভার।
মারখোর: রজার। আমি আশা করি, কারফিউ, পতাকা অপসারণ এবং রাস্তার অবরোধ সরানোর বিষয়ে আপনাদের ঘোষণাগুলো অবিরতভাবে দেওয়া হচ্ছে। আপনার আরেকটি পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমের ব্যবস্থা করা উচিত। আপনি যদি না পারেন, তবে আমরা আপনার জন্য একটির ব্যবস্থা করব। ওভার।
২৬: এই মুহূর্তে আমাদের কাছে নেই। অনুগ্রহ করে আমাদের জন্য একটির ব্যবস্থা করুন। ওভার।
মারখোর: ছোটা ফিরে এলে এবং আপনার সাথে থাকা পুলিশ শেষ হয়ে গেলে আপনি তখন আপনার সমস্ত কর্মী ও সরঞ্জাম সরিয়ে নেবেন এবং এখানে আমাদের সাথে আবার যোগ দিতে আসবেন। ওভার। ৯৯, আপনি ছোটাকে সেটি বলতে পারেন। এখন টেলিফোনে আপনার ট্যাটুকে ২২৭ নম্বরে কল করা উচিত, ২২৭–এ, তাকে বলুন যে কল সাইন ২৬-এর, পুলিশের রিজার্ভ লাইন থেকে পুলিশের অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহনের জন্য তিনটি বড় গাড়ির প্রয়োজন। ওভার।
৯৯: ৯৯। ২২৭–এ আমাদের ট্যাটুকে বলুন যে সে যেন হেডকোয়ার্টার সিরিয়াল ৪০৪ থেকে বা সিয়েরা সিয়েরা গ্রুপের আমাদের বন্ধুদের কাছ থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনটি বড় গাড়ি সংগ্রহ করে। তারা ধারে দুটি গাড়ি পেয়েছে। ওভার।
৯৯: ৯৯। আমি আবার বলছি, টেলিফোন ২২৭–এ আমাদের ট্যাটুকে বলুন যেন সিয়েরা ট্যাঙ্গো লোকদের কাছ থেকে বা সিয়েরা সিয়েরা গ্রুপের কাছ থেকে যাদের গতকাল দুটি গাড়ি ধারে দেওয়া হয়েছিল, তাদের থেকে এই তিনটি বড় গাড়ি নেওয়ার চেষ্টা করে, যাতে ট্যাটু এই দুটি ব্যবহার করতে পারে। ওভার।
৯৯: ৯৯। ছোটা এলে তাকে আমার সাথে কথা বলতে বলবেন। আপাতত এতটুকুই। আউট। মারখোরের জন্য অপেক্ষা করুন। আউট।
মারখোর: ৫৫। মারখোর বলছি। আপনাকে গতকাল দুটি গাড়ি ধারে দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো যদি এখন কল সাইন ২৬-এর কাছে পাঠানো যেত। দখল করা কিছু জিনিসপত্র ফেরত পাঠানোর কাজে তারা এগুলো ব্যবহার করতে চায়। পাহারাদার, রুট, গন্তব্য ইত্যাদির বিষয়ে আপনাকে মারখোর ২৬-এর সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিচ্ছি। ৫৪, ওভার।
৫৪-এর জন্য: মারখোরকে সেটে ডাকুন। ওভার। ওয়েট আউট।
৫৪: ২৬-এর জন্য ৫৪, ২৬-এর জন্য ৫৪, মারখোরকে সেটে ডাকুন। ওভার।
২৬: ৫৪, মারখোর ইমামের সাথে ব্যস্ত আছেন, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। ওয়েট আউট, অনুগ্রহ করে।
অজ্ঞাত: বার্তা। ওভার। পাঠান। ওভার।
৫৪: ২৬-এর জন্য ৫৪, ২৬-এর জন্য ৫৪। মারখোরকে সেটে ডাকুন। ওভার।
২৬: ৫৪-এর জন্য। তাকে জানান, তিনি বলছেন আমি আসছি। আমার কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু ইমামের সাথে ব্যস্ত আছেন। একটু অপেক্ষা করুন। ওয়েট আউট।
৯৯: ৯৯। বার্তা। ওভার। আমি আবার বলছি, আপনার বার্তা পাঠান। ওভার। ওখানে কি কোনো অফিসার আছেন? ওভার।
অজ্ঞাত: ৯৯, এর আগে মারখোরের যে বার্তাটি পাস করেছিলাম, তার কী জবাব পাওয়া গেছে? ওভার।
৯৯: ৯৯। ওই লিয়াজোঁ (Liaison) অফিসার যিনি আছেন, তিনি এখনই চলে গেছেন। তিনি ছোটার সাথে নিশ্চিত করার পর জবাব দেবেন। ওভার।
৯৯: ৯৯। রজার। আউট।
৫৪: ২৬-এর জন্য ৫৪, ২৬-এর জন্য ৫৪। মারখোরকে সেটে ডাকুন। ওভার।
২৬: ৫৪-এর জন্য ২৬, মারখোর অ্যাভেইলেবল নন। ওভার।
৫৪: ২৬-এর জন্য ৫৪। আগে দুবার বার্তা পাস করা হয়েছে। অন্তত তাকে তো জানিয়ে দিন। তার জন্য জরুরি বার্তা আছে এবং তাকে ডাকতে হবে। ওভার।
২৬: ৫৪-এর জন্য ২৬। দুবারই তাকে জানানো হয়েছে, তিনি বলেছেন আমি কথা বলছি এবং এভাবে ইমামের সাথে তিনি বাইরে চলে গেছেন। আবার এখন লোক পাঠিয়েছি, খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি। ওয়েট আউট। আউট।
২৬: ৫৪-এর জন্য ২৬। আবারও লোক পাঠিয়েছিলাম, খোঁজ নিয়েছি, তিনি বাইরে চলে গেছেন। যখন আসবেন, তখন আবারও আমি আপনাকে জানিয়ে দেব। ওভার।
৫৪: অন্য কোনো, অন্য যেকোনো অফিসারকে ডেকে দিন। ওভার।
২৬: ৫৪-এর জন্য ২৬। এই মুহূর্তে এখানে কোনো অফিসার নেই। ওভার। ওয়েট আউট।
৫৪: ২৬-এর জন্য, সংশোধন, ২৬-এর জন্য ৫৪, যখনই মারখোর আসেন, খুব তাড়াতাড়ি ডাকতে হবে। তার জন্যই বার্তা আছে। অন্য কোনো লোককে পাঠান। তিনি ওখানেই কাছাকাছি কোথাও থাকবেন; তাকে তাড়াতাড়ি ডাকার চেষ্টা করুন। আউট।
মারখোর: ৫৪-এর জন্য ২৬। মারখোর শুনছেন। আপনার বার্তা পাঠান। ওভার।
৫৪: ২৬-এর জন্য ৫৪, ওয়ান ওয়েট আউট, ওয়ান ওয়েট আউট। হ্যালো ৫৪, ২৬-এর জন্য ৫৪, হ্যালো ২৬-এর জন্য ৫৪, অনুগ্রহ করে মারখোরকে সেটে ডাকুন। ওভার।
মারখোর: ৫৪-এর জন্য ২৬, মারখোর শুনছেন। পাঠান। ওভার।
৫৪: ৫৪। আমি কন্ট্রোলের কাছ থেকে কিছু কাজের জন্য দুটি লরি পাঠানোর নির্দেশ পেয়েছি। রুট ইত্যাদির বিস্তারিত তথ্য আপনাকে দিতে হবে। অনুগ্রহ করে পাঠান। ওভার।
মারখোর: ৫৪-এর জন্য ২৬। ওই লরিগুলো প্রেসিডেন্টস হাউসে পাঠিয়ে দিন। আমি তাদের সেখান থেকে পরবর্তী নির্দেশ দেব। ওভার।
৫৪: ২৬-এর জন্য ৫৪। কী ধরনের পাহারাদার প্রয়োজন? ওভার।
মারখোর: ৫৪-এর জন্য ২৬। তাদের এখান থেকে কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহন করার কথা। তাই না, ...সেই অনুযায়ী পাহারাদার আনতে হবে। ওভার।
৫৪: ২৬-এর জন্য ৫৪। রজার। আউট।
৭৭: ৭৭। বার্তা। ওভার। ৭৭, ৭৭, বার্তা। ওভার।
৫৪: ৫৪, বার্তা। ওভার। ৫৪, ৫৪। পাঠান। ওভার।
অজ্ঞাত: কল সাইন ৭৭-এর ইমাম সেখানে কাছাকাছি আছেন। ওভার।
৫৪: ৫৪, ৫৪। না। আউট।
অজ্ঞাত: ৫৪। কল সাইন ৭৭ আপনার অবস্থানে এসেছে। তাকে কোথাও খুঁজে দেখুন; আমার মনে হয় স্কুলের কাছাকাছি হবে। যদি সেখানে থাকে, তবে তাকে বলুন, যেন সেট খোলে। ওভার।
৫৪: ৫৪। এখানে নেই। ৭৭ এখানে নেই এবং আমরা জানি না, সে কোথায়। আউট।
৯৯: ৯৯। বার্তা। ওভার।
অজ্ঞাত: পাঠান। ওভার।
৯৯: ৯৯। এখান থেকে টেলিফোনে...টেলিফোন করুন যে সেখানে কল সাইন ৭৭ যদি থাকে, তবে তাকে বলুন নিজের সেট খুলতে। ওভার।...এখানে যদি অন্য কোনো লোক আসে, তবে আমি তাকে পাঠাব। টেলিফোন এখান থেকে একটু দূরে এবং সেখানে আমার কাছে যে টেলিফোনটি, ছিল সেটি...
[বেতার কথোপকথন সমাপ্ত]