যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির ‘জন এফ কেনেডি সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টস’-এর সামনে গতকাল শুক্রবার বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন সাংবাদিক, সংগীতশিল্পী ও লেখকেরা। সমাবেশে হলিউড অভিনেত্রী জেন ফন্ডা মার্কিন নাগরিকদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘নীরবতা ভাঙার’ এবং ‘স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর’ আহ্বান জানান।
Visit moryak.biz for more information.
অভিনেত্রী জেন ফন্ডার গঠিত ‘কমিটি ফর দ্য ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট’-এর আয়োজনে এই বৃষ্টিভেজা কিন্তু প্রতিবাদী সমাবেশে প্রায় ১০০ জন আমন্ত্রিত অতিথি উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বক্তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে বই নিষিদ্ধ করা, রাজনৈতিক বিধিনিষেধ এবং বাক্স্বাধীনতার ওপর অন্যান্য হুমকির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ফন্ডা বলেন, ‘আজ বই নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। এই প্রশাসন যেসব ঐতিহাসিক ঘটনা ভুলে যেতে চায়, সেগুলো চিত্রিত করে নির্মিত ফলক ও স্মৃতিস্তম্ভ সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। জাদুঘর, ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর দ্য আর্টস, স্টেট আর্টস কাউন্সিল, পাবলিক ব্রডকাস্টিং—সবকিছুরই অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।’
বিক্ষোভের পটভূমি হিসেবে কেনেডি সেন্টারকে বেছে নেওয়াটা ছিল পরিকল্পিত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই জাতীয় শিল্প কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন, ‘ওক’ অনুষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছেন, এর মার্বেল দেয়ালে নিজের নাম লিখিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, সংস্কারকাজের জন্য এটি দুই বছর বন্ধ থাকবে। চলতি সপ্তাহ থেকেই সেখানে কয়েক ডজন কর্মীকে ছাঁটাই করা শুরু হয়েছে।
ফন্ডা মন্তব্য করেন, শিল্পীরা যখন আদর্শগত দাবি ও ইতিহাসের বর্ণবাদী চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টার কাছে নতি স্বীকার করতে অস্বীকার করলেন, তখন কেন্দ্রটিকে কার্যত স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কৌশল হিসেবে ট্রাম্প মেরামতের অজুহাতে এটি অন্তত দুই বছরের জন্য বন্ধ করে দিলেন। তিনি এমনকি এটিকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার ইঙ্গিতও দিয়েছেন।
ফন্ডা প্রশ্ন করে বলেন, তিনি কী করবেন? তিনি কি এখানে আরেকটি বলরুম বানাবেন, যেখানে তিনি নাচবেন, আর যখন তাঁর দেশ পুড়ছে, তখন নিরোর মতো বাঁশি বাজাবেন?
হলিউড অভিনেত্রী জেন ফন্ডা৮৮ বছর বয়সী এই অভিনেত্রীর এক বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার রয়েছে। তিনি দুটি অস্কার জিতেছেন এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় থেকেই তিনি একজন সক্রিয় কর্মী। গত বছর তিনি ‘কমিটি ফর দ্য ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট’ আবার চালু করেন। এটি মূলত ম্যাকার্থি যুগের একটি উদ্যোগ, যা তাঁর বাবা হেনরি ফন্ডা হলিউডের কালো তালিকাভুক্তকরণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে শুরু করেছিলেন।
জেন ফন্ডা বলেন, ‘কমিটি অনুভব করছে, আমাদের গণতন্ত্রের ভিত্তি প্রথম সংশোধনীর ওপর আক্রমণের গভীরতা প্রকাশ করার সময় এসেছে।’ তিনি গণমাধ্যম ও সাধারণ নাগরিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘এখন সময় এসেছে আপনাদের নীরবতা ভাঙার এবং দ্রুত জেঁকে বসা স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার। আমরা জানি, যখন ভয় জেঁকে বসে, তখন নীরবতা ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের সেটা হতে দেওয়া যাবে না।’
‘আর্টিস্টস ইউনাইটেড ফর আওয়ার ফ্রিডমস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সংবাদপত্রের ওপর প্রশাসনের দমনপীড়নের কঠোর সমালোচনা করা হয়। বর্ষীয়ান সম্প্রচারক জয় রিড এবং জিম অ্যাকোস্টা রাজনৈতিক চাপ ও একচেটিয়া করপোরেট নিয়ন্ত্রণের কারণে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়া গণমাধ্যমের হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁরা সংবাদমাধ্যমকে মুক্ত স্বাধীন থেকে কথা বলার আহ্বান জানান।
জয় রিড বলেন, ‘আমরা একধরনের স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে বাস করছি। যখন প্রতিটি সংবাদপাঠক বা সাংবাদিক এটিকে স্বৈরতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদ বলছেন না, তখন বুঝবেন গণমাধ্যম কলঙ্কিত অথবা সত্য বলতে লজ্জিত। যদি এটি স্বৈরাচারের মতো আচরণ করে, স্বৈরাচারের মতো গ্রেপ্তার করে, প্রেসিডেন্টের মুখ দিয়ে মুদ্রা তৈরি করে, কেনেডি সেন্টার দখল করে, সুপ্রিম কোর্ট তার সামনে নতজানু হয় এবং হাউস স্পিকার প্রেসিডেন্টকে ভুয়া পদক দেয়—তবে বাছা, এটি একটি স্বৈরাচারী শাসনই।’
মিডিয়া পলিসি ওয়াচডগ ‘ফ্রি প্রেস’-এর সহ-প্রধান নির্বাহী জেসিকা গঞ্জালেজ হোয়াইট হাউসের কৃপা পাওয়ার জন্য বিলিয়নিয়ারদের মিডিয়া সাম্রাজ্য কিনে নেওয়ার বিপদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। তিনি প্যারামাউন্ট এবং ওয়ার্নার ব্রাদার্সের প্রস্তাবিত একীভূতকরণের নিন্দা জানিয়ে বলেন, অলিগার্করা (প্রভাবশালী ধনীরা) পদ্ধতিগতভাবে বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করছে।
প্রবীণ লোকসংগীতশিল্পী জোয়ান বায়েজ বলেন, ‘তিনি তাঁর মর্যাদাপূর্ণ কেনেডি সেন্টার সম্মাননা ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, ফিরে দেওয়া মানে পরাজয় মেনে নেওয়া। এর অর্থ একজন অত্যাচারীর কাছে নতি স্বীকার করা। আমি এই সম্মাননা ধরে রাখব এবং আপনাদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাব।’
বায়েজ এবং গায়িকা ম্যাগি রজার্স মিলে বব ডিলানের ‘দ্য টাইমস দে আর আ-চেঞ্জিং’ গানটি পরিবেশন করেন।
ফন্ডা ১৯৭০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে তথাকথিত ‘বাজে শিল্প’ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘আমরা যদি এখনই সচেতন না হই এবং এসব বন্ধ না করি, তবে আমরা সেই দিকেই যাচ্ছি।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তৃতা করেছেন ঔপন্যাসিক অ্যান প্যাচেট, কমেডি লেখক বেস কাল্ব, অভিনেতা বিলি পোর্টার, গ্রিফিন ডান, স্যাম ওয়াটারস্টন প্রমুখ।
