সূর্য পশ্চিম আকাশে নরম হয়ে ঝুঁকে পড়েছে, ধীরে ধীরে বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গোধূলির কমলা আলো সরু রেখার মতো নেমে আসে বনঘেরা নদীর জলে, আর সেই আলো-ছায়ার খেলায় ভেসে ওঠে এক মায়াবী দৃশ্যপট। মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে নিজের হাতে এঁকে রাখছে কোনো গোপন ছবি। এই ছবি চোখে যতটা ধরা দেয়, তার চেয়ে বেশি ছুঁয়ে যায় মন।
Visit rouesnews.click for more information.
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণে রুহিতা সৈকতে এমন গোধূলি যেন প্রতিদিনই এক নতুন জন্ম নেয়। এখানে সন্ধ্যা নামা মানে কেবল আলো ফুরোনো নয়; বরং দিন আর রাতের মাঝামাঝি এক ধ্যানমগ্ন প্রহর, যেখানে প্রকৃতি নিজেকে নিঃশব্দে নতুন করে রচনা করে।
পাথরঘাটা নদী, সাগর আর মানুষের সহাবস্থানে গড়ে ওঠা এক উপকূল। এর এক নিভৃত কোণে দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে ছিল রুহিতা—নির্জন, অচেনা, অথচ অপার সৌন্দর্যে ভরপুর এক সৈকত।
সময় বদলাচ্ছে। ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে সেই আড়াল। অচেনা পথ চিনে নিচ্ছে মানুষের পদচারণ, আর পর্যটকদের আগ্রহে রুহিতা এখন জেগে উঠছে নতুন এক পরিচয়ে। এখানে ব্যস্ততা ও কোলাহল নেই। বরং আছে শান্ত ঢেউ, দীর্ঘ নির্জন তটরেখা আর এক গভীর নীরবতা, যা প্রকৃতিকে অন্য রকমভাবে অনুভব করতে শেখায়। ভোরের প্রথম আলো সাগরের বুকে ছড়িয়ে পড়লে আকাশ আর জলের মিশেলে তৈরি হয় এক কোমল স্বপ্নদৃশ্য।
দুপুরে সেই দৃশ্য বদলে যায়। সূর্যের আলোয় বালুকাবেলা সোনালি হয়ে ওঠে, বাতাসে মিশে থাকে লবণাক্ত ঘ্রাণ, ঢেউয়ের শব্দে তৈরি হয় এক ছন্দময় প্রশান্তি। রুহিতার প্রতিটি মুহূর্ত যেন একেকটি নিঃশব্দ চিত্র, যেখানে প্রকৃতি নিজের গভীরতম রূপ উন্মোচন করে।
এই সৈকতের পাশেই বিস্তৃত জেলেপল্লি। ভোর হতেই মাছ ধরার নৌকার সারি সাগরে পাড়ি জমায়, আর বিকেলে ফিরে আসে দিনের সংগ্রাম আর গল্প নিয়ে। জেলেদের কর্মচাঞ্চল্য মিলিয়ে এখানে ধরা পড়ে উপকূলীয় জীবনের এক অনাড়ম্বর, বাস্তব রূপ। পর্যটকদের কাছে এটি শুধু দৃশ্য নয়, একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতা।
পাথরঘাটার ভূপ্রকৃতিই এই সৌন্দর্যের পেছনে বড় কারণ। দক্ষিণের দীর্ঘ ও প্রধান তিন নদ-নদী বিষখালী, বলেশ্বর ও পায়রা—এখানেই পতিত হয়েছে বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলে। নদী আর সাগরের এই মিলনেই তৈরি হয় রুহিতার জলে অনন্য রঙের খেলা—কখনো কাদামাটির আভা, কখনো গভীর নীলের বিস্তার। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে বদলে যায় তটরেখা, বদলে যায় দৃশ্যপট—প্রতিদিন যেন নতুন এক রুহিতা।
পাথরঘাটা পৌরসভা থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে রুহিতা সৈকতের অবস্থান। পাথরঘাটা শহরের গোলচত্বর থেকে ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল কিংবা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে যাওয়া যায় সেখানে। তবে সেখানে যাওয়ার রাস্তা এখনো মসৃণ নয়। রুহিতা সৈকতের পাশেই রয়েছে পদ্মা সৈকত ও হরিণঘাটা বনাঞ্চল। রয়েছে বলেশ্বর নদের মধ্যে জেগে ওঠা বিহঙ্গ দ্বীপ। পর্যটকদের বিহঙ্গ দ্বীপ ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য সেখানে কয়েকটি নৌযান রয়েছে।
সড়ক যোগাযোগ মসৃণ না হওয়ায় রুহিতা সৈকতের সৌন্দর্য এত দিন প্রায় সবার অগোচরে ছিল। তবে বছর দুয়েক ধরে কিছু পর্যটক এখানে আসছেন। তবে উন্নত সড়ক যোগাযোগ, বিশ্রামাগার ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় এখনো অবহেলায় পড়ে আছে প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্যের এই জায়গা।
ঈদের দ্বিতীয় দিন রোববার এই সৈকতে গিয়ে দেখা যায়, পর্যটকদের ভিড়। শিশুরা দোলনায় দোল খাচ্ছে, কেউ বালিয়াড়িতে হাঁটছেন, ছবি তুলছেন। আবার কেউ পর্যটক বোটে বিহঙ্গ দ্বীপ কিংবা তিন নদ-নদী আর সাগর মোহনার মায়াবী দৃশ্য ঘুরে দেখার জন্য যাচ্ছেন।
ঈদে বরিশাল থেকে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে এসেছেন ব্যাংকার আখিরুজ্জামান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে আগেও এসেছি। পথঘাট ভালো না হওয়ায় আসতে বেশ ধকল যায়। তবু এখানে আসার পর সব কষ্ট মুছে যায়। তাই আবার দ্বিতীয়বার এসেছি।’
ঈদের ছুটিতে অনেকে বেড়াতে এসেছেন পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণে রুহিতা সৈকতেআমিনুল ইসলাম খুলনা থেকে শ্বশুরবাড়ি এসেছেন। সেখান থেকে বেড়াতে এসেছেন রুহিতায়। তিনি আরও বলেন, ‘রুহিতার সৌন্দর্যের ছবি-ভিডিও দেখেছি। আবার যাঁরা এখানে এসেছেন, তাঁদের কাছে বর্ণনা শুনেছি। তাই এবার ঈদের ছুটিতে বেড়াতে এসে এখানে আসার লোভ সামলাতে পারিনি। সত্যি জায়গাটা খুব সুন্দর।’ যাতায়াতের ভোগান্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে রাস্তাঘাট ভালো না হওয়ায় জায়গাটি জনপ্রিয় হচ্ছে না। এমন সুন্দর একটি স্থানে আসতে এত ভোগান্তি! দেখে আসলে হতাশ হয়েছি।’
এ বিষয়ে পাথরঘাটার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপস পাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে সদ্য যোগদান করেছি। ওই এলাকা পরিদর্শন করে এখানে পর্যটনবান্ধব যে পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন, সেই ব্যাপারে সরকারকে অবহিত করব। একই সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ভালো করতে উদ্যোগ নেব।’
